পৃথিবীতে মানুষের নানা দুর্বলতার জায়গা রয়েছে। তন্মধ্যে সবচেয়ে বেশি দুর্বল জায়গা হলো তার মা-বাবা। মায়ের এক ফোঁটা দুধের ঋণ কোনো সন্তান পরিশোধ করতে পারবে না। বাবার হাড়ভাঙা পরিশ্রম ও খাটুনির এক ফোঁটা ঘামের মূল্য কোনো সন্তানই আদায় করতে পারবে না। মা-বাবা যদি সমাজে সবচেয়ে নিম্নশ্রেণিরও হয়, তবুও সন্তানের কাছে তার মূল্য অপরিসীম। মোট কথা, মা-বাবা সন্তানের দুনিয়া ও আখেরাতের অমূল্য সম্পদ।
আধুনিক সভ্যতার এই অগ্রযাত্রায় মানুষ এত ব্যস্ত সময় পার করছে যে, তার মা-বাবাকে একটু সময় দেবে, তার ফুরসত মেলে না। জীবনযাত্রার গতি এতটাই দ্রুত যে, অনেকে চাইলেও বাবা-মায়ের সঙ্গে সময় কাটাতে পারেন না। চাকরি, ব্যবসা, শহুরে যাতায়াত— সব মিলিয়ে ব্যস্ততা যেন দিন দিন বেড়েই চলছে। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে বাবা-মায়ের খেদমত এমন এক দায়িত্ব, যা কোনো ব্যস্ততাই কমিয়ে দিতে পারে না।
আল্লাহতায়ালা পিতা-মাতার অধিকারের গুরুত্ব এমনভাবে বর্ণনা করেছেন যে, তাঁর তাওহিদের পরই তিনি উল্লেখ করেছেন তাদের প্রতি সদাচরণকে। ‘তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন, একমাত্র তাঁরই ইবাদত করো এবং পিতা-মাতার সঙ্গে উত্তম আচরণ করো।’ (সুরা আল-ইসরা ১৭:২৩)। স্পষ্ট নির্দেশ প্রমাণ করে, পুরোনো যুগে হোক বা আধুনিক যুগে— যে যুগেই বসবাস হোক না কেন— খেদমত ও সদাচরণে কখনো পিছিয়ে থাকা বৈধ নয়।
ইসলামে খেদমতের মূলনীতি
বাবা-মায়ের প্রতি খেদমত শুধু একটি নৈতিক দায়িত্ব নয়; বরং এটি ইবাদতের অংশ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘রবের সন্তুষ্টি নিহিত আছে বাবা-মায়ের সন্তুষ্টিতে।’ (তিরমিজি, হাদিস ১৮৯৯)
আরেক হাদিসে এসেছে, ‘তুমি ও তোমার সম্পদ তোমার পিতার।’ (ইবনু মাজাহ, হাদিস ২২৯১)
এগুলো প্রমাণ করে, শারীরিক সেবা, মানসিক সঙ্গ, আর্থিক সাহায্য— সবই খেদমতের অন্তর্ভুক্ত।
ব্যস্ত জীবনের বাস্তবতা ও প্রযুক্তির সুযোগ
আজকের পৃথিবীতে ব্যস্ততা বাস্তব একটি চ্যালেঞ্জ। বিস্ময়করভাবে, প্রযুক্তিই এ ব্যস্ততার মাঝেও খেদমত আদায়ের নতুন দরজা খুলে দিয়েছে। ইসলামি শরিয়াহ সরাসরি প্রযুক্তির কথা উল্লেখ না করলেও, ‘সক্ষমতা অনুযায়ী দায়িত্ব পালন’- এই সাধারণ নীতি প্রযুক্তি ব্যবহারের বৈধতা ও গুরুত্বকে শক্ত ভিত্তি দেয়। যেমন-
১. নিয়মিত যোগাযোগ রাখা
ভিডিও কল, ভয়েস কল, মেসেজ ইত্যাদির মাধ্যমে যোগাযোগ রাখা যায়। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন— ‘বাবা-মায়ের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলা সদাচরণের অন্তর্ভুক্ত।’ যদিও তারা সামনে উপস্থিত না থাকলে মুখ দেখা সম্ভব নয়, কিন্তু ভিডিও কলের মাধ্যমে প্রতিদিন তাদের খোঁজ নেওয়া— এটিও আজকের যুগে খেদমতেরই অংশ। অনেক সময় বাবা-মা শুধু সন্তানদের কণ্ঠ শুনেই সান্ত্বনা পান—এটিকে বাদ দিলে খেদমতের একটি বড় দিক নষ্ট হয়ে যায়।
২. স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ করা
বাবা-মা দূরে থাকলে তাদের স্বাস্থ্যকে অবহেলা করা চলবে না। স্মার্ট ওয়াচ, হেলথ মনিটর, রিমোট চেক-আপ অ্যাপ ইত্যাদির মাধ্যমে তাদের রক্তচাপ, সুগার, ওষুধ নেওয়ার সময়— সব নজরদারি করা যায়। এটি ‘কোনো প্রাণী তার সামর্থ্যের বাইরে দায়িত্ববদ্ধ করা হয় না।’ (বাকারা ২ : ২৮৬)
এই নীতির আওতায় পড়ে।
৩. আর্থিক খেদমত করা
ব্যস্ত ছেলে-মেয়েরা চাইলে বাবা-মায়ের খরচ, চিকিৎসা, বাজার— সব ডিজিটাল ব্যাংকিং বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পাঠাতে পারেন। এটি আর্থিক খেদমত, যা কোরআন-হাদিস অনুযায়ী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক বেদুইন যখন জানতে চাইলেন তার সম্পদ থেকে পিতা-মাতারা কি পাওয়ার যোগ্য? নবি (সা.) বললেন, ‘তারা তোমার জান্নাত এবং তোমার জাহান্নাম।’ (ইবনু মাজাহ, ৩৬৬২) অর্থাৎ তাদের চাহিদা পূরণ করা জান্নাতের মাধ্যম।
৪. অনলাইনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করে দেওয়া
ডাক্তার অ্যাপয়েন্টমেন্ট, ওষুধ অর্ডার, গৃহপরিচারিকার ব্যবস্থা, বিল পরিশোধ— সবকিছু অনলাইনে করা যায়। এগুলো খেদমতের আধুনিক রূপ— ইসলাম যার বিরোধী নয়; বরং উৎসাহ দেয়।
৫. তাদের একাকিত্ব দূর করা (ডিজিটাল শিক্ষামূলক কাজ, ইসলামি ব্যাখ্যান শোনানো)
বৃদ্ধদের সবচেয়ে বড় কষ্ট একাকিত্ব। সন্তান ব্যস্ত থাকলেও বাবা-মাকে ইসলামি ওয়াজ, কোরআন তিলাওয়াত, অনলাইন হালকা শিক্ষামূলক অ্যাপ—এসব ব্যবহারে সাহায্য করা খেদমতের একটি মহৎ দিক।
বেশ কয়েক বছর আগে অনলাইনে একটি ভিডিও দৃষ্টিগোচর হয়েছিল। বাংলাদেশের বড় একজন অভিনেতার শ্বশুর লাইভে এসে নিজেই নিজের মাথায় গুলি করে আত্মহত্যা করে।
এর কারণ হলো, বার্ধক্যের এই জরাজীর্ণ অবস্থায় এসেও পাশে কাউকে পেত না। যার ফলে একটা সময় জীবনের মায়া ত্যাগ করে এই পথ বেছে নেয়। এ রকম আরও অসংখ্য পরিবার আছে; যাদের সন্তানরা বিদেশের মাটিতে পারি জমিয়ে মা-বাবাকে এক নিষ্ঠুর জীবনের মুখে ফেলে দেয়। অথচ মা-বাবা কত কষ্ট করে তাদের বড় করেছেন। তাদের অবদানেই আজ সন্তান বিদেশে যেতে পেরেছে। এমন হতভাগা সন্তান যেন কারও কপালে না জোটে আল্লাহর কাছে পানাহ!
প্রযুক্তি যতটুকু দরকার ততটুকুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা। এক্ষেত্রে লক্ষণীয়-
১. প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে মা-বাবার সরাসরি সাক্ষাৎ থেকে বঞ্চিত না হওয়া উচিত। সুযোগ হলেই বাবা-মায়ের কাছে যাওয়া সুন্নাহ-সম্মত। হাদিসে এসেছে, ‘জান্নাত মায়ের পায়ের নিচে।’ (নাসাঈ, ৩১০৪)
২. প্রযুক্তির খেদমত হৃদয়হীন যান্ত্রিক খেদমত নয়— বরং আবেগ, শ্রদ্ধা ও আদবপূর্ণ যোগাযোগ থাকতে হবে।
৩. সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও অবহেলা করা জুলুম
বাবা-মায়ের সামনে ‘উফ’ পর্যন্ত বলা নিষেধ। যদি ‘সময় নেই’ অজুহাতে কেউ নিজে দেখা না করে, এমনকি যোগাযোগও না রাখে— এটি অবহেলা, যা গুনাহ। আজকাল সন্তান মা-বাবার সঙ্গে এমন খারাপ আচরণ করে যা বলা বাহুল্য। মা-বাবাকে ধমক দিয়ে কথা বলা, তাদের সঙ্গে বেয়াদবিপূর্ণ আচরণ করা, এগুলো তো এখন স্বাভাবিক ব্যাপার। এমনকি তাদের হত্যা করতেও বুক কাঁপে না কিছু হতভাগাদের। যা হোক, পরিবর্তনশীল যুগ ইসলামের নীতিকে পরিবর্তন করেনি। পরিবর্তন এসেছে কেবল উপকরণে।
সরাসরি সাক্ষাৎ, সঙ্গ, সেবা— নিঃসন্দেহে সর্বোচ্চ খেদমত। তবে আধুনিক ব্যস্ততার বাস্তবতায় প্রযুক্তি এক অবিশ্বাস্য নিয়ামত, যা আল্লাহ সহজ করে দিয়েছেন যাতে সন্তানরা দূরে থেকেও বাবা-মায়ের দায়িত্ব পালন করতে পারে।
যে সন্তান আন্তরিকতার সঙ্গে প্রযুক্তিকে খেদমতের মাধ্যম করে নেয়— সে জান্নাতের পথ সহজ করে নেয়। কারণ— তারা আমাদের জীবনের প্রথম রাহবার, আর তাদের খেদমত আমাদের জীবনের সর্বোচ্চ সফলতা।
লেখক: শিক্ষক, লেখক, অনুবাদক