গত বছর গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সহিংস ক্ষমতার অবসান ঘটে। যখন অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতিকে সম্পূর্ণ পতনের দ্বারপ্রান্ত থেকে উদ্ধার করার দায়িত্ব গ্রহণ করে, তখন অর্থনীতিকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার কাজটি প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। বিভিন্ন কমিশনের প্রতিবেদন থেকে অর্থনীতির প্রকৃত চিত্র বের হয়ে আসার পর মানুষ জানতে পারে পূর্ববর্তী শাসনামলে অর্থনীতি কতটা ধ্বংসের সম্মুখীন হয়েছিল।
মুদ্রাস্ফীতির অনিয়ন্ত্রিত প্রবাহ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাস ও বৃহৎ বাণিজ্যঘাটতি ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে প্রায় পতনের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। দুর্নীতিগ্রস্ত শাসনব্যবস্থার গুরুতর আর্থিক অনিয়ম এবং অন্যান্য বিষয় মিলে প্রায় সব প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংসপ্রায় অবস্থায় পরিণত হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য এসব মোকাবিলা করাই ছিল প্রধান চ্যালেঞ্জ। অর্থনীতির অবাধ পতন রোধ করতে এবং এটিকে গতিপথে ফিরিয়ে আনতে আমাদের কিছু সাহসী পদক্ষেপ নিতে হয়েছিল। মুদ্রা ও রাজস্বনীতি কঠোর করা হয়েছিল। এগুলো রুখতে কঠিন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সর্বাধিক প্রচেষ্টা প্রয়োগ করা হয়েছিল।
সাহসী সংস্কার ও পুনরুদ্ধার কর্মসূচির অধীনে প্রধান পদক্ষেপগুলো ছিল- বিস্তারিত সম্পদের মান পর্যালোচনা, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে কাঠামোগত সংস্কার নির্দেশিকা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা থেকে চুরি যাওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া শুরু করা এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থায় পর্যাপ্ত তারল্য নিশ্চিত করা। অর্থব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে সরকার রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধির জন্য সর্বোত্তম প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছে। বিশেষ কর সুবিধাগুলো পর্যায়ক্রমে বাতিল করা এবং করনীতিকে করপ্রশাসন থেকে পৃথক করা। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে নীতিগত হার ১০ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে, যা বিনিময় হার স্থিতিশীল করতে সহায়তা করতে পারে।
এক বছর পর তাকালে আমরা বাংলাদেশের অনন্য সামষ্টিক অর্থনৈতিক সাফল্য দেখতে পাব। কীভাবে আমরা পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে অসম্ভব কাজটি কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছি তার গল্প শেয়ার করে আনন্দিত হতে পারব। বর্তমানে যে পরিসংখ্যান এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকগুলো সেই গল্পটিই বলে।
বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেই যখন শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটে তখন উৎপাদন হ্রাস এবং মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি পায়। সম্প্রতি শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রে, সোহার্তো শাসনের পতনের সময় ইন্দোনেশিয়ায়, ১৯৮০-এর দশকের গোড়ার দিকে ইরানে এবং ১৯৯০-এর দশকের শুরুর দিকে রাশিয়ায় এমন ঘটনাই ঘটেছিল। ইন্দোনেশিয়ায় এক বছরে দারিদ্র্যের হার প্রায় ১৫ শতাংশ থেকে প্রায় ৩৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল।
শ্রীলঙ্কায় পূর্ববর্তী সরকারের পতনের এক বছর পর অর্থাৎ ২০২৩ সালে প্রায় ২৬ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করত। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৩ সালে রাশিয়ার মুদ্রাস্ফীতি ৮০০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায় এবং দেশটির পুনরুদ্ধারে প্রায় ১০ বছর সময় লেগেছিল। এদিকে, ১৯৯১ থেকে ১৯৯৪ সালের মধ্যে দেশটিতে পুরুষদের গড় আয়ু ছয় বছর কমে যায়। একই সময়ে আগের সোভিয়েত ইউনিয়নে এবং পূর্ব ইউরোপেও গড় আয়ু একই রকমভাবে হ্রাস পায়। কিন্তু বাংলাদেশে তা ঘটেনি। সেখানে মুদ্রাস্ফীতি বরং কমেছে এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক পর্যায়ে রয়ে গেছে।
প্রধান পদক্ষেপগুলো ছিল- বিস্তারিত সম্পদের মান পর্যালোচনা, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে কাঠামোগত সংস্কার নির্দেশিকা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা থেকে চুরি যাওয়া সম্পদের পুনরুদ্ধার এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থায় পর্যাপ্ত তারল্য নিশ্চিত করা। অর্থব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে সরকার রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধির জন্য সর্বোত্তম প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছে। বিশেষ কর সুবিধাগুলো পর্যায়ক্রমে বাতিল করা এবং করনীতিকে করপ্রশাসন থেকে পৃথক করা।...
আমাদের সরকারের নীতিমালায় সমর্থিত এ অসাধারণ সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধিতে সাহায্য করেছে। যেমন, জুলাই মাসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (DSEX) র্যালিতে ১২.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে যা বিশ্ববাজারের প্রধান পারফর্মারদের মধ্যে তৃতীয় স্থানে রয়েছে। যেখানে ভিয়েতনামে কেবল VN30 (+১৩.৯৩ শতাংশ) এবং থাইল্যান্ডের SET (+১২.৫৪ শতাংশ) এর নিচে। সূচকটি ৬০৫ পয়েন্ট বেড়ে ৫,৪৪৩ এ এসে থেমে যায়, যা সাড়ে নয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ স্তর ছিল।
অন্তর্বর্তী সরকারের সঠিক নীতিমালা বাংলাদেশের অর্থনীতির ধস বন্ধ করেছে এবং পুনরুজ্জীবিত হওয়ার লক্ষণ দেখা দিচ্ছে। প্রণোদনা এবং আস্থা বৃদ্ধির জন্য প্রবাসীরা সঠিক চ্যানেলের মাধ্যমে রেকর্ড পরিমাণে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। সুশাসনের মাধ্যমে আর্থিক ব্যবস্থার ওপরও মানুষের আস্থা ফিরে এসেছে। বাজার-ভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থা গ্রহণের পরও স্থানীয় মুদ্রা স্থিতিশীল রয়েছে।
বিশেষ করে আর্থিক খাতে এখনো চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। আর্থিক খাতে ঝুঁকি গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে কমাতে উদ্ধার কার্যক্রম এবং কঠিন সিদ্ধান্তের মিশ্রণ প্রয়োজন। অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পের ব্যয় এড়াতে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের হার উন্নত করার জন্য বিশেষ যত্ন প্রয়োজন। ভর্তুকি কমাতে বিদ্যুৎ খাতে উদ্ভাবনী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আমরা খাদ্যনিরাপত্তা এবং সামাজিক নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতেও প্রয়োজনীয় সহায়তা অব্যাহত রেখেছি।
এক বছর আগে যা অসম্ভব বলে মনে হচ্ছিল তা এখন নিয়ন্ত্রণে আছে। আমরা আশা করি, আগামী মাসগুলোতে অবস্থার আরও উন্নতি হবে। যদিও মুদ্রাস্ফীতি এখন নিম্নমুখী প্রবণতার দিকে যাচ্ছে। আমরা এটিকে ৭ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনতে আমাদের নীতিগুলোর কার্যক্রম অব্যাহত রাখব। শক্তিশালী মৌলিক বিষয় এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর ভিত্তি করে সুসমন্বিত রাজস্ব, মুদ্রা, বিনিময় হার এবং পুঁজিবাজার নীতির কারণে আমরা আরও উন্নতি আশা করি। আমরা আশা করি, প্রবৃদ্ধি বাড়বে, মুদ্রাস্ফীতি আরও হ্রাস পাবে। পাশাপাশি শেয়ারবাজারের গতিও ফিরে আসবে।
লেখক: অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা