ফজর নামাজের পর রাসুল (সা.) কোরআন তেলাওয়াত করতেন এবং বেশকিছু দোয়া-মামুলাত আদায় করতেন। কিছু আমল ও দোয়ার বর্ণনা তুলে ধরা হলো— নামাজের পর সূর্যোদয় পর্যন্ত নামাজের স্থলে বসে থাকতেন এবং জিকির-আজকার ও তাসবিহ-তাহলিল আদায় করতেন: এটা তাঁর দৈনন্দিন রুটিন ছিল। জাবের ইবনে সামুরা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন ফজরের নামাজ আদায় করতেন, ভালোভাবে সূর্যোদয় না হওয়া পর্যন্ত তিনি নামাজস্থলে বসে থাকতেন। (মুসলিম, ৬৭০; তিরমিজি, ৫৮৫)
আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি জামাতের সঙ্গে ফজরের নামাজ আদায় করে সূর্যোদয় পর্যন্ত সেখানে বসে আল্লাহর জিকির করবে এবং এরপর দুই রাকাত (ইশরাকের) নামাজ আদায় করবে, সে হজ ও উমরার পরিপূর্ণ সাওয়াব পাবে, পরিপূর্ণ সাওয়াব পাবে, পরিপূর্ণ সাওয়াব পাবে। (তিরমিজি, ৫৮৬)
ইস্তেগফার পাঠ করতেন: সাওবান (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন নামাজ শেষ করতেন, তখন তিনবার ইস্তেগফার করতেন এবং এই দোয়াটি পাঠ করতেন—বাংলা উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা আনতাস সালাম ওয়া মিনশাস সালাম তাবারকতা ইয়া জালজালালি ওয়াল ইকরাম। বাংলা অর্থ: হে আল্লাহ! আপনি শান্তিময় এবং আপনার থেকেই শান্তি। আপনি বরকতময়, হে মহিমান্বিত ও সম্মানিত! হাদিসের বর্ণনাকারী (ওয়ালিদ রহ.) বলেন, আমি আওজায়ি রহমাতুল্লাহি আলাইহিকে জিজ্ঞাসা করলাম, ইস্তেগফার কীভাবে পড়ব? তিনি বললেন, আস্তাগফিরুল্লাহ, আস্তাগফিরুল্লাহ বলবে। (মুসলিম, ৫৯১; ইবনে মাজাহ, ৯২৮)
নামাজের পর আয়াতুল কুরসি পাঠ করতেন: আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর আয়াতুল কুরসি পাঠ করবে, তার আর জান্নাতের মধ্যে বাধা থাকবে মৃত্যু। অর্থাৎ মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে জান্নাতে প্রবেশ করবে। বাংলা উচ্চারণ: আল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা হুওয়াল হাইয়্যুল কাইয়ুম। লা তা খুজুহু সিনাতু ওয়ালা নাউম। লাহু মা ফিস সামা ওয়াতি ওয়ামা ফিল আরদ। মান জাল্লাজি ইয়াশ ফাউ ইনদাহু ইল্লা বি ইজনিহি, ইয়া লামু মা বাইনা আইদিহিম ওয়ামা খালফাহুম, ওয়ালা ইউ হিতুনা বিশাই ইম মিন ইল মিহি ইল্লা বিমা শা আ, ওয়াসিয়া কুরসি ইউহুস সামা ওয়াতি ওয়াল আরদ, ওয়ালা ইয়া উদুহু হিফজুহুমা ওয়াহুয়াল আলি ইয়ুল আজিম। বাংলা অর্থ: আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো উপাস্য নেই, তিনি জীবিত, সবকিছুর ধারক। তাঁকে তন্দ্রাও স্পর্শ করতে পারে না এবং নিদ্রাও নয়। আসমান ও জমিনে যা কিছু রয়েছে, সবই তাঁর। কে আছো এমন যে সুপারিশ করবে তাঁর কাছে তাঁর অনুমতি ছাড়া? দৃষ্টির সামনে কিংবা পেছনে যা কিছু রয়েছে, সে সবই তিনি জানেন। তাঁর জ্ঞানসীমা থেকে তারা কোনো কিছুকেই পরিবেষ্টিত করতে পারে না, কিন্তু যতটুকু তিনি ইচ্ছা করেন। তাঁর কুরসি (সিংহাসন) সমস্ত আসমান ও জমিনকে পরিবেষ্টিত করে আছে। আর সেগুলোকে ধারণ করা তাঁর পক্ষে কঠিন নয়। তিনিই সর্বোচ্চ এবং সর্বাপেক্ষা মহান। (তাবারানি কাবির, ৭৪০৮)
প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর তাসবিহ, তাহলিল ও তাকবির পাঠ করতেন: আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি প্রত্যেক (ফরজ) নামাজের পর ৩৩ বার সুবাহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ এবং ৩৩ বার আল্লাহু আকবার পাঠ করার পর ১০০ পূর্ণ করার উদ্দেশ্যে এই দোয়াটি পাঠ করবে; তার গুনাহগুলো মাফ করে দেওয়া হবে, যদিও তার গুনাহ সমুদ্রের ফেনার মতো অধিক হয়। বাংলা উচ্চারণ: লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকালাহু। লাহুল মুলকু ওয়ালাহুল হামদু। ওয়াহুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদির। বাংলা অর্থ: একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তাঁর কোনো শরিক নেই; রাজত্ব তাঁরই, সমস্ত প্রশংসাও তাঁর। আর তিনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান। (মুসলিম, ৮৯৭; আবু দাউদ, ১৫০৪)
সুরা ইখলাছ, ফালাক ও নাস পাঠ করতেন: মুআজ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে খুবাইব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক বর্ষণমুখর অন্ধকার রাতে নামাজ পড়ার জন্য আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে খুঁজছিলাম। আমরা তাঁকে পেয়ে গেলাম। তিনি বলেন, বলো। আমি কিছুই বললাম না। পুনরায় তিনি বলেন, বলো। আমি কিছুই বললাম না। তিনি আবার বলেন, বলো। তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! কী বলব? তিনি (রাসুল) বলেন, তুমি যদি সন্ধ্যায় ও সকালে তিনবার সুরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পড়ো, তা হলে তুমি যাবতীয় অনিষ্ট হতে রক্ষা পাবে। (আবু দাউদ, ৫০৮২) অন্য বর্ণনায় এসেছে তা সব ব্যাপারে তোমার জন্য যথেষ্ট হবে। (তিরমিজি, ৩৫৭৫)
বিভিন্ন দোয়া পাঠ করতেন: এ সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে বিভিন্ন ধরনের দোয়া পাঠ করার বর্ণনা পাওয়া যায়। গুরুত্বপূর্ণ কিছু দোয়ার বর্ণনা তুলে ধরা হলো—
ক. আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য দোয়া করতেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি সকাল-সন্ধ্যা তিনবার এ দোয়া পাঠ করবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে সন্তুষ্ট করবেন। বাংলা উচ্চারণ: রদিতু বিল্লাহি রব্বাও ওয়া বিল ইসলামি দ্বিনাও ওয়াবি মুহাম্মাদিন নাবিয়্যা। বাংলা অর্থ: আল্লাহকে রব হিসেবে, ইসলামকে দ্বীন (ধর্ম) হিসেবে এবং মুহাম্মাদ (সা.)-কে নবি হিসেবে পেয়ে আমি সন্তুষ্ট। (তিরমিজি, ৩৩৮৯; ইবনে মাজাহ, ৩৮৭০)
খ. জাহান্নাম থেকে মুক্তির দোয়া করতেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি ফজরে ও মাগরিবে এই দোয়াটি সাতবার পাঠ করবে; ওই দিনে বা রাতে তার মৃত্যু হলে যে জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ করবে। বাংলা উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা আজিরনি মিনান নার। বাংলা অর্থ: হে আল্লাহ! আমাকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দিন। (আবু দাউদ, ৫০৭৯)
গ. উপকারী জ্ঞান, পবিত্র রিজিক ও কবুলযোগ্য আমলের দোয়া করতেন। উম্মে সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ফজরের নামাজের সালাম ফিরিয়ে এই দোয়া বলতেন। বাংলা উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা ইলমান নাফিয়ান। ওয়া রিজকান তাইয়্যিবান। ওয়া ইলমান মুতাকাব্বিলান। বাংলা অর্থ: হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে উপকারী জ্ঞান, পবিত্র রিজিক ও কবুল হওয়ার যোগ্য আমল প্রার্থনা করি। (ইবনে মাজাহ, ৯২৫)
ঘ. অনিষ্ট থেকে সুরক্ষার দোয়া করতেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় (ফজর ও মাগরিবের নামাজের পর) যে ব্যক্তি এই দোয়াটি তিনবার পাঠ করবে; কোনো কিছুই তার কোনো অনিষ্ট করতে পারবে না। বাংলা উচ্চারণ: বিসমিল্লা-হিল্লাযি লা ইয়াদুররু মাআসমিহি শাইয়ূন ফিল আরদি, ওয়া লা ফিস-সামায়ি ওয়া হুয়াস সামিউল আলিম। বাংলা অর্থ: আল্লাহতায়ালার নামে (শুরু করছি) যাঁর নামের বরকতে আকাশ ও মাটির কোনো কিছুই কোনো অনিষ্ট করতে পারে না। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞানী। (তিরমিজি, ৩৩৮৮; ইবনে মাজাহ, ৩৮৬৯)
এ ছাড়া কোরআন তিলাওয়াত করতেন: আতা ইবনে আবি রাবাহ (রহ) বলেন, আমার কাছে এই হাদিস পৌঁছেছে—রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি দিনের শুরুতে (সকালে বা ফজরের নামাজের পর) সুরা ইয়াসিন তেলাওয়াত করবে; তার যাবতীয় প্রয়োজন পূরণ করা হবে। (দারেমি, ২/৫৪৯)। সুন্দরভাবে ও অর্থ বুঝে কোরআন তেলাওয়াত করার নির্দেশনা এসেছে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি সুন্দর আর ওয়াজে কোরআন পড়ে না, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়। (বুখারি, ৭০৮৯)
জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের কাছে এলেন এবং সুরা আর-রহমান শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তেলাওয়াত করলেন। সাহাবিরা চুপ করে শুনলেন। এর পর রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, জিন রজনীতে আমি এই সুরা জিনদের তেলাওয়াত করে শুনিয়েছিলাম। তোমাদের তুলনায় তারা বেশি জবাব দিয়েছে। এই হাদিসের ব্যাখ্যায় মুহাদ্দিসগণ বলেছেন, কোরআন না বুঝলে জবাব দেওয়া অসম্ভব।
লেখক: আলেম, গবেষক ও সাংবাদিক