ঢাকা ১ আষাঢ় ১৪৩৩, সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
বিশ্বকাপ উন্মাদনায় খবরের কাগজে প্রতিদিন ৪ পৃষ্ঠার বিশেষ আয়োজন কাজের আশায় রাশিয়ায়, প্রাণ গেল ড্রোন হামলায় কিয়েভের ঐতিহাসিক ক্যাথেড্রালে রাশিয়ার হামলায় নিহত ১১ বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিষয়ক প্রবন্ধ রচনা, ২য় পর্ব, এইচএসসির বাংলা ২য় পত্র বিমানের ঢাকা-নারিতা রুট পুনরায় চালু ২৭ জুলাই দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র গাজীপুর: সেমিনারে বক্তারা জুলাই হত্যা মামলায় আবুল বারকাতের জামিন নামঞ্জুর প্রোগ্রামিং ভাষা অধ্যায়ের ১৪টি বহুনির্বাচনি প্রশ্ন ও উত্তর, ৭ম পর্ব, এইচএসসির তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ইথিওপিয়ায় বাস খাদে পড়ে ২৮ জন নিহত মাগুরায় আম পাড়তে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে নারীর মৃত্যু আইফোনের ক্যামেরার নিয়ন্ত্রণ এয়ারপডসে হাংচৌতে চায়না এআই উদ্যোক্তা সম্মেলন শুরু রংপুরের বাজারে আসছে হাড়িভাঙ্গা আম ইসাক-গাইকোরেস রসায়নে মুগ্ধ কোচ পটার মাগুরার জেলা প্রশাসককে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকায় স্থানান্তর দিল্লির ঘটনায় ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার পাওয়ান বঢ়েকে তলব চীনে বছরে ১ কোটি ৫০ লাখের বেশি মানুষের রক্তদান বাজেট কি শিশুবান্ধব ও শিশুর খাতে দৃশ্যমান? পেকুয়ায় বাস-সিএনজির মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ২, আহত ৪ হল ছাড়লেন জাকসুর জিএস, সময় চাইলেন ভিপি হোটেল হলিডে ইনে ম্যাচডে ফিস্ট বাগেরহাটে জিয়াউর রহমানের শাহাদতবার্ষিকী উপলক্ষে দোয়া ও বৃক্ষরোপণ জন-আকাঙ্ক্ষার বাজেটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বড় চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশে এসে ২০ বছরের তরুণীকে বিয়ে করলেন পঞ্চাশোর্ধ্ব আমিরাতের নাগরিক তুমিও হারিয়ে যাও আমাজনের জঙ্গলে সিরাজউদ্দৌলা নাটকের ৫টি অনুধাবনমূলক প্রশ্ন ও উত্তর, ৫ম পর্ব, এইচএসসির বাংলা ১ম পত্র আমরা সব ইরানির জন্য খেলি: তারেমি কালীগঞ্জে আ.লীগ নেতাকে গ্রেপ্তার ঘিরে মুখোমুখি বিএনপির দুই গ্রুপ ক্যারিয়ার গড়ুন সীমান্ত ব্যাংকে ত্রিশালে সরকারি বইসহ পিকআপ জব্দ, পলাতক মাদরাসা সুপার
Nagad desktop

চট্টগ্রাম বন্দর চলত লতিফের ইশারায়

প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৪, ১১:২০ এএম
আপডেট: ১১ অক্টোবর ২০২৪, ১২:১৪ পিএম
চট্টগ্রাম বন্দর চলত লতিফের ইশারায়
চট্টগ্রাম-১১ আসনের এমপি এম এ লতিফ

চট্টগ্রাম-১১ আসনের টানা চারবারের সংসদ সদস্য (এমপি) ছিলেন এম এ লতিফ। ক্ষমতার অপব্যবহার করে এলাকায় তিনি একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন। তার কথাই ছিল শেষ কথা, এর বাইরে কেউ কিছুই করতে পারতেন না। জমি দখলেও তিনি ছিলেন বেপরোয়া।

জানা গেছে, দেশের লাইফ লাইন চট্টগ্রাম বন্দর, কাস্টম হাউস, ইপিজেড, বিমানবন্দর, চট্টগ্রাম চেম্বার, তেল শোধনাগারসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তার ওপর কথা বলতে পারতেন না। তিনি যা চাইতেন তাই করতে হতো এসব সংস্থাকে। বন্দর-পতেঙ্গা আসনের এমপি হয়ে বিগত ১৫ বছর স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠেছিলেন সুযোগসন্ধানী এই ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদ। এর বাইরেও বিভিন্ন বিষয়ে বিতর্কিত লতিফ এখন একাধিক মামলায় কারাগারে।

চট্টগ্রাম চেম্বারে পরিবারতন্ত্র 
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিতে পরিবারতন্ত্র কায়েম করেছিলেন এম এ লতিফ। একক আধিপত্যে তার পরিবারের সবাইকে চেম্বারের সদস্য করেছেন। ২০০৮ সালে চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি হওয়ার পর থেকে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের আগ পর্যন্ত সংগঠনটির নিয়ন্ত্রণ ছিল তার কাছে। চেম্বারে বছরের পর বছর তার ইশারায় ভোটবিহীন কমিটি তৈরি হতো। যেখানে স্থান পেতেন কেবল তার ঘনিষ্ঠরা।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ২০১৪ সালে এমপি হওয়ার পর থেকে চেম্বারকে শতভাগ নিজের নিয়ন্ত্রণে নেন লতিফ। সাবেক সভাপতি মাহবুবুল আলম এফবিসিসিআই সভাপতি হলে অনেক প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীকে ডিঙিয়ে লতিফ তার ছেলে ওমর হাজ্জাজকে সভাপতি ও ওমর মুক্তাদিরকে ভোট ছাড়াই পরিচালক নির্বাচিত করেন। 

লতিফের স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্তের কারণে সর্বশেষ কমিটির পরিচালক পদ থেকে পদত্যাগ করেন সৈয়দ এম তানভীরসহ একাধিক পরিচালক। গত দেড় দশকে চেম্বারের যেকোনো ইস্যুতে কেউ লতিফের কথার বাইরে গেলে তাকে নানাভাবে হয়রানি করা হতো। চেম্বারের অর্থায়নে নির্মিত ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার নির্মাণ, ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া, বাণিজ্যমেলার স্টল বরাদ্দ দেওয়া সবকিছুই ছিল এম এ লতিফ ও তার ঘনিষ্ঠদের নিয়ন্ত্রণে।

এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি এস এম নুরুল হক বলেন, ‘বড় বড় ব্যবসায়ীকে বাদ দিয়ে চট্টগ্রাম চেম্বারের নিজের অল্পবয়সী ছেলেকে সভাপতি বানিয়েছেন এম এ লতিফ। কেউ তার ভয়ে কথা বলার সাহস করত না। ভোট ছাড়া টানা পাঁচটি কমিটি হয়েছে। তিনি যেভাবে চাইতেন সেভাবেই সবকিছু হতো। এর বাইরে কিছু হওয়ার সুযোগ ছিল না।’

বন্দরকেন্দ্রিক ব্যবসাবাণিজ্যে প্রভাব বিস্তার 
চট্টগ্রাম বন্দরে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া, যন্ত্রপাতি সরবরাহ, নিয়োগ, বদলিতে সরাসরি হস্তক্ষেপের অভিযোগ ছিল লতিফের বিরুদ্ধে। বন্দরের বহির্নোঙরে পণ্য খালাসে তার একটি প্রতিষ্ঠানও নিয়োজিত ছিল। এ ছাড়া বন্দর ও কর্ণফুলী নদীতে লতিফের ছত্রছায়ায় অবৈধ মালামাল, চোরাই তেলসহ কোটি কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্যে জড়িত ছিলেন তার অনুসারীরা। 

চট্টগ্রাম বন্দরের ঠিকাদার আওয়ামী লীগ নেতা রোটারিয়ান মো. ইলিয়াস বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দরের কোটি কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প থেকে কমিশন খেতেন এম এ লতিফ। নিজের পছন্দের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান ছাড়া কাউকে বন্দরে ঠিকাদারি কাজ করতে দিতেন না। নিজের লোকজনকে কাজ পাইয়ে দিতে তিনি অন্য ঠিকাদারদের নানাভাবে হয়রানি করতেন।’

লতিফের ঘনিষ্ঠ অনুসারী আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল মান্নান চৌধুরী জি এম ট্রেডিং নামের একটি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে বিভিন্ন স্ক্র্যাপ কাঠ ও মালামাল বের করতেন। এসব মালামাল বের করার আড়ালে বন্দরের কয়েকজন অসাধু কর্মচারীর সহযোগিতায় অবৈধ ঘোষণায় আমদানি হওয়া বিভিন্ন বৈধ-অবৈধ পণ্য ট্রাকে করে পাচার করত একটি সিন্ডিকেট। ২০১৪ সাল থেকে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে প্রতিদিন অন্তত ২৫-৩০টি ট্রাকে করে মালামাল বের করে আমদানিকারকের দেওয়া নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে দিত এই সিন্ডিকেটটি। এসব ট্রাকে হাজার কোটি টাকার পণ্য পাচার হলেও বোঝার সুযোগ ছিল না। এই সিন্ডিকেটের মূল নিয়ন্ত্রক ছিলেন লতিফের দুই ভাতিজা সোহেল ও দস্তগীর। এদের সঙ্গে পুরো বিষয়টি দেখভাল করতেন নগর যুবলীগ নেতা দেবাশীষ পাল দেবু, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা রাজীবসহ আরও কয়েকজন। 

লতিফের ছত্রছায়ায় কর্ণফুলী নদীতে চোরাই তেলের স্বর্গরাজ্য গড়ে তোলেন শুক্কুর নামের এক চোরাই তেলের কারবারি। রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান পদ্মা, মেঘনা, যমুনার জন্য আমদানি করা তেল বোঝাই ট্যাংকারগুলো থেকে তেল চুরি করে সরিয়ে নিত এই সিন্ডিকেট। শুক্কুর একসময় কর্ণফুলী নদীতে মাঝি হিসেবে কাজ করলেও চোরাই তেলের বাণিজ্য করে কোটিপতি বনে যান। এই অবৈধ ব্যবসা থেকে শুক্কুর লতিফকে প্রতি মাসে ৩০ লাখ টাকার বেশি কমিশন দিত বলে দাবি করেছে একটি সূত্র।

জমি দখলে ছিলেন বেপরোয়া 
লতিফের প্রভাব কাজে লাগান তার অনুসারী ব্যারিস্টার সুলতান আহমদ কলেজের সাবেক ভিপি জাহেদ হোসেন খোকন ও আওয়ামী লীগ নেতা আলমগীর। এ দুজন পতেঙ্গা এলাকার সিমেন্ট ফ্যাক্টরির পেছনে বন্দরের অন্তত ৪ একর জায়গা গত কয়েক বছর ধরে দখলে রেখেছিলেন। কর্ণফুলী নদী থেকে সংগ্রহ করা চোরাই তেল সেখানে নিয়ে মজুত করে পরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করা হতো। এখান থেকেও প্রতি মাসে লতিফ ১০ লাখ টাকার বেশি কমিশন পেতেন বলে দাবি করেছে আরেকটি সূত্র। 

এ ছাড়া ইপিজেড গেট থেকে কলসীর দিঘিরপাড় পর্যন্ত রেল বিটের পাশের বেশ কিছু খাস জায়গা দখল করে ২ শতাধিক অস্থায়ী দোকান নির্মাণ করে ভাড়া দিত আরেকটি সিন্ডিকেট। যার নেতৃত্বে ছিলেন লতিফের ঘনিষ্ঠ অনুসারী যুবলীগ নেতা হাসানুজ্জামান সোহেল, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা জাকের আহমেদ খোকন, আজিজ, রানাসহ কয়েকজন। 

এ ছাড়া ২০১৬ সালে মুন্সীগঞ্জের চরকিশোরগঞ্জ এলাকায় বেশ কিছু সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি দখল করে গ্লোব শিপইয়ার্ড ইঞ্জিনিয়ারিং নামে জাহাজ মেরামতকারী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার অভিযোগ আছে লতিফ পরিবারের বিরুদ্ধে।

হলফনামায় সম্পদ বেড়েছে কয়েক শ গুণ
হলফনামা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ১৫ বছর আগে ২০০৮ সালে লতিফের বার্ষিক আয় ছিল মাত্র ৬ লাখ ১৮ হাজার টাকা। আর অস্থাবর সম্পত্তি ছিল মাত্র ৩০ লাখ টাকার। ২০২৪ সালে এম এ লতিফের বার্ষিক আয় ৭৪ লাখ ৮২ হাজার টাকা। যদিও ২০১৮ সালে তার বার্ষিক আয় ছিল ৮২ লাখ ৩৭ হাজার টাকা। 

২০১৮ সালে তার অস্থাবর সম্পত্তি ছিল ২ কোটি ৬৪ লাখ টাকার। ২০২৪ সালে দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ৭২ লাখ টাকায়। ৫ বছরের ব্যবধানে বেড়েছে ৩ কোটি ৮ লাখ টাকা। বিগত ১৫ বছরের ব্যবধানে তিনি অঢেল সম্পদের মালিক বনেছেন। 

এম এ লতিফ আটক হন যেভাবে 
গত ৯ আগস্ট শুক্রবার পূর্ব মাদারবাড়ির নসু মালুম মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করেন এম এ লতিফ। এ সময় তাকে ঘিরে ধরেন স্থানীয়রা। অবস্থা বেগতিক দেখে মসজিদের কাছেই ভাগিনা আদনানুল ইসলাম চৌধুরীর বাসায় আশ্রয় নেন তিনি। এরপর স্থানীয়রা ওই বাড়ি ঘিরে রাখে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায় সেনাবাহিনীর একটি দল। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে গাড়িতে তুলে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে যায় সেনাবাহিনী। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম কারাগারে রয়েছেন।

আতঙ্কে ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ আসামিরা

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬, ০৮:৪২ এএম
আপডেট: ১৫ জুন ২০২৬, ১১:৫১ এএম
আতঙ্কে ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ আসামিরা
ছবি: সংগৃহীত

একসময়ের মহাপ্রতাপশালী হিসেবে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ ব্যাপক পরিচিত। যিনি বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালনের সময়ে অনেকের কাছেই ছিলেন মূর্তিমান আতঙ্ক। বলা হয়ে থাকে– বেনজীর আহমেদ সে সময়ের অনেক মন্ত্রীর চেয়েও ক্ষমতাধর ছিলেন। সেই বেনজীর আহমেদ এবার আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ‘ইন্টারপোল’ এর সহায়তায় দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হওয়ার পর বিদেশে পলাতক বা আত্মগোপনে থাকা অন্য আসামিরাও এখন আতঙ্কে ভুগছেন বলে মনে করছেন অপরাধ বিশ্লেষকরা।

রবিবার (১৪ জুন) ইন্টারপোলের ওয়েবসাইটের ‘রেড নোটিশ’ তালিকায় সারা বিশ্বের ৬ হাজার ৪৪২ জন ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ আসামির নাম, ছবি ও বয়সসহ প্রাথমিক তথ্য দেখা গেছে। এর মধ্যে শুধু বাংলাদেশের মোস্ট ওয়ান্টেড আসামি রয়েছেন ৫৯ জন। সাম্প্রতিক সময়ে এ তালিকায় নতুন মাত্র কয়েকজন যুক্ত হলেও অধিকাংশই দীর্ঘদিন ধরে ওই ওয়েবসাইটের রেড নোটিশের তালিকায় প্রদর্শিত হয়ে আসছেন।

যদিও এই রেড নোটিশের তালিকায় গতকাল পর্যন্ত সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের নাম বা ছবি কোনো কিছুই দেখা যায়নি। তবে ইন্টারপোলের কাছে ‘অফিশিয়ালি’ বাংলাদেশ পুলিশ বেনজীরকে গ্রেপ্তারে সহযোগিতা চেয়েছিল বলে জানা গেছে। গতকাল পুলিশ সদর দপ্তরের একজন এআইজি খবরের কাগজকে বলেন, ইন্টারপোলের পলিসি অনুসারে কিছু ক্ষেত্রে কোনো আসামির নাম বা ছবি তালিকায় না রেখে অপ্রকাশিত রাখা হয়। সেই পরিপ্রেক্ষিতে বেনজীর আহমেদ ইন্টারপোলের রেড নোটিশ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত থাকলেও তার নাম বা ছবি দেখা যায়নি।

এ কারণে দুবাইয়ে ‘বিপুল অর্থসম্পদ’ বিনিয়োগের তথ্য থাকা বেনজীর আহমেদ সেখানে গ্রেপ্তার হওয়ায় অন্য আলোচিত আসামিদের মধ্যেও এক ধরনের শঙ্কা বিরাজ করছে বলে মনে করেন অপরাধ বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে ইন্টারপোলের তালিকায় থাকা বা পলাতক হিসেবে বিভিন্ন দেশে আত্মগোপনে থাকা গুরুতর ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট মামলার আসামিরা অনেকটা আতঙ্কগ্রস্ত বলে মনে করেন তারা।

এ প্রসঙ্গে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক খবরের কাগজকে বলেন, বেনজীর আহমেদ গ্রেপ্তার হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই এই ধরনের আসামি যারা রয়েছেন, তাদের মধ্যে ভীতি বা আতঙ্ক কাজ করবে। অনেকেই যারা আত্মগোপনে রয়েছেন, তারা একই জায়গায় বেশি দিন থাকবেন না। তারা গ্রেপ্তার এড়াতে অবস্থান পাল্টাবেন–এগুলো স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া।

ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, ‘আমি মনে করি, এই ধরনের (বেনজীর) আসামি যারা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, ক্ষমতার চেয়ারে বসে রাষ্ট্রকে বিভ্রান্তির দিকে নিয়ে গিয়েছিলেন– তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া জরুরি। কেননা, শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে তা অন্যদের জন্য সতর্ক বার্তা বা শিক্ষণীয় হবে।

একই সঙ্গে সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার জায়গাগুলো আরও মজবুত হবে। ফলে বিদেশে গ্রেপ্তারেই যেন সবকিছু থমকে না থাকে। দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে আইনানুসারে যথাযথ বিচার বা শাস্তি নিশ্চিত করতে পারলেই কেবল এই প্রক্রিয়ার সার্বিক সুফল পাওয়া যাবে।

এ প্রসঙ্গে অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক খবরের কাগজকে বলেন, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় বা প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় এক শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা ক্ষমতার অপব্যবহার করেন। তারা ক্ষমতার চেয়ারে বসে বেপরোয়া দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা বা অপেশাদার আচরণ করেন–এমন কর্মকর্তাদের জন্য সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ গ্রেপ্তারের ঘটনাটি অবশ্যই শিক্ষণীয়।

যদিও এমন বিভিন্ন ঘটনা থেকেও অনেকে শিক্ষা নেন না। তার পরও পুলিশ, প্রশাসনসহ সব ক্ষেত্রেই কর্মকর্তাদের দুর্নীতি-স্বেচ্ছাচারিতা বা ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে সরকারের জবাবদিহিমূলক কঠোর অবস্থান জারি রাখতে হবে। এতে সরকারের সঙ্গে জনগণের সুসম্পর্ক বৃদ্ধি পাবে।

এ প্রসঙ্গে সাবেক আইজিপি (মহাপরিদর্শক) আব্দুল কাইয়ুম খবরের কাগজকে বলেন, প্রতিটি সরকারি চাকরিতে বা দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিভাগের নির্ধারিত রুলস বা বিধিবিধান রয়েছে। কিন্তু অনেকেই সেটি মনে রাখেন না। চেয়ার পেলেই অনেকেই হয়ে যান লাগামছাড়া। ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি ও অপেশাদার আচরণ তাদের এমনভাবে বাড়তে থাকে, যা সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভ ও তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। কিন্তু সবার মনে রাখা দরকার, কোনো চেয়ার বা ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। সেটা মাথায় রেখে শুধু পুলিশ কর্মকর্তা নন, যেকোনো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। যাতে করে ভবিষ্যতে অসম্মানজনক পরিণতির শিকার হতে না হয়।

ইন্টারপোলের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, ‘রেড নোটিশ’ বা লাল সংকেতের তালিকাটি হচ্ছে–বিশ্বব্যাপী আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর কাছে কোনো ব্যক্তিকে খুঁজে বের করতে এবং প্রত্যর্পণ, আত্মসমর্পণ বা অনুরূপ আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে তাকে সাময়িকভাবে গ্রেপ্তার করার একটি অনুরোধ। তবে রেড নোটিশ কোনো আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মূলত অনুরোধকারী সদস্য দেশ বা আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল দ্বারা ‘ওয়ান্টেড’। সদস্য দেশগুলো কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তাদের নিজস্ব আইন প্রয়োগ করে। অধিকাংশ রেড নোটিশ শুধু আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ব্যবহারের জন্য সীমাবদ্ধ।

গতকাল পর্যন্ত ইন্টারপোলের রেড নোটিশের তালিকায় থাকা ৫৯ জন বাংলাদেশি হলেন–

রাজু ঢালি (৪২), মো. মিলন (৩৭), লিটন ব্যাপারী (৪৭), রবিউল ইসলাম রবিউল ওরফে আরাভ খান (৩৮), জাফর ইকবাল (৪৪), তানজিরুল (৪১), স্বপন (৩৪), নজরুল ইসলাম মোল্লা (৪৯), মিন্টু মিয়া (৪৭), ওয়াসিম (৪১), খোরশেদ আলম (৪৩), গিয়াস উদ্দিন (৫৬), অশোক কুমার দাস (৪৫), মিজান মিয়া (৪৮), কুমার চন্দ্র রায় (৪৬), রাতুল আহমেদ বাবু (৪৫), মো. সিরাজ মোস্তফা লালু (৩০), জাহিদ হোসাইন খোকন (৮৪), মো. সাঈদ হোসাইন ওরফে হোসেন (৭৪), মো. হাছান আলী সাঈদ ওরফে সৈয়দ মো. হাছান আলী (৭৮), আজিজুর রহমান (৫০), অজয় বিশ্বাস (৪৪), তরিকুল ইসলাম (৩৯), এন এ হানিফ (৪১), আলাউদ্দিন মোহাম্মদ (৫৩), মোহাম্মদ সবুজ ফকির (৫১), মোহাম্মদ মনির ভুঁইয়া (৬২), শফিকুল (৫৮), আমান উল্লাহ শফিক (৪৪) আবুল কালাম আজাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকার (৭৯), জাহিদুল ইসলাম (৭০), সাজ্জাদ হোসাইন খান (৪৭), মো. নাঈম খান ইকরাম (৫৭), কালা জাহাঙ্গীর ওরফে ফেরদৌস (৪৮), মো. ইউসুফ (৭৯), আব্দুল আলিম শরীফ (৫৬), আহমেদ মজনু (৫৩), নুরুল দিপু (৪৯), মুহাম্মদ ফজলুল আমিন জাভেদ (৩৮), এস এইচ এম বি নূর চৌধুরী (৭৫), খন্দকার আবদুর রশিদ (৭৯), নাজমুল হোসেন আনসার (৭৩), শরিফুল হক ডালিম (৮০), আহমেদ শরিফুল হোসেন (৮৩), মুসলেম উদ্দিন খান (৮৮), এ এম রাশেদ চৌধুরী (৭৯), চৌধুরী মোহাম্মদ আতাউর রহমান (৬৪), আলহাজ মাওলানা মোহাম্মদ তাজউদ্দিন মিয়া (৫৩), সালাউদ্দিন মিন্টু (৪৬), গোলাম ফারুক অভি (৬০), হারুন শেখ (৫৫), তৌফিক আলম (৫১), আহমেদ জাফর (৫৬), রফিকুল ইসলাম (৫৫), জিসান আহমেদ (৫৬), আমীনুর রসুল (৬৮), নবী হোসেন (৫৬), প্রকাশ কুমার বিশ্বাস (৫৩) এবং আব্দুল জব্বার (৫৪)।

পরিদর্শন নেই, অরক্ষিত রেলপথ

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬, ০৮:৫৮ এএম
আপডেট: ১৪ জুন ২০২৬, ০৯:৩০ এএম
পরিদর্শন নেই, অরক্ষিত রেলপথ
ছবি: খবরের কাগজ

কাগজে-কলমে জনবল শতভাগ পূর্ণ থাকলেও বাস্তবে মাঠপর্যায়ে তাদের দেখা মেলে না। নিয়মিত পরিদর্শন ও তদারকির অভাবে অরক্ষিত থেকে যাচ্ছে রেলপথ, যার ফলে যেকোনো সময় ঘটতে পারে বড় ধরনের রেল দুর্ঘটনা। দায়িত্বে অবহেলা করলেও কর্মকর্তাদের নিয়মিত ‘মাসোহারা’ বা উৎকোচ দেওয়ার কারণে চাকরি হারানোর কোনো ঝুঁকি থাকে না। বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে (সিআরবি) এ ধরনের অনিয়মই যেন এখন এক স্বাভাবিক চিত্র।

কতিপয় কর্মকর্তা ও সিন্ডিকেটের যোগসাজশে ভেঙে পড়েছে সিআরবির চেইন অব কমান্ড, যার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ যাত্রীদের। সিআরবির বিভিন্ন নথি বিশ্লেষণে এ তথ্য উঠে এসেছে।

কাজ না করে হাজিরা, প্রশাসনের চোখে ধুলো

সিআরবির আওতাধীন উচ্চমান উপসহকারী প্রকৌশলী (এসএসএই-ওয়ে) এবং চট্টগ্রাম বন্দরসংলগ্ন রেলওয়ের প্রধান পণ্যবাহী ট্রেন পরিচালনার ইয়ার্ডের (সিজিপিওয়াই) অধীনে মোট ১৪টি ওয়ার্কিং টিম বা গ্যাং কাগজে-কলমে পূর্ণাঙ্গ জনবল নিয়ে চলছে। সূত্র বলছে, এখানে কোনো শূন্যপদ নেই।

এ ছাড়া মিরসরাইয়ের চিনকি আস্তানায় ১৪টি, ফেনীতে ১৪টি, লাকসামে ১৪টি এবং কুমিল্লায় ১৪টি গ্যাং চালু রয়েছে। প্রতি গ্যাংয়ে মেইট, কিম্যান ও ওয়েম্যানসহ সর্বোচ্চ ১১ জন এবং সর্বনিম্ন ৯ জন সদস্য থাকার কথা।

কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, অধিকাংশ ওয়েম্যান লাইনে নিয়মিত কাজ করছেন না। তারা সহকারী প্রকৌশলী চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রকৌশলী-৩, চট্টগ্রাম বিভাগীয় ব্যবস্থাপকের দপ্তরসহ সিআরবির বিভিন্ন অফিসে কর্মরত।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রকৌশলী-১-এর অধীনে গ্যাং নং ১৪-তে মাত্র ৩-৪ জন কর্মী কাজ করছেন। রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বাংলাবাজার এলাকায় এসআরভি রেলস্টেশনে সিজিপিওয়াই গ্যাংয়ের অধীনে ৯ জন রেলপথকর্মী নিয়োজিত থাকার কথা। কিন্তু তার বিপরীতে কাজ করতে দেখা গেছে মাত্র ১ জন ওয়েম্যানকে। অন্য গ্যাংয়ে ১১ জনের বিপরীতে কাজ করতে দেখা গেছে মাত্র ২ থেকে ৩ জনকে। রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী এসব জেনেও কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছেন না বলে রেলওয়ে মহাপরিচালকের দপ্তরে অভিযোগ জমা পড়েছে।

রেলের পূর্বাঞ্চলের (চট্টগ্রামের মিরসরাই) চিনকি আস্তানার ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী এবং ফেনীর সহকারী প্রকৌশলী কার্যালয়ের বিরুদ্ধেও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, রেলপথ তদারকি কার্যক্রমে তারা দায়িত্বের সঙ্গে কাজ করছেন না। একই চিত্র দেখা গেছে, এসএসএই (ওয়ে)-চট্টগ্রাম ও এসএসএই (ওয়ে)-ষোলশহরসহ প্রতিটি দপ্তরে। প্রশাসনের নাকের ডগা দিয়ে এই নিয়মবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের ফলে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ছে রেলপথ। এর আগে ২০২৪ সালে রেলওয়ের মহাপরিচালক দপ্তর থেকে ওয়েম্যানদের নিজ নিজ কর্মস্থলে ফেরার আদেশ জারি করা হয়েছিল। কিন্তু সে নির্দেশ মানেননি রেলের অসাধু কর্মচারীরা। এতে যারা রেলপথে নিয়মিত কাজ করছেন, তাদের ওপর বাড়তি কাজের চাপ পড়ছে।

ওয়েম্যানরাই রেলপথের মূল তদারককারী। তাদের অনুপস্থিতিতে লাইনের নাট-বল্টু ঢিলা হওয়া বা ফাটল শনাক্ত না হওয়ায় লাইনচ্যুত হওয়া ও বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহু গুণ বেড়ে যায়।

শাস্তির হাত থেকে বাঁচতে ‘নিয়মিত মাসোহারা’

অনুসন্ধানে জানা যায়, এসএসএই (ওয়ে), সিজিপিওয়াই এবং গ্যাং মেইটের (রেললাইনের রক্ষণাবেক্ষণকারী দল বা ‘গ্যাং’-এর দলনেতা) যোগসাজশে অনেক ওয়েম্যান বা গ্যাংম্যান গরহাজির থাকছেন। শাস্তির হাত থেকে বাঁচতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ‘মাসোহারা’ দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এই মাসোহারার জন্য গ্যাং মেইটদেরও ‘চাপে রাখা হয়’ বলে জানিয়েছেন ওয়েম্যানদের একাংশ।

চট্টগ্রাম গ্যাং নং ৮, ৯, ১০, ১১, ১২–এই ‘মাসোহারা সিস্টেম’-এর বিরুদ্ধে গ্যাং মেইটরা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠছেন।

কর্মস্থলে না গিয়েও বেতন-ভাতা তুলে নিচ্ছেন নিয়মিত

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রাম বিভাগে রেললাইন রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা ওয়েম্যানদের একটি বড় অংশ কর্মস্থলে না গিয়ে নিয়মিত বেতন-ভাতা তুলে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। লাইনে কঠোর শ্রম দেওয়ার কথা থাকলেও অনেকে বিভিন্ন নেতার দপ্তরে কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বাসাবাড়িতে অবস্থান করে মাস শেষে বেতন তুলছেন, আর মাসোহারা দিয়ে বছরের পর বছর চাকরি ধরে রেখেছেন।

রেলওয়ের মাঠপর্যায়ের একাধিক সাধারণ কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে খবরের কাগজকে জানান, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই ফাঁকিবাজ কর্মীরাও রাতারাতি খোলস বদল করেন। বিগত সরকারের আমলে যারা আওয়ামী লীগের পরিচয় দিয়ে সুবিধা নিয়েছেন, তারা এখন শ্রমিক দলের নাম ভাঙিয়ে কিংবা তথাকথিত ‘সংস্কারপন্থি’ গ্রুপের ‘লেবাস’ ধরে একই ধারা বজায় রাখছেন।

কর্মচারীদের অভিযোগ, এই কর্মীরা সপ্তাহে বড়জোর এক দিন কিংবা ১৫ দিনে একবার এসে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে যান, যাতে কাগজে-কলমে তাদের অনুপস্থিতি ধরা না পড়ে। মাস শেষে ঠিকই তারা পুরো মাসের বেতন তুলে নিচ্ছেন। একে রেলওয়ে ও রাষ্ট্রীয় কোষাগারের জন্য বড় ধরনের লোকসান ও ক্ষতি হিসেবে দেখছেন সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

একজন রেল কর্মচারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ব্যক্তিগত লাভের জন্য একটা মানুষ পুরো রেলের ক্ষতি করছেন। অথচ এদের দেখার যেন কেউ নেই।’

নিয়মিত বিরতিতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পরিদর্শনের নিয়ম থাকলেও কেন এই অনিয়ম ধরা পড়ছে না–এমন প্রশ্নে মাঠপর্যায়ের কর্মচারীরা জানান, রেলের ব্রিটিশ আমলের নিয়ম অনুযায়ী প্রধান প্রকৌশলীর ছয় মাসে একবার ট্রলিযোগে লাইন পরিদর্শনে আসার কথা। পূর্বাঞ্চলের বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী তানভীরুল ইসলাম কাজের বিষয়ে সচেতন হলেও এই পরিদর্শনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

কর্মচারীরা বলছেন, এখন অনলাইনের যুগ। প্রধান প্রকৌশলী পরিদর্শনে বের হওয়ার আগেই মোবাইল ফোনের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে বার্তা পৌঁছে যায় যে ‘আগামীকাল স্যার ট্রলি করবেন’। ফলে পরিদর্শনের দিন সকাল সকাল সব ফাঁকিবাজ কর্মী লাইনে গিয়ে হাজির হন। তিনি পরিদর্শনে গিয়ে সবাইকে কাজ করতে দেখেন। কিন্তু তিনি চলে গেলেই পরিস্থিতি আবার আগের মতো হয়ে যায়।

সাধারণ কর্মচারীদের মতে, অনিয়মের মূল গোড়াটি রয়েছে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের স্তরে। স্থানীয় এসএসএই (সিনিয়র সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার) বা এইএন (অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার) পর্যায়ের কর্মকর্তারা যদি কঠোরভাবে তদারকি না করেন, তবে প্রধান প্রকৌশলীর একক সচেতনতা দিয়ে এই দীর্ঘদিনের ফাঁকিবাজির সংস্কৃতি বন্ধ করা সম্ভব নয়।

যা বলছেন প্রধান প্রকৌশলী

পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের প্রধান প্রকৌশলী তানভীরুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, রেলওয়ের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অভ্যন্তরীণ এসব তথ্য বেশ সময়সাপেক্ষ। ফোনে সব প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর দেওয়া মুশকিল। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের পরামর্শ দেন তিনি। 
রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলীয় কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের অনেকেই জানিয়েছেন, রেলপথে জনবলে নিয়োগ ও পরিচালনার পুরো বিষয়টি চট্টগ্রামের সহকারী কর্মকর্তা (এএন) পর্যায় থেকে নিয়ন্ত্রিত হয়। এর ধারাবাহিকতায় ক্রমান্বয়ে বিভাগীয় প্রকৌশলী (ডিএন) এবং প্রধান পার্সোনেল অফিসার (সিপিও) উইংয়ের অধীনে পুরো পূর্বাঞ্চলের এই জনবল কাঠামো পরিচালিত হয়ে থাকে।

টেলিফোনে এই প্রশাসনিক কাঠামোর বিস্তারিত তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করে প্রধান প্রকৌশলী তানভীরুল ইসলাম বলেন, ‘টেলিফোনে আমি কোনো তথ্য দিতে পারব না। আপনি যদি চট্টগ্রামের কার্যালয়ে আসতে পারেন তবে ভালো, অন্যথায় স্থানীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন।’

খবরের কাগজের এই প্রতিবেদক পরে চট্টগ্রাম বিভাগীয় দপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাদের বার্তাও পাঠান। কিন্তু তারা কেউ সাড়া দেননি। ঢাকায় রেল ভবনের প্রধান পার্সোনেল কর্মকর্তা জাকির হাসানের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এই অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হবে।’ বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি ফোন কেটে দেন।

রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মো. সুবক্তগীনও খবরের কাগজের বার্তায় কোনো সাড়া দেননি।

গৌরীপুর ও মুক্তাগাছায় পানির প্রকল্প: ২ বছরে অগ্রগতি মাত্র ২০ শতাংশ

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬, ০৮:৪২ এএম
আপডেট: ১৩ জুন ২০২৬, ০৮:৪৪ এএম
গৌরীপুর ও মুক্তাগাছায় পানির প্রকল্প: ২ বছরে অগ্রগতি মাত্র ২০ শতাংশ
ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার পাইকেশমোড়ে ‘লার্জ পাইপড ওয়াটার সাপ্লাই স্কিম’ প্রকল্পের কাজ মেঝে পর্যন্ত হয়েই বন্ধ রয়েছে। ছবি: খবরের কাগজ

গ্রামীণ মানুষের জন্য নিরাপদ ও আর্সেনিকমুক্ত পানি সরবরাহের লক্ষ্য নিয়ে শুরু হয়েছিল সাড়ে ১২ কোটি টাকার একটি প্রকল্প। ১৮ মাসের মধ্যে এই পানি সরবরাহ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রায় দুই বছর পার হয়ে গেলেও কাজের অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ২০ শতাংশ। অভিযোগ রয়েছে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রকল্পের বড় অংশের বিল তুলে নিয়েছে। সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলী কার্যাদেশ বাতিলের জন্য প্রধান কার্যালয়ে চিঠি পাঠালেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। 

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের আওতায় ‘লার্জ পাইপড ওয়াটার সাপ্লাই স্কিম’ প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে। দুই উপজেলায় বাস্তবায়ন হতে যাওয়া এই প্রকল্পের মোট ব্যয় ১২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। ঢাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স নূর অ্যান্ড কোং এই কাজ পায়।

সম্প্রতি সরেজমিনে গৌরীপুর উপজেলার পুম্বাইল গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, প্রকল্পের কাজ বন্ধ রয়েছে। সেখানে কোনো শ্রমিক নেই। নির্মাণকাজের কোনো তৎপরতাও দেখা যায়নি। গৌরীপুরে শুধু একটি ঘরের আংশিক ইটের গাঁথুনি দাঁড়িয়ে আছে।

মুক্তাগাছার পাইকেশ মোড় এলাকায় প্রকল্প স্থানে গিয়েও দেখা যায়, নির্মাণকাজ কেবল মেঝে পর্যন্ত হয়েছে। অথচ দপ্তরের নথিতে কাজের অগ্রগতি ২০ শতাংশ দেখানো হচ্ছে।

বাস্তবে কাজের অগ্রগতি খুব কম হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে বড় অঙ্কের বিল তুলে নিয়েছে। কত টাকা ছাড় করা হয়েছে, সেই তথ্য গোপন রাখা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, প্রকল্প ব্যয়ের মোটা অংশ এরই মধ্যে ঠিকাদারের হাতে চলে গেছে।

ময়মনসিংহ জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ঠিকাদারকে একাধিকবার মৌখিক ও লিখিতভাবে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হওয়ায় কার্যাদেশ বাতিলে প্রধান কার্যালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তবে রহস্যজনক কারণে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

জানা গেছে, প্রকল্পের আওতায় গৌরীপুর এবং মুক্তাগাছায় পাম্প স্থাপন ও ট্যাংক নির্মাণ শেষ হলে মোট ৭০০ পরিবার বিশুদ্ধ পানি পাবে। উপকারভোগীরা মিটার অনুযায়ী পানির বিল পরিশোধ করবেন। স্থানীয়দের সঙ্গে আলোচনা করেই মাসিক বিল নির্ধারণ করা হবে। 

কিন্তু প্রকল্প এলাকার বাসিন্দারা জানান, এ বিষয়ে তারা তেমন কিছু জানেন না। কেউ তাদের সঙ্গে কথা বলেননি। তবে লোকমুখে তারা জেনেছেন পানি সরবরাহের জন্য পাম্প স্থাপন করা হবে। মাসে ১০০ টাকার বিনিময়ে পানি ব্যবহার করতে পারবেন গ্রামের মানুষ।

গৌরীপুরের পুম্বাইল গ্রামের বাসিন্দা আজিজ মিয়া বলেন, ‘আমাদের বাড়িতে মোটর আছে। বিশুদ্ধ পানিই খাই। আবার সরকারি পানি নেওয়ার দরকার কী?’ মুক্তাগাছার পাইকেশমোড় এলাকার বাসিন্দা ইউসুফ আলী বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে নামেমাত্র কাজ হয়। পরে আবার বন্ধ হয়ে যায়। এলাকার মানুষও এখন আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে।’

মুক্তাগাছা প্রকল্পে কাজ করা শ্রমিক শফিকুল ইসলাম জানান, শ্রমিকদের সঙ্গে ২৬ লাখ টাকার চুক্তি হয়েছে। কিন্তু নির্মাণসামগ্রী সময়মতো সরবরাহ না করায় কাজ দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। রড, সিমেন্টসহ প্রয়োজনীয় মালামাল ঠিকমতো না এলে কাজ এগোবে না।

নির্বাহী প্রকৌশলীর দপ্তর সূত্রে জানা যায়, মুক্তাগাছা ও গৌরীপুরের এই প্রকল্পের জমি কেনা হয়নি। দুটি ইউনিটেই জমি নেওয়া হয়েছে স্থানীয়দের দানের মাধ্যমে। ফলে জমি পেতেই অনেক সময় লেগে যায়। এরপর কাজ শুরু হলেও তা চলছে ধীরগতিতে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পর ঠিকাদার দ্বিতীয় দফায় মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করেন। কিন্তু সে বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক নূর আলম টিটু কাজের ধীরগতির কথা স্বীকার করেছেন। তবে তিনি দাবি করেন, কাজে কোনো অনিয়ম হয়নি। বিল উত্তোলনের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি সুনির্দিষ্ট কোনো উত্তর দেননি। তবে ঠিকাদারের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র বিল উত্তোলনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ময়মনসিংহ বিভাগের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ জামাল হোসেনের দায়িত্বে থাকাকালীন এই প্রকল্প শুরু হয়েছিল। তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি পরে কথা বলবেন বলে ফোন কেটে দেন। এরপর একাধিকবার চেষ্টা করলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ময়মনসিংহ বিভাগের বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ ছামিউল হক স্বীকার করেন, ঠিকাদারকে বারবার মৌখিক ও লিখিত তাগাদা দেওয়া হয়েছে। অগ্রগতি না হওয়ায় কার্যাদেশ বাতিলে প্রধান কার্যালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এখনো কোনো সিদ্ধান্ত বা ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

অর্থবিল বিশ্লেষণ: পার পাচ্ছেন সম্পদশালীরা

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬, ০৮:০১ এএম
আপডেট: ১৩ জুন ২০২৬, ০৮:০৩ এএম
অর্থবিল বিশ্লেষণ: পার পাচ্ছেন সম্পদশালীরা
বাজেট ২০২৬-২০২৭

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী খুব কায়দা করে প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব জাল বিছিয়েছেন। মোটাদাগে এ জালে সাধারণ মানুষকেই আটকে ফেলে বড়দের এড়িয়ে গেছেন। সম্পূরক শুল্ক কমবেশি করে হাজারের বেশি পণ্যের দাম বাড়িয়েছেন। ব্যবসায়ী অর্থমন্ত্রী অর্থনীতির টানাপোড়নেও দেশি শিল্প বিকাশের অনেক পদক্ষেপ নিয়েছেন। তবে ছাড় দিলেও ছেড়ে দিলেন না। করপোরেট করহার বাড়ালেন না। 

আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের অর্থবিল বিশ্লেষণ করে এমন তথ্য মিলেছে। 

অর্থবিলে উপজেলা থেকে পাড়ার মোড়ের দোকানও ভ্যাটের আওতায় আনার চেষ্টা করা হয়েছে। খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে পণ্য সরবরাহের ওপর দশমিক ২ শতাংশ হারে অগ্রিম কর আরোপের কথা বলা হয়েছে। এতে প্রতি ১ হাজার টাকায় ২ টাকা অগ্রিম কর কেটে রাখা হবে। 

অর্থবিলে সাধারণ মানুষ রাজস্ব পরিশোধ না করলে বিদ্যমান আইনের কঠোরতা বহাল রাখা হয়েছে। করমুক্ত আয়সীমা আগামী পাঁচ অর্থবছর কয়েক ধাপে বাড়ানোর কথা বলে বাহবা পাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে আগামী অর্থবছরে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ছে মাত্র ২৫ হাজার টাকা, যা মূল্যস্ফীতির জাঁতাকলে পিষ্ট মানুষের জন্য তেমন স্বস্তির হবে না। অথচ সম্পদশালীদের কর ফাঁকি ও অর্থ পাচার বন্ধ করতে সেই পুরোনো ঢিলেঢালা পথেই হেঁটেছেন। প্রতিবেশী দেশ ভারতের মতো বিভিন্ন দূতাবাসে রাজস্ব দপ্তর স্থাপন করে বিদেশে পাচারকারীদের সম্পদ চিহ্নিত করা এবং সেই দেশে আইন (ল ফার্ম) সংস্থা নিয়োগে পদক্ষেপ নিতে খোদ এনবিআরের সুপারিশ থাকলেও তা বাজেটে আনা হয়নি।

ঋণদানকারী সংস্থা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলকে (আইএমএফ) খুশি করতে অর্থবিলে রাজস্ব অব্যাহতির সুযোগ সীমিত করা হয়েছে। এতে আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক বাড়লেও জনজীবনে চাপ কমবে না, বরং বাড়বে। 

এতদিন ই-টিআইএন নিয়েও অনেকে করযোগ্য আয় না থাকলে শুধু রিটার্ন দাখিল করেছেন, একটি টাকার কর দিতে হয়নি। আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত অর্থবিল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, করদাতার আয় যা-ই হোক না কেন, অতি জরুরি অনেক সেবা নিতে হলে শুধু ই-টিআইএন থাকলেই হবে না, রিটার্ন জমার বাধ্যবাধ্যকতায় কঠোরতা আনা হয়েছে। শূন্য রিটার্ন নিরুৎসাহিত করে শূন্য রিটার্নধারীর আয়-ব্যয় খতিয়ে দেখার আইনি বিধান আনা হয়েছে। 

অর্থবিলে ব্যাংক হিসাব খুলতে ও ব্যাংকঋণ পেতে, পাসপোর্ট করতে, বিদেশ ভ্রমণ সম্পর্কিত কাগজপত্র সংগ্রহ করতে, বাড়ি, ফ্ল্যাট বা জমি কেনা, গাড়ি কেনা এবং এ-সংক্রান্ত কাগজপত্র নবায়ন করা থেকে যেকোনো ব্যবসায়ে লাইসেন্স পাওয়া বা নবায়ন করতে ই-টিআইএন নেওয়া ও রিটার্ন জমার পক্ষে প্রমাণপত্র জমায় কঠোরতা থাকছে। বাড়ির গ্যাস, বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন ইউলিটি সংযোগ নেওয়া থেকে এককালীন ৩ লাখ টাকার বেশি মূল্যের সোনা, মুক্তা বা মূল্যবান গহনাসহ যেকোনো কেনাকাটায়ও একই কঠোরতা থাকছে। অর্থবিলে সরকারি সব কাজে বা সেবা পেতে বাধ্যতামূলকভাবে ই-টিআইএন ও রিটার্ন দাখিলের পক্ষে প্রমাণপত্র দেখাতে হবে। 

আগামী প্রস্তাবিত অর্থবিলে হিমায়িত মাছ, গুঁড়া দুধ, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, মাখন, টমেটো, তাজা বা শুকনা আঙুর, কমলালেবু, আম, লেবুসহ প্রায় সব ধরনের ফল আমদানিতে সম্পূরক শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। সব ধরনের বিস্কুট, চকলেট ও ময়দাজাতীয় খাবার আমদানিতেও শুল্ক বাড়ানো হতে পারে। ফলে এসব পণ্যের দাম বাড়বে।

আয়কর অধ্যাদেশের ৬৮৮বি ধারা অনুসারে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সংস্থা (বিআরটিএ) ১৯৮৪ ধারায় ব্যক্তিগত যানবাহনের মালিকদের কাছ থেকে যানবাহন নিবন্ধন বা বার্ষিক ফিটনেস নবায়নের জন্য অগ্রিম আয়কর সংগ্রহ করে থাকে। ধাপে ধাপে এই অগ্রিম কর বাড়ানো হয়েছে। আগামীতে এই কর কমানোর আবেদন জানালেও অর্থবিলে গাড়ির ইঞ্জিনের ধারণক্ষমতা এবং গাড়ির মডেলের ধরনের ওপর অগ্রিম কর আগের মতোই বেশি থাকছে। 

সাধারণ আয়ের অনেক করদাতা বলেছেন, খাবারের খরচ অনেক বেড়েছে। বাসা ভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসা সবকিছুই এখন বেশি। এর মধ্যে সাধারণ আয়ের মানুষের ওপর কর পরিশোধে চাপ দেওয়া হলে ভোগান্তি বাড়বে।

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেন, বাজেট বক্তৃতায় অনেক কিছু আনা হয়নি। কিন্তু অর্থবিলে উল্লেখ করা হয়েছে। সমালোচনা এড়াতেই সরকার এটা করেছে। 

অর্থবিলে সৃজনশীল অর্থনীতি হিসেবে অনেক খাত নতুনভাবে যুক্ত করে করের আওতায় আনা হয়েছে। 

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গতকাল সংবাদ সম্মেলনে বলেন, সৃজনশীল খাত হিসেবে বিদেশে সরকার অনেক অর্থ আয় করে। ভারতেও এমন ব্যবস্থা আছে। 

অর্থবিল থেকে জানায় যায়, সৃজনশীল খাত হিসেবে উপজেলা পর্যায়ের কুটির শিল্প উৎপাদনকারীকেও আগামী অর্থবছর থেকে কর দিতে হবে। নাটক, সিনেমা বা স্টেডিয়ামে খেলা দেখার টিকিটেও কর বসানো হয়েছে। এমনকি কেউ কোনো রিসোর্টে বেড়াতে গেলেও বাড়তি কর গুনতে হবে। 

বাজেট ২০২৬-২৭ উত্থাপন আজ: আকাঙ্ক্ষা বনাম বাস্তবতার টানাপোড়েন

প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬, ০৮:১১ এএম
আপডেট: ১১ জুন ২০২৬, ০৮:১২ এএম
বাজেট ২০২৬-২৭ উত্থাপন আজ: আকাঙ্ক্ষা বনাম বাস্তবতার টানাপোড়েন
অলংকরণ: নিয়াজ চৌধুরী তুলি

নতুন সরকারের প্রথম বাজেট নিয়ে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনেক। আগামী বাজেটে বিপর্যস্ত অর্থনীতি থেকে উত্তরণ, বৈশ্বিক চাপ মোকাবিলা, দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনা, জ্বালানিসংকট ও বিনিয়োগে স্থবিরতা দূর করার চাপ আছে। সরকার পড়েছে বেকায়দায়। অর্থনীতির টানাপোড়েনে জন-আকাঙ্ক্ষা কতটা বাস্তবায়ন করতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতির বিশ্লেষকরা। 

খোদ অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী স্বীকার করেছেন, বিগত দুই সরকারের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে ভঙ্গুর অর্থনীতি পেয়েছেন। তলিয়ে যাওয়া অর্থনীতি আগামী বাজেটে টেনে তোলার চেষ্টা করা হবে। গতি আনতে আরও সময় লাগবে। 

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, দেশে কয়েক বছর ধরে শিল্পে বিনিয়োগে গতি নেই। বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি কমেছে। রাজস্ব আদায়ে রেকর্ড ঘাটতি হয়েছে। বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। নতুন কর্মসংস্থান নেই। মূল্যস্ফীতি বিগত ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। ব্যাংক খাতে অস্থিরতা, খেলাপি ঋণ বেড়েছে, রপ্তানি আয়ে ধস নেমেছে। সবকিছু মিলিয়ে অর্থনীতিতে নাজুক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। তারেক রহমান সরকারের একদিকে জন-আকাঙ্ক্ষা পূরণের চাপ, অন্যদিকে বিপর্যস্ত অর্থনীতির বাস্তবতা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সীমাবদ্ধতার মধ্যেই সরকারকে চাহিদা পূরণের চেষ্টা করতে হবে, যা কঠিন হবে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতির বিশ্লেষকরা। 

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, এটি নতুন সরকারের প্রথম বাজেট। খুব স্বাভাবিকভাবে সরকারের কাছে সাধারণ মানুষের অনেক প্রত্যাশা আছে। কিন্তু দেশের অর্থনীতি খুব খারাপ সময় পার করছে। নাজুক পরিস্থিতিতে সরকার জন-আকাঙ্ক্ষার অনেক কিছুই বাস্তবায়ন করতে পারবে না। এতে সরকারের কঠোর সমালোচনা হলেও কিছু্‌ই করার নেই। 

অর্থনীতির আরেক বিশ্লেষক এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে সরকারের নতুন ঋণচুক্তি করার বিষয়ে আলোচনা চলছে। সংস্থাটি সরকারকে অনেক কঠিন শর্ত দিয়েছে। এসব শর্ত পূরণ করতে হলেও জনগণের অনেক চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে না। বিপর্যস্ত অর্থনীতিতে আয় বাড়ানো, আইএমএফের শর্ত মানা এবং জন-আকাঙ্ক্ষা পূরণের চাপ–এই তিন মিলিয়ে সরকারকে কৌশলী বাজেট করতে হবে, যা অত্যন্ত কঠিন। তিনি বলেন, বাজেটে টানাপোড়েন তো থাকবেই।

ব্যয়ের খাত ও বেশির ভাগ খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অঙ্কের বাজেট দিতে যাচ্ছে তারেক রহমানের সরকার। বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা।

এই বাজেটে রাজস্ব ও অনুদান ধরা হয়েছে ৭ লাখ ১ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। এখানে মোট রাজস্ব ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে। এর মধ্যে কর রাজস্ব ধরা হয়েছে ৬ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকা, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছ থেকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, এনবিআরবহির্ভূত কর ২৫ হাজার কোটি টাকা, করবহির্ভূত রাজস্ব ৬৬ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে। বিদেশি অনুদান ৬ হাজার ১৫০ কোটি টাকা।

আসন্ন বাজেটে পরিচালন ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৫ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা, এ খাতে অভ্যন্তরীণ সুদ ১ লাখ ৫ হাজার কোটি ও বৈদেশিক সুদ ২২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। মূলধনি ব্যয় ৫৪ হাজার ৬৫৩ কোটি টাকা, উন্নয়ন ব্যয় ৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি ৩ লাখ কোটি টাকা। বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে (অনুদান বাদে) ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। 

বৈদেশিক ঋণ ১ লাখ ৫৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে নিট বৈদেশিক ঋণ ১ লাখ ৯ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের লক্ষ্যমাত্রা ৪৬ হাজার কোটি টাকা। 

অভ্যন্তরীণ ঋণ ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংক থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা এবং স্বল্পমেয়াদি ৬ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে। ব্যাংকবহির্ভূত ঋণ ১৫ হাজার কোটি টাকা, সঞ্চয়পত্র থেকে ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং অন্যান্য খাত থেকে ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। জিডিপি লক্ষ্যমাত্রা ৬৮ হাজার ৩০ হাজার ২৪ কোটি টাকা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে আসন্ন বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা শতাংশের হিসাবে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকার চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৫ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করেছিল। বাংলাদেশের নতুন সরকার উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জনের এক উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ঘাটতি অর্থায়নে সরকারকে বরাবরের মতো আগামীতেও বৈদেশিক ঋণ ও অভ্যন্তরীণ খাতের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। 

চলতি অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ৪ লাখ কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য ছিল। সংশোধিত বাজেটে ব্যাংক খাত থেকে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ১৪ হাজার কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে। আগামী অর্থবছর উচ্চসুদের সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়া কমাবে সরকার। চলতি অর্থবছরের বাজেটে এ খাত থেকে ২১ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল। সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ১৯ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী খবরের কাগজকে বলেন, বিএনপি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট দিতে গিয়ে প্রায় সব হিসাবেই উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা প্রাক্কলন করেছে। ঘাটতিও বড়। ব্যয়ের হিসাবও বেশি। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রাও উচ্চাভিলাষী। এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর ব্যাপকভাবে কর আরোপ করতে হবে। অনেক মানুষকে রাজস্ব-জালে আনতে হবে। এসব মানুষের মধ্যে সাধারণ আয়ের মানুষ থাকবেন বেশি। 

তিনি আরও বলেন, সরকারকে অনেক নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতেই হবে। কারণ সরকারপ্রধান এসব অঙ্গীকার করেই ক্ষমতায় এসেছেন। এসব অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে গিয়েও সরকারকে রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে। ফলে আগামী বাজেট হবে সাধাণ মানুষকে চেপে ধরার বাজেট। 

অর্থসংকটে আছে সরকার। এর মধ্যেও সরকারি কর্মচারীর বেতন-ভাতা বাড়ানো হবে। আগামী বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জন, নির্বাচনি ইশতেহারের বাস্তবায়ন, সামাজিক সুরক্ষাজালের সম্প্রসারণ, কল্যাণকর অর্থনীতির ভিত্তি স্থাপনে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড কর্মসূচির বাস্তবায়ন এবং ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ ১৩টি ইস্যু সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। এর সঙ্গে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কর্মসূচির বাস্তবায়ন শুরু করেছে সরকার, যা বিএনপির নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির অংশ। 

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর খবরের কাগজকে বলেন, দেশের অর্থনীতি ধ্বংসের পথে। ব্যাংকগুলোতে সীমাহীন দুর্নীতি, অর্থ পাচার, রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ প্রদানসহ আরও হাজারও অপতৎপরতার ফলে মাথা সোজা করে দাঁড়াতে পারছে না, খেলাপি ঋণ বেড়ে প্রায় ৩৬ শতাংশ হয়েছে এবং মূলধন ঘাটতি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। রাজস্ব আদায় ২০ বছরের বেশি সময় ধরে একই জায়গায় স্থবির হয়ে আছে, মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বাজেট দেওয়া হচ্ছে। সরকারের সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকছে জনপ্রত্যাশা বা জন-আকাঙ্ক্ষা পূরণে।