মানুষ প্রকৃতিগতভাবে সৌন্দর্যপ্রেমী। বেশভূষায় পরিপাটি হয়ে চলা মানুষের সাধারণ প্রবৃত্তি। তাছাড়া পরিচ্ছন্ন, পরিপাটি, শালীন পোশাক পরিহিত মানুষকে সবাই পছন্দ করে। ইসলাম বাহ্যিক বেশভূষায় পরিপাটি হয়ে চলাকে উৎসাহিত করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রায়ই বলতেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ সুন্দর। তিনি সৌন্দর্যকে পছন্দ করেন।’ (মুসলিম, ১৬৬) পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা নামাজের সময় সাজসজ্জা গ্রহণের জন্য সরাসরি নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘হে আদম সন্তান! প্রত্যেক সালাতের সময় সুন্দর পোশাক-পরিচ্ছদ গ্রহণ করো।’ (সুরা আরাফ, ৩১)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বাহ্যিক বেশভূষা ও চালচলনে যথেষ্ট সচেতন ছিলেন। তিনি সাহাবিদেরও পরিপাটি হয়ে চলতে নির্দেশ দিতেন। আবুল আহওয়াস (রহ.) হতে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমি কম দামি পোশাক পরে নবি (সা.)-এর কাছে এলে তিনি বললেন, তোমার কেমন ধনসম্পদ আছে? আমি বললাম, আল্লাহ আমাকে উট, ছাগল, ঘোড়া ও দাস-দাসী ইত্যাদি সম্পদ দিয়েছেন। তিনি (সা.) বলেন, যেহেতু আল্লাহ তোমাকে সম্পদশালী করেছেন, কাজেই আল্লাহর নেয়ামত ও অনুগ্রহের নিদর্শন তোমার মাঝে প্রকাশিত হওয়া উচিত। (আবু দাউদ, ৪০৬৩)
ইসলাম অপরিচ্ছন্ন ও জীর্ণশীর্ণ পোশাক পছন্দ করে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) নতুন পোশাক পরিধানের জন্যও উৎসাহিত করেছেন। কারণ, নতুন পোশাক পরিচ্ছন্নতা ও আল্লাহর নেয়ামতের প্রকাশ ঘটায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) উমর (রা.)-এর পরনে একটি সাদা জামা দেখতে পেয়ে বলেছিলেন, ‘তোমার এ কাপড় পরিষ্কার না নতুন?’ তিনি বলেন, ‘না, বরং ধৌত করা।’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘নতুন কাপড় পরিধান করো, উত্তম জীবনযাপন করো এবং শহিদি মৃত্যুবরণ করো।’ (ইবনে মাজাহ, ৩৫৫৮)
বাহ্যিক পরিপাটির ক্ষেত্রে মহানবি (সা.) ছিলেন অহংকারহীন, মার্জিত, তবে রুচিশীল। তাঁর জীবন ছিল পরিমিতি, পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যের জীবন্ত উদাহরণ। মহানবি (সা.) যেমন পরিপাটি ছিলেন:
পছন্দের পোশাক: মহানবি (সা.) ইয়েমেনে প্রস্তুত করা লুঙ্গি এবং চাদর পরিধান করতেন। তাঁর দুই ঈদ ও জুমার দিন পরিধানের জন্য সুন্দর একজোড়া কাপড় ছিল। আবার প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য ছিল আরেক জোড়া। একদা আনাস (রা.)-কে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রিয় ও আকর্ষণীয় পোশাক কী ছিল জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে প্রিয় পোশাক ছিল হিবারাহ নামক ইয়েমেনি চাদর। (মুসলিম, ৫৩৩৩)। আয়েশা (রা.) ও আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) উভয়ে বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ্ (সা.) যখন মৃত্যুশয্যায় শায়িত, তখন তিনি তাঁর কারুকার্যপূর্ণ চাদর দ্বারা মুখ ঢেকে রাখেন। যখন তাঁর শ্বাসরোধ হয়ে আসত তখন তাঁর মুখ থেকে তা সরিয়ে নিতেন। (বুখারি, ৫৮১৫)
হলুদ বস্ত্র না পরা: ইবনে উমার (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ‘মুফাদ্দাম’ পরতে নিষেধ করেছেন। রাবি ইয়াজিদ (রা.) বলেন, আমি হাসান ইবনে সুহাইলকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘মুফাদ্দাম’ কী? তিনি বলেন, হলুদ রংয়ে রঞ্জিত বস্ত্র। (ইবনে মাজাহ, ১/৩৬০১)
সুগন্ধি ব্যবহার: রাসুলুল্লাহ (সা.) সুগন্ধি ব্যবহারে অনেক যত্নবান ছিলেন। তাঁকে কেউ সুগন্ধি উপহার দিলে কখনোই তা তিনি ফিরিয়ে দিতেন না। যেমন আনাস ইবনে মালিক (রা.) বলেন, ‘নবি (সা.)-এর কাছে সুগন্ধি পেশ করা হলে তিনি তা ফেরত দিতেন না।’ (নাসায়ি, ৫২৫৮)
চোখে সুরমা দেওয়া: রাসুলুল্লাহ (সা.) চোখে সুরমা ব্যবহার পছন্দ করতেন। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবি (সা.) বলেছেন, তোমরা ইছমিদ সুরমা ব্যবহার করো। কারণ, তা চোখের জ্যোতি বৃদ্ধি করে ও পরিষ্কার রাখে এবং অধিক ভ্রু উৎপন্ন করে। ইবনে আব্বাস (রা.) আরও বলেন, নবি (সা.)-এর একটি সুরমাদানি ছিল। প্রত্যেক রাতে (ঘুমানোর আগে) ডান চোখে তিনবার এবং বাম চোখে তিনবার সুরমা লাগাতেন। (শামায়েলে তিরমিজি, ৪১)
পরিপাটি চুল: রাসুলুল্লাহ (সা.) চুল আঁচড়িয়ে পরিপাটি করে রাখতেন। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘আমি হায়েজ (ঋতুবতী) অবস্থায়ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মাথার চুল পরিপাটি করতাম। (শামায়েলে তিরমিজি, ২৭)
জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, একদা রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের এখানে এসে এক এলোমেলো চুলওয়ালাকে দেখে বললেন, ‘লোকটি কি তার চুলগুলো আঁচড়ানোর জন্য কিছু পায় না?’ তিনি ময়লা কাপড় পরিহিত অপর ব্যক্তিকে দেখে বলেন, ‘লোকটি কি তার কাপড় ধোয়ার জন্য কিছু পায় না?’ (আবু দাউদ, ৪০৬২)
আংটি ব্যবহার: রাসুলুল্লাহ (সা.) হাতে রৌপ্যের আংটি ব্যবহার করতেন। ইসলামে পুরুষের জন্য স্বর্ণ ব্যবহার নিষিদ্ধ। আবু সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর ডান হাতে আংটি পরতেন। (নাসায়ি, ৫২০৩)
আনাস বিন মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘‘রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি রুপার আংটি গ্রহণ করেন। তাতে আবিসিনীয় পাথর ছিল এবং তার গায়ে ‘মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ খোদাইকৃত ছিল।’’ (ইবনে মাজাহ, ৩৬৪১)
ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়কে সাধ্যের মধ্যে পরিপাটি ও শালীন পোশাক পরিধান করতে উৎসাহিত করেছে; তবে এর মাধ্যমে অহংকার, অশ্লীলতা বা অপচয় করাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে।
লেখক: শিক্ষার্থী
আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া