ইসলামি শরিয়ত যেমন পুরুষের জন্য বিশেষ পরিস্থিতিতে তালাকের বৈধতা দিয়েছে, তেমনি তালাকের পর নারীর জন্যও মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করেছে। তালাকপ্রাপ্তা নারী কোনোভাবেই সমাজ বা প্রাক্তন স্বামীর খবরদারির অধীন নন। ইদ্দতকালীন সময় অতিবাহিত হওয়ার পর তিনি সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নিজের পছন্দ অনুযায়ী নতুন জীবনসঙ্গী বেছে নিতে পারেন।
স্বাধীনভাবে বিয়ের অধিকার: তালাকপ্রাপ্তা নারীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধিকার হলো ইদ্দত (তালাকের পর নির্দিষ্ট অপেক্ষার সময়) শেষ হওয়ার পরে নিজের পছন্দমতো বিয়ে করার স্বাধীনতা। এই অধিকার ইসলাম সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিত করেছে।
আইনের বিধান: ইদ্দতের সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর নারীর পছন্দ অনুযায়ী বিয়েতে প্রাক্তন স্বামী, অভিভাবক বা অন্য কোনো আত্মীয় বাধা দেওয়ার অধিকার রাখেন না। প্রস্তাবদাতা ও প্রস্তাবগ্রহীতা শরিয়তসম্মত ও সামাজিকভাবে প্রচলিত পন্থায় বিয়ে করতে চাইলে, নারীর আগ্রহের এই বিয়েতে হস্তক্ষেপ করার অধিকার কারও নেই।
প্রাক্তন স্বামীর খবরদারি- জাহেলি বর্বরতা: দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক তালাকদাতা স্বামী তালাক প্রদানের পরেও প্রাক্তন স্ত্রীর ওপর খবরদারি ও দাপট দেখানোর চেষ্টা করেন। তারা নারীকে বা তার পরিবারকে বিভিন্নভাবে হুমকি-ধমকি দিয়ে তার স্বাধীন জীবন গড়ার পথে বাধা সৃষ্টি করে।
ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে এ ধরনের আচরণ সম্পূর্ণভাবে নিন্দনীয়। এটি হলো জাহিলি যুগের বর্বর ও নোংরা অনুশীলন— যেখানে নারীর স্বাধীনতাকে পদদলিত করা হতো। ইসলামে তালাকের মাধ্যমে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার পর প্রাক্তন স্বামীর কর্তৃত্ব বা খবরদারি সম্পূর্ণরূপে বাতিল হয়ে যায়।
প্রত্যাবর্তনের ক্ষেত্রে বাধা দেওয়া বৈধ নয়: কখনো কখনো দেখা যায়, স্বামী ও তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী উভয়েই অনুতপ্ত হয়ে পরস্পরের কাছে ফিরে যেতে চান। তারা সমঝোতা করে ন্যায়সঙ্গত উপায়ে আবার একত্রে দাম্পত্য জীবন শুরু করতে আগ্রহী হন। কিন্তু এই ভালোবাসাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের পথে অনেক সময় স্ত্রীর পরিবার বা অভিভাবকরা বাধা হয়ে দাঁড়ান। শরিয়ত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে যে, স্বামী-স্ত্রীর পরস্পরের প্রতি আস্থা রেখে সমঝোতা করে চলার পথে অভিভাবকদের এভাবে অন্যায়ভাবে বাধা হয়ে দাঁড়ানো বৈধ নয়। এই বাধা দেওয়া সরাসরি আল্লাহতায়ালার নির্দেশনার লঙ্ঘন।
কোরআনের সুস্পষ্ট নির্দেশনা: তালাকপ্রাপ্ত দম্পতির পুনর্বিবাহের (রাজাআত বা নতুন করে বিয়ে) ক্ষেত্রে মহান আল্লাহতায়ালা অভিভাবকদের হস্তক্ষেপকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, আর যখন তোমরা স্ত্রীদেরকে (এক বা দুই) তালাক দেবে, অতঃপর তারা (অর্থাৎ তোমাদের এক বা দুই তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীগণ) তাদের ইদ্দতের শেষ সীমায় পৌঁছে যাবে, তখন তারা যদি ন্যায়ানুগভাবে পরস্পর সম্মত হয়, তা হলে স্ত্রীগণ তাদের (তালাকদাতা পূর্বের) স্বামীদেরকে পুনর্বিবাহ করতে চাইলে তোমরা তাদেরকে বাধা দিয়ো না। এ দ্বারা তাকে উপদেশ দেওয়া হচ্ছে, তোমাদের মধ্যে যে আল্লাহ ও আখিরাতে ঈমান রাখে। এটাই তোমাদের জন্য শুদ্ধতম ও পবিত্রতম। আর আল্লাহ জানেন এবং তোমরা জানো না। (সুরা বাকারা, ২৩২)
এই আয়াতটি তালাকপ্রাপ্ত নারীর অধিকারের প্রতি ইসলামের গভীর শ্রদ্ধাবোধের প্রমাণ। তালাকের পর নারীর ব্যক্তিগত জীবন, তার সিদ্ধান্ত এবং নতুন করে ঘর বাঁধার আকাঙ্ক্ষা সম্পূর্ণভাবে সুরক্ষিত। প্রাক্তন স্বামী বা অভিভাবকদের উচিত নয় কোনোভাবেই তার স্বাধীন পথে বাধা সৃষ্টি করা। আল্লাহর নির্দেশনার প্রতি আনুগত্যশীল থাকা এবং নারীর অধিকারকে সম্মান করাই হলো ঈমানদারদের জন্য শুদ্ধতম ও পবিত্রতম পথ।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক