আল্লাহতায়ালা মুমিনদের নেক আমলের প্রতিদান স্বরূপ শান্তি ও স্বস্তির এক চিরন্তন নিবাস তৈরি করে রেখেছেন, যার নাম জান্নাত। কিয়ামতের দিন হিসাবনিকাশ শেষে মুমিনদের সেখানে প্রবেশ করানো হবে। ‘জান্নাত’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো বাগান। মানুষ সাধারণত বাগানে অনাবিল শান্তি ও হৃদয়ের প্রশান্তি খুঁজে পায়; সম্ভবত সেই কারণেই আখিরাতের আরামদায়ক জীবনকে বাগানের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। সেখানে মুমিনরা এমন পরম আনন্দ লাভ করবেন যেখানে দুঃখ-বেদনার কোনো চিহ্নও থাকবে না। জান্নাতে মুমিনদের জন্য যেসব নিয়ামত রাখা হয়েছে, তা আজ পর্যন্ত কোনো চোখ দেখেনি, কোনো কান শোনেনি এবং কোনো মানুষের হৃদয়ে তার কল্পনাও কখনো উদিত হয়নি। (বুখারি, ৪৭৭৯)
জান্নাতে হীরা ও জহরত খচিত সুউচ্চ প্রাসাদ থাকবে। প্রাসাদের ভেতর থেকে বাইরের দৃশ্য এবং বাইরে থেকে ভেতরের সবকিছু স্পষ্টভাবে দেখা যাবে। এসব প্রাসাদের দেয়াল নির্মিত হয়েছে স্বর্ণ ও রুপার ইট দিয়ে, আর ইটের গাঁথুনিতে ব্যবহৃত হয়েছে সুগন্ধি কস্তুরীর আস্তর। জান্নাতের জমিন জাফরান দিয়ে তৈরি এবং এর পাথরকুচিগুলোর পরিবর্তে ছড়িয়ে আছে মণি-মুক্তা ও ইয়াকুত পাথর। (তিরমিজি, ২৫২৬)
জান্নাতিরা সেখানে যা খুশি আহার করবেন, কিন্তু সবই হজম হয়ে যাবে। সেখানে কোনো ধরনের অপবিত্রতা, ময়লা-আবর্জনা থাকবে না। তাদের ঢেকুর থেকে নির্গত সুগন্ধি হবে কস্তুরী ও কর্পূরের চেয়েও সুমধুর। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, জান্নাতে একজন ঘোষণাকারী উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করবেন— হে জান্নাতবাসী! তোমরা সর্বদা সুস্থ থাকবে, কখনো অসুস্থ হবে না। তোমরা চিরকাল জীবিত থাকবে, কখনো তোমাদের মৃত্যু হবে না। তোমরা চিরকাল যুবক থাকবে, কখনো বৃদ্ধ হবে না এবং তোমরা সর্বদা পরম সুখে ও স্বাচ্ছন্দ্যে থাকবে, কখনো কোনো বিপদে পতিত হবে না। (মুসলিম, ২৮৩৭)
আবু সাঈদ (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, দুনিয়াতে যে ব্যক্তিই মৃত্যুবরণ করুক না কেন, তার বয়স কম হোক বা বেশি, জান্নাতে প্রবেশের পর তারা সবাই ৩০ বছর বয়সী যুবকে পরিণত হবে। এরপর তাদের বয়স আর কখনো বৃদ্ধি পাবে না। (তিরমিজি, ২৫৪৩)। জান্নাতবাসীরা যখন তাদের চিরস্থায়ী নিবাসে পৌঁছে যাবেন, তখন সেখানে বিচিত্র সব নিয়ামতের মাঝে সবচেয়ে বড় ও শ্রেষ্ঠ যে নিয়ামতটি তারা লাভ করবেন, তা হলো—আল্লাহতায়ালার চিরন্তন সন্তুষ্টি এবং তাঁর মহিমান্বিত সত্তার দর্শন বা দিদার।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, জান্নাতবাসীরা যখন জান্নাতে প্রবেশ করবেন, তখন আল্লাহতায়ালা তাদের সম্বোধন করে বলবেন, ‘তোমরা কি চাও যে আমি তোমাদের আরও কিছু দান করি?’ তারা আরজ করবেন, ‘হে আল্লাহ! আপনি কি আমাদের চেহারা উজ্জ্বল করে দেননি? আপনি কি আমাদের জান্নাতে প্রবেশ করাননি এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেননি?’ (অর্থাৎ আমরা যা পেয়েছি তাতেই আমরা ধন্য)। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, অতঃপর আল্লাহতায়ালা (নুরের) পর্দা সরিয়ে দেবেন এবং জান্নাতবাসীরা তাদের রবের দর্শন লাভ করবেন। আল্লাহর দিদারের চেয়ে অধিক প্রিয় আর কোনো বস্তু জান্নাতিদের কাছে মনে হবে না। (মুসলিম, ১৮১)
কিয়ামতের দিন শুধু নেককার ও পরহেজগার বান্দারাই জান্নাতে প্রবেশ করবেন; আর জান্নাত মূলত তাদের জন্যই প্রস্তুত করা হয়েছে। আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেন, ‘এবং নিজ প্রতিপালকের পক্ষ থেকে মাগফিরাত ও সেই জান্নাত লাভের জন্য একে অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হও, যার প্রশস্ততা আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীতুল্য। যা মুত্তাকিদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।’ (সুরা আলে ইমরান, ১৩৩)
লেখক: আলেম ও প্রাবন্ধিক