শহিদ আরবি শব্দ। অভিধানে যার অর্থ হলো- সাক্ষী, প্রত্যক্ষদর্শী, উপস্থিত ও আল্লাহর দ্বীন ইসলাম বাস্তবায়নে জীবন দেওয়া। ইসলামের জন্য প্রাণ উৎসর্গকারী ইত্যাদি। একইভাবে শাহাদাত শব্দটিও। যার অর্থ সাক্ষ্য দেওয়া, সত্যায়ন করা ইত্যাদি। তবে পরিভাষায়, আল্লাহর পথে জীবন উৎসর্গ করা বা শহিদ হওয়াও শাহাদাত অর্থে ব্যবহৃত হয়। আর ইন্টারনেট ঘাঁটলেও আপনি এমনই পাবেন যে, ‘শহিদ’ শব্দের অর্থ ‘আত্মদানকারী’ বা ‘সাক্ষী’, যা সাধারণত সেই ব্যক্তিকে বোঝায় যিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। যেমন, দেশ, ধর্ম বা বিশ্বাসের জন্য মৃত্যুবরণ করা। এ শব্দটি আরবি ‘শাহীদ’ থেকে এসেছে। সাধারণ অর্থ ‘সাক্ষী’ হলেও, এটি পরে এমন ব্যক্তিদের বোঝাতে ব্যবহৃত হতে শুরু করেছে, যারা কোনো মহৎ উদ্দেশ্যে (যেমন, দেশের জন্য বা রাষ্ট্রের জন্য) আত্মত্যাগ করেন।
এ ছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা কঠিন রোগে মৃত্যু, নিজস্ব সম্পদ রক্ষায় মৃত্যু এবং মহামারি, পেটের পীড়া বা ভবন ধসে মারা যাওয়া, পানিতে ডুবে, আগুনে পুড়ে মৃত ব্যক্তিরাও শহিদের হুকুমের অন্তর্ভুক্ত। উল্লেখ্য যে, প্রকৃত শহিদ হওয়ার জন্য ইসলামের অনুসারী মুসলমান হওয়া আবশ্যক। উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, শহিদ এটি ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা। তবে বর্তমানে স্ব-দেশের জন্য জীবনদানকারী যেকোনো ব্যক্তির জন্যও শহিদ শব্দটি ব্যবহৃত হচ্ছে। হয়ে চলছে। কিংবা আত্মোৎসর্গকারী যেকোনো ব্যক্তিই হতে পারেন শহিদ। সুতরাং শহিদ আবুল বারাকাত ইত্যাদি বলা যেতে পারে।
একইভাবে ভাষাশহিদ, জুলাইশহিদ ইত্যাদি প্রয়োগ হতে পারে। আর যেহেতু শহিদ আরবি শব্দ এবং মুসলমানদের ব্যবহৃত একটি ধর্মীয় সর্বোচ্চ সম্মানজনক উপাধি বিশেষও। আল্লাহতায়ালা বলেন, যারা আল্লাহর পথে জীবন দিয়েছে, তাদেরকে মৃত মনে করবেন না। বরং তারা জীবিত, সৃষ্টিকর্তা তাদেরকে রিজিক দেন। আল্লাহ তাদেরকে যে অনুগ্রহ দান করেছেন, তাতে তারা খুশি। তোমাদের পরবর্তীদের থেকে যারা তাদের সঙ্গে এখনো মিলিত হয়নি, তাদের ব্যাপারে তারা অনেক উৎফুল্ল। আর তাদের কোনো ভয় নেই এবং কোনো দুঃখ নেই। ( সুরা আলে ইমরান, ১৬৯)
কোরআনে আরও বর্ণিত হয়েছে যে, ‘আর যারা আল্লাহর পথে হিজরত করে এবং নিহত হয় বা মারা যায়, তাদেরকে অবশ্যই তিনি উত্তম জীবিকা দান করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা অনেক ভালো রিজিকদাতা। তিনি তাদেরকে এমন এক স্থানে প্রবেশ করাবেন, সেখানে যা তাদেরকে খুশি করবে। আল্লাহ নিশ্চয়ই মহাজ্ঞানী ও পরম সহনশীল। ( সুরা হজ, ৫৮-৫৯)। এ আয়াত দুটোও আমাদেরকে এই নির্দেশনা প্রদান করে যে, আল্লাহর জন্য যারা ইসলামের পথে জীবন দেয়, তারা শহিদ এবং বিশেষ মর্যাদার অধিকারী।
সুতরাং এটিকে ঢালাওভাবে যার-তার জন্য ব্যবহার করা সমীচীন নয়। বিশেষ করে কোনো অমুসলিমের জন্য। বরং এগুলো অপপ্রয়োগ এবং নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি উদাসীনতা বা বিরূপ মনোভাবেরই নামান্তর। বারা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, লৌহবর্ম আবৃত এক ব্যক্তি আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর নিকট এসে বলল, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমি যুদ্ধে শরিক হব, না ইসলাম গ্রহণ করব?’ তিনি বললেন, ‘ইসলাম গ্রহণ করো, অতঃপর যুদ্ধে যাও।’ অতঃপর সে ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করে যুদ্ধে গেল এবং শাহাদাত লাভ করল। আল্লাহর রাসুল (সা.) বললেন, ‘সে কম আমল করে অধিক পুরস্কার পেল।’ (বুখারি, ২৮০৮)
আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেছেন, ‘জান্নাতে প্রবেশের পর আর কেউ দুনিয়ায় ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা করবে না, যদিও দুনিয়ার সকল জিনিস তাকে দেওয়া হয়। একমাত্র শহিদ ব্যতীত; সে দুনিয়ায় ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা করবে, যেন দশবার শহিদ হয়। কেননা সে শাহাদাতের মর্যাদা দেখেছে।’ (বুখারি, ২৮১৭)। এ জাতীয় ধর্মীয় বিশেষ পরিভাষা ব্যবহারে আমাদের সচেতন হওয়া উচিত। যাতে করে ধর্মীয় সভ্যতা-সংস্কৃতি অক্ষুণ্ণ থাকে। পরিভাষা ও অর্থ যেন নিরাপদ থাকে।
লেখক: খতিব, ভবানীপুর মাইজপাড়া হক্কানি জামে মসজিদ, গাজীপুর