ইসলামের সোনালি যুগে সাহাবিদের জীবনে প্রেম-ভালোবাসার এক অসাধারণ চিত্র দেখা যায়। ইসলামের আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে তারা স্ত্রীদের প্রতি যে মহব্বত ও সম্মান দেখিয়েছেন, তা আমাদের জন্য অনুকরণীয়। তাদের জীবনে প্রেম ছিল কেবল আবেগ নয়, বরং ইসলামের নির্দেশনা মেনে চলা এক পবিত্র সম্পর্ক।
ভালোবাসার এক অনন্য দৃষ্টান্ত
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সংস্পর্শে এসে সাহাবিরা হয়ে উঠেছিলেন প্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। হজরত আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রা.) ছিলেন এমনই একজন। একবার তিনি জিহাদ থেকে ফেরার পথে জানতে পারেন তার স্ত্রী অসুস্থ। এই খবর শুনে তিনি এতটাই অস্থির হয়ে পড়েন যে, দ্রুত বাড়ি পৌঁছার জন্য মাগরিব ও এশার নামাজ একসঙ্গে আদায় করে নেন। স্ত্রীর প্রতি তার এই উৎকণ্ঠা গভীর ভালোবাসারই বহিঃপ্রকাশ।
আরেকবার তার বাবা হজরত উমর (রা.) তার স্ত্রীকে তালাক দিতে বলেন। আবদুল্লাহ (রা.) চরম দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়েন। একদিকে প্রিয় স্ত্রীর প্রতি গভীর টান, অন্যদিকে পিতার আদেশ। তিনি তালাক দিতে রাজি হননি। অবশেষে হজরত উমর (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে বিষয়টি পেশ করেন এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশে তিনি স্ত্রীকে তালাক দেন। এই ঘটনা থেকে বোঝা যায়, স্ত্রীর প্রতি তার ভালোবাসা কতটা গভীর ছিল।
বিরহের করুণ সুর
সাহাবিদের জীবনে ভালোবাসা শুধু প্রাপ্তিতে সীমাবদ্ধ ছিল না, বিচ্ছেদের বেদনাও ছিল সমান তীব্র। হজরত হাসান (রা.) একবার কোনো কারণে স্ত্রীকে তালাক দেন। তালাকের খবর শুনে স্ত্রী কান্নায় ভেঙে পড়েন। স্ত্রীর এই কষ্ট দেখে হজরত হাসানও দিশাহারা হয়ে পড়েন এবং কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, যদি বাইন তালাক না হতো, তবে তিনি স্ত্রীকে অবশ্যই ফিরিয়ে নিতেন। এই বিরহ তাদের হৃদয়ে কতটা দাগ কেটেছিল, তা এর থেকেই স্পষ্ট।
হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর ছেলে সম্পর্কেও এমন একটি ঘটনা জানা যায়। তিনি তার স্ত্রীকে এতটাই ভালোবাসতেন যে, তাকে ছেড়ে জিহাদে যেতে চাইতেন না। তাই কিছু জিহাদে তিনি অংশ নিতে পারেননি। হজরত আবু বকর (রা.) বিষয়টি জানতে পেরে ছেলেকে স্ত্রীকে তালাক দিতে বলেন। পিতার চাপে তিনি তালাক দিলেও স্ত্রীর বিরহে কাতর হয়ে পড়েন এবং বিরহগাথা গেয়ে দিন কাটাতে থাকেন। ছেলের এই করুণ অবস্থা দেখে হজরত আবু বকর (রা.) নিজেও বিচলিত হয়ে পড়েন এবং অবশেষে ছেলেকে স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে বলেন।
মুগিসের প্রেম, বারিরার সিদ্ধান্ত
হজরত বারিরা (রা.) ও মুগিসের ঘটনা হাদিসের প্রসিদ্ধ একটি ঘটনা। বারিরা প্রথমে ছিলেন একজন বাঁদি। পরবর্তীতে তিনি মুক্তি লাভ করলে শরিয়তের বিধান অনুযায়ী তিনি মুগিসের সঙ্গে থাকবেন কি না, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা পান। শত অনুরোধ সত্ত্বেও বারিরা মুগিসের সঙ্গে না থাকার সিদ্ধান্ত নেন। এর পর মুগিস বারিরার বিরহে মদিনার অলিতে-গলিতে কাঁদতেন। এই ঘটনায় বোঝা যায়, ভালোবাসা কতটা গভীর হলে একজন মানুষ এমন করুণ অবস্থায় পড়তে পারে।
যে নারীরা ইসলামপূর্ব যুগে অবজ্ঞা ও অবহেলার শিকার ছিলেন, ইসলামের কল্যাণে তারাই লাভ করলেন অতুল সম্মান ও মর্যাদা। সাহাবিদের জীবনে আমরা দেখতে পাই, স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান ছিল তাদের ঈমানেরই অংশ। এই ভালোবাসার শিক্ষাই আজ আমাদের পারিবারিক জীবনে শান্তি ও সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনতে পারে। সাহাবিদের জীবনের এই ঘটনাগুলো কি আমাদের নিজেদের পারিবারিক সম্পর্কের ব্যাপারে নতুন করে ভাবতে উৎসাহিত করে না?
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক