সাফা-মারওয়ায় সাঈ করা
জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) মাকামে ইবরাহিমের পেছনে নামাজ শেষ করে হাজরে আসওয়াদের কাছে গিয়ে তা স্পর্শ করলেন। এরপর তিনি দরজা দিয়ে সাফার দিকে গেলেন। এরপর সাফা থেকে সাঈ শুরু করেন এবং মারওয়াতে গিয়ে সাঈ শেষ করলেন। (মুসলিম, ১২১৮)
জাবের (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) সাফার কাছাকাছি হয়ে এই আয়াত তেলাওয়াত করলেন, নিশ্চয়ই সাফা এবং মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনের অন্তর্ভুক্ত। (সুরা বাকারা, আয়াত ১৫৮)
এরপর বললেন, মহান আল্লাহ যার কথা প্রথমে বলেছেন, আমরাও প্রথমে তার সাঈ করব। এ কথা বলে রাসুলুল্লাহ (সা.) সাফা পাহাড়ে আরোহণ করলেন। এরপর কাবার দিকে মুখ করে আল্লাহর একত্ব ও মাহাত্ম্য ঘোষণা করে বললেন, বাংলা উচ্চারণ: লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইইন কাদির। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু আনজাজা ওয়াদাহু ওয়া নাসারা আবদাহু ওয়া হাজামা আহজাবা ওয়াহদাহু। বাংলা অর্থ: আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। তিনি এক; তার কোনো অংশীদার নেই। তার জন্যই রাজত্ব এবং তার জন্যই সব প্রশংসা। তিনি প্রতিটি জিনিসের ওপর শক্তিমান। আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। তিনি এক। তিনি নিজের প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেছেন, তার বান্দাকে সাহায্য করেছেন এবং শত্রু বাহিনীকে একাই পরাস্ত করেছেন।
এ দোয়া তিনি তিনবার বললেন। এরপর সেখান থেকে নেমে মারওয়া পাহাড়ের দিকে অগ্রসর হলেন। সমতল ভূমিতে অবতরণ করে (বাতনে ওয়াদি নামক স্থানে, যা বর্তমানে সবুজ বাতি দ্বারা চিহ্নিত করা) উপত্যকা অতিক্রম করা পর্যন্ত দ্রুতগতিতে চললেন। এরপর মারওয়া পাহাড়ে হেঁটে চললেন। অতঃপর এখানেও সাফা পাহাড়ে যা (আমল) করেছিলেন, তা করলেন। (মুসলিম, ২৮২১)
ইবনে ওমর (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, বনি উব্বাদ থেকে জিকাক বনি আবু হুসাইন পর্যন্ত (সবুজ বাতির মধ্যবর্তী স্থানটুকু) দৌড়ে যাবে। (বুখারি, ১৬৪৩)
এক বর্ণনায় এ সময় একটি দোয়া পড়ার কথা এসেছে, বাংলা উচ্চারণ: রব্বিগফির ওয়ারহাম ইন্নাকা আনতাল আয়াজ্জুল আকরাম।
বাংলা অর্থ: হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করুন এবং আমার প্রতি রহম করুন। নিশ্চয়ই আপনি চির সম্মানিত ও মর্যাদাশালী। (তাবরানি, ৮৭০)
মিনায় অবস্থান করা
ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) মিনায় আমাদের জোহর, আসর, (৮ জিলহজের) মাগরিব, এশা ও ফজরের (৯ জিলহজের) নামাজ পড়িয়েছেন এবং এরপর আরাফায় গমন করেছেন। (তিরমিজি, ৮৭৯)
ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) মিনায় রাত যাপন করেছিলেন। (আবু দাউদ, ১৯৫৮) ইবনে ওমর (রা.) থেকে আরও বর্ণিত, তিনি বলেন, বিদায় হজে রাসুলুল্লাহ (সা.) মাথা মুণ্ডিয়েছিলেন। (বুখারি: ১/২৩৩)
আরাফায় অবস্থান করা
জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ৮ জিলহজ রাসুলুল্লাহ (সা.) বাহনে আরোহণ করে মিনায় জোহর, আসর, মাগরিব, এশা ও ফজরের নামাজ আদায় করতেন। সূর্য ওঠা পর্যন্ত সেখানে অপেক্ষা করতেন। নামিরা নামক স্থানে গিয়ে তার জন্য একটি তাঁবু স্থাপনের নির্দেশ দিতেন। এরপর আরাফার দিকে রওনা হয়ে যেতেন। কোরাইশরা মনে করত, রাসুলুল্লাহ (সা.) মাশআরুল হারামের কাছে অবস্থান করবেন, যেখানে জাহেলি যুগে কোরাইশরা অবস্থান করত। কিন্তু তিনি সামনে এগিয়ে আরাফায় পৌঁছান। দেখতে পান, নামিরায় তার জন্য তাঁবু খাটানো হয়েছে। তিনি সেখানে অবতরণ করলেন।
তারপর যখন সূর্য ঢলে পড়ল, তখন তিনি তার কাসওয়া নামক উটনীকে প্রস্তুত করার নির্দেশ দিলেন। তার পিঠে হাওদা লাগানো হলো। তখন তিনি বাতনে ওয়াদিতে এলেন। লোকদের উদ্দেশে (বিদায় হজের ঐতিহাসিক) ভাষণ দিলেন। ভাষণের পর আজান ও ইকামত দিয়ে জোহর পড়লেন। এরপর আবার ইকামত দিয়ে আসর পড়লেন। এ দুই নামাজের মাঝে অন্য কোনো নামাজ পড়েননি। সূর্যাস্ত পর্যন্ত এভাবে অবস্থান করলেন। হলদে আভা কিছু দূর হয়ে যখন সূর্যের গোলক সম্পূর্ণ অদৃশ্য হলো, তখন তিনি উসামা (রা.)-কে তার বাহনের পেছন দিকে বসিয়ে মুজদালিফার উদ্দেশে যাত্রা করলেন। (মুসলিম, ২৮২১)।
ইবনে শিহাব (রহ.) আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, আরাফায় অবস্থান করে আমরা কী করব? সালেম (রহ.) বললেন, যদি তুমি সুন্নতের ওপর আমল করতে চাও, তাহলে আরাফার দিন নামাজ দ্রুত পড়বে। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বললেন, তিনি সত্য বলেছেন। সাহাবিরা সুন্নত মোতাবেক আরাফায় জোহর ও আসরের নামাজ একত্রে আদায় করতেন। ইবনে শিহাব (রহ.) সালেম (রহ.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, আল্লাহর রাসুলও কি এমনটা করেছেন? সালেম (রহ.) বললেন, সাহাবিরা কি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বাতানো পথ ছাড়া অন্য কিছু অনুসরণ করবেন? (বুখারি, ১৬৬২)
এছাড়া আরাফায় খুতবা সংক্ষেপ করা এবং আরাফা থেকে ফেরার সময় যথাসম্ভব দ্রুত চলার ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশনা রয়েছে। (বুখারি, ১৬৬৬)
মুজদালিফায় অবস্থান করা
জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) মুজদালিফায় পৌঁছে একই আজানে এবং দুই ইকামতে মাগরিব ও এশার নামাজ আদায় করলেন। এ দুই নামাজের মাঝে অন্য কোনো নফল নামাজ আদায় করেননি। এরপর রাসুলুল্লাহ (সা.) ফজর পর্যন্ত ঘুমালেন। ভোর হয়ে গেলে তিনি আজান ও ইকামতসহ ফজরের নামাজ আদায় করলেন। অতঃপর কাসওয়ার পিঠে আরোহণ করে মাশআরুল হারামে এলেন। এখানে তিনি কিবলামুখী হয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন। তার মাহাত্ম্য বর্ণনা করলেন। কালিমায়ে তাওহিদ পড়লেন। তার একত্ব ঘোষণা করলেন। দিনের আলো উজ্জ্বল না হওয়া পর্যন্ত তিনি এভাবেই কাটিয়ে দিলেন। (মুসলিম, ২৮২১)
মিনায় গমন, পাথর নিক্ষেপ ও কোরবানি
আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এরপর রাসুলুল্লাহ (সা.) মিনায় আসতেন। জামারায় এসে পাথর নিক্ষেপ করতেন। পরে মিনায় নিজ জায়গায় ফিরে এসে কোরবানি করতেন। হাজ্জামকে (ক্ষৌরকার) ইশারায় বলতেন, প্রথমে ডানপাশ, পরে বামপাশ মুণ্ডন করো। অতঃপর তিনি চুলগুলো আবু তালহা আনসারি (রা.)-এর হাতে দিয়ে বললেন, মানুষের মাঝে বণ্টন করে দাও। (মুসলিম, ৩০৪৩; তিরমিজি, ৯১২)
জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) কোরবানির দিন সূর্য হেলে যাওয়ার আগে এবং কোরবানির পরের তিন দিন সূর্য হেলে যাওয়ার পর পাথর নিক্ষেপ করতেন। প্রথমে ছোট জামারায়, এরপর মধ্যম জামারায় এবং সবশেষে বড় জামারায় পাথর নিক্ষেপ করতেন। (মুসলিম, ১২৯৭)
ইমাম জুহরি (রহ.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) মসজিদে মিনার দিক থেকে প্রথমে অবস্থিত জামারায় সাতটি পাথর নিক্ষেপ করতেন। প্রত্যেকটি পাথর মারার সময় তিনি তাকবির বলতেন। এরপর সামনে এগিয়ে কিবলামুখী হয়ে দাঁড়িয়ে হাত তুলে দোয়া করতেন।
এখানে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতেন। অতঃপর দ্বিতীয় জামারায় এসে সাতটি পাথর মারতেন। প্রতিটি পাথর মারার সময় তাকবির বলতেন। তারপর বাঁ-দিকে মোড় নিয়ে ওয়াদির কাছে এসে কিবলামুখী হয়ে দাঁড়াতেন, হাত তুলে দোয়া করতেন। অবশেষে আকাবার কাছে জামারায় এসে তিনি সাতটি পাথর মারতেন। প্রতিটি পাথর মারার সময় তাকবির বলতেন। এরপর ফিরে যেতেন, এখানে বিলম্ব করতেন না। (বুখারি, ১৭৫৩)
আলি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) (মিনায় কোরবানির পশু) জবাই করার স্থানে এসে বললেন, এটা জবাই করার জায়গা এবং গোটা মিনা জবাই করার জায়গা। (তিরমিজি, ৮৮৫)
পাথর নিক্ষেপ করার সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে একটি দোয়া পাঠ করার বর্ণনা পাওয়া যায়, বাংলা উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাজয়ালহু হাজ্জান মাবরুরান ওয়া জানবান মাগফুরান। বাংলা অর্থ: হে আল্লাহ! আপনি এ হজ কবুল করুন এবং গুনাহ ক্ষমাকারী বানান। (তাবরানি, ৮৮১)
তাওয়াফে জিয়ারা বা ইফাদা
আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) কোরবানির দিন মিনা থেকে মক্কায় এসে তাওয়াফে জিয়ারত বা মূল তাওয়াফ আদায় করতেন। এরপর মিনায় গিয়ে জোহরের নামাজ আদায় করতেন। (মুসলিম, ১৩০৮)
জিলহজ মাসে হজের সঙ্গে ওমরা করতেন
দশম হিজরিতে রাসুলুল্লাহ (সা.) বিদায় হজ করেন। সেবার তিনি কিরান হজ করেছিলেন। আর হজ ও উমরা একসঙ্গে আদায় করাকে কিরান হজ বলা হয়। (বুখারি, ১৭৭৫)
লেখক: আলেম, গবেষক ও সাংবাদিক