আবুল আব্বাস সাহল ইবনে সাদ আস-সাঈদি রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বলল, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমাকে এমন একটি আমলের কথা বলে দিন, যা করলে আল্লাহও আমাকে ভালোবাসবেন এবং মানুষও আমাকে ভালোবাসবে।’ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘দুনিয়ার প্রতি নির্মোহ হও, আল্লাহ তোমাকে ভালোবাসবেন। আর মানুষের হাতে যা আছে, তার প্রতি লোভ করো না, মানুষ তোমাকে ভালোবাসবে।' (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৪১০২)
আলিমগণ উল্লেখ করেছেন যে, এই হাদিসে ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতির কথা বলা হয়েছে, সে অনুযায়ী একজন মসলিম তার জীবন পরিচালনা করবে। এক সাহাবি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এমন এক আমলের কথা জানতে চাইলেন, যা করলে তিনি আল্লাহ ও মানুষ- উভয়েরই ভালোবাসা লাভ করতে পারবেন। এটি তো এক মহান সৌভাগ্য ও অফুরন্ত কল্যাণ! আল্লাহর ভালোবাসা এবং মানুষের ভালোবাসা- এই দুটি বিষয় কি একই সঙ্গে চাওয়া যায়? অনেক সময় তো মানুষের সন্তুষ্টি আল্লাহর সন্তুষ্টির পরিপন্থি হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু এই হাদিসে এমন এক পথের সন্ধান দেওয়া হয়েছে, যা উভয়কেই একত্রিত করে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, দুনিয়ার প্রতি নির্মোহ হও, আল্লাহ তোমাকে ভালোবাসবেন।
‘যুহদ’ বা নির্মোহতা হলো দুনিয়াকে পরিত্যাগ করা। তবে এর মানে এই নয় যে, আপনি রিজিক অন্বেষণ করা ছেড়ে দেবেন, বা হালাল উপার্জন থেকে বিরত থাকবেন। বরং যুহদ হলো- আপনার যা প্রয়োজন নেই, তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া। সুতরাং হালাল উপার্জন তো নিষিদ্ধ নয়। নিষিদ্ধ হলো সেই মুবাহ বা বৈধ বিষয়াবলির পেছনে ছুটে চলা, যার আপনার কোনো প্রয়োজন নেই। পাশাপাশি এ হাদিসে আমাদের জন্য আরও এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাও রয়েছে-দ্বীনি বিষয়ে জানতে চাইলে, জানতে হবে আলিমদের কাছ থেকেই। যেমন- এই ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন, নিজের মনগড়া কিছু করলেন না, নিজে কোনো আমল আবিষ্কার করলেন না। এর মাধ্যমে স্পষ্ট হলো- যে ব্যক্তি দ্বীন সম্পর্কে এমন কিছু উদ্ভাবন করে, যা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেননি, তবে তা ‘বিদআত’। এমন কর্ম আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য নয়, বরং প্রত্যাখ্যাত। দ্বীন তো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দেখানো পথেই শিখতে হবে, আর তাঁর ওফাতের পর আলিমগণই হলেন নবিদের উত্তরসূরি।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরেকটি আমলের কথা বলেছিলেন, অর্থাৎ, মানুষের হাতে যা আছে, সেদিকে লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকিও না। কারণ যখন তাদের সম্পদের দিকে তাকাবে, তাদের কাছে চাইবে, তখন তারা তোমাকে ঘৃণা করবে। কিন্তু যখন তুমি তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তখন তারা তোমাকে ভালোবাসবে। কারণ মানুষ তো স্বভাবগতভাবেই তাদের সম্পদকে ভালোবাসে এবং চায় না যে, কেউ তাদের সম্পদ চেয়ে নিক। তাই কেউ যদি চায়, মানুষ যেন তাকে ভালোবাসে, তবে সে যেন কারও কাছে কিছু না চায়। বরং চাইবে তো সেই সত্তার কাছে যার ভাণ্ডার সীমাহীন, যার রাহমাহ অপরিসীম। হ্যাঁ, কখনো যদি খুব দরকার হয়, অথবা অনিবার্য হয়ে পড়ে, তবে চাওয়া বৈধ। কিন্তু চেষ্টা থাকবে যেন মানুষের থেকে বাঁচা যায়। কোনো এক কবি চমৎকার বলেছেন,
সুতরাং এই হাদিসটি এক মহান মূলনীতি স্থাপন করে। আল্লাহর ভালোবাসা চাইলে দুনিয়ার প্রতি নির্মোহ হও। মানুষের ভালোবাসা চাইলে তাদের প্রতি নির্মোহ হও।