২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু স্মৃতিস্মারকগুলো ভাঙচুর ও লুটপাটের শিকার হয়। লালমনিরহাট শহরের শিশুপার্কসংলগ্ন ম্যুরাল কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হয়, পরে ম্যুরালে থাকা বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি ভাঙা হয়। রাজশাহী জেলা কমান্ড কার্যালয়ে তিনতলা ভবনের অফিস ভাঙচুর করায় তা এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। জামালপুরে মুক্তিযুদ্ধের ভেঙে ফেলা ম্যুরাল সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেই। রংপুরে বহু ম্যুরাল ও স্থাপনা ১৫ মাসেও সংস্কার হয়নি, মডার্ন মোড়ে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি কালি দিয়ে মুছে দেওয়া হয়। সিলেটে ভেঙে ফেলা মুক্তিযুদ্ধের প্রথম ভাস্কর্য ‘চেতনা-৭১’ এখনো সংস্কার হয়নি। তবে দিনাজপুরের বোচাগঞ্জে বঙ্গবন্ধুর ভেঙে ফেলা ম্যুরাল পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এখনো ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন বয়ে বেড়াচ্ছে খুলনা বেতার, চট্টগ্রামে ম্যুরাল ও ভাস্কর্য ভাঙা অবস্থায় পড়ে আছে। বরগুনায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। মেহেরপুরে একদল দুর্বৃত্ত ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে ‘মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্স’-এর তিন শতাধিক ছোট-বড় ভাস্কর্য গুঁড়িয়ে দিয়েছে এবং সংস্কারের উদ্যোগ নেই। এসব ঘটনায় দেশব্যাপী স্মৃতিস্মারক ও সাংস্কৃতিক স্থাপনার নিরাপত্তাহীনতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
লালমনিরহাট শহরের বিডিআর রোডে শিশুপার্কসংলগ্ন মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিস্মারক মঞ্চে স্থাপিত ম্যুরাল। ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর ম্যুরালটি কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হয়। পরে ৩০ মার্চ জেলা প্রশাসনের নির্দেশে এর একাংশ ভেঙে ফেলা হয়। বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি আঁকা অংশ ভাঙা হলেও মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলনকেন্দ্রিক অংশ রাখা হয়। ভাঙার কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের ভাষ্য, জেলা প্রশাসক এইচ এম রকিব হায়দারের নির্দেশে কাজটি করা হয়।
বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, রাজশাহী জেলা কমান্ড কার্যালয়। গত ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর এখানে ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ হয়। তিনতলা ভবনের দ্বিতীয় তলার কার্যালয়ের সাইনবোর্ড অক্ষত থাকলেও পুরো অফিস ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। জানালা-দরজার কাঠামো ভাঙা। দেয়ালে পোড়া দাগ। প্লাস্টার খসে পড়েছে। গ্রিলের কোনো অস্তিত্ব নেই। ফটকের পাশে থাকা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শুধু মুখের অংশ অক্ষত।
জামালপুরে ভেঙে ফেলা মুক্তিযুদ্ধের ম্যুরাল এখনো সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেই। ২০২৩ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় শহরের শেখেরভিটা এলাকায় জামালপুর-মাদারগঞ্জ ও ঢাকা-দেওয়ানগঞ্জ সড়কের সংযোগস্থলে এই দৃষ্টিনন্দন ম্যুরাল স্থাপন করা হয়। গত বছরের ৫ আগস্ট সরকার পতনের দিন ছাত্র-জনতা এতে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়।
রংপুরে ৫ আগস্ট ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন ম্যুরাল ও স্থাপনা ছাত্র-জনতা ভেঙে দেয়। নগরীর বিভিন্ন মোড় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ম্যুরাল ভাঙচুরের ১৫ মাস পার হলেও কোনো সংস্কার হয়নি। ১৮ জুলাই ২০২৫ রংপুরের মডার্ন মোড়ে স্বাধীনতার স্মারক ম্যুরালে থাকা শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি কালি দিয়ে মুছে দেওয়া হয়।
সিলেটে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম ভাস্কর্য ‘চেতনা-৭১’। এটি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিক্ষা ভবন ‘এ’-এর উত্তর-পশ্চিম পাশে অবস্থিত। গাছগাছালিতে ঘেরা স্থানে ভাস্কর্যটি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিল। বহু বাধা পেরিয়ে ২০১১ সালের ৩০ জুলাই ভাস্কর্যটির উদ্বোধন করেন তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ। সিলেটে আসা পর্যটক ও শিক্ষার্থীদের কাছে এটি ছিল আকর্ষণীয় স্পট। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের দিনই মুক্তিযুদ্ধবিরোধীরা ভাস্কর্যটি ভাঙচুর করে।
দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ বাজারে স্থাপিত বঙ্গবন্ধুর মুর্যাল ভেঙে ফেলা হয়েছে। গত বছরের ৫ আগস্ট রাতের আঁধারে দুর্বৃত্তরা দিনাজপুরের বিভিন্ন স্থানে থাকা বঙ্গবন্ধু স্মৃতিস্তম্ভ ও বঙ্গবন্ধু ম্যুরাল ভাঙচুর করে। বোচাগঞ্জ উপজেলাসহ আশপাশের কয়েকটি উপজেলায় এই ভাঙচুর আরও ব্যাপক আকারে ঘটে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দ্রোহের আগুনে পুড়ে যায় শিল্প ও সংস্কৃতির অন্যতম পীঠস্থান খুলনা বেতার। ছাত্র আন্দোলনের মাঝে সুযোগসন্ধানী দুষ্কৃতকারীরা ধ্বংস করে স্টুডিও ভবন, আর্কাইভ ও ব্রডকাস্টিং যন্ত্রপাতি। কম্পিউটারসহ মূল্যবান যন্ত্রপাতি লুট করা হয়। তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ হয়ে যায় সম্প্রচার। আগুনে পুড়ে যাওয়ার পরও দীর্ঘদিন বেতার ভবনে রয়ে যায় ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল শতকোটি টাকার বেশি।
মেহেরপুরের মুজিবনগর, মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থান। তৎকালীন বৈদ্যনাথতলা আম্রকানন বা আজকের মুজিবনগরে ১৭ এপ্রিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠিত হয়। ১৯৭৪ সালের ১৭ এপ্রিল সরকার ‘মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্স’ নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে। ৬৬ একর জায়গাজুড়ে কমপ্লেক্সটি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি হিসেবে গড়ে ওঠে। কিন্তু আজ এটি ধ্বংসের প্রতিচ্ছবি হয়ে গেছে।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর চট্টগ্রামে শেখ মুজিবুর রহমানের কয়েকটি ম্যুরাল ও ভাস্কর্য ভাঙচুর করা হয়। ভাঙচুরকৃত ম্যুরাল ও ভাস্কর্য এখনো একই অবস্থায় আছে। কোনো সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বড়পোলের ভাস্কর্য ভেঙে সড়কের এক পাশে ফেলে রাখা হয়েছে। ভাঙা ভাস্কর্য ঘিরে ভাসমান দোকান ও রিকশা, ট্যাক্সিস্ট্যান্ড গড়ে উঠেছে। চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবেশদ্বারে চসিকের বসানো ম্যুরালও ভেঙে ফেলা হয়, তবে ভাঙা অংশগুলো সরিয়ে পরিষ্কার করা হয়েছে।
বরগুনায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর দেড় বছর পরেও পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দুর্বৃত্তরা জাদুঘরে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরও সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই পড়ে আছে বহু স্মারক, দলিল ও প্রদর্শনী উপকরণের ভগ্নাংশ।