আধুনিক বিশ্বের নানা উত্তাল প্রবাহের মাঝেও ইসলাম নারীর জন্য একটি সুদৃঢ় চরিত্রকাঠামো নির্ধারণ করেছে, যা কেবল তার ব্যক্তিজীবন নয়, সমাজ ও জাতিকেও আলোকিত করতে পারে। কোরআন ও হাদিসে একজন পূর্ণাঙ্গ মুমিন নারীর যে বৈশিষ্ট্যসমূহ তুলে ধরা হয়েছে, তা মানবতার জন্য এক মহামূল্যবান পথনির্দেশ। আদর্শ মুসলিম নারীর আবশ্যক দশটি গুণের কথা তুলে ধরা হলো।
১. ঈমানদার হওয়া: ঈমান ছাড়া কোনো আমল কবুল হয় না। ঈমানই মানুষকে আল্লাহর সঙ্গে সংযুক্ত করে। আল্লাহতায়ালা বলেন, যে কেউ নেক আমল করে, সে পুরুষ হোক বা নারী এবং সে মুমিন, আমি তাকে নিশ্চয়ই একটি সুন্দর জীবন দান করব। ( সুরা নাহল, ৯৭)
ঈমানদার নারী হলো সেই নারী, যিনি সর্বাবস্থায় আল্লাহর বিধান মান্য করেন এবং কোরআন-হাদিস অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করেন। তার ঈমান তাকে দুনিয়ার লোভ থেকে রক্ষা করে এবং পরকালীন মুক্তির পথ দেখায়।
২. নিয়মিত নামাজ আদায় করা: নামাজ হলো ঈমানের প্রমাণ ও মুমিনের মিরাজ। এর মাধ্যমে আত্মার শুদ্ধি ও আল্লাহর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন হয়। এটি একজন নারীকে সংযম, ধৈর্য ও আত্মিক শক্তি দেয়। রাসুল (সা.) বলেন, নামাজ দ্বীনের স্তম্ভ। (তিরমিজি, ২৬১৬)
যে নারী নামাজে অটল, সে গুনাহ থেকে দূরে থাকে এবং সংসারেও বরকত লাভ করে। নামাজ একজন নারীর দিন যাপনকে সুশৃঙ্খল ও আল্লাহভীতির আলোয় আলোকিত করে।
৩. লজ্জাশীলতা ও পর্দাশীলতা: এটি ঈমানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। লজ্জা নারীসুলভ গুণ এবং পর্দাশীলতা ইসলামের একটি মৌলিক আদর্শ। রাসুল (সা.) বলেন, লজ্জা ঈমানের অঙ্গ। (মুসলিম, ৩৬)। উক্ত বিষয়ে আল্লাহতায়ালা বলেন, তারা যেন নিজের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, যা সাধারণত প্রকাশ হয় না। (সুরা নূর, ৩১)। যে নারী পর্দা ও শালীনতা বজায় রাখে, সে নিজের মর্যাদা রক্ষা করে এবং সমাজে শালীনতা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখে।
৪. সত্যবাদিতা ও আমানতদারি: সত্যবাদিতা একজন মুমিনের অলংকার এবং চরিত্রের মূলস্তম্ভ। আল্লাহতায়ালা বলেন, হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্য কথা বলো। (সুরা আহজাব, ৭০)। রাসুল (সা.) বলেন, যার মাঝে আমানত নেই, তার মাঝে ঈমানও নেই। (মুসনাদে আহমদ, ১২৫৬৩)।
একজন সত্যবাদী ও আমানতদার নারী পরিবারের আস্থা, শান্তি ও নিরাপত্তার প্রতীক। তিনি সমাজে একটি অনুকরণীয় চরিত্র হয়ে ওঠেন।
৫. মা-বাবা ও স্বামীর আনুগত্য ও সেবা: এটি যেন জান্নাতের চাবি। ইসলাম নারীকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন করেছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমার রব আদেশ দিয়েছেন, তুমি তার ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে’(সুরা বনী ইসরাঈল : ২৩)। রাসুল (সা.) বলেন, যে নারী পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, রমজানের রোজা রাখে, স্বামীর আনুগত্য করে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (ইবনে হিব্বান, ৪১৬৩)। একজন নারী যখন মা-বাবা ও স্বামীর সন্তুষ্টিলাভে সচেষ্ট থাকেন, তখন আল্লাহ তার জীবনে রহমতের বারি বর্ষণ করেন।
৬. কোরআন তিলাওয়াত ও ইলম অর্জনে আগ্রহী হওয়া: ইলম অর্জন নারী-পুরুষ সবার জন্য ফরজ। রাসুল (সা.) বলেন, তোমাদের মধ্যে উত্তম সেই, যে কোরআন শেখে এবং অন্যকে শেখায়। (বোখারি, ৫০২৭)। কোরআন পাঠ নারীর অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে, চিন্তাকে আলোকিত করে এবং জ্ঞানকে কল্যাণে পরিণত করে। একজন আলিমা নারী তার সন্তানদেরও দ্বীনের পথে পরিচালিত করতে পারে।
৭. গিবত থেকে বিরত থাকা: গিবত মানুষের আত্মা ধ্বংস করে দেয়। আল্লাহতায়ালা বলেন, তোমাদের কেউ যেন অপরজনের গিবত না করে। কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের মাংস খেতে পছন্দ করবে? (সুরা হুজুরাত, ১২)। একজন নারীর উচিত অন্যের সম্মান রক্ষা করা এবং পেছনে বদনাম না করা। গিবত বর্জন এক প্রকার আত্মার সিয়াম।
৮. কৃপণতা ও অপব্যয় থেকে দূরে থাকা: ইসলাম অপচয় ও কৃপণতা উভয়কেই নিন্দা করেছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই। (সুরা ইসরাঈল, ২৭)। একজন মধ্যপন্থি নারী ঘরের সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনায় দক্ষ হয়, স্বামীর উপার্জন সযত্নে ব্যয় করে এবং সংসারে বরকত আনে।
৯. পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতা বজায় রাখা: পরিচ্ছন্নতা শুধু বাহ্যিক নয়, বরং আত্মিক শুদ্ধিও। রাসুল (সা.) বলেন, পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অর্ধেক। (মুসলিম, ২২৩)। একজন নারীর শরীর, পোশাক, বাসস্থান ও হৃদয় সবকিছু পরিচ্ছন্ন থাকলে তার জীবনে নেমে আসে প্রশান্তি ও সৌন্দর্য।
১০. কষ্ট ও বিপদে ধৈর্য ধরে থাকা: ধৈর্য একটি মহৎ গুণ। এটি আল্লাহর নৈকট্য লাভের পথ। আল্লাহতায়ালা বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন। (সুরা বাকারা, ১৫৩)। জীবনের প্রতিটি কঠিন সময়েই একজন নারী যদি ধৈর্যধারণ করেন, তা হলে তার অন্তরে আল্লাহর সান্ত্বনা আসে এবং পরিণামে জান্নাতের দরজা খুলে যায়।
লেখক: শিক্ষার্থী খাদিজাতুল কুবরা মহিলা মাদরাসা লক্ষ্মীপুর