চিকিৎসকরা দুই দফায় তার শরীরে অস্ত্রোপচার করেছেন। ২০টি গুলি বের করা হয়েছে। এখনো তার শরীরে ২৫০টির বেশি গুলিবিদ্ধ রয়েছে। মাথা থেকে কোমর পর্যন্ত গুলির আঘাত। দিন কোনো রকমে পার করেন। কিন্তু রাত ভীষণ কষ্টে কাটে মো. মাইনুদ্দিনের (৪৫)। চোখে ও মাথায় ছররা গুলি নিয়ে যন্ত্রণায় কাতরান তিনি।
নারায়ণগঞ্জ জেলার সিদ্ধিরগঞ্জ উপজেলার সানারপাড় এলাকার বাসিন্দা মাইনুদ্দিন। বাবা রুহুল আমিন (৮০)। মা ফিরোজা বেগম (৭০)। দুই বোন বিবাহিত। কয়েক বছর আগে স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটে তার। এরপর থেকে মা-বাবাকে নিয়েই তার সংসার।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য মাইনুদ্দিনের উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন। নয়তো হারাতে পারেন দৃষ্টিশক্তি।
মাইনুদ্দিন এখন আছেন নিদারুণ অর্থকষ্টে। অসুস্থ হওয়ায় চাকরি হারিয়েছেন। জরুরি ভিত্তিতে তার উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন। কিন্তু সেই উদ্যোগ নেওয়ার আর্থিক সামর্থ্য তার পরিবারের নেই।
মাইনুদ্দিন বলেন, ‘আমি বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। তাদের দেখাশোনার দায়িত্ব আমার। তবুও সেদিন ঘরে থাকতে পারিনি। গত ৫ আগস্ট সকালে বাবা-মার চোখের দিকে তাকিয়ে বিদায় নিয়ে বাসা থেকে বের হই। সঙ্গে ছিল বন্ধু হিজবুল্লাহ। মৌচাকের কাছাকাছি এসে একটা মিছিলের সঙ্গে মিশে যাই। সেখানে প্রায় হাজারখানেক মানুষ। একবারের জন্যও মনে হয়নি আমি তাদের চিনি না। মনে হয়েছে, ভাই ভাই আমরা, প্রত্যেকটি মানুষকে চিনি।
মাইনুদ্দিনের ভাষ্য, শনিরআখড়ার ঢালে যাওয়ার পর যা দেখি তাতে শরীরের রক্ত গরম হয়ে যায়। একের পর এক রক্তাক্ত লাশ নিয়ে মানুষ হাসপাতালে যাচ্ছেন। যাত্রাবাড়ী মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের টোলপ্লাজার কাছে যাওয়ার পর পুলিশ আমাদের মিছিল আটকে দেয়। এর মধ্যে একজন পুলিশ হ্যান্ডমাইকে আমাদের ডাকেন। বুঝলাম কথা বলার জন্য ডাকছে। ভয়ে কেউ যাওয়ার আগ্রহ দেখাচ্ছিল না। ভাবলাম কি বলবে শুনি, না গেলে যদি গুলি শুরু করে, তাহলে সবাই মারা যাব। মিছিলের ভাইদের কথা ভেবে পুলিশের দিকে হাঁটা শুরু করি। আমাকে দেখে সাদা টিশার্ট পরা একটা স্কুলপড়ুয়া ছেলে আমাকে বলে, ভাইয়া আমিও আপনার সঙ্গে যাব। বললাম, গেলে তো গুলি খেতে পার! ছেলেটা বলল, ‘গুলি খাওয়ার জন্যই তো এসেছি।’ সে আমার পেছন পেছন আসে। ৮-১০ ফুটের দূরত্বে যখন পৌঁছে যাই, তখন পুলিশদের মধ্যে একজন বলেন, গুলি কর। সত্যিই পুলিশ গুলি করে। গুলি করার সঙ্গে সঙ্গে আমি ছিটকে রাস্তায় পড়ে যাই। কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফিরে দেখি পুরো শরীরের রক্তে শার্ট ভিজে গেছে। শ্বাসকষ্ট শুরু হয়।
পুলিশদের তখন বলেছিলাম, ‘তোদের সঙ্গে কথা বলতে এসেছিলাম। ধোঁকা দিয়ে গুলি করেছিস, তোদের পতন নিশ্চিত।’ এটা বলে পিছনে ফিরে যেতেই আরেকটা ধাক্কা খেলাম। দেখি, ১০০ গজ দূরে সাদা টিশার্ট পরা ছেলেটা মাটিতে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। ওরে শটগানের গুলি করা হয়েছিল। আমি ওর কাছে যাওয়ার চেষ্টা করি। কিছুক্ষণের মধ্যে আমার রক্তবমি শুরু হয়। আমি আর সেখানে পৌঁছাতে পারিনি। পরে কয়েকজন আমাকে ধরে ভ্যানে উঠিয়ে ইসলামি ব্যাংক হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরিস্থিতি গুরুতর হলে আমাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়।
আহত মাইনুদ্দিন বলেন, ‘হাসপাতালে থাকা অবস্থায় একজন ডাক্তার বললেন, ‘আপনার রক্ত দেওয়া স্বার্থক, ফ্যাসিবাদ ভাগছে। মুহূর্তেই সব ব্যথা ভুলে যাই, অদ্ভুত এক স্বস্তি কাজ করে।’ এর মধ্যে বাবা আমার গুলি লেগেছে শুনে হার্ট অ্যাটাক করেন। তিনি এখন সুস্থ আছেন।
গুলশানের একটি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন মাইনুদ্দিন। ৫ আগস্টের পর হারিয়েছেন তার চাকরি। বিষয়টি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘চাকরির দায়িত্বের জন্য ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও শুরু থেকে আন্দোলনে যেতে পারিনি। কিন্তু ৪ আগস্ট আর নিজেকে স্থির রাখতে পারছিলাম না। অফিস থেকে দুপুরের খাবারের আগে ছুটি চাইলাম। প্রথমে তারা ছুটি দিতে চায়নি। পরে অফিস থেকে বের হয়ে যাচ্ছি বলে সাদা কাগজে স্বাক্ষর রেখে ছুটি দেয়। আমি শাহবাগ অবস্থান থেকে আন্দোলনে যুক্ত হই। আমার কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নেই। সাধারণ জনতার সঙ্গে মিলে আন্দোলন করেছিলাম। কিন্তু আহত হওয়ার পর থেকে আর চাকরি করার অবস্থায় ছিলাম না। চাকরি নেই। এখন বাসায় বেকার আছি। পুরোপুরি সুস্থ হলে যদি কোনো চাকরি হয় আরকি, সেই আশায় আছি। জুলাই শহিদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন থেকে এক লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা পাওয়ার কথা জানান তিনি।
মাইনুদ্দিনের মা ফিরোজা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমার পোলায় মৃত্যুকে জয় করে আমাগো কাছে ফিরেছে। চিকিৎসার অভাবে ছেলে এখন রাইতে ছটফট করে ব্যথায়। বুড়া বয়সে ওরে এখন আমাগো খেয়াল রাখতে হয়। আমার পোলাডার চাকরি গেছে গা, ওর শরীরের এই অবস্থা! আমাগো কি হইব আল্লাহ জানেন!’