ইসলামে দাওয়াত বা আল্লাহর পথে আহ্বান একটি মহান ও সর্বোত্তম নেক কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এটি নবি-রাসুলদের প্রধান দায়িত্ব ছিল এবং তাদের উত্তরসূরি হিসেবে উম্মতে মুহাম্মদীকেও এই দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। দাওয়াতের মাধ্যমে মানুষকে আল্লাহর নির্দেশনার পথে ফিরিয়ে আনা হয়, যা সমাজ, রাষ্ট্র এবং আখিরাতে কল্যাণের পথ সুগম করে।
‘দাওয়াত’ শব্দের অর্থ হলো আহ্বান করা, মনোযোগ আকর্ষণ করা, পৌঁছানো, আমন্ত্রণ জানানো, ডাকা, সাহায্য কামনা করা, কাউকে কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যের দিকে অনুপ্রাণিত করা, উৎসাহিত করা ইত্যাদি। ইংরেজিতে যাকে বলা হয় To invite, To convenc, to call ইসলামি পরিভাষায় দাওয়াত বলতে বোঝায়—মানবজাতিকে আল্লাহর দিকে, তাঁর তাওহীদের পথে এবং রাসুল (সা.)-এর দেখানো সুন্নাহর পথে আহ্বান করা। আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. আহমদ গালুশ বলেন, মানুষকে ইসলামের দিকে নিয়ে আসার জন্য কার্যত বা বাচনিক সকল প্রচেষ্টার অপর নাম ইসলামি দাওয়াত।
কোরআন ও হাদিসের আলোকে দাওয়াত
মহান আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, তাদের মধ্য হতে এমন একদল হওয়া উচিত, যারা মানুষের প্রতি দাওয়াত দেবে কল্যাণের দিকে, সৎকাজের আদেশ দেবে এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে। এরাই হচ্ছে সফলকাম। (সুরা আলে ইমরান) অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, আর কে আছে তার চেয়ে উত্তম কথা বলার, যে আল্লাহর দিকে আহ্বান করে, সৎকাজ করে এবং বলে, আমি অবশ্যই মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত? (সুরা ফুসসিলাত)
উপরিউক্ত আয়াতে কারীমা থেকে বোঝা যায়, আল্লাহর পথে মানুষকে ডাকাকে তিনি ‘সর্বোত্তম কথা’ ও সর্বোত্তম কাজ বলেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, তোমাদের মধ্যে যে কেউ কোনো মন্দ কাজ দেখবে, সে যেন তা হাত দিয়ে পরিবর্তন করে; যদি না পারে, তবে মুখ দিয়ে (বলে) তা পরিবর্তন করুক; তাও যদি না পারে, তবে অন্তরে ঘৃণা করুক—এটাই হলো ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর। (মুসলিম, ৪৯) অন্য হাদিসে আরও এসেছে, তোমরা আমার পক্ষ থেকে একটি আয়াত হলেও পৌঁছে দাও। (বুখারি, ৩৪৬১) এই হাদিসগুলো প্রমাণ করে যে, ইসলামি দাওয়াত কেবল আলেমদের একার কাজ নয়, বরং প্রতিটি মুসলমানের ওপর দায়িত্ব।
দাওয়াতের গুরুত্ব ও উপকারিতা
পৃথিবীতে যত জাতি আছে তার মধ্যে মুসলিম উম্মাহ হলো সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি। সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি বলে তাদের দায়িত্ব হলো সমগ্র মানবতাকে ভালো কাজ ও কল্যাণের দিকে আহ্বান করা, অন্যায় ও মন্দ কাজ কথা বিশ্বাস থেকে তাদের নিষেধ করা। এটি সর্বোত্তম কাজ। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন, তোমরা হলে সর্বোত্তম জাতি। মানুষের কল্যাণের জন্য যাদের বের করা হয়েছে। তোমরা সৎকাজের আদেশ দেবে আর মন্দকাজ থেকে নিষেধ করবে। (সুরা আল ইমরান, ১১০)
আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন
দাওয়াত একটি ইবাদত। এটি আল্লাহর অন্যতম নির্দেশ, যার মাধ্যমে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন সম্ভব।
সমাজে শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা: দাওয়াতের মাধ্যমে মানুষ সৎ ও ন্যায়পথে ফিরে আসে। এতে সমাজে অশান্তি, অপরাধ, অন্যায় হ্রাস পায়।
আখিরাতের মুক্তি : যারা দাওয়াত কার্যক্রমে যুক্ত থাকে, তাদের জন্য পরকালে মহান পুরস্কার ও জান্নাতের অঙ্গীকার রয়েছে।
মানবতার কল্যাণ: দাওয়াত মানুষকে তাদের প্রকৃত পরিচয় ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। ফলে তারা ন্যায়, সততা, সহানুভূতি ও ভালোবাসার পথে চলতে শেখে।
আজকের বাস্তবতায় দাওয়াতের প্রয়োগ
বর্তমান সময়ে ধর্মীয় মূল্যবোধের অবক্ষয়, পাশ্চাত্য সংস্কৃতির আগ্রাসন ও সামাজিক অনৈতিকতার প্রেক্ষাপটে দাওয়াতের প্রয়োজন আরও বেশি। এখন প্রযুক্তির কল্যাণে দাওয়াতের নতুন নতুন মাধ্যম সৃষ্টি হয়েছে—যেমন: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম (Facebook, YouTube, TikTok) ইসলামিক ব্লগ, ওয়েবসাইট ও অনলাইন দাওয়াত প্ল্যাটফর্ম, ইমেইল, লাইভ সম্প্রচার, মোবাইল অ্যাপসই-গ্লাস, এসএমএস বা ক্ষুদে বার্তা, অনলাইন মাহফিল। যদি প্রতিটি মুসলমান তার অবস্থান থেকে সত্যিকারের দায়িত্বশীলতার সঙ্গে দাওয়াত কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে, তবে সমাজে ব্যাপক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
দাওয়াত শুধু একজন আলেম বা দাঈর কাজ নয়, বরং প্রতিটি সচেতন মুসলমানের নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব। এটি এমন একটি নেক কাজ যা শুধু ব্যক্তিগত উন্নতিই ঘটায় না, বরং সমগ্র সমাজকে আলোকিত করে। তাই আসুন, আমরা দাওয়াতকে জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গ্রহণ করি এবং আল্লাহর পথে মানুষকে আহ্বান করে পৃথিবী ও পরকালের কল্যাণ অর্জন করি।
লেখক: সহকারী শিক্ষক, নাদির হোসেন উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়, পাংশা, রাজবাড়ী