খাদ্যগ্রহণ আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি অপরিহার্য অংশ। পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান হিসেবে এ বিষয়েও ইসলামে রয়েছে সুনির্দিষ্ট কিছু সুন্নত, আদব ও বিধি-বিধান। ইসলামে খাদ্যগ্রহণকে ইবাদতের অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে কিছু মৌলিক নীতি অনুসরণ করা অপরিহার্য। নিচে কোরআন ও হাদিসের আলোকে খাদ্যগ্রহণের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত ও আদব তুলে ধরেছেন
হালাল ও পবিত্র খাদ্যগ্রহণ: ইসলামের প্রথম ও প্রধান বিধান হলো কেবল হালাল এবং পবিত্র খাদ্য গ্রহণ করা। আল্লাহতায়ালা বলেন, হে মুমিনগণ, তোমাদেরকে যেসব পবিত্র রিজিক দেওয়া হয়েছে তা থেকে খাও ও পান করো (সুরা আল-বাকারা, ১৭২)।
হালাল খাদ্য বলতে সেসব খাবারকে বোঝায়, যা ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী অনুমোদিত এবং অবৈধ পন্থায় উপার্জিত হয়নি।
খাওয়ার আগে ও পরে হাত ধোয়া: পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ইমানের অঙ্গ। খাবার গ্রহণের আগে এবং পরে হাত ধোয়ার নিয়ম রয়েছে। এটি স্বাস্থ্যবিধি রক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাসুল (সা.) বলেছেন, কেউ যেন ঘুম থেকে উঠে হাত না ধুয়ে খাবারের ভেতর হাত না দেয় (আবু দাউদ, হাদিস ১০৫)। এর মাধ্যমে খাদ্যবাহিত রোগ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।
বিসমিল্লাহ বলে শুরু করা: খাবার শুরু করার আগে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ বলা অপরিহার্য। এর মাধ্যমে মুসলিম তার খাদ্যগ্রহণের কাজ আল্লাহর নামে শুরু করেন। তবে কেউ শুরুতে বিসমিল্লাহ বলতে ভুলে গেলে, মাঝখানে মনে পড়া মাত্রই ‘বিসমিল্লাহি আউয়ালাহু ওয়া আখিরাহু’ বলতে হবে (তিরমিজি, ১৮৫৮)। বিসমিল্লাহ বলা খাবারের বরকত বাড়ায়।
ডান হাত দিয়ে খাওয়া: খাবার গ্রহণ ও বিনিময়ের ক্ষেত্রে ডান হাত ব্যবহার করা উচিত। মহানবি (সা.) এ ব্যাপারে নির্দেশনা দিয়েছেন। রাসুল (সা.) বলেন, ‘কেউ যেন বাম হাত দ্বারা কিছু গ্রহণ না করে এবং তার দ্বারা কিছু প্রদানও না করে।’ এটি ডান হাতের পবিত্রতা ও শ্রেষ্ঠত্বের প্রতি ইঙ্গিত করে। (তিরমিজি, ১৮০০)
পেটভরে না খাওয়া: পেটভর্তি করে খাওয়া ইসলামে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। অতিরিক্ত খাদ্যগ্রহণ শারীরিক অসুস্থতার কারণ হতে পারে। রাসুল (সা.) বলেছেন, পেটকে তিন ভাগে ভাগ করে খাবার খাবে। পেটের এক ভাগ খাদ্য, এক ভাগ পানি এবং এক ভাগ বাতাসের জন্য খালি রাখা উচিত। (তিরমিজি, ৫১৯২)
খাবারের দোষ না ধরা: খাবারের দোষ ধরা থেকে বিরত থাকা উচিত। এটি রান্নাকারীর মনে কষ্ট দিতে পারে এবং আল্লাহর নেয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। নবিজি (সা.) কখনো খাবারের দোষ ধরতেন না। যদি তাঁর পছন্দ হতো, খেতেন; আর পছন্দ না হলে ছেড়ে দিতেন (বুখারি, ৩৫৬৩)।
খাবার অপচয় না করা: খাবার অপচয় করা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। আল্লাহতায়ালা বলেন, তোমরা পানাহার করো, কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না (সুরা আরাফ, ৩১)। রাসুল (সা.) পাত্রের শেষ অংশ পর্যন্ত চেটে খাওয়ার কথা বলেছেন, যাতে কোনো খাবার নষ্ট না হয়। অপচয়কারী শয়তানের ভাই হিসেবে পরিচিত।
খাবারের পর আলহামদুলিল্লাহ বলা: খাবার শেষ করার পর আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা অপরিহার্য। খাবারের পরে আলহামদুলিল্লাহ (সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য) বলা উচিত। আহারের পর ‘আলহামদুলিল্লা হিল্লাজি আতআমানি হাজা ওয়া রাজাকানিহি মিন গাইরি হাওলিন মিন্নি ওয়ালা কুওয়াহ’ দোয়াটি পাঠ করা উচিত (আবু দাউদ, ৪০২৩)।
হেলান দিয়ে না খাওয়া: হেলান দিয়ে খাওয়াকে ইসলামে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আমি হেলান দিয়ে খাই না (বুখারি, ৫৩৯৯)। এটি বিনয় এবং মধ্যমপন্থা অবলম্বনের একটি উদাহরণ। হেলান দিয়ে খেলে সাধারণত অতিরিক্ত খাওয়া হয়, যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
সবার সঙ্গে মিলেমিশে খাওয়া: খাবারে বরকত আনতে এবং সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করতে সবার সঙ্গে মিলেমিশে খাওয়াকে উৎসাহিত করা হয়েছে। রাসুল (সা.) সম্মিলিতভাবে খাবার গ্রহণকে উৎসাহিত করেছেন (ইবনে মাজাহ, ৩২৯৯)। এর মাধ্যমে পারস্পরিক ভালোবাসা ও সৌহার্দ বৃদ্ধি পায়।
লেখক: শিক্ষার্থী, টেকেরহাট পপুলার হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ, মাদারীপুর