মাথার চুল থাকে খোলা। পরনে কখনো কালো, কখনো লাল পোশাক। এক হাতে বাঁশের লাঠি। তীব্র গতিতে গিয়ে আক্রমণ করেন প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়কে। একপর্যায়ে লাঠির কলাকৌশলে পরাজিত করেন প্রতিপক্ষকে। এই লাঠিয়াল হচ্ছেন কুষ্টিয়ার মেয়ে রূপন্তী। পুরো নাম মঞ্জুরীন সাবরীন চৌধুরী রূপন্তী। এভাবেই তিন পুরুষের ঐতিহ্যের লাঠি নিয়ে সুনামের সঙ্গে লাঠিখেলার ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন।
রূপন্তীর বাড়ি কুষ্টিয়া শহরের মজমপুর এলাকায়। জন্ম ৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৪ সালে। দুই বোনের মধ্যে রূপন্তী বড়। কুষ্টিয়া সরকারি বালিকা বিদ্যালয় থেকে ২০১০ সালে এসএসসি পাস করে চলে আসেন ঢাকায়। শহরের পরিবেশে থাকলেও প্রায় শত বছরের পারিবারিক ঐতিহ্য হওয়ায় ছোট থেকেই লাঠিখেলার সঙ্গেই বড় হয়েছেন তিনি। তার পরিবারে নারী-পুরুষ, ছেলেমেয়ে বিভেদ নেই। পরিবারের কমবেশি সবাই লাঠিখেলায় পারদর্শী। দাদা সিরাজুল হক চৌধুরী (যাকে সবাই চেনেন ওস্তাদ ভাই নামে) ১৯৩৩ সালে প্রথম নিখিল বঙ্গ লাঠিয়াল বাহিনী প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে দাদার হাত ধরেই বাবা মঞ্জুরুল হক চৌধুরীর (রতন চৌধুরী) হাতে লাঠি উঠে আসে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর নাম পরির্বতন করে রাখেন বাংলাদেশ লাঠিয়াল বাহিনী। আর বাবার কাছেই মূলত রূপন্তীর লাঠিখেলার হাতেখড়ি। তার বয়স যখন সাত বছর তখন বাবার খেলা দেখে হাতে তুলে নেন লাঠি। লাঠি ঘোরানো রপ্ত করতে থাকেন রূপন্তী। শিখে নেন প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার কৌশল।
এরপর ওস্তাদ শুকুর আলী ও ওসমান সরদারের কাছে শেখেন লাঠিখেলার আরও নানা কলাকৌশল। ওসমান সরদারই রূপন্তীর লাঠিখেলার গুরু। তিনি পদ্মার চরে খেলায় বিশেষজ্ঞ ছিলেন। রূপন্তীর পরিবারের সবাই লাঠিখেলায় জড়িত। ফুপু হাসনা বানু বাংলাদেশের প্রথম নারী লাঠিয়াল। ফুপাতো বোন শাহিনা সুলতানা ও শারমিন সুলতানাও লাঠিখেলায় পারদর্শী। ছোটবোন ক্রমন্তীও লাঠি খেলে।
রূপন্তীর লাঠিখেলার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে ২০১৬ সালে। ওই বছরের জানুয়ারিতে দেশের লাঠিয়ালদের একমাত্র সংগঠন ‘বাংলাদেশ লাঠিয়াল বাহিনী’ দুই দিনের উৎসবের আয়োজন করে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ মাঠে। কুষ্টিয়া ছাড়া নড়াইল, ঝিনাইদহ, পাবনা, নাটোর, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা ও যশোরসহ দেশের বিভিন্ন জেলার ২৫টি দলের প্রায় ৫০০ লাঠিয়াল অংশ নেন এ উৎসবে।
এসব দলে পুরুষ সদস্যদের পাশাপাশি নারীরাও ছিলেন। কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের মাঠে লাঠিখেলায় অন্যদের মতো মঞ্জুরীন সাবরীন চৌধুরী রূপন্তীও দর্শকদের লাঠিখেলা দেখান। ওই সময় তার লাঠিখেলায় মুগ্ধ হন সবাই। তিনি যখন লাঠি হাতে তীব্র গতিতে প্রতিপক্ষ লাঠিয়ালের দিকে তেড়ে যান সে সময় তার চোখে আগুন ঝরে। তাকে ঠেকাতে হিমশিম খেয়ে যায় প্রতিপক্ষ। এভাবেই খেলায় পারদর্শিতার কারণে লাঠিখেলায় তার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে।
২০১৮ সালের ২১ জানুয়ারি দর্শকের মন জয় করেছেন যশোরের মধুমেলাতেও। ১৪২২ এবং ১৪২৩ বঙ্গাব্দের পয়লা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে, ২০১৭ সালের ৪ মার্চে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারেও লাঠি খেলায় অংশগ্রহণ করে দারুণ নৈপুণ্য দেখিয়েছেন। ছায়ানটে ২০১৭ সালের ৭ মার্চ নারী দিবস উপলক্ষে পেয়েছেন সম্মাননা।
বর্তমানে তিনি রোকনুজ্জামান দাদাভাইয়ের কচিকাঁচার মেলায় প্রশিক্ষক হিসেবে শিশুদের লাঠিখেলা শেখান। রূপন্তীর ইচ্ছা, পুরো পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ুক এই লাঠিখেলা। ফুটবল, ক্রিকেটের মতো লাঠিখেলাও সর্বত্র ছড়িয়ে যাক।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে লাঠিয়াল রূপন্তী বললেন, এটা আমাদের পারিবারিক ঐতিহ্যের তিন পুরুষের খেলা। মেয়ে হয়ে জন্ম নিয়েও যে স্বাধীনভাবে সংস্কৃতি চর্চা ও খেলাধুলা করা যায় আমাদের পরিবারই তার উদাহরণ। লাঠিখেলা শুধু ঐতিহ্য নয়, আত্মরক্ষার জন্যও প্রয়োজন। বিশেষ করে মেয়েদের জন্য। কারণ পথেঘাটে চলতে গিয়ে মেয়েদের নিয়মিত অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। এ ছাড়া খেলাধুলা করলে মন ও শরীর দুটোই ভালো থাকে। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে লাঠিখেলা বিলুপ্তির পথে। কারণ এখানে লাঠিয়ালরা সরকারি-বেসরকারিভাবে কোনো অর্থ পান না। লাঠিখেলা যেহেতু আমাদের দেশীয় সংস্কৃতির অংশ, সেহেতু আমরা চাই এটি ধরে রাখতে। সরকারি-বেরসরকারি উদ্যোগে এটাকে যদি জাতীয়ভাবে আয়োজন করা যায় তাহলে আরও উন্নয়ন করা সম্ভব। আমি তো এখন প্রায় সারা দেশেই লাঠি খেলা দেখাচ্ছি। এখন জাতীয় থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আমাদের লাঠিয়ালদের নৈপুণ্য তুলে ধরতে চাই।
রূপন্তী বলেন, লাঠিখেলার সময় দৃষ্টি থাকতে হয় প্রখর ও তীক্ষ্ণ। প্রতিপক্ষ কে, সেটা ভাবা ঠিক নয়। ঠিক তেমনি সমাজে নিজেকে তুলে ধরতে প্রতিপক্ষ কে, সেটা ভাবাও ঠিক নয়। লক্ষ্য থাকতে হবে জয়ের, বাড়াতে হবে মনোবল। থাকতে হবে মনের জোর, তবেই জয় হবে। নিজেই নিজেকে রক্ষা করার মনোবল থাকা উচিত।
তিনি বলেন, ‘পিছিয়ে থাকার দিন শেষ। যেকোনো আঘাতের বিরুদ্ধে একটু হলেও প্রতিবাদ করতে হবে নারীদের। দিন বদলে গেছে। আমি পারব, করবই- সেই শক্তি জোগাতে হবে নারীদের মনে।’
এক সন্তানের জননী রূপন্তী, তার পরও তিনি লাঠিখেলায় নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছেন। মেয়েকেও তিনি এই খেলা শেখাতে চান। তিনি বলেন, এই খেলায় পরিবার থেকে উৎসাহ পেলেও সামাজিকভাবে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা এসেছে। তার পরও থেমে থাকিনি। বর্তমানে দেশে পুরুষ লাঠিয়াল অনেক থাকলেও মেয়েরা এই খেলায় আসতে চায় না। তাই নারীদের এই খেলায় এগিয়ে আনার জন্য নারীদের নিয়ে একটি দল গঠন করা হয়েছে। যে দলে বর্তমানে ২৩ জন নারী খেলোয়াড় আছেন।
পারিবারিক পরিচিতিতে নয়, নিজের যোগ্যতায় লাঠি খেলেন রূপন্তী চৌধুরী। একজন খেলোয়াড় হিসেবেই খেলে জায়গা করে নিয়েছেন পুরুষের পাশে। আরও এগিয়ে যেতে চান।
রূপন্তীর জীবনসঙ্গী রাজধানীর সিটি ইউনিভার্সিটির মানব সম্পদ উন্নয়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সাব্বির হাসান চৌধুরী, তিনি নিজেও লাঠিখেলা করতেন। তিনি বলেন, স্ত্রী রূপন্তীর কারণে সবাই আমাকে আলাদাভাবে চেনে, যা আমার জন্য অন্যরকম ভালো লাগার বিষয়।
তিনি আরও বলেন, ১৯৩৩ সালে ওস্তাদ সিরাজুল হক চৌধুরী প্রথমে নিখিলবঙ্গ লাঠিয়াল বাহিনী গড়ে তোলেন। পরে দেশ বিভক্তির পর বাংলাদেশ লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে নামকরণ করা হয়। সে সময় ৭ থেকে ১০ দিন ধরে লাঠিখেলা উৎসব চলত। বর্তমানে সেই ধারা বজায় রাখার প্রয়াস চালানো হলেও অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া এটি করাও সম্ভব না।