আমাদের একবিংশ শতাব্দীর হাল বড়ই নাজুক। সিংহভাগ মানুষই পেরেশান। বেশির ভাগ মানুষেরই আয় কম, খরচ বেশি। অনেক মানুষ তো ধরেই নিয়েছে যে, পৃথিবীতে সৎ থাকার উপায় নেই। সৎ উপার্জন দিয়ে পৃথিবীতে টিকে থাকা সম্ভব নয়। মনে করুন, একজন ব্যক্তি বেতন পান মাসে দশ হাজার টাকা। স্বাভাবিক অবস্থায় ওষুধে লাগে ১০০০, চাল ২০০০, মাছ-গোশত-শাকসবজি ৩০০০, দুইজন ছেলে-মেয়ের পড়ালেখার খরচ ৪০০০, দশ হাজার কিন্তু শেষ। এখন সে তার বাবা-মা, ভাই-বোন বা অন্য হকদারকে কি দেবেন? দৈনিক কয়েকজন ভিক্ষুক তার সামনে হাত বাড়ায়।
ইমাম সাহেবের বেতন, বন্ধুদের আড্ডা, মেহমানদের খরচ, পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে কীভাবে সামাল দেবে? আমাদের সমাজের বেশির ভাগ মানুষের হতাশাটা এখানেই। কিন্তু হতাশ হবেন না প্লিজ। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। আর অর্থনীতি মানবজীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই ইসলাম আপনার এ গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা এড়িয়ে যায়নি। সুতরাং আপনার সমস্যার সমাধান ইসলাম থেকে গ্রহণ করুন। আপনার সমস্যার সমাধান অবশ্যই মিলবে কোনো না কোনো গবেষকের গবেষণায়। আমার এ কলমের কালি আপনার সমস্যা সমাধানে উৎসর্গ হোক।
মাসিক বাজেট কীভাবে করবেন: প্রতিজন মানুষ এবং প্রতিটি পরিবার এক একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের যেমন বার্ষিক বাজেট থাকে, ব্যক্তি পরিবারেও বাজেট থাকা চাই। আপনার খরচের খাতগুলো চিহ্নিত করে প্রতিটি খাতেই বাজেট করুন। মাসিক ইনকামে মাসিক বাজেট। খাবার খাত। পোশাক খাত। চিকিৎসা খাত। মেহমান আপ্যায়ন খাত। বাচ্চাদের লেখাপড়ার খাত। দানের খাত। এভাবে প্রতিটি খাতের জন্য আলাদা আলাদা বাজেট করুন। এবং সর্বাত্মক চেষ্টা করুন- যেন কোনো খাতে বাজেটের অতিরিক্ত খরচ না হয়।
প্রয়োজনগুলোর মান যাচাই করুন। খাতভিত্তিক বাজেট করেছেন ঠিক। কিন্তু তাতেও কোনো সমাধান হচ্ছে না। এক খাতের বাজেট ফুরিয়ে অন্য খাত থেকে নিতে হচ্ছে। অবশেষে ঋণ চেপে বসে আপনার মাথায়। কিন্তু এ সমস্যার প্রধানতম যে কারণ তা হচ্ছে, প্রতিটি খাতেই একাধিক চাহিদা সামনে আসে। আমরা কোনো চাহিদাই এড়িয়ে যেতে চাই না। সবগুলোই গ্রহণ করি। তাই বাজেটে টান পড়ে। তাই চাহিদাকে নয়। প্রয়োজনকে মূল্যায়ন করুন। উদাহরণস্বরূপ বাচ্চার খাতা-কলম ও ব্যাট-বল লাগবে। সম্ভব না হলে ব্যাট-বল কিনবেন না। শুধু খাতা-কলম কিনবেন। ব্যাট-বল চাহিদা। আর খাতা-কলম প্রয়োজন। এভাবে চাহিদা এড়িয়ে প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিন। আবার প্রয়োজনের ওপর অধিক প্রয়োজনকে বেশি গুরুত্ব দিন। এভাবেই ব্যায়ের মাঝে আয়ের সীমা রক্ষা করুন।
ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অপব্যয় থেকে বাঁচুন: অপব্যয়ের ব্যাপারে আমরা সচেতন নই। আর যারা বড় বড় অপব্যয়ের ব্যাপারে সচেতন, তারা আবার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অপব্যয়ের ব্যাপারে অসচেতন। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে, ক্ষুদ্র একটি ছিদ্র বড় একটি জাহাজ ডুবিয়ে দেয়। তাই অপব্যয়কে না বলুন।
টাকা-পয়সাই কেবল সম্পদ নয়: প্রিয় ভাই আমার! কেবল টাকা-পয়সাই সম্পদ নয়। আরও এমন কিছু সম্পদ আছে যেগুলো জীবনে সচ্ছলতা নিয়ে আসতে পারে। বরং বলা চলে সচ্ছলতার মূলধন সেগুলোই।
মন সর্বদা প্রফুল্ল রাখুন। মনকে বোঝান আমি অনেক ভালো আছি। অনেক মানুষ তো আমার থেকেও মন্দ হালাতে রয়েছে। মনের ধনাঢ্যতাই প্রকৃত ধনাঢ্যতা। মনকে কখনো উপকরণের কাছে দুর্বল করবেন না।
অন্যের দোয়া কুড়ান। কেননা অর্থ-সম্পদের মাধ্যমে যারা বড় হয়। অর্থ-সম্পদ কখনো কখনো তাদের হাতছাড়া হয়ে যায়। কিন্তু মানুষের দোয়া নিয়ে যারা বড় হয়, মানুষের দোয়া কখনো তাদের হাতছাড়া হয় না। আপনার সম্পদ হয়তো আপনাকে সর্বদা সাহায্য করবে না। কিন্তু মানুষের দোয়া আপনাকে সব বিপদ-আপদে সাহায্য করবে। তাই মানুষের দোয়া আপনার সচ্ছল থাকার সম্পদ।
বদদোয়া থেকে বাঁচুন। কারণ, মানুষের কষ্টজনিত নিঃশ্বাস বড়ই বিষাক্ত। হিমালয় পরিমাণ সম্পদও পচিয়ে কাউকে নিঃশেষ করে দিতে পারে। বিশ্বাস না হলে যারা মানুষকে কষ্ট দিয়ে সম্পদ জমায়, তাদের শেষ পরিণতি দেখুন। অন্যের সুখে হাসুন। অন্যের দুঃখে কাঁদুন। অন্যের বিপদে এগিয়ে যান। সাবধান! আল্লহর বিধিনিষেধ উপেক্ষা করবেন না। সকালে দ্রুত জাগুন, রাতে দ্রুত ঘুমান।
কখন বুঝবেন আপনি সচ্ছল: অনেক সময় সচ্ছল মানুষও নিজেকে অসচ্ছল মনে করে। আবার অনেক অসচ্ছলও বেশ খুশি নিজেকে নিয়ে। কারণ অসচ্ছলতার প্রকৃত রূপটা আমাদের সামনে স্পষ্ট নয়। জাগতিক সচ্ছলতার একটি নীতিমালা আপনাদের সামনে পেশ করছি- আপনি আপনার মাসিক ইনকামকে তিন ভাগে ভাগ করুন। এক, দৈনন্দিন প্রয়োজন পূরণের জন্য। দুই, সম্ভাব্য বিপদ মোকাবিলার জন্য। তিন, ভবিষ্যতের জন্য। এক-তৃতীয়াংশ দিয়েই যদি দৈনন্দিনের প্রয়োজন পূরণ হয়, তবে আপনি পরিপূর্ণ সচ্ছল। আর যদি দৈনন্দিনের প্রয়োজন পূরণ হতে দ্বিতীয়াংশে হাত দিতে হয়; তবে আপনি মোটামুটি সচ্ছল।
আর যদি দৈনন্দিনের প্রয়োজন পূরণ হতে তৃতীয়াংশে হাত দিতে হয়; তবে আপনি পুরাই অসচ্ছল। সুতরাং স্বল্প আয়ে সচ্ছল হতে চাইলে দৈনন্দিনের খরচ ইনকামের দুই-তৃতীয়াংশের ভেতর রাখতে হবে।
উপদেষ্টার বিকল্প নেই: আপনি যত বড় জ্ঞানীই হোন না কেন, হতাশা আপনাকে ঘিরে ধরবেই। জীবনের ক্ষণে ক্ষণে আপনার ওপর নেমে আসা হতাশা দূর করতে এবং জীবন সচ্ছল করতে উপদেষ্টা আপনার অপরিহার্য। তাই দ্রুত কাউকে উপদেষ্টা নির্বাচন করুন।
লেখক: ধর্মত্ত্ববিদ ও অনুবাদক