সম্পত্তির উত্তরাধিকার নিয়ে পারিবারিক কলহ নতুন কিছু নয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেকে ভাইবোনদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে নানারকম কৌশল ও ছলচাতুরীর আশ্রয় নেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এমন ঘটনা প্রায়শই দেখা যায়, যেখানে ভাইয়েরা বোনদের ঠকিয়ে বা কম দিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করার চেষ্টা করেন। এর ফলে বোনেরা তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হন, যা শুধু অন্যায়ই নয়, সামাজিকভাবেও অগ্রহণযোগ্য।
কৌশলী বঞ্চনার চিত্র
ভাইদের এই অপকৌশলগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো, বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে সম্পদ বণ্টনে বিলম্ব করা। অনেক সময় বলা হয়, ভিটেবাড়িতে বোনেরা পায় না, যা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। এটি একটি প্রচলিত ভুল ব্যাখ্যা, যা বোনদেরকে তাদের পৈতৃক ভিটার অধিকার থেকে বঞ্চিত করার একটি কৌশল। এই ধরনের কথার মাধ্যমে বোনদের মনে দ্বিধা তৈরি করা হয় এবং তাদের প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করা হয়।
আবার দেখা যায়, ভাইয়েরা যৌথ সম্পত্তি নিজেদের প্রয়োজনে বিক্রি করে দেন। যখন বোনেরা তাদের ভাগের কথা তোলেন, তখন বলা হয় সম্পত্তি নেই অথবা নামমাত্র কিছু দিয়ে তাদের ভুলিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়। কেউ কেউ ছোটখাটো উপহার বা টাকাপয়সা দিয়ে বোনদের তুষ্ট রাখার চেষ্টা করেন, যাতে তারা বড় ধরনের কোনো দাবি নিয়ে না আসেন। বোনেরা অনেক সময় লজ্জা বা সামাজিকতার কারণে ভাইদের কাছে তাদের পাওনা চাইতে পারেন না, যা ভাইদের জন্য আরও সুবিধা করে তোলে।
বিচার-সালিশের নামে হয়রানি
যখন বোনেরা সরাসরি তাদের অধিকার দাবি করেন, তখন অনেক ভাই বলেন, লোকজন নিয়ে আসো, কেমনে কী নেবে ফয়সালা করো। আপাতদৃষ্টিতে এই কথাটি খারাপ না শোনালেও, এর পেছনের উদ্দেশ্য থাকে বোনদেরকে ঝামেলার মধ্যে ফেলে দেওয়া এবং সালিশ-পঞ্চায়েতের মাধ্যমে তাদেরকে কম দিয়ে পার পাওয়ার চেষ্টা করা। আমাদের সমাজে প্রায়শই দেখা যায়, সালিশকারীরা বোনদেরকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত করার পক্ষে না থাকলেও, শরিয়ত অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ অধিকার দেওয়ার পক্ষে থাকে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভাইদের স্বার্থকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং বোনদেরকে কোনোমতে বুঝিয়ে বিদায় করা হয়। একজন নারীর পক্ষে এই ধরনের বিচার-সালিশ মোকাবিলা করা এমনিতেই কঠিন, তার ওপর সমাজের এ ধরনের মনোভাব তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে।
সমাধানের সরল পথ ও নৈতিক দায়বদ্ধতা
যদি ভাইয়েরা আন্তরিক হতেন, তা হলে কোনো রকম লুকোচুরি বা ছলচাতুরী না করে নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে যথাযথভাবে সম্পদ বণ্টন করে নিতে পারতেন। যদি নিজেদের মধ্যে মতানৈক্য দেখা দিত, তা হলে দু-চারজন বুঝমান ব্যক্তিকে ডেকে বিষয়টির সুরাহা করে নেওয়া যেত। ভাইদের মনে রাখা উচিত, কোনো প্রকার কৌশল অবলম্বন করে বোনদের সম্পদ ভোগ করা মারাত্মক অপরাধ। আল্লাহতায়ালা আমাদের সব ছলচাতুরী সম্পর্কে অবগত।
তাই তাদের জন্য সবচেয়ে কল্যাণকর হলো, সরলতার সঙ্গে বোনদেরকে তাদের অধিকার যথাযথভাবে বুঝিয়ে দেওয়া। ভাইয়েরা যেমন নিজেদের মধ্যে সম্পদ বণ্টন করে নেওয়াকে খারাপ বা অকল্যাণকর মনে করেন না, তেমনি বোনদের প্রাপ্য বুঝিয়ে দেওয়ার সময়ও যেন তাদের মনোভাবের পরিবর্তন না আসে। পারিবারিক শান্তি এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে হলে এই ন্যায়পরায়ণতা অত্যন্ত জরুরি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাওফিক দান করুন।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক