চালের বস্তায় ধানের জাত, মিলগেটের মূল্য, উৎপাদনের তারিখ ও প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের নাম লিখতে হবে ১৪ এপ্রিল থেকে। খাদ্য মন্ত্রণালয় এমন নির্দেশনা দেওয়ার তিন মাস পরও বাজারে এর বাস্তবায়নের ছিটেফোঁটা চিহ্ন চোখে পড়েনি। রাজধানীর বড় বড় বাজার থেকে পাড়া-মহল্লার অলিগলিতেও মিনিকেট লেখা বস্তাভর্তি চাল দেদার বিক্রি হচ্ছে। বেশি দামের আশায় পলিশ করে মিনিকেট নামে বস্তাভর্তি চাল বিক্রি করছে রশিদ, আকিজ, মনজুর, ডায়মন্ড এআর গ্রুপসহ বিভিন্ন নামিদামি কোম্পানি।
খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতাদের অভিযোগ, মিলে উৎপাদন বন্ধ করলে আমরাও বিক্রি করতে পারব না। সরকার বলছে, মিনিকেট নামে কোনো জাত নেই। অথচ রাইসমিল থেকে আসছেই মিনিকেট চাল। এ নিয়ে তামাশা করা হচ্ছে। মিলের মালিকরা বলছেন, কৃষকরা উৎপাদন বন্ধ করলেই মিলে আসবে না। কৃষি মন্ত্রণালয়কেই ঘোষণা দিতে হবে মিনিকেটসহ কোন কোন জাতের ধান দেশে উৎপাদন হয়, আর কোনটা হয় না। তাহলে বিক্রি বন্ধ করা সম্ভব হবে।
বুধবার (১০ জুলাই) রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতা থেকে শুরু করে মিল মালিকদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
মিনিকেট নামে কোনো ধানের জাত নেই- খাদ্য মন্ত্রণালয়সহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে বলার পরও সরু বা চিকন চালের নামে বাজারে বেশি দামেই তা বিক্রি হচ্ছে। জিরা ও আটাশ ধান কেটে বা পলিশ করে সরু বানিয়ে এই চাল বিক্রি করা হচ্ছে। এ নিয়ে দেশে হইচই পড়লে সরকার এক বছর আগে ২০২৩ সালের ৬ জুলাই ২১ নং আইনও করেছে। বিধান অনুযায়ী পলিশিং ও কাটিংয়ের মাধ্যমে তৈরি মিনিকেট চাল বিক্রি ও সরবরাহ আইনগতভাবে অবৈধ।
চালের বস্তায় ধানের জাত, মিলগেটের মূল্য, উৎপাদনের তারিখ ও প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের নাম লিখতে হবে। এমনকি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের অবস্থান (জেলা ও উপজেলা) উল্লেখ করতে হবে। এসব উল্লেখ করে গত ফেব্রুয়ারি মাসে পরিপত্র জারি করে খাদ্য মন্ত্রণালয়। তাতে বলা হয়, পহেলা বৈশাখ থেকে এটা কার্যকর হবে। এর ব্যত্যয় ঘটলে রয়েছে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। তারপরও বাজারে তা কার্যকর হয়নি। মিল মালিকরা মিনিকেট লেখা বস্তাভর্তি চাল বিক্রি করছেন। তাতে ধানের জাত উল্লেখ করা হয় না বস্তায়।
গত ৮ মে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ‘আগামী তিন মাসের মধ্যে ধানের জাত, উৎপাদন তারিখ ও বিক্রয়মূল্যসংবলিত চালের বস্তা বাজারে চলে আসবে। আর ছয় মাসের মধ্যে চাল পলিশিং বা ছাঁটাই বন্ধ করা হবে। তারপর কেউ যদি চাল ছাঁটাই করে চিকন করে, তাহলে তাদের মেশিন জব্দ করা হবে। আমরা আইন করেছি, মিনিকেট চাল থাকবে না।’
তারপরও বাজারে ধানের জাতসহ বিভিন্ন তথ্যসংবলিত চালের বস্তা চোখে পড়ে না। সর্বশেষ গত ২৪ জুন নিজ এলাকা নওগাঁর নিয়ামতপুরে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেছেন, মিনিকেট লিখে চাল বিক্রির চেষ্টা করলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হবে।
কিন্তু কে শোনে কার কথা! এমন চিত্রই দেখা গেছে বাজারে। গতকাল রাজধানীর চালের পাইকারি আড়ত কৃষি মার্কেট, কারওয়ান বাজার, বাদামতলী বাজারসহ বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় দেখা গেছে বিভিন্ন নামিদামি কোম্পানির মিনিকেট লেখা বস্তাভর্তি চাল বিক্রি করছেন খুচরা বিক্রেতারা।
কারওয়ান বাজারের জব্বার স্টোরের মো. জব্বার আলী খবরের কাগজকে বলেন, ভালো মানের মিনিকেট চাল ৭৫ টাকা কেজি। রশিদ, মনজুর, ডায়মন্ডসহ বিভিন্ন কোম্পানির চাল বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। কৃষি মার্কেট ও এই বাজারের পাইকারদের কাছ থেকে এসব চাল কেনা হয়েছে। এই বাজারের বিসমিল্লাহ স্টোরের রাশেদ বলেন, পাবনার এআর গ্রুপের মিনিকেটসহ বিভিন্ন কোম্পানির মিনিকেট বিক্রি হচ্ছে ৬৮-৭৫ টাকা কেজি।
এক প্রশ্নের জবাবে তারা বলেন, ‘আমরাও কিছুদিন ধরে শুনছি মিনিকেট নামে চাল থাকবে না। কিন্তু মিলে বন্ধ করলেই শেষ। বাজারে আসবে না। আমরাও বিক্রি করতে পারব না।’ এই বাজারের পাইকারি চাল বিক্রেতা হাজি রাইস এজেন্সির মো. মাঈন উদ্দিন বলেন, সরকার ইচ্ছা করলে সবই সম্ভব। মিল মালিকদের নিয়ে মিটিং করে বললেই মিলে মিনিকেট নামে চাল উৎপাদন হবে না। মিনিকেট বন্ধ করা হবে বলে এক প্রকারের তামাশা করা হচ্ছে। খাদ্যমন্ত্রীর কাছের মানুষই মিনিকেট চাল বাজারে বিক্রি করছেন। তাহলে কীভাবে বন্ধ হবে? শুধু এসি রুম থেকে সার্কুলার জারি করলেই হবে না। সরেজমিনে বাজার দেখতে হবে। তবেই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে।
কৃষি মার্কেটের শাপলা রাইস এজেন্সির পাইকারি চাল ব্যবসায়ী শিপন ও খুচরা চাল বিক্রেতা শওকত আলী বলেন, ‘মিনিকেট নামে কোনো ধানের জাত নেই। এটা আমরাও শুনে আসছি। কিন্তু বস্তার গায়ে লেখা মিনিকেট তো বন্ধ হচ্ছে না। নামিদামি কোম্পানিই বেশি দামের আশায় জিরাশাইল, আটাশ ধান কেটে মিনিকেট চাল বেশি দামে বিক্রি করছে। মিল মালিকরা উৎপাদন বন্ধ করলে আমরাও বিক্রি করতে পারব না। ভোক্তাদের ঠকতে হবে না। আমরাও চাই সরকার যে নিয়ম করেছে, তা কার্যকর হোক। অন্য পণ্যের মতো চালের বস্তায় দামসহ সব তথ্য থাক।’
মোহাম্মদপুরের ফিউচার হাউজিংয়ের খুচরা বিক্রেতা আনোয়ার বলেন, ভালো চাল মিনিকেট আছে। ৭০-৭৫ টাকা কেজি। তাদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জানতে চাইলে বাংলাদেশ অটো রাইসমিল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. খোরশেদ আলম এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমরাও চাই দেশে দামসহ চালের বস্তায় বিভিন্ন তথ্য চালু হোক। কারণ দেশে যে পরিমাণ মিনিকেট ধান হয়, তাতে এক মাসের চাল হবে। কিন্তু প্রাণ, সিটি গ্রুপ, আকিজ, বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠানসহ রশিদ, মনজুর কোম্পানিও সারা বছর মিনিকেট চাল সরবরাহ করছে। তারা মিনিকেটের নামে ধোঁকা দিচ্ছে ভোক্তাদের। আমাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে দাবি হচ্ছে, সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা কার্যকর করা হোক। কারণ মিল থেকে আটাশ ও উনত্রিশ ধান পলিশ করে মিনিকেট নামে বিক্রি করা হচ্ছে। তা বন্ধ করতেই হবে। তাহলে ভোক্তারা ঠকবেন না।
বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং মিল মালিক সমিতির সভাপতি ও রশিদ গ্রুপের কর্ণধার আব্দুর রশিদ বলছেন ভিন্ন কথা। মিনিকেটের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘জিরা, আটাশ, উনত্রিশ ধান কেটে মিনিকেট চাল করা হচ্ছে তা বলা যাবে না। কারণ কিছু হলেও মিনিকেট উৎপাদন হচ্ছে। সরকার আইন করেছে, তা মানতে হবে। আমরা মানব। কিন্তু সমাধানের জায়গায় আসতে হবে। কৃষি মন্ত্রণালয়কে স্পষ্টভাবে বলতে হবে কোন কোন ধানের জাত আবিষ্কার করা হয়েছে দেশে। আর কোন ধানটা বাইরের, যা দেশের কৃষকরা উৎপাদন করছেন। মিনিকেট বন্ধ করতে হলে তা কৃষক পর্যায়ে বন্ধ করতে হবে। তবেই সরকারের সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে। মিনিকেট নামে চালের বস্তা বন্ধ হবে।’