নব দাম্পত্যজীবনের প্রথম রাত, অর্থাৎ বাসর রাত, প্রতিটি মুসলিম দম্পতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মুহূর্ত। এই রাতে স্বামী-স্ত্রীর প্রথম সাক্ষাৎ এবং একে অপরের প্রতি আচরণ কেমন হওয়া উচিত, সে বিষয়ে ইসলামে সুন্দর নির্দেশনা রয়েছে। এই নির্দেশনাগুলো অনুসরণ করা সুন্নাত এবং দাম্পত্যজীবনে বরকত নিয়ে আসে। নিচে বাসর রাতে করণীয় কিছু গুরুত্বপূর্ণ আদব আলোচনা করা হলো:
১. স্ত্রীর সঙ্গে কোমল আচরণ করুন
বাসর রাতে স্ত্রীর সঙ্গে কোমল আচরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম সাক্ষাতে স্ত্রীর মনে সংকোচ ও লজ্জা থাকা স্বাভাবিক। তাই তাকে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করানোর জন্য স্বামীর পক্ষ থেকে উষ্ণ ও সহানুভূতিশীল আচরণ কাম্য। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র জীবনে এর সুন্দর দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। আয়েশা (রা.)-এর বিবাহের সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর সঙ্গে অত্যন্ত কোমলভাবে আচরণ করেছিলেন এবং তাঁর লজ্জাকে সম্মান জানিয়েছিলেন। (মুসনাদে আহমাদ, ২৬৯২৫)। তাই স্ত্রীকে সময় দিন, তার সঙ্গে কথা বলুন এবং তাকে মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে দিন।
২. স্ত্রীর জন্য দোয়া করুন
প্রথম সাক্ষাতে স্ত্রীর মাথায় হাত রেখে দোয়া করা সুন্নাত। এই দোয়া নবদম্পতির জন্য আল্লাহর কাছে কল্যাণ ও বরকত চাওয়ার একটি সুন্দর মাধ্যম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যখন তোমাদের কেউ কোনো নারীকে বিয়ে করে, তখন সে যেন স্ত্রীর মাথার অগ্রভাগ ধরে এই দোয়াটি পড়ে।
বাংলা উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা খায়রহা ওয়া খাইরা মা জাবালতাহা আলাইহি, ওয়া আউজু বিকা মিন শাররিহা ওয়া মিন শাররি মা জাবালতাহা আলাইহি।
অর্থ: হে আল্লাহ! আমি তার কল্যাণটুকু এবং যে কল্যাণের ওপর তাকে সৃষ্টি করেছেন, অভ্যস্ত করেছেন সেটা প্রার্থনা করি। আর তার অনিষ্ট থেকে ও যে অনিষ্টের ওপর তাকে সৃষ্টি করেছেন, অভ্যস্ত করেছেন- তা থেকে আশ্রয় চাই। (সুনানে আবু দাউদ, ২১৬০)
এই দোয়াটি পাঠের মাধ্যমে স্বামী তার স্ত্রীর জন্য আল্লাহর কাছে মঙ্গল কামনা করেন এবং অমঙ্গল থেকে আশ্রয় চান, যা তাদের দাম্পত্যজীবনের ভিত্তিকে মজবুত করে।
৩. স্বামী-স্ত্রী একত্রে দুই রাকাত নামাজ আদায় করা
কিছু সলফে সালেহীন (নেককার পূর্বসূরিগণ) স্বামী-স্ত্রী একত্রে দুই রাকাত নামাজ আদায় করাকে মুস্তাহাব বলে গণ্য করেছেন। এই নামাজ আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং তাদের দাম্পত্যজীবনের সূচনায় বরকত চাওয়ার একটি মাধ্যম। আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রা.)-এর কাছে এক ব্যক্তি এসে যখন তার নববিবাহিতা স্ত্রীর অপছন্দ করার আশঙ্কার কথা জানালেন, তখন তিনি তাকে এই নামাজ পড়ার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, মিল-মহব্বত আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে। দূরত্ব ও ঘৃণা শয়তানের পক্ষ থেকে আসে। আল্লাহ যা হালাল করেছেন শয়তান সেটাকে তোমাদের কাছে অপছন্দনীয় করে তুলতে চায়। যখন সে তোমার কাছে আসবে তখন তাকে তোমার পিছনে দুই রাকাত নামাজ পড়ার নির্দেশ দেবে।(মুসান্নাফে ইবনু আবি শাইবা ১৭১৫৬)। এই নামাজ দম্পতির মধ্যে মানসিক শান্তি ও একে অপরের প্রতি ভালোবাসা বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে।
৪. সহবাসের পূর্বে নির্দিষ্ট দোয়া পাড়া
যখন স্বামী-স্ত্রী সহবাস করতে চাইবেন, তখন নির্দিষ্ট দোয়া পাঠ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে রক্ষা পাওয়ার এবং পবিত্র সম্পর্ককে আল্লাহর বরকতে পরিপূর্ণ করার একটি উপায়।
দোয়াটি হলো:
বাংলা উচ্চারণ: বিসমিল্লাহি আল্লাহুম্মা জান্নিবনাশ শায়তনা ওয়া জান্নিবিশ শায়তনা মা রজাকতানা।
অর্থ: আল্লাহর নামে শুরু করছি, হে আল্লাহ! আমাদেরকে তুমি শয়তান থেকে দূরে রাখ এবং আমাদেরকে তুমি যা দান করবে (মিলনের ফলে যে সন্তান দান করবে) তা থেকে শয়তানকে দূরে রাখ।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, এরপরে যদি তাদের দুজনের মাঝে কিছু ফল দেওয়া হয় অথবা বাচ্চা পয়দা হয়, তাকে শয়তান কখনো ক্ষতি করতে পারবে না। (বুখারি, ৪৭৮৭)। এই দোয়া সম্পর্কের পবিত্রতা বজায় রাখে এবং ভবিষ্যতের প্রজন্মের জন্য বরকত নিয়ে আসে।
৫. একে অপরের হকের প্রতি আল্লাহকে ভয় করা
দাম্পত্যজীবনের সূচনাতেই সৎভাবে সংসার করার দৃঢ় নিয়ত করা উচিত। স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই একে অপরের প্রতি আল্লাহর ভয় (তাকওয়া) রাখা আবশ্যক। আল্লাহতায়ালা সুরা নিসার ১৯ নম্বর আয়াতে বলেছেন, আর তোমরা তাদের সঙ্গে সৎভাবে জীবনযাপন করবে। তোমরা যদি তাদেরকে অপছন্দ কর তবে এমন হতে পারে যে, আল্লাহ যাতে প্রভূত কল্যাণ রেখেছেন তোমরা তাকেই অপছন্দ করছ।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে নারী পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, রমজান মাসে রোজা রাখে, নিজের যৌনাঙ্গ হেফাজতে রাখে, স্বামীর আনুগত্য করে; তাকে বলা হবে: তুমি জান্নাতের যে দরজা ইচ্ছা হয় সে দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ কর। (মুসনাদে আহমাদ, ১১৬১)। এই নির্দেশনাগুলো স্বামী-স্ত্রী উভয়কেই তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করে তোলে এবং একটি সফল ও বরকতময় দাম্পত্যজীবন গঠনে সহায়ক হয়।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক