ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শিক্ষা ও সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা কামাল আবদুল নাসের চৌধুরীকে গ্রেপ্তারের পর রিমান্ডে এনেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি পুলিশকে বেশকিছু স্পর্শকাতর কথা জানিয়েছেন। কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় কমিটি বাস্তবায়নের প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। শেখ হাসিনার যে কয়জন বিশ্বস্ত লোক ছিলেন তার মধ্যে তিনি ছিলেন অত্যতম। তিনি বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ছিলেন আত্মবিশ্বাসী, কারও কথা শুনতেন না।
বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে হামলা ও মকবুল নামে দলটির এক কর্মীকে হত্যার অভিযোগে গত মঙ্গলবার রাতে নাসেরকে গ্রেপ্তার করা হয়। পর দিন বুধবার তাকে আদালতে নেওয়া হয়। আদালত তাকে ৪ দিনের জন্য রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন মঞ্জুর করেন। রিমান্ডে আসার পর তিনি ২ দিন জ্বরে ভোগেন। তার শারীরিক অবস্থার অনেকটা উন্নতি হওয়ায় পুলিশ তাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে।
জিজ্ঞাসাবাদে নাসের বলেন, ‘রাষ্ট্রের সব কাজে ও বিরোধী দলকে মাঠপর্যায়ে মোকাবিলায় অতি আত্মবিশ্বাসী ছিলেন শেখ হাসিনা। নাসেরসহ আরও কয়েকজন তার উপদেষ্টা ছিলেন। নাসের পুলিশকে জানান, শেখ হাসিনা কারও কথা শুনতেন না। নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকতেন।’ মামলার তদন্তকাজে সম্পৃক্ত এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ কথা জানান।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) রেজাউল করিম মল্লিক শনিবার (৫ অক্টোবর) দুপুরে খবরের কাগজকে বলেন, ‘সাবেক উপদেষ্টা কামাল আবদুল নাসের চৌধুরীকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।’
নাসেরের মামলার তদন্তের সঙ্গে সম্পৃক্ত ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, জিজ্ঞাসাবাদে নাসের পুলিশের কাছে দাবি করেছেন যে, পল্টন থানায় দায়ের করা যে মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে সেই মামলা সম্পর্কে তিনি কিছুই জানেন না। তাকে হয়রানির উদ্দেশ্যে মামলায় জড়ানো হয়েছে। নাসের বলেন, ছাত্র আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন শেখ হাসিনা কয়েকজন উপদেষ্টাকে তার বাসভবন গণভবনে ডেকে পাঠান। ওই সময় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। তবে তিনি কারও কথা শোনেননি। নাসের আরও বলেন, শেখ হাসিনা ভেবেছিলেন ২০১৮ সালের মতো ২০২৪ সালের কোটা আন্দোলন থেমে যাবে। তিনি আরও বলেন, আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সরকার ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতা করার জন্য প্রথমে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল সাবেক কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাককে। কিন্তু পরে তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়। কেন তাকে সরিয়ে দেওয়া হয় প্রশ্ন করা হলে নাসের বলেন, ২৪ সালের নির্বাচনে বিএনপির আসা না আসা এবং সরকারের মামলা তুলে নেওয়ার ব্যাপারে আব্দুর রাজ্জাককে নিয়ে সমালোচনা হওয়ায় সরিয়ে দেওয়া হয়।
এদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সাবেক সচিব জাহাঙ্গীর আলমের রিমান্ড শেষ হয়েছে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাকে আবারও রিমান্ডে আনা হতে পারে। এ জন্য আদালতের কাছে তারা আবার রিমান্ড আবেদন করবেন।
জিজ্ঞাসাবাদে জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সাবেক ডিবি প্রধান হারুন অর রশীদ সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের আস্থাভাজন ছিলেন। প্রত্যেক রাতেই হারুন কামালের বাসায় যেতেন এবং বিভিন্ন বিষয় জানাতেন। জিজ্ঞাসাবাদে জাহাঙ্গীর বলেন, এ বিষয়টি নিয়ে ডিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিরক্ত ছিলেন। এ ছাড়াও ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার খ. মহিদ উদ্দিনকেও সরাতে চেয়েছিলেন ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান। হাবিবুরের ব্যাচমেট ছিলেন খ. মহিদ উদ্দিন। কিন্তু এসবির অতিরিক্ত আইজিপি মনিরুল চাচ্ছিলেন মহিদ ডিএমপিতে থাকুক। এ জন্য তাকে সরানো যায়নি।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তারা জাহাঙ্গীরের কাছে সদ্য চাকরিচ্যুত সাবেক আইজিপি মামুনের বিষয়ে জানতে চাইলে জাহাঙ্গীর বলেন, দ্বিতীয় মেয়াদে আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনের চাকরির সময়সীমা বাড়ানো হয়। তবে মামুন আর আইজিপি পদে থাকতে চাচ্ছিলেন না। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী ১২ ব্যাচ থেকে কাউকে আইজিপি আর করতে চাচ্ছিলেন না বিধায় তার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী আইজিপিকে গণভবনে ডেকে দায়িত্ব পালন করার নির্দেশ দেন।