সত্য তুলে ধরা সাংবাদিকের দায়িত্ব। পাশাপাশি জনগণের জানার যে অধিকার তা রক্ষা করা সাংবাদিকতা পেশার নৈতিক অঙ্গীকার। দীর্ঘ ২৫ বছরের সাংবাদিকতার কর্মজীবনে সাহসী প্রতিবেদন তৈরি করতে নানা অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছি। গত দুই বছরে মুক্ত চিন্তার স্বাধীন দৈনিক খবরের কাগজের কর্মজীবনের কঠিনতম নানা অধ্যায় পার করেছি। তার দু-একটি আজ এ লেখায় বলব।
ঝিনাইদহ-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম আনারকে ২০২৪ সালের মে মাসে হত্যা করা হয় ভারতের পশ্চিমবঙ্গে। মূল অভিযুক্ত হিসেবে নাম এসেছে শিমুল ভূঁইয়ার। আমানুল্লাহ তার ছদ্মনাম। শিমুল পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টির খুলনা বিভাগীয় প্রধান ছিলেন। তার অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে খবরের কাগজ অফিস থেকে প্রতিবেদন তৈরি করার জন্য বলা হয়। সেই সময় প্রধান বার্তা সম্পাদক বর্তমান ব্যবস্থাপনা সম্পাদক খালেদ ফারুকী ভাই গাইডলাইন দিলেন প্রতিবেদন তৈরির ব্যাপারে। পাশাপাশি মনে করিয়ে দিলেন, জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে সাংবাদিকতা না করতে। এমনিতেই এই শিমুল ভূঁইয়ার দুর্ধর্ষ কর্মকাণ্ড সম্পর্কে দুই যুগের সাংবাদিকতা করার কারণে আগে থেকেই জানা ছিল। কিন্তু আনার হত্যার নৃশংসতার তথ্য পাওয়ার পর মনের মধ্যে এক অজানা আতঙ্ক কাজ করছিল। মনের আকাশে ভেসে উঠল আমাদের উত্তরসূরি শহীদ সাংবাদিক যশোরের সামছুর রহমান ও আর এম সাইফুল আলম মুকুল ভাইয়ের কথা। পাশাপাশি খুলনার মানিক সাহাসহ দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে যেসব সাংবাদিক খুন হয়েছেন তাদের কথা। প্রথিতযশা এসব সাংবাদিক খুন হয়েছেন ভাড়াটিয়া চরমপন্থি কিলারদের হাতে। বর্তমানে চরমপন্থিদের সেই দাপট না থাকলেও তাদের তৎপরতা থেমে নেই। জনপ্রতিনিধিসহ রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী খুনে চরমপন্থিদের কানেকশন মেলে।
সাংবাদিকতা আমার কাছে শুধু পেশা নয়, এটি এক ধরনের সংগ্রাম- অন্যায়ের বিরুদ্ধে, ভয়ভীতির বিরুদ্ধে, নীরবতার বিরুদ্ধে। জনগণ যেন সত্যটা জানতে পারে, সেটাই আমার একমাত্র লক্ষ্য। প্রতিদিন নিজের জীবন ও পরিবারকে ঝুঁকিতে রেখে কাজ করি, কারণ আমি বিশ্বাস করি, সংবাদমাধ্যমই ন্যায়ের কণ্ঠস্বর। অপরাধীরা যত শক্তিশালীই হোক, ইতিহাস একদিন তাদের মুখোশ উন্মোচন করবেই। আর সেই ইতিহাস লেখার কাজে সাংবাদিকের কলম কখনো থেমে থাকবে না।…
শিমুল ভূঁইয়ার অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে তথ্য নিতে শুরু করলাম যশোর, খুলনা, ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়ার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা চরমপন্থিদের কাছ থেকে। যোগাযোগ করলাম পুলিশসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে। চরমপন্থিদের অধিকাংশ সোর্সই জানালেন, শিমুল ভূঁইয়ার নিজস্ব কিলার বাহিনী আছে। তারা ভাড়াটে হিসেবে কাজ করে। অনেকে নিরুৎসাহিত করলেন নিউজ না করার জন্য। কেননা শিমুল ভূঁইয়া ভয়ংকর দুর্ধর্ষ। তার পরও ভয় কাটিয়ে নিউজটি পাঠালাম অফিসে। রাতে অফিস থেকে ফোন এল। কথা বললেন তখনকার ডেপুটি এডিটর ও বর্তমানে নির্বাহী সম্পাদক এনাম আবেদিন ভাই। বললেন- ‘একটু চোখ-কান খোলা রেখে চলাচল করেন। কোনো সমস্যা বা সন্দেহ মনে হলে, সঙ্গে সঙ্গেই যোগাযোগ করবেন। খবরের কাগজ সবসময় সহকর্মীদের পাশে আছে।’
যাই হোক, সংবাদটি প্রকাশের পর আলোচনায় আসে। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যোগাযোগ করেন। তারা অভয় দিয়ে বলেন, আপনার কাছে আর কী কী তথ্য আছে যা পত্রিকায় প্রকাশ করতে পারছেন না। মামলার অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখতে পারে তথ্যগুলো। তাদের সঙ্গে কিছু তথ্য আদান-প্রদান হলো। তার হাফ ডজন ছদ্মনাম নিয়ে আরও একটি প্রতিবেদন করলাম। এরই মাঝে শিমুল ভূঁইয়ার দুই সহযোগী যশোর থেকে গ্রেপ্তার হলেন। তখন মনে একটি প্রশ্ন- এ অবস্থায় তারা যশোরে কেন? তখনই মনে হলো একটু সাবধানে চলাচল করা উচিত। মনের মধ্যে এক অজানা আতঙ্ক কাজ করছিল। কেননা শিমুল ভূঁইয়ার বাড়ি খুলনার ফুলতলার দামোদর ইউনিয়নে হলেও ছাত্রজীবন থেকেই যশোরে ছিল তার যাতায়াত। যশোরের দুটি খুনের মামলার আসামিও ছিল শিমুল। এ অঞ্চলের রাজনৈতিক, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন ব্যক্তিকে হত্যার মাস্টারমাইন্ড তিনি। যশোরের প্রথিতযশা সাংবাদিক জনকণ্ঠের বিশেষ প্রতিনিধি শামছুর রহমান কেবলের কিলিং মিশনের শিমুল ব্যক্তি ছিল বলে গোয়েন্দা সংস্থার ধারণা।
এবার আসি ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দীর্ঘ কর্তৃত্ববাদি আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর একটি প্রতিবেদন তৈরির ব্যাপারে। তখন চারদিকে মবের রাজত্ব। এসময় ‘জুলাই শহিদদের’ তালিকা নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করা দুরূহ ব্যাপার। এর মধ্যেও খবরের কাগজে গত ২০ এপ্রিল ‘জুলাই অভ্যুত্থানে শহিদদের তালিকা: যশোরে ৩ জনকে নিয়ে বিতর্ক’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। খবরটি দেশজুড়ে সাড়া ফেলে। তবে প্রতিবেদন তৈরির সময় তথ্য সংগ্রহে নানা প্রতিকূলতার মুখে পড়ি। প্রশাসন ও পুলিশের গড়িমসি, তথ্য গোপন এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে সাংবাদিকতার নৈতিক দায়িত্ব পালন করা ছিল অত্যন্ত চ্যালেঞ্জের। সত্য প্রকাশ করাই সাংবাদিকতার মূল দায়িত্ব। কিন্তু যখন সেই সত্য প্রভাবশালী কারও স্বার্থে আঘাত করে, তখন শুরু হয় নানা বাধাবিপত্তি। আমি যখন এ তালিকার তথ্য সংগ্রহে মাঠে নামি, তখন অনেক কর্মকর্তা সরাসরি তথ্য দিতে অনীহা প্রকাশ করেন। কেউ বলেন, ‘ঊর্ধ্বতনদের অনুমতি লাগবে’, কেউ আবার বিষয়টি এড়িয়ে যেতে চান। এতে মনে হয়েছে, সত্য লুকিয়ে রাখার যেন এক অঘোষিত চেষ্টাই চলছে। প্রশাসনিক বাধা ছাড়াও ভয়ংকর অভিজ্ঞতা হয়েছে সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপের কারণে। তালিকাভুক্ত কিছু ব্যক্তির অনুসারীরা আমাকে ভয়ভীতি দেখিয়েছেন। নানা মাধ্যমে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করেছেন। কখনো ফোনে, কখনো পরিচিতদের মাধ্যমে বার্তা পাঠিয়ে সতর্ক করা হয়েছে- ‘এই রিপোর্টটা যেন না বের হয়’। এমনকি প্রলোভন দেখানোরও চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু থেমে থাকিনি।
পরিশেষে বলতে চাই, নানা বাধাবিপত্তির মধ্যেও সাংবাদিকতা চালিয়ে যাচ্ছি শুধু জনগণের জানার অধিকার রক্ষার স্বার্থে। আমি জানি, এতে আমার নিজের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ছে। কিন্তু সাংবাদিকতা আমার কাছে শুধু পেশা নয়, এটি এক ধরনের সংগ্রাম- অন্যায়ের বিরুদ্ধে, ভয়ভীতির বিরুদ্ধে, নীরবতার বিরুদ্ধে। জনগণ যেন সত্যটা জানতে পারে, সেটাই আমার একমাত্র লক্ষ্য। প্রতিদিন নিজের জীবন ও পরিবারকে ঝুঁকিতে রেখে কাজ করি, কারণ আমি বিশ্বাস করি, সংবাদমাধ্যমই ন্যায়ের কণ্ঠস্বর। অপরাধীরা যত শক্তিশালীই হোক, ইতিহাস একদিন তাদের মুখোশ উন্মোচন করবেই। আর সেই ইতিহাস লেখার কাজে সাংবাদিকের কলম কখনো থেমে থাকবে না।
লেখক: নিজস্ব প্রতিবেদক, যশোর, খবরের কাগজ