দাওয়াহ ইসলামের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিভাষা। যার অর্থ ডাকা বা আমন্ত্রণ জানানো। ইসলামি দাওয়াহ হলো আল্লাহর পথের দিকে বা ইসলামি জীবনব্যবস্থার দিকে মানুষকে আহ্বান করা। যাদের মাঝে দাওয়াতি কাজ করা হবে, তাদের দিক বিবেচনায় দাওয়াহ সাধারণত দুই প্রকার। কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিবিশেষকে দাওয়াত এবং ব্যাপকভাবে সর্বসাধারণের মাঝে দাওয়াত। ইসলামে এই উভয় প্রকার দাওয়াতের হুকুম স্থান, কাল ও পাত্রভেদে সব মুসলিমের ওপর ফরজ করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানবজাতির কল্যাণের জন্য তোমাদের আবির্ভাব হয়েছে। তোমরা সৎ কাজের আদেশ করবে এবং অসৎ কাজ হতে নিষেধ করবে। (সুরা আলে ইমরান, আয়াত-১১০) । আল্লাহ আরও বলেন, আপনি মানুষকে আপনার রবের পথের দিকে আহ্বান করুন। (সুরা নাহল, আয়াত: ১২৫)
দাওয়াত প্রদানের ক্ষেত্রে যুগের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা বাঞ্ছনীয়। যুগে যুগে প্রেরিত সব নবি-রাসুলগণকে আল্লাহতায়ালা তাদের স্বজাতির ভাষাভাষী করে প্রেরণ করেছিলেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, আমি প্রত্যেক রাসুলকে তাদের স্বজাতির ভাষাভাষী করে প্রেরণ করেছি, যাতে তাদেরকে পরিষ্কারভাবে বুঝাতে পারে। (সুরা ইবরাহিম, আয়াত: ৪)। আয়াতে মুখের ভাষার সঙ্গে যুগের ভাষা, অবস্থার ভাষাও অন্তর্ভুক্ত। এটাই আল্লাহতায়ালার নিয়ম। এ জন্য দাওয়াতের ক্ষেত্রে বিদ্যমান যুগের ভাষা বুঝে, সেই যুগের প্রযুক্তি ব্যবহার করেই দাওয়াত দিতে হবে। তা হলেই তা অধিক ফলপ্রসূ এবং যুক্তিযুক্ত হবে। অন্যথায় ইসলাম সবার কাছে সমানভাবে গ্রহণীয় হবে না। সব যুগের নবি-রাসুলগণ তাদের যুগের প্রযুক্তি ব্যবহার করেই মানুষকে হেদায়াতের আলোকবর্তিকা দেখিয়েছেন।
যেমন- শেষ নবি মুহাম্মাদ (সা.)-এর যুগ ছিল সাহিত্যের উৎকর্ষের যুগ। আরব জাতি তখন ভাষাজ্ঞান ও জাত্যভিমানে গর্ব করত, আল্লাহতায়ালা তখন অতি উচ্চাঙ্গের ভাষাশৈলী দিয়ে কোরআন অবতীর্ণ করেন। যার ফলে শুধু আরবরা নয়; গোটা বিশ্বই হতভম্ব হয়ে যায়। এ ছাড়াও তখন ইসলামের প্রাথমিক যুগে মক্কাবাসীরা বিপজ্জনক বা গুরুত্বপূর্ণ কোনো ঘটনা জনসাধারণকে জানানোর জন্য পাহাড়ের চূড়ায় আরোহণ করত এবং কাপড় ছুড়ে ফেলত। মহানবি (সা.) তাদের মাঝে ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার তাদের এই পদ্ধতি বা প্রযুক্তিটি গ্রহণ করেছিলেন। (বুখারি, হাদিস, ৪৭৭০)
এরূপ মুসা (আ.)-এর যুগে ছিল জাদুবিদ্যার ব্যাপক প্রচলন। আল্লাহতায়ালা মুসা (আ.)-কে যুগের প্রেক্ষাপটে জাদুবিদ্যার ন্যায় মুজিজা প্রদান করলেন। তাঁর যথাযথ কার্যক্রমে ফেরাউনের জাদু পরাস্ত হয়েছিল এবং সব জাদুকর ইমান এনেছিল। আল্লাহ বলেন, অতঃপর জাদুকরেরা সিজদাবনত হলো। (সুরা ত্বহা, ৭০)। অনুরূপভাবে আল্লাহতায়ালা সুলাইমান (আ.)-কে অসংখ্য যোগাযোগ শক্তি দান করেছিলেন। তিনি পাখিদের ভাষাও বুঝতেন। দাউদ (আ.)-এর সময়ে ইসরাঈলি সমাজে সংগীতের ব্যাপক চর্চা ছিল। তাই দাউদ (আ.) অত্যন্ত সুললিত কণ্ঠে আল্লাহর বাণী আবৃত্তি করতেন।
ঈসা (আ.)-এর যুগে বস্তুবাদ, গ্রিক দর্শন ও চিকিৎসাবিদ্যার চরম উৎকর্ষসাধিত হওয়ায় আল্লাহতায়ালা ঈসা (আ.)-কে চিকিৎসাবিজ্ঞানের মুজিজা দান করেছিলেন। বর্তমান যুগ আধুনিক প্রযুক্তির যুগ। মিডিয়া, গণমাধ্যম, ইন্টারনেট ইত্যাদি ছাড়া বিশ্ব অচল। বর্তমান বিশ্ব এগুলো ছাড়া কল্পনা করা যায় না। সব মানুষ আধুনিক প্রযুক্তি দ্বারা প্রভাবিত কিংবা সবাই এর ব্যবহার করছেন। এমতাবস্থায় ইসলামের দাওয়াতের ক্ষেত্রে দাঈকে জন্য সময়োপযোগী এই প্রযুক্তির জ্ঞান রাখা এবং এর যথাযথ ব্যবহার আবশ্যক।
ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপস, সোশ্যাল মিডিয়াসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহারে ভালো দখল থাকলে জ্ঞান অর্জন এবং ইসলাম প্রচার উভয়ই সহজ হবে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের দ্বারা কোরআন-হাদিসের রেফারেন্স খুঁজে বের করা, প্রাথমিক ব্যাখ্যা করা, বিশ্বের যে কোনো প্রান্তের গবেষণাপত্র বের করা ইত্যাদি। এসব বিষয় দাঈকে ইসলাম প্রচার ও জ্ঞানার্জনে সহযোগিতা করবে।
প্রযুক্তির ভালো ও খারাপ উভয় দিক রয়েছে। এটা একটি ছুরির মতো, যার খারাপ ব্যবহারে প্রযুক্তি বা ছুরি কেউ দায়ী নয়; বরং মানুষ এটার জন্য দায়ী। আধুনিক বিমান থাকতে হেঁটে হজ করতে যাওয়া যেমন বোকামি, তেমনি সব ক্ষেত্রে সামর্থ্য থাকতেও প্রযুক্তির কল্যাণ গ্রহণ না করাটাও বোকামির শামিল। ইলেকট্রিক এবং প্রিন্ট মিডিয়াসহ সব আধুনিক প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার দাঈকে যুগোপযোগী করবে এবং তিনি সময়োপযোগী পদ্ধতিতেই মানুষের মাঝে ইসলাম প্রচার করতে পারবেন।
লেখক: শিক্ষার্থী
আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া