হজের মৌসুম যখন আসে, তখন লাখ লাখ মুসলমানের হৃদয়ে এক অদ্ভুত কম্পন জাগে—মক্কার পথে ছুটে যাওয়ার আকুলতা, আল্লাহর ঘরের সামনে দাঁড়ানোর স্বপ্ন। কিন্তু শুধু পৌঁছালেই কি যথেষ্ট? যে হজ কবুল হবে, যে হজ জীবন বদলে দেবে—সে হজ তো তাঁরই অনুসরণে হতে হবে, যিনি বিদায় হজে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, তোমরা আমার থেকে হজের নিয়ম শিখে নাও। রাসুল (সা.)-এর হজ শুধু আনুষ্ঠানিকতা ছিল না—ছিল আত্মার গভীর থেকে উৎসারিত অনন্য ইবাদত। আসুন, তাঁর সেই পবিত্র সফরের পথ ধরে আমরাও হাঁটি। হজ পালনের সংক্ষিপ্ত বিধান তুলে ধরেছেন মিরাজ রহমান
ইহরাম বাঁধা
জায়েদ ইবনে সাবেত (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে ইহরাম পরিধান করার জন্য পরিধেয় কাপড় খুলতে এবং গোসল করতে দেখেছেন। (তিরমিজি, ৮৩০)
রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনার অদূরে জুলহুলাইফায় ইহরাম বাঁধেন। সাঈদ ইবনুল জুবায়ের (রহ.) ইবনে আব্বাস (রা.)-এর কাছে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইহরাম বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে আমি সবচেয়ে ভালোভাবে অবগত। রাসুলুল্লাহ (সা.) জুলহুলাইফার মসজিদে দুই রাকাত নামাজ আদায় করে সেখানেই তালবিয়া পাঠের মাধ্যমে ইহরাম বেঁধেছেন। (বুখারি, ১৫৪২; আবু দাউদ, ১৭৭০)
তালবিয়া পাঠ করা
হজের অন্যতম আমল তালবিয়া পাঠ করা। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর তালবিয়া ছিল বাংলা উচ্চারণ: লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নিয়মাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারিকা লাক।
বাংলা অর্থ: আমি উপস্থিত, হে আল্লাহ আমি উপস্থিত। আমি হাজির (তোমার দরবারে), আমি হাজির, তোমার কোনো শরিক নেই। নিশ্চয়ই যাবতীয় প্রশংসা, সব নেয়ামত এবং নিখিল বিশ্বের রাজত্ব একমাত্র তোমারই। তোমার কোনো শরিক নেই। (বুখারি, ১৫৪৯)
রাসুলুল্লাহ (সা.) উচ্চৈঃস্বরে তালবিয়া পাঠ করতেন। তিনি বলেছেন, আমার কাছে জিবরাইল (আ.) এসে আমাকে বলল, যেন আমি আমার সাহাবিদের এবং আমার সঙ্গে থাকা সবাইকে উচ্চৈঃস্বরে তালবিয়া পাঠের নির্দেশ দিই। (আবু দাউদ, ১৮১৪)
জামারায় পাথর নিক্ষেপ করার আগ পর্যন্ত রাসুলুল্লাহ (সা.) তালবিয়া পাঠ করতে থাকতেন। ফজল ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বড় জামারায় পাথর নিক্ষেপের আগ পর্যন্ত তালবিয়া পড়তে থাকতেন। (আবু দাউদ, ১৮১৫)
তাওয়াফ করা
হজের অন্যতম আমল পবিত্র কাবাঘর তাওয়াফ করা। রাসুলুল্লাহ (সা.)ও কাবাঘর তাওয়াফ করেছেন। তিনি মক্কায় প্রবেশের পর প্রথম তাওয়াফ হেঁটে করেছেন। মদিনায় গিয়ে মুসলমানরা দুর্বল হয়ে গেছে বলে মুশরিকরা খোঁচা দিলে নিজেদের শক্তিমত্তা প্রদর্শনের জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রথম তিন চক্করে রমল (কাঁধ দুলিয়ে বীরদর্পে ঘনঘন পায়ে চলা) করেন এবং সাহাবিদেরও করতে বলেন। (মুসলিম, ১২৬৪)
ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) হাজরে আসওয়াদ থেকে পুনরায় হাজরে আসওয়াদ পর্যন্ত তিন চক্কর দ্রুত পদক্ষেপে আদায় করতেন। আর বাকি চার চক্কর স্বাভাবিকভাবে হেঁটে আদায় করতেন। (মুসলিম, ১২৬২)। আতা (রহ.) বলেন, আবু হুরায়রা (রা.) আমার কাছে বর্ণনা করে বলেছেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, এখানে ৭০ হাজার ফেরেশতা নিয়োজিত থাকে। এখানে এই দোয়া পাঠ করো: বাংলা উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আসয়ালুকাল আফওয়া ওয়াল আফিয়াতা ফিদ দুনিয়া ওয়াল আখিরাতা। রব্বানা আতিনা ফিদ দুনিয়া হাসানাতাও ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানা, ওয়াকিনা আজাবান নার।
বাংলা অর্থ: হে আল্লাহ! দুনিয়া ও আখিরাতে আপনার কাছে ক্ষমা ও সুস্থতা কামনা করি। হে আমার রব! আপনি আমাদের দুনিয়ায় কল্যাণ দান করুন এবং আখেরাতেও কল্যাণ দান করুন। আর আমাদের জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন। (ইবনে মাজাহ, ২৯৫৭)
আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে দুই রোকন তথা রোকনে ইয়ামেনি ও হাজরে আসওয়াদ ছাড়া অন্য কোনো রোকনে ইশতিলাম (স্পর্শ বা ইশারা) করতে দেখিনি। (বুখারি, ১৬০৯)
ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বাইতুল্লাহ সাতবার তাওয়াফ করেছেন এবং মাকামে ইব্রাহিমের পেছনে দুই রাকাত নামাজ আদায় করেছেন। (বুখারি, ১৬২৭)
অন্য এক বর্ণনায় জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাওয়াফের দুই রাকাত নামাজে সুরা কাফিরুন ও সুরা ইখলাস তেলাওয়াত করেছেন। (তিরমিজি, ৮৬৯)। তাওয়াফের পর মুলতাজাম ধরে দোয়া করা। আমর ইবনে শুয়াইব তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, আমি আমার পিতা আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রা.)-এর সঙ্গে তাওয়াফ করছিলাম। তখন আমি কিছু মানুষকে দেখলাম বাইতুল্লাহ ধরে আছে। (এটা দেখে) আমি আমার পিতাকে বললাম–চলুন আমরাও তাদের সঙ্গে বাইতুল্লাহ আঁকড়ে ধরি। তিনি বললেন, আমি আল্লাহর কাছে বিতাড়িত শয়তান থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। এরপর তিনি তাওয়াফ শেষে বাইতুল্লাহর ফটক ও হাজরে আসওয়াদ পাথরের মধ্যস্থান (মুলতাজাম) আঁকড়ে ধরে বললেন, আল্লাহর শপথ! এটাই সে জায়গা রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে আমি যেটা আঁকড়ে ধরতে দেখেছি। (বাইহাকি, ৯৩৩২)
আসলাম (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-কে হাজরে আসওয়াদে চুমু খাওয়ার সময় এ কথা বলতে শুনেছি, তিনি বলতেন, যদি আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে চুম্বন করতে না দেখতাম, তাহলে আমি কখনোই তোমাকে চুমু খেতাম না। (বুখারি, ১৬১০)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, হে ওমর! তুমি শক্তিশালী মানুষ। সুতরাং হাজরে আসওয়াদকে স্পর্শ করার সময় মানুষকে কষ্ট দিও না। যদি সম্ভব হয় তাহলে ইশতিলাম করবে, নতুবা তার দিকে মুখ ফিরিয়ে তাকবির বলে দেবে। (বাইহাকি, ৯২৬১)
ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) উটে আরোহণ করে বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করেছেন এবং যতবার রুকন তথা হাজরে আসওয়াদের সামনে এসেছেন, ততবারই কিছু জিনিস দিয়ে তার দিকে ইশারা করেছেন এবং তাকবির বলেছেন। (বুখারি, ১৬১৩)। অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, মিনায় পাথর নিক্ষেপের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) ফরজ তাওয়াফ উটনীর ওপর আরোহণ করে আদায় করেন। হাতের লাঠি দিয়ে হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করেন, যাতে মানুষ তাকে ভালোভাবে দেখতে পারে। আর তিনি উঁচুতে ছিলেন যাতে মানুষ তাকে মাসয়ালা জিজ্ঞেস করতে পারে। কারণ, তিনি তখন লোকদের বেষ্টনীর মধ্যে ছিলেন। (মুসলিম, ২৯৪০)
লেখক: আলেম,গবেষক ও সাংবাদিক