মানবজাতির হেদায়েতের জন্য যুগে যুগে আল্লাহতায়ালা অসংখ্য নবি-রাসুল পাঠিয়েছেন। তাঁদের প্রত্যেকের জীবনই আমাদের জন্য আদর্শ ও শিক্ষার আধার। তবে হজরত ঈসা (আ.)-এর জীবন এক অনন্য ও অলৌকিক মহিমায় ভাস্বর। পিতাহীন জন্ম থেকে শুরু করে জীবন্ত আসমানে তুলে নেওয়া পর্যন্ত তাঁর জীবনের প্রতিটি বাঁক আল্লাহর কুদরত ও হিকমতের সাক্ষ্য দেয়। পবিত্র কোরআনে এই মহান নবি সম্পর্কে অত্যন্ত বিস্তারিত ও প্রাঞ্জল বর্ণনা এসেছে, যা আমাদের ঈমানকে করে মজবুত।
হজরত ঈসা (আ.)-এর জীবনের সবচেয়ে বড় অলৌকিকত্ব হলো তাঁর পিতাহীন জন্ম। আল্লাহতায়ালা কোনো মাধ্যম ছাড়াই কেবল তাঁর আদেশের মাধ্যমে তাঁকে সৃষ্টি করেছেন। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘তিনি (আল্লাহ) কোনো কিছু করতে ইচ্ছা করলে কেবল বলেন ‘হও’, তখনই তা হয়ে যায়।’ (সুরা আলে ইমরান, ৪৭)। এটি সৃষ্টিজগতের কাছে আল্লাহর অসীম ক্ষমতার এক জলজ্যান্ত নিদর্শন।
পৃথিবীর অন্য নবিদের ক্ষেত্রে নাম রাখা হতো তাঁদের বংশ বা মা-বাবার পছন্দ অনুযায়ী। কিন্তু ঈসা (আ.)-এর নাম স্বয়ং আল্লাহতায়ালা আগে থেকেই নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। ফেরেশতারা হজরত মারইয়াম (আ.)-কে সুসংবাদ দিয়ে বলেছিলেন, ‘তাঁর নাম হবে মাসিহ, ঈসা ইবনে মারইয়াম।’ (সুরা আলে ইমরান, ৪৫)। তিনি দুনিয়া ও আখিরাতে মহাসম্মানের অধিকারী এবং আল্লাহর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠদের অন্তর্ভুক্ত।
জন্মলগ্ন থেকেই হজরত ঈসা (আ.) ও তাঁর মহীয়সী মাতা হজরত মারইয়াম (আ.) আল্লাহর বিশেষ সুরক্ষায় ছিলেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি তাকে ও তার সন্তানকে অভিশপ্ত শয়তানের স্পর্শ থেকে রক্ষা করেছি।’(সুরা আলে ইমরান, ৩৬)। নিষ্পাপ চরিত্রের এমন উদাহরণ মানব ইতিহাসে বিরল।
ঈসা (আ.)-এর জন্মের পর যখন তাঁর মাতা মানুষের সমালোচনার মুখে পড়েন, তখন নবজাতক ঈসা (আ.) আল্লাহর কুদরতে দোলনায় থেকে কথা বলে ওঠেন। তিনি নিজের পরিচয় দিয়ে বলেন, ‘আমি আল্লাহর বান্দা। তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন এবং নবী করেছেন।’ (সুরা মারইয়াম, ৩০)। শৈশব থেকেই তাঁর নবুওয়াতের প্রমাণ এভাবেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
বনি ইসরাঈল জাতির কাছে প্রেরিত এই নবীকে আল্লাহ তায়ালা এমন কিছু মুজিজা বা অলৌকিক ক্ষমতা দিয়েছিলেন, যা সমসাময়িক চিকিৎসাবিদ্যাকেও হার মানিয়েছিল। সুরা আলে ইমরানের ৪৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে যে, তিনি:
১. মাটির পাখি বানিয়ে ফুঁ দিলে তা জীবন্ত হয়ে যেত।
২. জন্মান্ধ ও কুষ্ঠরোগীকে আল্লাহর হুকুমে সুস্থ করে তুলতেন।
৩. আল্লাহর বিশেষ আদেশে মৃত মানুষকে জীবিত করতেন।
আল্লাহতায়ালা হজরত ঈসা (আ.)-কে আসমানি কিতাব ‘ইনজিল’ প্রদান করেছিলেন। এই কিতাব কেবল নতুন বিধানই আনেনি, বরং পূর্ববর্তী কিতাব ‘তাওরাত’-এর সত্যতাও নিশ্চিত করেছিল। তিনি মানবজাতিকে এক আল্লাহর ইবাদত করার এবং সরল পথে চলার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
ইহুদিদের চক্রান্ত থেকে রক্ষা করতে আল্লাহতায়ালা তাঁর এই প্রিয় নবিকে অলৌকিকভাবে আসমানে তুলে নেন। কোরআন স্পষ্টভাবে বলছে, ‘তারা ঈসাকে হত্যা করেনি এবং শূলে চড়ায়নি; বরং তাদের কাছে তা সন্দেহজনক করে দেওয়া হয়েছিল।’ (সুরা নিসা, ১৫৭)। আল্লাহ তাঁকে নিজের কাছে তুলে নিয়েছেন এবং তিনি কিয়ামতের আগে পুনরায় পৃথিবীতে ফিরে আসবেন।
হজরত ঈসা (আ.)-এর জীবন কেবল অলৌকিক ঘটনার সমষ্টি নয়, বরং তা আল্লাহর একত্ববাদ এবং অসীম ক্ষমতার স্মারক। তাঁর প্রতি যথাযথ বিশ্বাস ও ভালোবাসা পোষণ করা আমাদের ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর ত্যাগ ও আল্লাহর প্রতি আনুগত্য আমাদের জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে ধৈর্য ও বিশ্বাসের প্রেরণা জোগায়।