মুসলমানদের সৃষ্টি করা হয়েছে মানবজাতির কল্যাণের জন্য। আর মুমিন মুসলমানদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ মানব হচ্ছেন নবি আলাইহিস সালামরা। যাদের প্রধান কাজের মধ্যে অন্যতম একটি ছিল মানুষকে সংশোধন করা।
সঠিক পথে পরিচালিত করা। সেই নবিদের ওয়ারিশ হচ্ছেন আলেমরা। কাজেই আলেমরা সমাজ, রাষ্ট্র ও জাতি বিনির্মাণে অংশগ্রহণ করবেন না। এটি কীভাবে হতে পারে?
আর মুসলিম জাতি হিসেবে আমাদের সবার দায়িত্ব ও কর্তব্য হলো কল্যাণকর কাজে ভূমিকা পালন করা। এজন্য পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, তোমরা হলে এমন এক শ্রেষ্ঠ জাতি, যাকে (তথা মুসলিম উম্মাহকে) বের করা হয়েছে মানবজাতির (হেদায়েত ও কল্যাণের) জন্য। (সুরা আলে ইমরান, ১১০)
সুনানে আবু দাউদে বর্ণিত হাদিসের বক্তব্য অনুযায়ী, আলেমরা হলেন নবিদের ওয়ারিশ তথা উত্তরাধিকারী। তাই নবিদের যেসব কাজ বা দায়িত্ব ছিল। হুবহু সেই কাজ বা দায়িত্বগুলোই এখনো যথাযথভাবে পালন করে আসছেন, উম্মাহর আলেম সমাজ। সমাজের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে যাওয়া বহু অন্যায়, অনাচার, অবিচার, পাপাচারের বিরুদ্ধে কাজ করছেন। কথা বলছেন। আলোচনা করছেন। জনসচেতনতা তৈরি করছেন। সৎ ও সঠিক পথে আহ্বান করছেন।কখনো দাওয়াতের অঙ্গনে দাঈ হিসেবে, কোনো বয়ানে বা মসজিদের মিম্বরে। বক্তা ও আলোচকরা ওয়াজ মাহফিলে।
হক্কানি পীর-মাশায়েখরা খানকায়; তাকিয়ায়ে নফস তথা আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে। এভাবেই জাতি গঠনে ভূমিকা রাখছেন আলেমরা। হাজারও পথভোলা, বিপথগামী মানুষকে সঠিক পথে পরিচালিত করার প্রয়াস চালাচ্ছেন। গণমাধ্যমও যেহেতু একটি বড় যোগাযোগমাধ্যম। তাই অনেকেই লেখনীর সাহায্যে পত্রিকাগুলোয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রবন্ধ নিবন্ধ ও কলাম লিখে কিংবা বই পুস্তক ইত্যাদি রচনার মাধ্যমেও আদর্শ জাতি গঠনের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন অবিরত। শুধু ব্যক্তি বা পরিবারই নয়; বরং সুন্দর সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনেও তাদের গুরুত্বপূর্ণ মোটিভেশনাল বক্তব্যগুলো এখনো সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে নীতি-নৈতিকতা ও আদর্শ চর্চার দ্বারকে উন্মুক্ত রেখেছে।
দেশ-বিদেশে আলেমদের নেতৃত্বেই পরিচালিত হচ্ছে নানাবিধ দ্বীনি খেদমত। যার সবগুলোই মূলত আদর্শ নীতি-নৈতিকতাসম্পন্ন সুনাগরিক গড়ে তুলতে অসামান্য অবদান রাখতে সক্ষম হচ্ছে। নিচে আমরা কয়েকটি বিষয়ের উদাহরণ উল্লেখ করছি। যাতে সমাজে আলেমদের অবদান আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেই সঙ্গে আলেমদের কর্ম ও অবদানের সামাজিক মূল্যায়নও যেন আরও বৃদ্ধি পায়। সব দলমত নির্বিশেষে সবার মধ্যে যেন একটি ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হয় সেই আশাবাদও ব্যক্ত করছি।
মসজিদভিত্তিক সমাজ গঠন: সারা দেশে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৪ লাখ মসজিদ রয়েছে। যেগুলোর ইমাম ও খতিবের দায়িত্ব পালন করছেন আলেম সমাজ। জুমা ও বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব, যেমন দুটি ঈদসহ শবেবরাত, শবেকদর, ১০ মহররমের তাৎপর্য ইত্যাদি বিষয়ে সাধারণ মুসল্লিদের প্রতিনিয়ত দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে এই মসজিদগুলো থেকেই। মসজিদের মিম্বরে ধ্বনিত হচ্ছে ইসলামের সঠিক দাওয়াত। তুলে ধরা হচ্ছে সত্যের আহ্বান। যার মাধ্যমে মানুষ ইবাদতমুখী হচ্ছে। বিভিন্ন অন্যায় ও গুনাহ ছেড়ে ফিরে আসছে আল্লাহর পথে। এভাবে তারা তওবা করে পরিশুদ্ধ করছেন নিজেদের পাপাসক্ত জীবনকে। সুস্থ সমাজ গঠনে এর চেয়ে সুন্দর ভূমিকা আর কী হতে পারে?
একইভাবে প্রতি মাসে মাসিক তাফসির মাহফিল বা সাপ্তাহিক ঈমানি মজলিস ও প্রত্যহ হাদিসের তালিমবিষয়ক আলোচনাতেও তারা কোরআন-হাদিসের আলোকে বিভিন্ন অন্যায় অনাচার ও পাপাচার থেকে বিরত থাকার উপদেশ দিচ্ছেন প্রতিনিয়ত। যেসবের মাধ্যমে প্রত্যেকের দায়িত্ব পালন সম্পর্কে সচেতন করা, অন্যায় ও মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকার উপদেশ এবং আদর্শ ও নৈতিক শিক্ষা দেওয়াই মূল উদ্দেশ্য। এ ছাড়া মসজিদভিত্তিক মক্তবের মাধ্যমেও শিশু-কিশোরদের বিশুদ্ধ কোরআন পাঠও শেখানো হচ্ছে।
মাদরাসাভিত্তিক দীনি খেদমত: সারা দেশে কওমি ও আলিয়া মাদরাসার শিক্ষাব্যবস্থায় প্রতি বছর লাখো শিক্ষার্থী কোরআন-হাদিসের ইলম অর্জন করার সুযোগ লাভ করছেন। এভাবেই তারা সাক্ষরতা লাভ করছেন। আদর্শ নাগরিক হিসেবে সমাজ বিনির্মাণে অংশগ্রহণ করছেন। যারা কখনো নেশাগ্রস্ত হন না।
মারামারি ঝগড়াঝাটি খুনোখুনির মতো ন্যক্কারজনক কোনো অপরাধের সঙ্গেও জড়িত হন না। এভাবে আদর্শ জাতি গঠনের লক্ষ্যে মাদরাসাগুলোর অবদান অপরিসীম।
ধর্মীয় শিক্ষক হিসেবে অবদান: সারা দেশে প্রাইমারি স্কুল থেকে শুরু করে মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার মাধ্যমে আলেম সমাজ আদর্শ ও নৈতিকতা সম্পন্ন সুশিক্ষা ও ধর্মীয় শিক্ষার মাধ্যমে লাখো শিশু-কিশোরকে আদর্শ শিষ্টাচার সম্পন্ন সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়াস চালাচ্ছেন। এ ছাড়া সরকারি আলিয়া মাদরাসায় অধ্যাপনার মাধ্যমেও তারা সমাজ সংস্কারসহ আরও বহু সামাজিক দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
সমাজসেবায় আলেমরা: বিগত বন্যাকবলিত সময়ে শায়েখ আহমাদুল্লাহর আসসুন্নাহ ফাউন্ডেশন, হাফেজ্জি হুজুর সেবা সংস্থা, মাওলানা ইমরান হুসাইন হাবিব পরিচালিত সংগঠনের মাধ্যমে বহু অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সংবাদ ইতোমধ্যে শুধু সোশ্যাল মিডিয়াতেই নয়; বরং সারা দেশে ব্যাপক আলোচনা ও প্রশংসা কুড়িয়েছে।
এভাবেই সমাজের সব সেক্টরে আলেম সমাজ তাদের মূল্যবান সামাজিক কার্যক্রম করে আসছেন। এরপরও যদি কেউ আলেমদের অবদান ও কর্মকে অস্বীকার করতে চান। তবে তা হবে পরিষ্কার মিথ্যাচার কিংবা সত্যকে অস্বীকার করার মতো। আমরা আমাদের এ জাতীয় ভাইদের শুভবুদ্ধি কামনা করছি। আল্লাহতায়ালা তাদের সঠিক বুঝ দান করুন। সমাজ, রাষ্ট্র ও জাতি গঠনের লক্ষ্যে আলেমদের এ জাতীয় অবদানকে আরও বেশি গতিশীল করুন।
লেখক: খতিব, ভবানীপুর মাইজপাড়া হক্কানি জামে মসজিদ, গাজীপুর