শীতকাল মুমিনের প্রিয় ঋতু। কেননা, এ সময় মুমিন বান্দারা বেশি বেশি ইবাদত করতে পারেন। একাগ্রচিত্তে মহান রবের ধ্যানে মগ্ন থাকতে পারেন। আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘শীতকাল মুমিনের বসন্তকাল।’ (মুসনাদে আহমাদ)
দিন ছোট, রাত বড় হওয়ায় মুমিন বান্দারা ইবাদতে অনেক সময় পান। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘কুরাইশদের আগ্রহের নিমিত্তে! তাদের অনুরাগ হলো শীত ও গ্রীষ্মে ভ্রমণে। অতএব, তারা যেন ইবাদত করে এই (কাবা) গৃহের প্রভুর জন্য। যিনি তাদের ক্ষুধায় অন্ন দান করেন এবং শঙ্কায় নিরাপত্তা প্রদান করেন।’ (সুরা কুরাইশ, আয়াত: ১-৪)
জাহান্নামের আজাব থেকে মুক্তি চাওয়া : শীত-গ্রীষ্মের হাদিসে বর্ণিত ব্যাখ্যা হলো, শীত ও গ্রীষ্মের তীব্রতা আসে জাহান্নামের নিঃশ্বাস থেকে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, জাহান্নাম তার রবের কাছে অভিযোগ করে বলে, হে রব, আমার এক অংশ অন্য অংশকে খেয়ে ফেলেছে। মহান আল্লাহ তখন তাকে দুটি নিঃশ্বাস ফেলার অনুমতি দেন। একটি নিঃশ্বাস শীতকালে, আরেকটি গ্রীষ্মকালে। কাজেই তোমরা গরমের তীব্রতা এবং শীতের তীব্রতা পেয়ে থাকো। (বুখারি : ৩২৬০)। তাই তীব্র শীতে জাহান্নামের ভয়াবহ আজাবের কথা স্মরণ করে মহান আল্লাহর কাছে পানাহ চাওয়া উচিত।
উৎপাদিত খাবারের জন্য শোকরিয়া আদায় করা: শীতকালের উর্বর মাটি ও সজীবতা পেয়ে প্রচুর শাকসবজি ও ফলমূল উৎপাদিত হয়। এটি বান্দার প্রতি মহান আল্লাহতায়ালার অশেষ নিয়ামত। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘মানুষ তার খাদ্যের প্রতি লক্ষ করুক। আমি তো অঝোর ধারায় বৃষ্টি বর্ষণ করেছি। অতঃপর মাটিকে বিদীর্ণ করেছি। আর তাতে উৎপন্ন করেছি শস্যাদি, আঙুর, শাকসবজি, জলপাই, খেজুর, বহু বৃক্ষবিশিষ্ট বাগান, ফলফলাদি ও ঘাস। এসব তোমাদের ও তোমাদের পালিত পশুকুলের জীবনধারণের জন্য।’ (সুরা আবাসা, আয়াত ২৪-৩২)। এসব অফুরন্ত নিয়ামত পেয়ে অধিক পরিমাণে মহান আল্লাহর শোকরিয়া আদায় করা উচিত।
শীতবস্ত্রের জন্য আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন: পোশাক মানুষের লজ্জা নিবারণ করে। এটি আল্লাহর দান, বান্দার প্রতি অশেষ অনুগ্রহ। তিনি শীতে মোটা পোশাক আর গ্রীষ্মে পাতলা পোশাক দান করেছেন। কত সুন্দর, উত্তম পরিকল্পনা তাঁর বান্দার জন্য। পবিত্র কোরআনে এসেছে, ‘আর আল্লাহ তোমাদের জন্য ব্যবস্থা করেছেন পরিধেয় বস্ত্রের; তা তোমাদের তাপ থেকে রক্ষা করে এবং তিনি ব্যবস্থা করেন তোমাদের জন্য বর্মের, তা তোমাদের যুদ্ধে রক্ষা করে।’ (সুরা নাহল, আয়াত : ৮১)
নফল রোজা রাখা: শীতকালে দিনের সময়টা কম, দিন থাকে খুব ছোট। এ সময় রোজা রাখলে বেশি কষ্ট হয় না। এমনকি পানি পিপাসা ও ক্ষুধা তেমন অনুভূত হয় না। তাই এই ঋতুতে বেশি রোজা রাখা যায়, কাজা রোজাও আদায় করা যায়। আমের ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, শীতল গনিমত হচ্ছে শীতকালে রোজা রাখা। (তিরমিজি: ৭৯৫)
শীতকাল এলে উবাইদ বিন উমাইর (রা.) বলতেন, ‘হে কোরআনের ধারক! তোমাদের রাতগুলো তিলাওয়াতের জন্য প্রলম্বিত করা হয়েছে, অতএব তা পড়তে থাকো। আর রোজা রাখার জন্য তোমাদের দিনগুলো সংক্ষেপিত করা হয়েছে, তাই বেশি বেশি রোজা রাখো।’
অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো: আমাদের দেশে শীতের তীব্রতা কম নয়। প্রচণ্ড শীতে দরিদ্র, অসহায় মানুষ খুব কষ্ট পায়। শীতে এসব মানুষের পাশে দাঁড়ানো যেমন নৈতিক দায়িত্ব, তেমনি এটি ইসলামিক আদর্শেরও অন্তর্ভুক্ত। শীতে গরিব, বস্ত্রহীন মানুষকে বস্ত্রদান করা উচিত। শীতে ইসলামিক আদর্শ রক্ষা করতে এক জোড়া মোজা হলেও দান করা উচিত। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আত্মীয়স্বজনকে দাও তার প্রাপ্য এবং অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকেও। আর কিছুতেই অপব্যয় করো না।’ (সুরা বনি ইসরাঈল, আয়াত : ২৬)
তাহাজ্জুদের নামাজ আদায়: শীতকাল মানে তাহাজ্জুদের সুবর্ণ সুযোগ। মুমিন বান্দারা এ সুযোগ যথাযথভাবেই কাজে লাগান। কোরআনে বর্ণিত হয়েছে , ‘তারা রাতের সামান্য অংশই ঘুমিয়ে কাটায় আর রাতের শেষ প্রহরে তারা ক্ষমা চাওয়ায় রত থাকে।’ (সুরা জারিয়াত, আয়াত: ১৭-১৮) রাত বড় হওয়ায় অনেক সময় নিয়ে তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করা যায়। মহান রব্বুল আলামিনের ইবাদত, জিকির করা যায়। মহান আল্লাহ ঈমানদারদের গুণাবলি সম্পর্কে বলেন, ‘তাদের পার্শ্ব শয্যা থেকে আলাদা থাকে। তারা তাদের রবকে ডাকে ভয়ে ও আশায় এবং আমি তাদের যে রিজিক দিয়েছি, তা থেকে ব্যয় করে।’ (সুরা সাজদাহ, আয়াত : ১৬)
অজু-গোসলে সচেতন হওয়া: সঠিকভাবে অজু করা, অজুর অঙ্গ ধোয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ আমল। রাসুল (সা.) বলেন, ‘তিনটি আমল পাপ মোচন করে—অভাবের দান, গ্রীষ্মের রোজা ও শীতের অজু।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি কি তোমাদের জানাব না- কিসে তোমাদের পাপমোচন করবে এবং মর্যাদা বৃদ্ধি করবে?’ সাহাবায়ে কেরাম বললেন, ‘অবশ্যই! হে আল্লাহর রাসুল (সা.)!’ তিনি বলেন, ‘শীতের কষ্ট সত্ত্বেও ঠিকভাবে অজু করা।’ (মুসলিম: ২৫১; তাফসিরে কুরতুবি)।
শীতকালে পবিত্রতা বজায় রাখা আবশ্যক। কেননা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ। শীতের ভয়ে অজু-গোসলে অলসতা, কার্পণ্য করা যাবে না। কম পানিতে অজু-গোসল করা ঠিক নয়। প্রয়োজনে গরম পানি দিয়ে করতে হবে। এমনকি শীতের কারণে এক অজুতে একাধিক নামাজ পড়াও ঠিক নয়। বরং, শীতকে উপেক্ষা করে প্রতি ওয়াক্তে অজু করলে বেশি সওয়াব পাওয়া যায়।
রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, অজু করার সময় পায়ের গোড়ালি যেসব স্থানে পানি পৌঁছেনি সেগুলোর জন্য জাহান্নাম। তাই তোমরা ভালোভাবে অজু করো। (মুসলিম, হাদিস : ৪৫৮)
লেখিকা: সিনিয়র স্টাফ নার্স , উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স মোংলা, বাগেরহাট