মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় সংগ্রাম হলো নিজের খারাপ অভ্যাসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম। মিথ্যা বলা, গিবত করা, অশ্লীলতা দেখা, রাগ নিয়ন্ত্রণ না করা, নামাজে অবহেলা—এসব বদভ্যাস ধীরে ধীরে মানুষকে দুর্বল করে দেয়। কিন্তু আল্লাহতায়ালা বান্দাদের জন্য এমন একটি বিশেষ সময় নির্ধারণ করেছেন, যখন আত্মশুদ্ধি ও পরিবর্তন সহজ হয়—সেটি হলো রমজান।
কখনো কি আমরা ভেবেছি—একই মানুষ রমজানে কীভাবে বদলে যায়? যে ব্যক্তি সারা বছর ফজরের নামাজে উঠতে পারে না, সে রমজানে সাহরির জন্য জেগে ওঠে! যে ব্যক্তি কথায় কথায় রেগে যায়, সে রোজার কারণে নিজেকে থামিয়ে রাখে!! যে ব্যক্তি গিবত বা অশ্লীলতায় অভ্যস্ত, সে অন্তত এই মাসে নিজেকে সংযত রাখার চেষ্টা করে!!! কেন এমন হয় বা কেন এমনটা সম্ভব হয়? কারণ, রমজান হৃদয়কে নরম করে দেয়। মানুষ বুঝতে পারে—জীবন ক্ষণস্থায়ী, আর এই সুযোগ হয়তো শেষ সুযোগ। এই আবেগ, এই অনুতাপ ও এই আল্লাহভীতি—খারাপ অভ্যাস ত্যাগের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রেরণা।
এ ছাড়া রমজানে শয়তানকে বেঁধে রাখা হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যখন রমজান আসে, জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানদের শৃঙ্খলিত করা হয়। (বুখারি, ১৮৯৯; মুসলিম, ১০৭৯)। এই হাদিস প্রমাণ করে—রমজানে পাপের প্ররোচনা কমে যায়। শয়তানের কুমন্ত্রণা দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে খারাপ অভ্যাস ত্যাগ করা তুলনামূলক সহজ হয়।
তাকওয়া অর্জনের মাস রমজান। তাকওয়া মানে আল্লাহভীতি ও আত্মসংযম। যখন মানুষ তাকওয়া অর্জন করে, তখন সে নিজের ভুল বুঝতে পারে এবং তা সংশোধনের চেষ্টা করে। তাই রমজান আত্মশুদ্ধির মাস। রমজানে মানুষ দিনের বেলা হালাল খাবার ও পানীয় থেকেও বিরত থাকে। যখন একজন ব্যক্তি নিজের মৌলিক চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তখন সে অন্য পাপ থেকেও নিজেকে বিরত রাখতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, রোজা ঢালস্বরূপ। (বুখারি, ১৮৯৪)
রোজা মানুষকে আত্মসংযমের শক্তিশালী প্রশিক্ষণ দেয়, যার ফলে খারাপ অভ্যাস ত্যাগ করা সহজ হয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও মিথ্যা কাজ পরিত্যাগ করে না, তার পানাহার ত্যাগ করার আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই (বুখারি, ১৯০৩)। এ হাদিস আমাদের সতর্ক করে— গুনাহ পরিত্যাগ না করলে রোজার পূর্ণ ফজিলত নেই। রমজানের উদ্দেশ্য চরিত্র সংশোধন। শুধু না খেয়ে থাকাই লক্ষ্য নয়; বরং বদভ্যাস ত্যাগই আসল সাফল্য।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় রমজানের রোজা রাখে, তার পূর্বের গুনাহগুলো ক্ষমা করে দেওয়া হয়। (বুখারি, ৩৮; মুসলিম, ৭৬০) যখন অতীতের গুনাহ মাফ হওয়ার সুযোগ সামনে থাকে, তখন নতুন জীবন শুরু করার এটিই সেরা সময়।
রমজানে সমাজের পরিবেশ বদলে যায়। মসজিদ ভরে যায় মুসল্লিতে, কোরআন তিলাওয়াত বৃদ্ধি পায়, দান-সদকা বাড়ে। ভালো পরিবেশ মানুষকে ভালো পথে চলতে সাহায্য করে। তাই এই মাস বদভ্যাস ত্যাগের জন্য একটি অনুকূল ও শক্তিশালী পরিবেশ তৈরি করে। রমজান একটি আধ্যাত্মিক বিপ্লবের মাস। শয়তান শৃঙ্খলিত থাকে, তওবার দরজা খোলা থাকে, হৃদয় নরম থাকে এবং পরিবেশ সহায়ক হয়। তাই খারাপ অভ্যাস ত্যাগের জন্য রমজানের চেয়ে উত্তম সময় আর নেই। এই মাসে যদি আমরা সত্যিকারের সিদ্ধান্ত নিতে পারি—আমি বদলাব। তাহলে আল্লাহর সাহায্যে সেই পরিবর্তন স্থায়ী হতে পারে। রমজান আমাদের শেখায়, পরিবর্তন সম্ভব; শুধু দরকার আন্তরিক ইচ্ছা ও আল্লাহর দিকে ফিরে আসা।
হে ভাইবোনরা, রমজান এসেছে—পবিত্র, আলো ও রহমতের মাস। এই সময়কে কাজে লাগাও নিজের খারাপ অভ্যাস ত্যাগ করার জন্য। রাগ, মিথ্যা, গিবত, অশ্লীলতা ও অপ্রয়োজনীয় আচরণ থেকে নিজেকে মুক্ত করো। এই মাসে তুমি যদি ছোট ছোট পরিবর্তন করো, তোমার জীবন, পরিবার ও সমাজ হবে আলোকিত। রমজানকে কাজে লাগাও—নিজেকে ও অন্যকে উন্নত করার জন্য।
লেখক: আলেম, গবেষক ও সাংবাদিক