ঢাকা ১০ আষাঢ় ১৪৩৩, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
সমর্থকদের আস্থা রাখতে বললেন ইংল্যান্ড কোচ ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বার্ষিক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী চ্যাম্পিয়ন দলের হাতে ট্রফি তুলে দেবেন ট্রাম্প তাত্ত্বিক গবেষক অধ্যাপক ড. মাহবুবুল হক পপ গানে নিউ অরলিন্সের জ্যাজ ফিউশন, ‘ক্লাউডসেভ’ এর বাজিমাত আখতার-উল-আলম: সাংবাদিকতা, সাহিত্য ও জাতীয় চেতনার অগ্রসেনানী পাকিস্তানে মানবাধিকারকর্মী মাহরাংকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড নেইমারকে নিয়ে রহস্য রাখলেন আনচেলত্তি প্রধানমন্ত্রীর থেকে কৃষক কার্ড নেওয়া সেই কৃষক মারা গেছেন ২৪ জুন: সিঙ্গাপুর ডলার ছাড়া সব মুদ্রার দাম কমেছে টাকাপয়সা নিয়ে উধাও বাংলাদেশি স্ত্রী, অভিযোগ চীনা নাগরিকের মুনিওজের গোলে নকআউটে কলম্বিয়া রবিনহুডের আশ্রয় নেওয়া ১২০০ বছরের সেই প্রাচীন গাছটি মরে গেছে ১০ হাজার মানুষকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর দাবি শুভেন্দুর পুতিন-ট্রাম্পের ‘বোঝাপড়া’ বাস্তবায়নে ব্যর্থতায় যুক্তরাষ্ট্রকে দুষছে রাশিয়া স্বর্ণের দাম আবার ভরিতে কমল ৫৪৮২ টাকা জেট বিমানের চেয়েও জোরে চিৎকার! গিনেস রেকর্ড ভাঙলেন অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক বিশ্ব সংগীত দিবসে প্রকাশিত হলো নজরুলের গান ‘বরষা ঋতু এলো এলো’ হরমুজে আটকেপড়া ১১ হাজার নাবিককে সরিয়ে নিচ্ছে আইএমও সৌদিতে শুটিংয়ের মাঝেই হলিউড অভিনেতার ইসলাম গ্রহণ দেশজুড়ে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল ক্যাম্পেইন ২৮ জুন ইরান যুদ্ধ বন্ধে মার্কিন সিনেটে বড় ধাক্কা খেলেন ট্রাম্প মেসিকে নিয়ে প্রশ্নে নাখোশ রোনালদো, আর্জেন্টিনার ম্যাচ নিয়ে দিলেন বার্তা নাভানা গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান গ্রেপ্তার শেরপুরে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিজিবির টহল ঝিনাইদহে ট্রাক্টরের ধাক্কায় প্রাণ গেল ইজিবাইকের যাত্রীর অপেক্ষা ফুরোচ্ছে নেইমারের নোয়াখালীতে পিকআপ-মোটরসাইকেল সংঘর্ষে ২ বন্ধু নিহত সংসদীয় কমিটি গঠনে বিলম্ব নজরদারি প্রশ্নবিদ্ধ নওগাঁ সীমান্তে ৯ জনকে পুশইনের চেষ্টা

ওষুধের কাঁচামালে কারসাজি

প্রকাশ: ১২ মার্চ ২০২৪, ১২:৪৭ পিএম
আপডেট: ১২ মার্চ ২০২৪, ০১:২৪ পিএম
ওষুধের কাঁচামালে কারসাজি
খবরের কাগজ গ্রাফিকস

রাজধানীর ধানমন্ডির একটি প্রাইভেট হাসপাতালের একজন ক্যানসার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত একজন রোগীর পরার্মশপত্রে চারটি ওষুধ লেখেন। এর মধ্যে একটি ওষুধ দেশেও তৈরি হয়, আবার বিদেশি একটি কোম্পানির ওষুধও চোরাইপথে দেশে আসে। ওই চিকিৎসক রোগীর স্বজনকে পরামর্শ দেন সম্ভব হলে বিদেশি ওষুধটি কেনার। রোগীর স্বজন চিকিৎসকদের পাল্টা প্রশ্ন করে কারণ জানতে চাইলে চিকিৎসক বলেন, দেশি ওই ওষুধটির মান ভালো না। রোগীর স্বজন দ্বিধায় পড়ে যান। তিনি কষ্ট হলেও দেশিটা বাদ দিয়ে বেশি দামে বিদেশি ওষুধ কেনেন।

বেশ জনপ্রিয় ও বহুল ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিক ‘সিপ্রোফ্লোক্সাসিন’। বহু ধরনের ইনফেকশনের ক্ষেত্রে এটি ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে থাকেন চিকিৎসকরা। দেশের অধিকাংশ ওষুধ প্রস্তুতকারক কোম্পানি ওই জেনেরিকের বিভিন্ন ক্যাটাগরির ওষুধ প্রস্তুত ও বাজারজাত করে। কেউ ট্যাবলেট, কেউ ক্যাপসুল কেউবা সিরাপ করে। ওষুধটির এত চাহিদার সুযোগ নিয়ে কোনো কোনো কোম্পানি যেনতেনভাবে  তা বাজারে ছাড়ে। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর গত ১১ জানুয়ারি মাকর্সম্যান ফার্মাসিটিউক্যাল লিমিটেডের তৈরি ও বাজারজাত করা সিপ্রোফ্লোক্সাসিন ৫০০ মিলিগ্রাম জেনেরিকের ‘সিপ্রোকুইন’ ব্র্যান্ডের ওষুধটি নিম্নমানের বলে শনাক্ত করে তা বাজার থেকে প্রত্যাহার ও উৎপাদন নিষিদ্ধের আদেশ জারি করে। এর আগে ওই ওষুধের নমুনা সংগ্রহ করে তা ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা হয়। 

এর আগে ২ জানুয়ারি একইভাবে নিম্নমানের ওষুধ হিসেবে প্রমাণ পেয়ে বাজার থেকে প্রত্যাহার করার আদেশ দেওয়া হয় গ্লোব ফার্মাসিটিউক্যালসের ডেসলোরেটেডিন জেনেরিকের ডেসলোনা ট্যাবলেট। এটি উৎপাদন করা হয় ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে এবং মেয়াদ লেখা ছিল চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, যা ব্যবহার হয় জ্বর ও এলার্জিজনিত সমস্যা থেকে উপশমের জন্য। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর এই ওষুধটিরও নিবন্ধন বাতিল করে। 

অন্যদিকে ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য নকল ইনসুলিনও পাওয়া দেশের বাজারে। তাও আবার ডেনমার্কভিত্তিক ওষুধ কোম্পানি নভো নরডিক্সের নামে। গত বছর ৩০ অক্টোবর ‘ওজিমপিক’ ১ মিলিগ্রাম ডোজের ইনসুলিন বাজার থেকে জব্দ করে নিষিদ্ধ করেছে। ওই ওষুধটি মিসরে প্যাকিং  করা হয়েছে বলে প্যাকেটের গায়ে উল্লেখ ছিল। একই দিনে সিলোরফিন নামের একটি নকল আইড্রপ নিষিদ্ধ করা হয়, যা নকল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। এই ওষুধটির আসল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাপেক্স ফার্মা লিমিডেট।

সরকারের ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর মাঝেমধ্যে তদারকিতে নেমে এমন কিছু নিম্নমানের ও নকল বা ভেজাল ওষুধ জব্দ কিংবা নিষিদ্ধ করলেও বিশেষজ্ঞদের মতে বাজারে এমন শত শত নিম্নমানের, নকল, ভেজাল ওষুধের ছড়াছড়ি রয়েছে, যা মানুষ টাকা দিয়ে কিনে ব্যবহার করে একদিকে প্রতারিত হচ্ছেন, অন্যদিকে সুস্থ হওয়ার চেয়ে আরও বড় ক্ষতির মুখে পড়ছেন শারীরিকভাবে। দেশে এমন নিম্নমানের, নকল ও ভেজাল ওষুধ তৈরি ও বাজারজাতের পেছনে ওষুধের কাঁচামাল আমদানিকারক  বিশেষ চক্রকে দায়ী করা হয়। যাদের সঙ্গে কিছু ওষুধ প্রস্তুতকারক কোম্পানি ও কাঁচামাল বিক্রেতা চক্রের জোগসাজশ রয়েছে বলে জানা যায় সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে। বিশেষ করে রাজধানীর মিটফোর্ড এলাকায় এই চক্রের মাধ্যমেই বড় বেচাকেনা চলে বছরের পর বছর। মাঝেমধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেখানে অভিযান চালালেও কিছুদিন পরেই আবার যেমনটা তেমন পর্যায়ে চলে যায়। এমনকি তিন বছর আগে এমন এক অভিযানের সময় ঘেরাওয়ের মুখে পড়েছিলেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। 

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্নিনিক্যাল ফার্মেসি ও ফার্মাকোলজি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. মুনীরউদ্দীন আহমদ খবরের কাগজকে বলেন, ওষুধ সেক্টরে খুবই বিশ্রী অবস্থা চলছে। এখানে দুভাবে ওষুধ তৈরি হচ্ছে। বিদেশি রপ্তানির ওষুধে আন্তর্জাতিক মান রক্ষা করে তৈরি করা হয়। কিন্তু দেশের বাজারে থাকা ওষুধের মানে কঠোর কোনো মনিটরিং ব্যবস্থা নেই, যা খুবই দুঃখজনক। ওষুধ কখনো দুই রকম হতে পারে না।

ওই বিশেষজ্ঞ বলেন, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর যখন অভিযান চালায় তখন যে ওষুধ জব্দ করে এবং নিষিদ্ধ করে। কিন্তু সেই ওষুধ এর আগে যত দিন বাজারে ছিল তার দায় কে নেবে! যারা ওষুধ খেয়েছে এবং ক্ষতি হয়েছে তার কী হবে! কেউ যদি মারা গিয়ে থাকে সেটা কে দেখবে!

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কিছুসংখ্যক ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান নিজেরা সরকারের কাছ থেকে কোনো না কোনোভাবে লাইসেন্স বের করে নামমাত্র কিছু ওষুধ প্রস্তুত ও বাজারজাত করে থাকে। তাদের মূল ব্যবসা থেকে সরকারি কোটা কাজে লাগিয়ে বিদেশ থেকে স্বল্প মেয়াদের, কম দামের কাঁচামাল খুঁজে বের করে কিনে দেশে এনে অন্যদের কাছে বিক্রি করা।

ওই কর্মকর্তারা বলেন, মিটফোর্ডে যেভাবে প্রকাশ্যে যে হারে সারি দিয়ে শত শত দোকানে ওষুধের কাঁচমাল বিক্রি হয় তা কোথা থেকে সংগ্রহ করা হয় সেটা ভালো করে খুঁজে দেখা দরকার। কারণ মিটফোর্ডের খুচরা বিক্রেতাদের পক্ষে এত পরিমাণে কাঁচামাল আমদানি করা বা বৈধ আমদানিকারকদের কাছ থেকেও সংগ্রহ করা সম্ভব নয়। আবার এই কাঁচামালের ক্রেতা কারা সেটাও দেখা জরুরি। কারণ কোনো ভালো কোম্পানি মিটফোর্ড থেকে কাঁচামাল কিনে ওষুধ তৈরির জন্য ব্যবহার করে না। ভালো সব কোম্পানিই বাইরে থেকে সব কাঁচামাল নিয়ে আসে সরকারের অনুমতি নিয়েই। 

আরেকটি কোম্পানির মহাব্যবস্থাপক খবরের কাগজকে বলেন, তিনি বর্তমান প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়ার আগে যেখানে ছিলেন সেই কোম্পানিতে একজন কর্মকর্তা ছিলেন যার কাজ ছিল দেশের বাইরে কোথায় কবে কী ওষুধের কাঁচামালের অকশন ডাকা হয় সেগুলোর খোঁজখবর নেওয়া। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজার দর অনুসারে সবচেয়ে কম দামে কোথায় পাওয়া যায় সেটা খুঁজে বের করা হতো। সেই সঙ্গে বেশি নজর রাখা হতো মেয়াদ কম আছে এমন কাঁচামালের ওপর। 

ওই কর্মকর্তা উদাহরণ দিয়ে বলেন, যে কাঁচামালের মেয়াদ এক বছর থাকে তার দাম যদি হয় ৫০ হাজার টাকা, সেখানে মেয়াদ যদি দুই মাস থাকে সেই মালের দাম নেমে যায় ১০ হাজার টাকায়, যা এক ধরনের অকশনে বিক্রি করা হয়। আমাদের দেশের একশ্রেণির কোম্পানির নিয়োগ করা কর্মীরা এই কাঁচামাল দেশে ঢুকিয়ে বাজারে ছেড়ে দেন। যারা এই কাঁচামাল কিনে ওষুধ তৈরি করেন তারা ওষুধের প্যাকেটের গায়ে লম্বা সময় উল্লেখ করেন।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৩০৪। এর মধ্যে ৬২ প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে বিভিন্ন কারণে। ১০০টির বেশি কোম্পানির লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে বিভিন্ন সময়ে। এর বাইরে ৬টি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন স্থগিত রাখা হয়েছে। ৪টি প্রতিষ্ঠান নিজেরাই অচল করে রেখেছেন মালিকরা। এসব কোম্পানির প্রায় দেড় হাজার জেনেরিকের বিপরীতে প্রায় ৩০ হাজার ব্র্যান্ড নামের ওষুধ এখন ছড়িয়ে আছে বাজারে।

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক মো. সালাহউদ্দীন আহম্মেদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমাদের ওষুধের খাত এখন যত বড় হয়েছে সেই তুলনায় পর্যাপ্ত মনিটরিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল নেই। এটা আমাদের বড় সংকট।  তবু আমরা আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছি নিম্নমানের, নকল, ভেজাল ও চোরাই ওষুধ নিয়ন্ত্রণ করতে।’

ওই কর্মকর্তা বলেন, কিছু মুষ্টিমেয় অসাধু ব্যবসায়ী হয়তো কালোবাজারে গোপনে নিম্নমানের কাঁচামাল বেচাকেনা করে থাকেন। আমাদের সেটাও মনিটরিংয়ের চেষ্টা আছে। আমাদের টিম আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় অভিযান চালায়। মামলা করে, জেল-জরিমানাও হয়।

>চিকিৎসকরাও ওষুধ নিয়ে ভয়ে থাকি
>সরকারের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই

সংসদীয় কমিটি গঠনে বিলম্ব নজরদারি প্রশ্নবিদ্ধ

প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২৬, ০৯:১৮ এএম
আপডেট: ২৪ জুন ২০২৬, ০৯:৫৮ এএম
সংসদীয় কমিটি গঠনে বিলম্ব নজরদারি প্রশ্নবিদ্ধ
খবরের কাগজ ইনফোগ্রাফ

জাতীয় সংসদের কার্যকারিতা, নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি এবং মন্ত্রণালয়গুলোর নিয়মিত তদারকির অন্যতম প্রধান কাঠামো হিসেবে বিবেচিত হয় সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। সংসদীয় কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণেই এসব কমিটিকে বলা হয় ‘মিনি পার্লামেন্ট’। অথচ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ গঠনের প্রায় তিন মাস অতিক্রান্ত হলেও এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে গঠন করা হয়নি সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো। 

সংসদ সচিবালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত ৫০টি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির মধ্যে এখন পর্যন্ত গঠিত হয়েছে মাত্র ৮টি স্থায়ী কমিটি ও ২টি বিশেষ কমিটি। বাকি কমিটি গঠন এখনো প্রক্রিয়াধীন। এ নিয়ে সংসদের কার্যকারিতা, প্রশাসনিক নজরদারি এবং সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সংবিধানের ৭৬ অনুচ্ছেদ এবং জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী, যেকোনো সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের মধ্যেই মন্ত্রণালয়ভিত্তিক সব স্থায়ী কমিটি গঠন বাধ্যতামূলক। তবে অতীতের যেকোনো সংসদের তুলনায় এবারের সংসদে কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া অপেক্ষাকৃত ধীরগতিতে এগোচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে ২০২৪ সালে গঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরুর মাত্র পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যেই ৫০টি সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠনের নজির স্থাপিত হয়েছিল। সেই তুলনায় বর্তমান সংসদের ধীরগতি আরও বেশি দৃশ্যমান।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয় গত ১২ মার্চ। এরপর গত ১৪ জুন পর্যন্ত তিন মাসের বেশি সময় অতিক্রান্ত হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে অধিকাংশ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি গঠন হয়নি। 

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে এখন পর্যন্ত গঠিত কমিটিগুলোর মধ্যে রয়েছে সংসদসংক্রান্ত ৫টি কমিটি–বিজনেস অ্যাডভাইজরি কমিটি, হাউস কমিটি, স্ট্যান্ডিং কমিটি অব প্রিভিলেজেস, প্রাইভেট মেম্বার্স বিলস অ্যান্ড রেজল্যুশনস কমিটি এবং লাইব্রেরি কমিটি। এগুলো গঠন করা হয় গত ১২ মার্চ অধিবেশনের প্রথম কার্যদিবসে। পরে গত ১০ জুন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি এবং ১৪ জুন অর্থ মন্ত্রণালয় ও আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি গঠন করা হয়।

এ ছাড়া সংসদে উত্থাপিত বিল পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং দেশের জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় দুটি বিশেষ কমিটিও গঠন করা হয়েছে। গত ২৬ এপ্রিল জ্বালানিসংকট মোকাবিলা ও করণীয় নির্ধারণে গঠিত ১০ সদস্যের বিশেষ কমিটির মেয়াদ নির্ধারণ করা হয় গেজেট প্রকাশের তারিখ থেকে ৩০ দিন। চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি সংসদে এ প্রস্তাব উত্থাপন করলে তা কণ্ঠভোটে গৃহীত হয়।

সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠনে এবার ধীরগতির কারণ জানতে চাইলে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি দৈনিক খবরের কাগজকে বলেন, ‘কমিটি গঠনে কোনো অনীহা বা রাজনৈতিক জটিলতা নেই। এবারের সংসদে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। আমরা চাই প্রতিটি কমিটিতে ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে। অনেক ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের পছন্দ, বিশেষজ্ঞতা এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে অভিজ্ঞতার বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। এ জন্য সময় কিছুটা বেশি লাগছে। তবে সরকার সংসদীয় কমিটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। বাকি স্থায়ী কমিটিগুলো দ্রুত গঠনের বিষয়ে আলোচনা চলছে। সংসদীয় নজরদারি শক্তিশালী করাই আমাদের লক্ষ্য।’

এ বিষয়ে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, সংসদীয় কমিটি গঠন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল প্রক্রিয়া। শুধু সংখ্যাগত প্রতিনিধিত্ব নয়, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, স্বতন্ত্র সদস্য, পেশাগত দক্ষতা ও সংসদ সদস্যদের আগ্রহ– সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই কমিটি গঠন করতে হচ্ছে। 

তিনি বলেন, ‘আমরা চাই এমন কমিটি গঠন করতে, যা কার্যকরভাবে মন্ত্রণালয়গুলোর ওপর নজরদারি করতে পারে। এ কারণে কিছুটা সময় লাগছে। তবে বিষয়টি নিয়ে সংসদ সচিবালয় ও সংসদীয় নেতৃত্ব কাজ করছে। আশা করছি, বাকি কমিটিগুলোও পর্যায়ক্রমে গঠন করা হবে।’

সংসদীয় কমিটির গুরুত্ব তুলে ধরে স্পিকার আরও বলেন, একটি সংসদকে কার্যকর এবং জবাবদিহিমূলক করতে স্থায়ী কমিটি গঠনের বিকল্প নেই। কারণ এসব কমিটি না থাকলে মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ডের নিয়মিত তদারকি হয় না, বাজেট ব্যয়ের পর্যালোচনা দুর্বল হয়ে পড়ে, সরকারি প্রকল্পের জবাবদিহি কমে যায় এবং সংসদ সদস্যদের নীতিগত পর্যালোচনার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। ফলে সংসদের কার্যকারিতা অনেকাংশেই অধিবেশনকক্ষের বিতর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়।

সুজন সম্পাদক এবং নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সংসদীয় স্থায়ী কমিটি জাতীয় সংসদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জবাবদিহিমূলক কাঠামোগুলোর একটি। এসব কমিটি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পর্যালোচনা, সরকারি ব্যয়ের হিসাব যাচাই এবং নির্বাহী বিভাগের ওপর সংসদের কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করে। তবে অতীতে অনেক সংসদীয় কমিটি প্রত্যাশা অনুযায়ী কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষায়, দলীয় প্রভাব, সীমিত স্বাধীনতা এবং সুপারিশ বাস্তবায়নের দুর্বল সংস্কৃতির কারণে অনেক কমিটি কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ ছিল। যদিও কিছু কমিটি গুরুত্বপূর্ণ অনিয়ম উন্মোচন এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। এ জন্য কমিটিগুলোকে আরও স্বাধীন, সক্রিয় ও কার্যকর করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশে সংসদীয় কমিটি ব্যবস্থার কার্যকর বিকাশ শুরু হয় সপ্তম জাতীয় সংসদ (১৯৯৬-২০০১) থেকে। এরপর থেকে সংসদীয় কমিটিগুলো ধীরে ধীরে সংসদীয় জবাবদিহির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে শুরু করে।

বিপিসির প্রধান কার্যালয় ঢাকায় নিতে চিঠি

প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২৬, ০৮:৩৭ এএম
বিপিসির প্রধান কার্যালয় ঢাকায় নিতে চিঠি
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় স্থানান্তরের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। চট্টগ্রামে প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নিজস্ব স্থায়ী ভবন উদ্বোধনের অপেক্ষায় থাকা সত্ত্বেও আমলাতান্ত্রিক অনীহা ও একটি সংসদীয় নোটিশের জেরে এই ‘বিদ্যুৎ গতির’ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত ১৭ জুন বিপিসি চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে যে চিঠি দিয়েছেন, তাতে তিনি বিপিসি প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রাম থেকে এখনই সরিয়ে নেওয়া জরুরি বলে তুলে ধরেছেন। 

গত ২৯ মে চিটাগং চেম্বারের নেতারা অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে তার মেহেদীবাগের বাসায় সাক্ষাৎ করতে গেলে মন্ত্রী তাদের আশ্বাস দেন বিপিসি’র প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রামেই থাকছে। কিন্তু দুই সপ্তাহ না যেতেই বিপিসি চেয়ারম্যানের এ সংক্রান্ত চিঠি চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী সমাজ এবং সচেতন মহলকে হতবাক করেছে। এই চিঠিকে মন্ত্রী বিপিসি’র মতামত বলে উল্লেখ করেছেন।

অভিযোগ রয়েছে, সরকারের শীর্ষ ও প্রভাবশালী কর্মকর্তারা রাজধানীর বিলাসবহুল জীবন ছেড়ে চট্টগ্রামে থাকতে চান না। আর কর্মকর্তাদের এই ‘ঢাকা ছাড়তে অনীহা’র মানসিকতাকে পুঁজি করেই এবার শুরু হয়েছে স্থায়ীভাবে সদর দপ্তর ঢাকায় ফিরিয়ে নেওয়ার সূক্ষ্ম ও অতি গোপনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, যা চট্টগ্রামের বাণিজ্যিক স্বার্থকে চরমভাবে ক্ষুণ্ণ করবে। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ৬ মে কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী একটি জরুরি ও জনগুরুত্বসম্পন্ন নোটিশ দেন। নোটিশে তিনি জনস্বার্থে বিপিসির কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সুষ্ঠুভাবে কার্যসম্পাদনের লক্ষ্যে সংস্থাটির প্রধান কার্যালয় বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম থেকে প্রশাসনিক রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তরের আবেদন জানান। একই সঙ্গে তিনি ঢাকায় বিপিসির একটি স্বতন্ত্র ও নিজস্ব বহুতল ভবন নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করার কথাও বলেন।

সাধারণত যেকোনো জনগুরুত্বসম্পন্ন নোটিশ বা প্রস্তাবনার ওপর সরকারের বিভিন্ন পর্যায় ও অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা, যাচাই-বাছাই ও পর্যালোচনার নিয়ম থাকলেও বিপিসির ক্ষেত্রে তা ঘটেছে অলৌকিক গতিতে। একটি বিশেষ নোটিশ এবং তার পরপরই মন্ত্রণালয়ের নজিরবিহীন ‘বিদ্যুৎ গতির’ চিঠি চালাচালির মাধ্যমে এই স্থানান্তর প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত রূপ নিতে যাচ্ছে।

সংসদ সদস্যের নোটিশের মাত্র ছয় দিনের মাথায় অর্থাৎ ১২ মে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বিষয়টি আমলে নিয়ে বিপিসির চেয়ারম্যানকে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি দেন। এরপর থেকেই মূলত আড়ালে-আবডালে থাকা স্থানান্তর প্রক্রিয়াটি ‘বিদ্যুৎ গতিতে’ ডানা মেলতে শুরু করে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, গত ৩৫ বছর ধরে সংস্থাটির বড় কর্মকর্তারা নানা অজুহাতে ঢাকাতেই লিয়াজোঁ অফিস বা অন্য কোনো নাম দিয়ে অবস্থান করে আসছিলেন। সপ্তাহে দুই-এক দিন অথবা মাঝেমধ্যে লোক দেখানো চট্টগ্রাম সফর করলেও তাদের মূল মনোযোগ ও যাতায়াত ছিল রাজধানীকেন্দ্রিক।

চট্টগ্রামে প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নিজস্ব আধুনিক বহুতল প্রধান কার্যালয় ভবন যখন উদ্বোধনের অপেক্ষায়, ঠিক তখন কর্মকর্তাদের এই ‘ঢাকা ছাড়তে না চাওয়ার’ মানসিকতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতেই সংসদ সদস্যের এই নোটিশ এবং মন্ত্রণালয়ের এই অতি-তৎপরতা বলে উল্লেখ করেন চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা। 

আছে আইনি বাধা
১৯৯০ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের ৪ নং ধারা পরিবর্তন করে বিপিসির প্রধান কার্যালয় ঢাকার পরিবর্তে চট্টগ্রামে করা হয়। বর্তমানে বিপিসি আইন-২০১৬ অনুযায়ী সংস্থাটি পরিচালিত হচ্ছে। ওই আইনের ৫(১) ধারা অনুযায়ী ‘করপোরেশনের প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রামে থাকিবে’-একথা উল্লেখ রয়েছে। তা ছাড়া ‘করপোরেশন প্রয়োজনবোধে সরকারের পূর্বানুমোদনক্রমে বাংলাদেশের যেকোনো স্থানে শাখা কার্যালয় স্থাপন করতে পারবে বলে উল্লেখ রয়েছে। 

মন্ত্রণালয়ের এই উদ্যোগের তীব্র সমালোচনা করে একে ‘কালো অধ্যায়’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন চট্টগ্রামের নাগরিক সমাজ। 

জানতে চাইলে চিটাগং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি শিল্পপতি আমিরুল হক খবরের কাগজকে বলেন, বিষয়টি আমরা জেনে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে কথা বলেছি। চিটাগং চেম্বারের নবনির্বাচিত কমিটির সবাই সেখানে ছিলেন। মন্ত্রী আমাদের আশ্বাস দেন বিপিসি কার্যালয় চট্টগ্রামে আছে, চট্টগ্রামেই থাকবে। নতুন করে বিপিসি চেয়ারম্যানের চিঠি দেওয়ার বিষয়টি তার জানা নেই বলে উল্লেখ করেন তিনি। তিনি বলেন, বিপিসির কার্যালয় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হবে আত্মঘাতী। এতে রাষ্ট্রের ক্ষতি হবে। দেশের জ্বালানি সেক্টরের অন্যতম বিভাগ হলো বিপিসি। সেখানে কাজের সমন্বয়হীনতা সৃষ্টি হবে।

বৃহত্তর চট্টগ্রাম উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটির মহাসচিব এইচ এম মজিবুল হক শাকুর ক্ষোভ প্রকাশ করে খবরের কাগজকে বলেন, চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানীর তকমা দেওয়া হলেও একে একে অনেক প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সর্বশেষ বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের প্রধান কার্যালয়ও চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার তোড়জোড় চলছে, যা চট্টগ্রামবাসীকে হতাশ করেছে। অথচ চট্টগ্রাম চেম্বার নেতারা সম্প্রতি অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন বিপিসি কার্যালয় চট্টগ্রামেই থাকবে। কিন্তু বিপিসি চেয়ারম্যান যে চিঠি দিয়েছেন তাতে মনে হয় না অর্থমন্ত্রীর কথা তিনি শুনেছেন। বিপিসি কার্যালয় ঢাকায় সরিয়ে নেওয়ার চিঠি দেওয়ার জন্য তিনি তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, সরকার যদি এ ধরনের কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নিতে যায়, তা হলে চট্টগ্রামবাসী রাজপথে নামতে বাধ্য হবেন। তিনি বলেন, যেখানে সরকারের মূলনীতি বিকেন্দ্রীকরণ, সেখানে কর্মকর্তাদের আরাম-আয়েশ ও বিলাসবহুল জীবনযাপনের স্বার্থে একটি পুরো জাতীয় সংস্থাকে ঢাকায় ফেরত নিয়ে যাওয়া চরম বৈষম্যমূলক। একে তিনি ‘কালো অধ্যায়’ বলে অভিহিত করেন।

চিটাগং ডেভেলপমেন্ট ফোরামের মুখপাত্র খোরশেদ আলম খবরের কাগজকে বলেন, অর্ধশত কোটি টাকা ব্যয় করে চট্টগ্রামে বিপিসির নিজস্ব স্থায়ী কার্যালয় নির্মাণ করা হয়েছে। কার্যালয় উদ্বোধনের আগে ঢাকায় নতুন করে স্বতন্ত্র ভবন নির্মাণের প্রস্তাব জনগণের ট্যাক্সের কোটি টাকার চরম অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়। সবচেয়ে বড় কথা হলো, বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে চট্টগ্রামের যে মর্যাদা ও গুরুত্ব, তা এই ধরনের আমলাতান্ত্রিক সিন্ডিকেটের কারণে বারবার ক্ষুণ্ন হচ্ছে। মুষ্টিমেয় কিছু কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য দেশের পুরো জ্বালানি খাতের নিয়ন্ত্রণ কক্ষকে অপারেশনাল এরিয়া (চট্টগ্রাম) থেকে দূরে সরিয়ে নেওয়া জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থি। এই ‘বিদ্যুৎ গতির’ আত্মঘাতী প্রক্রিয়া অবিলম্বে বন্ধ করে বিপিসির পূর্ণাঙ্গ সদর দপ্তর সদ্য নির্মিত চট্টগ্রামের স্থায়ী ভবনেই কার্যকর করা এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে।

সিন্ডিকেটের কবলে চট্টগ্রাম বন্দর: প্রতিযোগিতা রুখতে সুপরিকল্পিত ‘খেলা’

প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২৬, ০৮:২৯ এএম
আপডেট: ২৪ জুন ২০২৬, ০৮:৩৪ এএম
সিন্ডিকেটের কবলে চট্টগ্রাম বন্দর: প্রতিযোগিতা রুখতে সুপরিকল্পিত ‘খেলা’
ছবি: খবরের কাগজ

দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি চট্টগ্রাম বন্দর এখন এক গভীর প্রশাসনিক ও ব্যবসায়িক সংকটের আবর্তে। দেশের আমদানি-রপ্তানির সিংহভাগ সচল রাখা এই বন্দরের বার্থ ও শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ঘিরে যে চিত্র সামনে এসেছে, তা মুক্তবাজার অর্থনীতি ও স্বচ্ছতার নীতিকে বুড়ো আঙুল দেখানোর শামিল।

অভিযোগ উঠেছে, নতুন ও দক্ষ লজিস্টিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রবেশের পথ সম্পূর্ণ রুদ্ধ করে গুটিকয়েক পুরোনো অপারেটরের একচ্ছত্র আধিপত্য ও সিন্ডিকেট টিকিয়ে রাখতে পর্দার আড়ালে চলছে এক সুপরিকল্পিত খেলা।

  • নতুন অপারেটরদের সুযোগ না দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে পুরোনো সিন্ডিকেটকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
  • লাইসেন্স প্রক্রিয়া স্থগিত রেখেই কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের টেন্ডার আহ্বান করায় নতুন প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিযোগিতা থেকে বাদ পড়েছে।
  • বিষয়টি নিয়ে হাইকোর্টে রিট হলে আদালত লাইসেন্স স্থগিত ও টেন্ডার প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে রুল জারি করেন।

দীর্ঘদিন ধরে চলা এই সিন্ডিকেট আরও বেশি প্রকাশ্যে আসে গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর, যখন বন্দর কার্যক্রমে গতিশীলতা ও স্বচ্ছতা আনতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় নতুন ‘শিপ হ্যান্ডলিং ও বার্থ অপারেটর লাইসেন্সিং নীতিমালা-২০২৫’ প্রণয়ন করে। একই দিনে নতুন লাইসেন্স প্রদানের বিজ্ঞপ্তি জারি করা হলে দেশের শীর্ষস্থানীয় লজিস্টিক প্রতিষ্ঠান ‘ভার্টেক্স অব-ডক লজিস্টিক সার্ভিসেস লিমিটেডসহ একাধিক যোগ্য প্রতিষ্ঠান সব নিয়ম মেনে, কোটি টাকার যন্ত্রপাতি ও আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণসহ আবেদন জমা দেয়। কিন্তু নতুনদের এই আগমনী বার্তা হয়তো বন্দরের পুরোনো একচেটিয়া ব্যবসায়ী ও তাদের দোসরদের শঙ্কায় ফেলে দিয়েছিল। ফলে আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের শেষ মুহূর্তে গত ৩ মার্চ নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের এক রহস্যজনক আদেশে নতুন লাইসেন্স প্রদানের পুরো প্রক্রিয়া স্থগিত করে দেওয়া হয়। একটি কথিত ‘তদন্তাধীন বিষয়’-এর অজুহাত দেওয়া হলেও কী সেই তদন্ত বা কেন পুরো প্রক্রিয়া থমকে গেল, তার কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা মেলেনি।

তবে রহস্যের আসল জট খোলে একই দিনে। ৩ মার্চ নতুন লাইসেন্স স্থগিতের আদেশের পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ স্থানীয় পত্রিকায় পাঁচ বছর মেয়াদি মেগা টেন্ডার আহ্বান করে। বন্দরের সাধারণ কার্গো বার্থ নং ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭ ও ৮-এ কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের জন্য এই দরপত্র আহ্বান করা হয়। সচেতন মহলের প্রশ্ন, নতুন লাইসেন্স প্রাপ্তি যেখানে স্থগিত, সেখানে নতুন ও আধুনিক লজিস্টিক প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে এই টেন্ডারে অংশ নেবে? কারণ লাইসেন্স ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষে দরপত্রে অংশ নেওয়ার সুযোগ নেই। এই স্ববিরোধী ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পদক্ষেপই প্রমাণ করে, প্রতিযোগিতা শুরুর আগেই প্রতিযোগীদের মাঠ থেকে তাড়িয়ে দিয়ে পুরোনো সিন্ডিকেটকে একচেটিয়া বাণিজ্য উপহার দেওয়ার সব আয়োজন সম্পন্ন করা হয়।

এই চরম বৈষম্য ও অনিয়মের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে নামে বঞ্চিত প্রতিষ্ঠানগুলো। গত ২৬ এপ্রিল ভার্টেক্স অব-ডক লজিস্টিক সার্ভিসেস লিমিটেড হাইকোর্টে রিট আবেদন করলে আদালত বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নেন। গত ১০ মে হাইকোর্ট এক রুলে জানতে চান— লাইসেন্স স্থগিতের আদেশ কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না এবং এই বিতর্কিত টেন্ডার কেন বাতিল করা হবে না। যদিও বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম সচল রাখতে আদালত টেন্ডার প্রক্রিয়া সচল রাখার অনুমতি দিয়েছেন, তবে তা চূড়ান্ত রায়ের ওপর নির্ভরশীল থাকবে বলে স্পষ্ট করে দেন। আদালতের এই হস্তক্ষেপ প্রমাণ করে, প্রথম দর্শনেই এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় গুরুতর গলদ ও আইনি লঙ্ঘনের উপাদান রয়েছে।

বঞ্চিতদের অভিযোগ, ফি ও নথিপত্র গ্রহণের পর কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়া প্রক্রিয়া স্থগিত রাখা শুধু বৈষম্যমূলকই নয়, বরং স্বাধীনভাবে ব্যবসা পরিচালনার সাংবিধানিক অধিকারের পরিপন্থি। অথচ আদালতের এই রুল ও তীব্র বিতর্কের মাঝেই গত ১১ জুন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে ৩০ জুনের মধ্যে দরপত্র জমা দেওয়ার চূড়ান্ত সময়সীমা নির্ধারণ করেছে। বঞ্চিতদের অভিযোগ–লাইসেন্সহীন নতুন আবেদনকারীদের ঝুলিয়ে রেখে পুরোনো লাইসেন্সধারীদের অনুকূলে টেন্ডার চূড়ান্ত করার এই চাতুর্য এখন সাধারণ ব্যবসায়ীদের কাছেও পরিষ্কার হয়ে গেছে।

জানতে চাইলে ‘ভার্টেক্স অব-ডক লজিস্টিক সার্ভিসেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপক (ভূ-সম্পত্তি এবং বাণিজ্য) রিপন চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আমাদেরকে কৌশলে কার্গো বার্থ ও কার্গো হ্যান্ডলিং প্রতিযোগিতা থেকে দূরে রাখায় তারা উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। আদালত রুল জারি করেছেন। সেই রুল নিষ্পত্তি হওয়ার আগেই বন্দর কর্তৃপক্ষ বেশ কিছু বার্থ ও শিপিং হ্যান্ডলিংয়ের দরপত্র কার্যকর করতে যাচ্ছে। শুধু ভার্টেক্স লজিস্টিকস নয়, লাইসেন্সের জন্য এরকম আরও কয়েক শ আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানকে কৌশলে সরিয়ে দিয়ে তারা কাজটির দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে যাচ্ছে। যা সম্পূর্ণ অন্যায্য।

ফোন করা হলে চট্টগ্রাম বন্দরের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা সচিব মো. নাসির উদ্দিন খবরের কাগজকে জানিয়েছেন, সম্প্রতি নতুন করে লাইসেন্স দেওয়ার জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। আগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর যারা আবেদন করেছিলেন, তাদের আবেদনও বিবেচনা করা হবে। যারা যোগ্য ও সক্ষম তারা লাইসেন্স পাবে। দীর্ঘদিন লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়া স্থগিত রাখার কারণে অনেকেই বঞ্চিত হচ্ছেন–এমন অভিযোগের সদুত্তর তিনি দিতে পারেননি।

বন্দরসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মতে, এটি কোনো সাধারণ প্রশাসনিক ভুল নয়, এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক সিন্ডিকেটের আগ্রাসী রূপ। আধুনিক বিশ্বের বন্দরগুলোতে যখন প্রতিযোগিতা বাড়িয়ে সেবার মান উন্নত করা ও খরচ কমানোর চেষ্টা চলছে, তখন চট্টগ্রাম বন্দরে ঘটছে উল্টো ঘটনা। নতুন প্রযুক্তি, আধুনিক ক্রেন ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন উদ্যোক্তারা এলে কার্গো খালাসের ব্যয় কমত এবং দেশের অর্থনীতি উপকৃত হতো। কিন্তু গুটিকয়েক প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের পকেট ভারী করতে পুরো দেশের সরবরাহ ব্যবস্থাকে জিম্মি করা হচ্ছে। দেশের অর্থনীতির এই লাইফলাইনকে যদি এভাবে সিন্ডিকেটের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়, তবে তা জাতীয় বাণিজ্যের জন্য এক ভয়াবহ অশনিসংকেত নিয়ে আসবে।

সাবেক এমডি আলী রেজার দুর্নীতির অনুসন্ধান ইবিএলের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলার হুঁশিয়ারি দুদকের

প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২৬, ০৮:০৬ এএম
আপডেট: ২৪ জুন ২০২৬, ০৮:১১ এএম
ইবিএলের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলার হুঁশিয়ারি দুদকের
ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেডের (ইবিএল)

অনিয়ম-দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেডের (ইবিএল) সাবেক এমডি ও সিইও আলী রেজা ইফতেখারের বিরুদ্ধে চলমান অনুসন্ধানে তথ্য দিতে টালবাহানা করছেন ইবিএলের কর্মকর্তারা। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কয়েক দফা তাগিদ দিলেও প্রতিবারই সময় চেয়ে আবেদন করেছেন ইবিএল কর্মকর্তারা। 

  • আলী রেজা ইফতেখারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগে দুদকের অনুসন্ধান চলছে।
  • প্রয়োজনীয় নথি দিতে বারবার সময় চাইলেও এখনো তথ্য দেয়নি ইস্টার্ন ব্যাংক (ইবিএল)।
  • অনুসন্ধানে বাধা দেওয়ার অভিযোগে ইবিএলের বর্তমান এমডিসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে দুদক।

ফলে অনুসন্ধানকাজে অসহযোগিতা ও বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা করার হুঁশিয়ারির বার্তা দিয়েছেন দুদকের অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা। 

অবিলম্বে তথ্য-উপাত্ত না পাওয়া গেলে কমিশনের অনুমোদন সাপেক্ষে ইবিএলের বর্তমান এমডি ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা করা হতে পারে। 

গত ৩ মার্চ ড. মোমেন কমিশন পদত্যাগ করায় দুদকের সিদ্ধান্ত গ্রহণ বন্ধ রয়েছে। শিগগিরই কমিশন পুনর্গঠন হতে পারে। নতুন কমিশন দায়িত্ব গ্রহণের পরই বিষয়টি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে বলে দুদক সূত্রে জানা গেছে। 

ঋণ জালিয়াতি, অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে পদ্মা ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান চৌধুরী নাফিজ সরাফতের বিরুদ্ধে গত বছরের ১৩ এপ্রিল মামলা করে দুদক। সেই মামলার তদন্তের একপর্যায়ে আলী রেজা ইফতেখারের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়। সেই তথ্যের ভিত্তিতে সম্প্রতি তার বিরুদ্ধেও আলাদা করে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। 

অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেওয়া হয় দুদকের উপপরিচালক মো. মোস্তাফিজুর রহমানকে। তিনি অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে আলী রেজা ইফতেখারের বিষয়ে ৬ রকমের নথিপত্র চেয়ে গত ৩ মে ইস্টার্ন ব্যাংকের কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি দেন। চিঠিতে ইস্টার্ন ব্যাংকে থাকা আলী রেজা ইফতেখারের ব্যক্তিগত নথির সত্যায়িত কপি, জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টের কপি, মোবাইল ও টেলিফোন নম্বরসহ বর্তমান এবং স্থায়ী ঠিকানা, গত ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত বেতন-ভাতার সমুদয় হিসাব বিবরণী, তার নামে পরিচালিত সব ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য (চালু ও বন্ধ) এবং এ পর্যন্ত তাকে দেওয়া অবসরকালীন সুবিধাসহ সব আর্থিক লেনদেনের নথিপত্র চাওয়া হয়। 

নথি সরবরাহের জন্য ইস্টার্ন ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে ১৭ মে পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ে ইস্টার্ন ব্যাংক নথি সরবরাহে ব্যর্থ হয়। নির্ধারিত সময়ের শেষ দিনে আরও ১০ কর্মদিবস সময় চেয়ে দুদকে আবেদন করে ইস্টার্ন ব্যাংক। সার্বিক বিবেচনায় ৭ কর্মদিবস সময় মঞ্জুর করেন দুদকের অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা। সে অনুসারে ৩ জুনের মধ্যে সব নথি দুদকে জমা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই সময়ের মধ্যেও নথিপত্র সরবরাহ করেনি ইবিএল। উপরন্তু আরও ৩ মাস সময় চেয়ে ৪ জুন আবেদন করেন ইবিএলের ডিএমডি মাহমুদুন নবী চৌধুরী ও হেড অব এএমএলডি মো. শাহজাহান আলী। 

এই আবেদনে ক্ষুব্ধ দুদকের অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা মো. মোস্তাফিজুর রহমান গত ৮ জুন ইবিএলের এমডিকে কড়া ভাষায় নোটিশ দেন। নোটিশে ১৮ জুনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সব নথি সরবাহের চূড়ান্ত বার্তা দেওয়া হয়। অন্যথায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দুদক আইনের ১৯(৩) ধারায় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ার করা হয়। 

চূড়ান্ত বার্তার পরেও কোনো নথি সরবরাহ করেনি ইবিএল কর্তৃপক্ষ। ফলে ইবিএলের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থার প্রস্তুতি নিচ্ছেন দুদক কর্মকর্তারা। 

দুদক আইন

দুদক আইনের ১৯(৩) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বা কর্মকর্তা-কর্মচারী দুদকের অনুসন্ধান বা তদন্তের কাজে বাধা দিলে বা ইচ্ছাকৃতভাবে নির্দেশ অমান্য করলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এই অপরাধের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা কর্মকর্তা-কর্মচারী সর্বোচ্চ ৩ বছরের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। 

উল্লেখ্য, আলী রেজা ইফতেখার ২০০৪ সালে ইবিএলের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে যোগদান করেন। ২০০৬ সালে পদোন্নতি পেয়ে অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক হন। ২০০৭ সালে তিনি ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নিযুক্ত হন। চলতি বছরের ১৮ এপ্রিল তিনি অবসরে যান। বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারি কোনো ব্যাংকেই কোনো এমডি এত দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। দীর্ঘ সময়ে অন্তত ৫ বার তাকে এমডি পদে পুনর্নিয়োগ দেওয়া হয়। 

আলী রেজা ইফতেখার ২০১২ সালে দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত এশিয়ান লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড ‘সিইও অব দ্য ইয়ার-২০১২’ পুরস্কারে ভূষিত হন। ২০২০-২১ এবং ২০১৪-১৫ মেয়াদে দেশের ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন।

বরিশালে অর্থনৈতিক ইউনিট বেড়েছে, পিছিয়ে কর্মসংস্থানে

প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬, ০৮:৪৪ এএম
আপডেট: ২৩ জুন ২০২৬, ০৮:৪৭ এএম
বরিশালে অর্থনৈতিক ইউনিট বেড়েছে, পিছিয়ে কর্মসংস্থানে
ছবি: সংগৃহীত

দেশে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তারের ধারায় গত এক দশকে বরিশাল বিভাগে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও সেবা খাতের সম্প্রসারণের ফলে বিভাগে অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৭৮ দশমিক ২ শতাংশ। তবে অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা বাড়লেও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে দেশের অন্যান্য বিভাগের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে বরিশাল। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত ‘অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪’-এর জাতীয় প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে বরিশাল বিভাগে মোট অর্থনৈতিক ইউনিট রয়েছে ৬ লাখ ৫৬ হাজার ৯৪৪টি। ২০১৩ সালের শুমারিতে এ সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৬৮ হাজার ৫৬২টি। সে হিসাবে এক দশকে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ২ লাখ ৮৮ হাজার ৩৮২টি অর্থনৈতিক ইউনিট।

দেশের মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের মধ্যে বরিশাল বিভাগের অংশীদারত্ব ৫ দশমিক ৬১ শতাংশ। অর্থাৎ দেশের প্রতি ১০০টি অর্থনৈতিক ইউনিটের মধ্যে প্রায় ছয়টি বরিশাল বিভাগে অবস্থিত।

তবে কর্মসংস্থানের চিত্র তুলনামূলকভাবে ভিন্ন। শুমারির তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন অর্থনৈতিক ইউনিটে বর্তমানে ১২ লাখ ৭৯ হাজার ১২০ জন কর্মরত রয়েছেন। এটি জাতীয় কর্মসংস্থানের মাত্র ৪ দশমিক ১৮ শতাংশ। কর্মসংস্থানের দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে ঢাকা বিভাগ, যেখানে রয়েছে জাতীয় কর্মসংস্থানের ৯ দশমিক ৫১ শতাংশ।

অর্থনৈতিক শুমারির তথ্য অনুযায়ী, বরিশালের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বড় অংশই সেবা খাতনির্ভর। বিভাগে মোট ৫ লাখ ৯৬ হাজার ৩৯২টি অর্থনৈতিক ইউনিট সেবা খাতের আওতায় পরিচালিত হচ্ছে। এটি মোট ইউনিটের প্রায় ৯০ দশমিক ৮ শতাংশ। অন্যদিকে শিল্প খাতে রয়েছে ৬০ হাজার ৫৫২টি ইউনিট, যা মোট ইউনিটের ৯ দশমিক ২ শতাংশ।

প্রতিবেদনে আরও দেখা গেছে, বরিশালের অর্থনৈতিক ইউনিটগুলোর বড় অংশই ক্ষুদ্র, কুটির ও পারিবারিক পর্যায়ের উদ্যোগ। আকারভিত্তিক শ্রেণিকরণে বিভাগে কুটিরশিল্প রয়েছে ২ লাখ ৪৮ হাজার ৪১২টি এবং মাইক্রো শিল্প রয়েছে ৩ লাখ ৮৬ হাজার ৫৭৪টি। এ ছাড়া ক্ষুদ্র শিল্প রয়েছে ২০ হাজার ১৪০টি, মাঝারি শিল্প ১ হাজার ৫৬৯টি এবং বৃহৎ শিল্প মাত্র ২৪৯টি।

বরিশাল বিভাগের মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের মধ্যে স্থায়ী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৩ লাখ ৬৬ হাজার ৯৩৮টি। অস্থায়ী প্রতিষ্ঠান রয়েছে ১৯ হাজার ৯৪৬টি। আর অর্থনৈতিক খানা বা পারিবারিক অর্থনৈতিক ইউনিট রয়েছে ২ লাখ ৭০ হাজার ৬০টি।

কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও স্থায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর অবদান বেশি। এসব প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত রয়েছেন ৮ লাখ ৯৭ হাজার ৪৬৮ জন। অর্থনৈতিক খানাগুলোতে কর্মরত আছেন ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৩৩৩ জন এবং অস্থায়ী প্রতিষ্ঠানে রয়েছেন ২৫ হাজার ৩১৯ জন।

জেলাভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, অর্থনৈতিক ইউনিট ও কর্মসংস্থান উভয় ক্ষেত্রেই শীর্ষে রয়েছে বরিশাল জেলা। জেলায় মোট অর্থনৈতিক ইউনিট ১ লাখ ৭২ হাজার ৬৭৬টি এবং কর্মরত রয়েছেন ৩ লাখ ৭১ হাজার ৫৯২ জন।

এর পর রয়েছে পটুয়াখালী। সেখানে অর্থনৈতিক ইউনিট ১ লাখ ৩২ হাজার ১৬৪টি এবং কর্মসংস্থান ২ লাখ ৪৫ হাজার ৯৬ জন। ভোলায় রয়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার ৮৮৯টি ইউনিট এবং ২ লাখ ২১ হাজার ৬৯৪ জন কর্মরত।

পিরোজপুরে ৯৫ হাজার ৬০০টি ইউনিটে কর্মরত রয়েছেন ১ লাখ ৮৪ হাজার ৬৩২ জন। বরগুনায় রয়েছে ৭৪ হাজার ৬৭০টি ইউনিট এবং ১ লাখ ৪০ হাজার ৩৬০ জন কর্মসংস্থানে নিয়োজিত। সবচেয়ে কম অর্থনৈতিক ইউনিট রয়েছে ঝালকাঠি জেলায়। সেখানে ইউনিট সংখ্যা ৬২ হাজার ৯৪৫টি এবং কর্মরত রয়েছেন ১ লাখ ১৫ হাজার ৭৪৬ জন।

বরিশাল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি এবায়েদুল হক চাঁন বলেন, ‘অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা বৃদ্ধি কোনো অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য, উৎপাদন ও সেবামূলক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের গুরুত্বপূর্ণ সূচক। বরিশালে গত এক দশকে এই প্রবৃদ্ধি নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি, স্থানীয় বাজার সম্প্রসারণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতির গতিশীলতার ইঙ্গিত বহন করে।’

তবে কর্মসংস্থানের জাতীয় অংশীদারত্ব তুলনামূলক কম হওয়ায় উৎপাদনমুখী শিল্পায়ন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠা এখনো বিভাগের অন্যতম চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক জ্যোতিময় বিশ্বাস। তিনি বলেন, ‘গ্রামাঞ্চলে পারিবারিক পর্যায়ের উদ্যোগ ও ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এটিকে অতিরঞ্জিতভাবে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির প্রধান সূচক হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। ভারী শিল্প খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে পারলে অর্থনৈতিক ইউনিট বৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মসংস্থানেও আরও বড় অগ্রগতি সম্ভব হবে।’