হজের পবিত্র সফর শুধু একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি জীবনের সবচেয়ে বড় ইবাদত। কিন্তু অনেক হাজি মক্কা-মদিনায় পৌঁছে আবেগের বশে এমন কিছু করে ফেলেন, যা পরে মূল হজ পালনেই বাধা হয়ে দাঁড়ায়। শরীর ভেঙে পড়ে, নিয়ম ভুল হয়ে যায়, হজের আসল স্বাদ থেকে বঞ্চিত হতে হয়। তাই মক্কা-মদিনায় অবস্থানকালে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সচেতন ও সতর্ক থাকা একান্ত প্রয়োজন।
ইহরামের বিধান যথাযথভাবে মেনে চলুন: যারা হজের নিয়তে ইহরাম বেঁধেছেন, তাদের ইহরামের সব বিধান অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পালন করতে হবে। মাথার উকুন বা শরীরে পিঁপড়া, মশা, মাছি বসলে অভ্যাসবশত মেরে ফেলা যাবে না। ইহরাম অবস্থায় সুগন্ধি, সুগন্ধিযুক্ত সাবান বা লোশন ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন।
ঝগড়া-বিবাদ ও অশোভন আচরণ থেকে দূরে থাকুন: ইহরাম অবস্থায় স্বামী-স্ত্রীসহ সব সহযাত্রীর সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদ, গিবত ও যাবতীয় নিষিদ্ধ কাজ থেকে দূরে থাকা অপরিহার্য। বিশেষ করে আরাফাতের ময়দানে সারা বিশ্বের মুসলিম একত্রিত হন। বিভিন্ন দেশের হাজিদের ইবাদতের ধরনে পার্থক্য থাকতে পারে।
নামাজে আগেভাগে মসজিদে যান: মসজিদে হারাম ও মসজিদে নববিতে প্রতিটি ওয়াক্তের নামাজের কমপক্ষে এক ঘণ্টা আগে গিয়ে জায়গা নিন। জুমার দিন অন্তত দুই ঘণ্টা আগে না গেলে মসজিদের ভেতরে বসার জায়গা পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
জানাজার নামাজের নিয়ম জেনে রাখুন: মক্কা ও মদিনায় প্রতিটি ওয়াক্ত নামাজের পরই জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এই জানাজায় অংশ নেওয়ায় অত্যন্ত বেশি সওয়াব রয়েছে। তাই নারী-পুরুষ উভয়ের জানাজার নামাজের নিয়মকানুন ভালোভাবে শিখে নিন।
নারীরা মাহরাম ছাড়া চলবেন না: হজে আসা নারীরা প্রতিটি ইবাদতে মাহরামসহ অংশ নিন। মসজিদে হারামে জামাতে নামাজ আদায় থেকে শুরু করে সব কাজেই মাহরামের উপস্থিতি নিশ্চিত করুন।
ঐতিহাসিক স্থানগুলো পরিদর্শন করুন: মক্কা-মদিনায় ইসলাম ও মুসলমানদের স্মৃতিবিজড়িত অসংখ্য দর্শনীয় স্থান রয়েছে। হজে আসার আগেই এই স্থানগুলো সম্পর্কে জেনে আসুন। এসব স্থান পরিদর্শন করুন এবং আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করুন।
দোয়া কবুলের বিশেষ স্থানগুলো চিনে রাখুন: কাবা শরিফের হাতিম, মুলতাজেম, কাবার দরজা, হাজরে আসওয়াদ, রোকনে ইয়ামেনি, মাকামে ইবরাহিম, সাফা-মারওয়া পাহাড়, জমজম কূপের উৎসস্থল, জান্নাতুল মাওয়ালা, আরাফাতের ময়দান, মিনা, মুজদালিফা, জাবালে রহমত, মসজিদে নববির রিয়াজুল জান্নাহ, জান্নাতুল বাকি, মসজিদে কুবা ও মসজিদে কিবলাতাইন–এই স্থানগুলোয় একনিষ্ঠ চিত্তে দোয়া করুন। এসব স্থানে দোয়া কবুলের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে।
ভালোবাসার দৃষ্টিতে কাবা শরিফ দেখুন: পবিত্র কাবা দেখাও একটি ইবাদত। রাসুলুল্লাহ (সা.) কাবাকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। যার অন্তরে কাবার ভালোবাসা নেই, সে নিতান্তই দুর্বল মুমিন। তাই মনভরে কাবা ঘর দেখুন।
মসজিদে কুবায় যাওয়ার আগে অজু করে বের হন: মদিনা থেকে মসজিদে কুবায় যাওয়ার আগে হোটেল বা বাসা থেকেই অজু করে বের হন। অজু অবস্থায় মসজিদে কুবায় গিয়ে দুই রাকাত নামাজ পড়লে একটি উমরার সওয়াব পাওয়া যায়।
খাওয়া-দাওয়া ও স্বাস্থ্যের বিষয়ে সতর্ক থাকুন: তৈলাক্ত ও অস্বাস্থ্যকর খাবার সম্পূর্ণ পরিহার করুন। মসজিদে যাওয়ার সময় সঙ্গে হালকা খাবার–খেজুর, বাদাম, বিস্কুট রাখুন। প্রচুর পরিমাণে জমজমের পানি, ফলের রস ও খেজুর খান। আবেগের বশে একের পর এক তাওয়াফ বা উমরা করতে গিয়ে শরীর নিঃশেষ করবেন না।
হজের আগে শরীরকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম দিন: মূল হজ শুরুর আগে অতিরিক্ত তাওয়াফ বা জিয়ারতে শরীর ক্লান্ত করবেন না। হজের আগের সময়টুকু মক্কায় বাইতুল্লায় নামাজ ও তাওয়াফে এবং মদিনায় মসজিদে নববিতে ইবাদতের মাধ্যমে কাটান।
চলাফেরায় হালকা ও আরামদায়ক পোশাক পরুন: হালকা স্যান্ডেল ও ঢিলেঢালা পোশাক ব্যবহার করুন। মিনা, মুজদালিফা ও আরাফায় প্রচুর হাঁটতে হয় এবং খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে হয়। তাই ব্যাগের বোঝা হালকা রাখুন।
জামরায় পাথর নিক্ষেপে সতর্ক থাকুন: জামরাতে শুধু নির্ধারিত কঙ্করই নিক্ষেপ করুন। আবেগের বশে জুতা, স্যান্ডেল বা বোতল ছোড়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। মুজদালিফা থেকেই প্রয়োজনীয় কঙ্কর সংগ্রহ করে রাখুন। জামরায় বড় ব্যাগ নিয়ে যাবেন না, নিরাপত্তারক্ষীরা বড় ব্যাগ আটকে দেন। দোয়া পড়তে পড়তে শয়তানের প্রতি মনে মনে ঘৃণা পোষণ করে কঙ্কর নিক্ষেপ করুন।
আরাফাতের ময়দানে গাছের ডাল ভাঙবেন না: আরাফাতের ময়দানে সারি সারি নিমগাছ রয়েছে। ইহরাম অবস্থায় এই গাছের ডাল ভাঙা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অনেকেই অসাবধানতাবশত গাছের ডাল ভেঙে মেসওয়াক করে থাকেন, যা ইহরামের বিধান লঙ্ঘন করে।
কাফেলার সঙ্গে থাকুন: যেখানেই যান, কাফেলার সবাই মিলে আগে থেকে একটি নির্দিষ্ট মিলনস্থল ঠিক করে রাখুন। কোনো কারণে কাফেলা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে সেই নির্ধারিত স্থানে অপেক্ষা করুন। কাফেলার সন্ধান না পেলে বাংলাদেশ হজ ক্যাম্পের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক