‘উসওয়াতুল হাসানাহ’ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কোরআনি পরিভাষা। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা ঘোষণা করেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসুলের মধ্যে তোমাদের জন্য উত্তম আদর্শ নিহিত রয়েছে, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিবসকে কামনা করে ও অধিকহারে আল্লাহকে স্মরণ করে।’ (সুরা আহজাব, ২১)। ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, রাসুল (সা.)-এর বাণী, কর্ম ও তাঁর সামগ্রিক অবস্থাকে অনুসরণ করার জন্য এই আয়াতটি একটি বড় ভিত্তি। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চরিত্র সম্পর্কে তাঁর প্রিয় সহধর্মিণী আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘তাঁর চরিত্র ছিল কোরআন’। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, আর অবশ্যই আপনি মহান চরিত্রের উপর অধিষ্ঠিত। (সুরা আল-কলম, ৪)
উত্তম চরিত্রের এই আদর্শ মানবজাতির সামনে একটি পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। মহানবি (সা.) বলেছেন, ‘আমাকে উত্তম চরিত্রের পূর্ণতা দানের জন্যই প্রেরণ করা হয়েছে।’(মুওয়াত্তা ইবনে মালিক)। এই বাণী থেকে স্পষ্ট হয় যে, ইসলামের মূল লক্ষ্যই হলো মানুষের চরিত্র নির্মাণ ও নৈতিকতার বিকাশ ঘটিয়ে তাকে প্রকৃত মানবিক মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করা। পবিত্র কোরআনে আরও ইরশাদ হয়েছে, ‘আমার বান্দাদেরকে বলে দিন,তারা যেন এমন কথা বলে যা অত্যন্ত সুন্দর।’ (সুরা বনি ইসরাঈল, ৫৩) এছাড়াও কোরআনে উত্তম জবাব দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছে, ‘আর যখন তোমাদেরকে অভিবাদন (সালাম) জানানো হয়, তখন তোমরাও তার চেয়ে উত্তম অভিবাদন জানাও অথবা অন্তত সেই অভিবাদনই ফিরিয়ে দাও।’(সুরা আন-নিসা, ৮৬)
উসওয়াতুল হাসানাহ শুধু একটি তাত্ত্বিক ধারণা নয়; বরং এটি একটি বাস্তব জীবনের আদর্শ। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতিটি কাজ, কথা ও আচরণ আমাদের জন্য অনুকরণীয়। তিনি যখন কাউকে সালাম দিতেন, তখন অত্যন্ত বিনয়ের সাথে দিতেন। তিনি কখনো কাউকে কটু কথা বলেননি। তিনি অপরের প্রতি দয়া ও সহানুভূতি দেখাতেন। এমনকি তাঁর শত্রুর প্রতিও তিনি ন্যায় ও ইনসাফের পরিচয় দিতেন। এই আদর্শ অনুসরণ করলেই আমাদের চরিত্রের পরিশুদ্ধি ঘটবে এবং আমরা মিশ্র সংস্কৃতির জটিল আবহেও নিজেদের নৈতিক অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হব।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সার্বিক জীবনই মানবজাতির জন্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি অন্ধকার যুগের আরব সমাজে নেমে এসেছিলেন চরম অবক্ষয়ের মধ্যে। কিন্তু তাঁর উত্তম ব্যবহার ও সুন্দর আদর্শের মাধ্যমেই তিনি সেই সমাজে আমূল পরিবর্তন এনেছিলেন। তিনি নিজে যেমন উত্তম চরিত্রের অধিকারী ছিলেন, তেমনি অন্যদেরকেও উত্তম চরিত্রের শিক্ষা দিতেন। এক হাদিসে তিনি বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম যার চরিত্র উত্তম।’(আবু দাউদ ও তিরমিজি)। অন্য হাদিসে তিনি ইরশাদ করেন, ‘কিয়ামতের দিন পরিমাপের সময় কারো কোনো কর্ম উত্তম চরিত্রের অধিক শ্রেষ্ঠ হবে না।’(উসুলে কাফি, খন্ড ২, পৃ. ৯৯)
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানুষের ভুল-ত্রুটি উপেক্ষা করে তাদের প্রতি দয়া ও সহানুভূতি প্রদর্শন করা। কোরআনে আল্লাহতায়ালা নির্দেশ দিয়েছেন, ‘আপনি ক্ষমাশীলতা অবলম্বন করুন এবং মানুষকে ভালো বিষয়ের আদেশ করুন আর মূর্খদের উপেক্ষা করুন।’(সুরা আরাফ, ১৯৯-২০০)। এই আয়াতে রাসুল (সা.)-কে মানুষের প্রতি কেমন আচরণ করতে হবে তার পূর্ণ দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তিনি কখনো কাউকে অহেতুক কষ্ট দিতেন না। তিনি মানুষের প্রতি বিনয়ী ও নম্র ছিলেন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাসুলুল্লাহ (সা.) বিভিন্ন সংস্কৃতি ও ধর্মের মানুষদের সাথে কীভাবে মিশতেন? তিনি কখনো কারো ধর্ম বা সংস্কৃতিকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেননি। বরং তিনি সুস্থ ও কল্যাণকর বিষয়গুলো গ্রহণ করতেন এবং ক্ষতিকর ও অনৈতিক বিষয়গুলো বর্জন করতেন। ইসলাম সূচনালগ্ন থেকেই প্লুরালিস্ট বা মিশ্র সংস্কৃতি চর্চা করেছে। মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের সংস্কৃতি, গঠনপ্রকৃতি ও কাঠামো ভিন্ন ভিন্ন। কিন্তু যেসব সংস্কৃতিতে ‘ফাহেশা ও মুনকার’ (দৃষ্টিকটু নগ্নতা, অন্যায়, অনৈতিক ও মন্দ)-এর কোনো উপাদান থাকে না, সেগুলো গ্রহণে ইসলাম কোনো বাধা দেয় না।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক