যদি প্রশ্ন রাখা হয়, এই মুহূর্তে অর্থনীতির সবচেয়ে খারাপ খবর কী? সবাই এক বাক্যে বলবেন, জিনিসপত্রের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি। বিশেষ করে চাল, ডাল, চিনি, ভোজ্য তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন দাম বৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে। তবে নিত্যপণ্যের দাম হঠাৎ করেই বাড়েনি। মূলত ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারির শেষে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শুরুর পর থেকে অভ্যন্তরীণ বাজারে পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী হওয়া শুরু হয়। এটি বর্তমানে তীব্র আকার ধারণ করেছে।
এ কথা ঠিক যে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি নিয়ে মানুষের মধ্যে অসন্তোষ ছিল। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকার বিদায় নেওয়ার পর জনগণের মধ্যে বিশ্বাস ছিল যে, নোবেলবিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করে মানুষকে কিছুটা হলেও স্বস্তি দেবেন। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে মূল্যস্ফীতি কমাতে নিত্যপণ্যের ওপর থেকে শুল্ক-কর প্রত্যাহার, নীতি সুদহার বৃদ্ধিসহ নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু কোনো পদক্ষেপই কাজে আসেনি। মেলেনি সুফল। বরং মূল্যস্ফীতি বেড়েই চলছে। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পাগলা ঘোড়ার মতো বাড়ছে জিনিসপত্রের দাম।
মূল্যস্ফীতি বলতে আমরা যেটা বুঝি সেটা হলো- কোনো একটি নির্দিষ্ট সময় থেকে পরবর্তী আরেকটি সময়ে দাম কেমন বেড়েছে? যেমন- গত বছর একটি পণ্যের দাম ছিল ৫ টাকা। এ বছর সেই পণ্যের দাম বেড়ে দাঁড়াল ১০ টাকা। ‘বাড়তি’ যে দাম সেটাই মূল্যস্ফীতি। মূল্যস্ফীতি দুই ধরনের। খাদ্য মূল্যস্ফীতি এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হালনাগাদ (বিবিএস) তথ্য বলছে, অক্টোবরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৮৭ শতাংশ। গত তিন মাসে অর্থাৎ অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এটাই সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি। মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ৮৭ শতাংশ- এর অর্থ হচ্ছে, গত বছর যে পণ্যটি কিনতে ১০০ টাকা লেগেছিল, এ বছর সেই পণ্যটি কিনতে হয়েছে ১১০ টাকা ৮৭ পয়সায়। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, খাদ্যমূল্যস্ফীতি অক্টোবরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ দশমিক ৬৬ শতাংশ।
মূল্যস্ফীতি এক ধরনের কর। এটি বাড়লে জনগণের জীবনযাত্রার ওপর চাপ বাড়ে। বিশেষ করে নিম্ন ও স্বল্প আয়ের মানুষের কষ্ট বেশি বাড়ে। কারণ, জিনিসপত্রের দাম বাড়লেও বাড়েনি তাদের আয়। এজন্য মূল্যস্ফীতি বাড়লে তা সব দেশের সরকারের জন্য মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মূল্যস্ফীতির হার নিয়ে বাংলাদেশে বিতর্ক রয়েছে। কোনো কোনো অর্থনীতিবিদ মনে করেন, মূল্যস্ফীতি নিরূপণে পদ্ধতিগত ত্রুটি রয়েছে। বাস্তবে মূল্যস্ফীতির হার বর্তমানের চেয়ে কমপক্ষে দ্বিগুণ।
মূল্যস্ফীতির প্রভাব: রাজধানীর তালতলার বাসিন্দা রেহেনা বেগম খবরের কাগজকে বলেন, গত বছর যে টাকায় সংসার চালিয়েছেন, খাবার কেনা বা বাড়ি ভাড়া দিয়েছেন, এই বছর আর সেই পরিমাণ টাকায় চালাতে পারছেন না। মাস ফুরোবার আগেই টাকা শেষ হয়ে যাচ্ছে।
গত বছর রেহেনা বেগম এই সময় চাল কিনেছেন ৭০ টাকা কেজি দরে, একই চালের জন্য এখন দিতে হচ্ছে ৭৫ টাকা। বাড়ি ভাড়া বেড়েছে ১ হাজার টাকা, যাতায়াতের খরচ বেড়েছে, অথচ তার আয় বাড়েনি। এভাবেই মূল্যস্ফীতি মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে থাকে। সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে সীমিত এবং নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর ওপর। কারণ দাম বেড়ে যাওয়ার ফলে অনেক পণ্য তাদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়।
এখন দেখা যাক, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অন্তর্বর্তী সরকার কী ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আরও একবার নীতি সুদহার বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সর্বশেষ গত ২২ অক্টোবর নীতি সুদহার বা রেপো রেট ৫০ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে প্রায় ১০ শতাংশ করা হয়েছে। ড. আহসান এইচ মনসুর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের দায়িত্ব নেওয়ার পর তৃতীয়বারের মতো নীতি সুদহার বাড়ানো হয়েছে। বাংলাদেশ ২০২২ সালের মে থেকে এ পর্যন্ত ১১ বারের মতো নীতি সুদহার বাড়িয়েছে, মূল্যস্ফীতির চাপ কমানোর চেষ্টা জোরদার করছে। কিন্তু প্রকৃত অর্থে মূল্যস্ফীতি কমেনি।
গত সপ্তাহে সচিবালয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে অর্থ উপদেষ্টা ও ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠক শেষে গভর্নর এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার সুফল পেতে সময় লাগবে। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, মূল্যস্ফীতি কমে আসতে অন্তত ১২ থেকে ১৮ মাস সময় লাগবে। সে পর্যন্ত সবাইকে ধৈর্য ধরতে হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে সুদহারে তফসিলি ব্যাংকগুলোকে স্বল্প সময়ের জন্য ঋণ দেয়, সেটাই হচ্ছে নীতি সুদহার। ইংরেজিতে একে বলে রেপো রেট। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য নীতি সুদহার বাড়ানো একটি অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে পরিচিত। বিশ্বের প্রায় সব দেশেরই কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ হাতিয়ার ব্যবহার করে।
এদিকে কয়েক দফা নীতি সুদহার বাড়ানোয় উদ্বিগ্ন ব্যবসায়ীরা। তাদের যুক্তি- এতে ঋণের সুদ বাড়বে। সুদহার বাড়লে ব্যবসার খরচ বাড়বে। ফলে বিনিয়োগকারীরা নতুন বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হবেন। তাদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীদের মধ্যে বিনিয়োগে আগহ কম। ঋণের সুদ আরও বাড়লে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে। ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তারা বলেছেন, বর্তমানে ব্যাংকগুলোতে ঋণের সুদ হার ১৬ থেকে ১৭ শতাংশ। এত বেশি উচ্চ সুদে কোনো ব্যবসা পরিচালনা করা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় কমে গেছে ৪৪ শতাংশ। এর অর্থ হচ্ছে, দেশে বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ নেই। খুব শিগগিরই পরিবেশের উন্নতি হবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।
ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবুল কাসেম খান খবরের কাগজকে বলেন, খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির জন্য সরবরাহব্যবস্থা প্রধানত দায়ী। এই জায়গায় নিবিড় তদারকি দরকার। কোথায় কোথায় খরচ বেড়ে যাচ্ছে, সেটা যদি চিহ্নিত করা যায় তাহলে এর সমাধান সহজ হবে।
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক সমীক্ষার উদ্ধৃত দিয়ে তিনি বলেন, মোট পণ্যমূল্যের ২২ থেকে ৪৪ শতাংশ পর্যন্ত পরিবহন খাতে ব্যয় হয়। এই ব্যয় যৌক্তিকভাবে হচ্ছে কিনা তা খতিয়ে দেখা দরকার। যেখানে অন্যান্য দেশে এই খরচ মাত্র ১০ থেকে ১২ শতাংশ, সেখানে আমাদের দেশে খরচ হচ্ছে দ্বিগুণেরও বেশি। সরবরাহব্যবস্থা উন্নত করতে হলে এই জায়গায় নজর বেশি দিতে হবে বলে জানান তিনি। সরবরাহব্যবস্থায় কোথায় কোথায় দাম বাড়ছে তা নির্ধারণে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে একটি যৌথ সমীক্ষা করার পরামর্শ দেন এই ব্যবসায়ী নেতা। প্রতিবেশীসহ অন্যান্য দেশ কীভাবে পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করছে তা অনুসরণের প্রস্তাব দেন।
শুল্ক তুলে নিলেও প্রভাব নেই বাজারে: মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতি সুদহার বাড়ানোর পাশাপাশি নিত্যপণ্যের আমদানির ওপর শুল্ক হ্রাস ও প্রত্যাহার করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, গত তিন মাসে চাল, পেঁয়াজ, ভোজ্য তেল, আলু, চিনি ও ডিমের আমদানির ওপর শুল্ক ছাড় এবং প্রত্যাহার করা হয়েছে। উদ্দেশ্য, বাজারে পণ্যের সরবরাহ বাড়ানো। পেঁয়াজ আমদানিতে এখন কোনো শুল্ক নেই। ২ শতাংশ অগ্রিম কর ছাড়া চাল আমদানিতে শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে। ডিম আমদানিতে ২৫ শতাংশ শুল্কের পরিবর্তে ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এসব পণ্যের দাম কমেনি। মাঝখান থেকে সরকারের শত শত কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। গত ১৩ নভেম্বর বুধবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনের এক অনুষ্ঠানে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ অকপটে স্বীকার করে বলেন, শুল্ক কমানোর পরও নিত্যপণ্যের দাম কমছে না। শুল্ক কমানোর সুফল পাচ্ছেন না ভোক্তারা।
এনবিআরের সাবেক সদস্য ফরিদ উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, শুল্ক ছাড়ের উদ্দেশ্য হচ্ছে ভোক্তা যাতে সাশ্রয়ী দামে পণ্য কিনতে পারেন। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, শুল্ক ছাড়ের সুবিধা কখনই ভোক্তা পান না। লাভের গুড় পিঁপড়ে খায়।
নীতি সুদহার বাড়ানোই একমাত্র সমাধান নয়: বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতি সুদহার বাড়ানো একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হলেও এটি একমাত্র সমাধান নয়। মূল্যস্ফীতি কার্যকরভাবে কমানোর জন্য অন্যান্য বিষয়কে একযোগে মোকাবিলা করতে হবে। তাদের মতে, সরবরাহব্যবস্থায় গতিশীলতা এবং কার্যকরভাবে উৎপাদন খরচ ও দেশীয় বাজার ব্যবস্থাপনাও মূল্যস্ফীতি কমানোর জন্য অপরিহার্য বিষয়। মূল্যস্ফীতি কমানোর জন্য চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান কমাতে হবে এবং পরিবহন খরচ ও বাজারের অব্যবস্থাপনা কমাতে হবে। এসব ব্যবস্থা একযোগে না নিলে শুধুমাত্র নীতি সুদহার বৃদ্ধির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা কার্যকর হবে না। বরং এটি প্রবৃদ্ধির গতিকে ব্যাহত করবে।
সামগ্রিক বিষয়ে জানতে চাইলে সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএসের সাবেক ঊর্ধ্বতন গবেষণা পরিচালক ড. জায়েদ বখত খবরের কাগজকে বলেন, সরকারের যুক্তি হচ্ছে, সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসছে না। সে জন্য সুদহার বাড়িয়ে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অব্যাহত রাখার কৌশল নেওয়া হয়েছে। আমি এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বলতে চাই, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ তেমন বেশি নয়। যদি ঋণের প্রবৃদ্ধি বেশি না হয়, তাহলে সুদহার বাড়ানোর কোনো যৌক্তিকতা নেই। সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অব্যাহত রাখার পক্ষে আমি নই।
এ ক্ষেত্রে আপনার পরামর্শ কী? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি মনে করি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সরবরাহব্যবস্থা উন্নতি করতে হবে। সেটা করতে হবে পর্যাপ্ত আমদানি বাড়িয়ে। কারণ আমাদের দেশে যে মূল্যস্ফীতি সেটা আমদানিজনিত। চাহিদাজনিত নয়। কাজেই, নীতি সুদহার বৃদ্ধি না করে সরবরাহব্যবস্থার দিকে নজর দিতে হবে বেশি।