ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ বেনজীর আহমদ ঢাকা-২০ (ধামরাই) আসনের তিনবারের এমপি ছিলেন। আর তিনবার এমপি হওয়ার সুবাদে যেন আলাদিনের চেরাগ পেয়ে যান তিনি। জড়িয়ে পড়েন অনিয়ম-দুর্নীতির বেড়াজালে। আপন ছোট ভাই, ভগ্নিপতি, এমনকি গ্রাম-পুলিশের মাধ্যমেও তিনি টাকা হাতিয়ে নিতেন। সখ্য ছিল বিরোধী দল বিএনপির কিছু ব্যবসায়ীর সঙ্গে। তাদের সঙ্গে ছিল তার ব্যবসা। ধামরাইয়ের প্রতিটি কল-কারখানা, কাবিটা, কাবিখা প্রকল্প ছিল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার রাস্তা। তবে সবচেয়ে বেশি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বায়রা নামক রিক্রুটিং এজেন্সির সভাপতি হয়ে। এভাবে বেনজীর আহমদের বার্ষিক আয় গত পাঁচ বছরে বেড়েছে প্রায় ৩০ গুণ।
সংসদ নির্বাচনে বেনজীরের অংশগ্রহণ
১৯৯১ ও ২০০১ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পান। তবে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খানের ছেলে বিএনপির প্রার্থী ব্যারিস্টার জিয়াউর রহমানের সঙ্গে নির্বাচন করে পরাজিত হন। পুনরায় নৌকার প্রার্থী হয়ে ২০০৮ সালে নির্বাচনে অংশ নেন এবং বিজয়ী হন। এরপর ২০১৮ ও ২০২৩ সালের ভোটে আওয়ামী লীগ থেকে টানা দুবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালে সংসদ সদস্য হওয়ার পরই তার কপাল খোলে। বাড়তে থাকে সম্পদের পরিমাণ। তার তিনটি নির্বাচনি হলফনামা থেকে এমন তথ্য পাওয়া যায়।
বেনজীরের আপন ছোট ভাই এনামুল হক আইয়ুব। তিনি ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ছিলেন। আইয়ুব নিজ এলাকায় একক আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন। এমন কোনো খাত নেই, যেখান থেকে তিনি অর্থ হাতিয়ে নেননি। কুশুরা আব্বাস আলী উচ্চবিদ্যালয়ের সভাপতি হয়েছিলেন বড় ভাই বেনজীর আহমদের আশীর্বাদে। ওই স্কুলের দোতলায় ছিল তার নিজের অফিস। সেখানে ছিল থাকার ব্যবস্থা। কক্ষটি ছিল শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। তিনি একাধারে জায়গা-জমি, মারামারি ও ধর্ষণের মতো ঘটনায় নিয়মিত সালিশ বৈঠক বসিয়ে জরিমানা করে অর্থ হাতিয়ে নিতেন। নিজস্ব বাহিনী ছিল, যারা এসব কাজ তদারকি করতেন। কুশুরা ইউনিয়নে নদী থেকে ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালি উত্তোলন করা হতো। এগুলো হতো তার নেতৃত্বে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিশেষ পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করে হাতিয়ে নিতেন টাকা। কিন্তু এমপির ভাই বলে কেউ কিছু বলতে সাহস পেত না।
সাবেক এমপি বেনজীর আহমদের আপন ভাই সাবেক রাষ্ট্রদূত সোহরাব হোসেনের বাড়িতে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার পর পরই এমপি সাহেব তাদের গ্রামের বাড়ির পাশে পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করেন। নিজের পরিবারের নিরাপত্তার জন্য এলাকার একটি ক্লাবকে দখল করে এই ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছিল। কারণ তিনি ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ওই ক্যাম্প উদ্বোধন করেন। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে ওই ক্যাম্প শূন্য পড়ে রয়েছে।
অন্যদিকে পিছিয়ে নেই সাবেক এমপি বেনজীর আহমদের ভগ্নিপতি নুরুজ্জামানও। করতেন সরকারি চাকরি। কোনো দিন রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর বেনজীর আহমদ তার একক ক্ষমতায় ভগ্নিপতি নুরুজ্জামানকে কুশুরা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতির পদ দেন। পরবর্তী সময়ে তাকে ওই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানও বানিয়েছেন। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা কেউ নির্বাচনি প্রচার চালাতে পারেননি। একপর্যায়ে তারা মাঠ ছেড়ে দেন। বিনা ভোটে হয়ে যান পরিষদের চেয়ারম্যান। এতেই থেমে নেই নুরুজ্জামান। এমপির বিশেষ ক্ষমতাবলে ২০২১-২২ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের মধ্যে বিভিন্ন খাত থেকে ২৫টি প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ৫৮ লাখ টাকা, তিন মেট্রিক টন চাল ও দুই টন গম বরাদ্দ নিয়েছেন তিনি। পিআইও অফিস তার চেক আটকিয়ে দিলেও পরে বেনজীর আহমদের বিশেষ সুপারিশে চেকটি পাস হয়। অথচ তার নিজ ইউনিয়নে একটি মাটির রাস্তার মেরামতও করেননি তিনি। এ নিয়েও একাধিক পত্রপত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।
এতেই থেমে নেই বেনজীর আহমদের পরিবারের লোকজন। তার আপন ভাগ্নে মাহফুজুর রহমান শাহিন কানাডাপ্রবাসী হলেও মামা এমপি হওয়ার পর প্রায় ১০ বছর দেশে অবস্থান করেন। ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে হাতিয়ে নেন বিভিন্ন কারখানার ঝুট ব্যবসা। আর প্রতি মাসে কামিয়েছেন লাখ লাখ টাকা।
এ ছাড়া তার একমাত্র মেয়ের জামাতা ধামরাই পৌরসভায় ‘আমিন মডেল টাউন’ নামে একটি আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলেন। ওই প্রকল্পে অনেকের জমি নামমাত্র মূল্য দিয়ে লিখে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
বেনজীর আহমদ এলাকার প্রত্যেকটি কল-কারখানা থেকে আপনজনের মাধ্যমে মাসিক মাসোয়ারা নিতেন। এ ছাড়া এলাকায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মনোনয়ন-বাণিজ্যও করেছেন। আবার কিছু ইউনিয়নে দলীয় প্রার্থীদের পক্ষে না থেকে কাজ করেছেন স্বতন্ত্রদের পক্ষে। ফলে ওই সব চেয়ারম্যান প্রার্থীর কাছ থেকে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে।
বেনজীর আহমদ ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে ‘বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সি’র (বায়রা) সভাপতি হয়েছিলেন। জনশক্তি রপ্তানি বাজার নিয়ন্ত্রণ ও কুক্ষিগত করে রাখতে সাবেক চার সংসদ সদস্য নিয়ে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। সিন্ডিকেটের সদস্যরা হলেন নিজাম উদ্দিন হাজারী, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, বেনজীর আহমদ ও আ হ ম মুস্তাফা কামাল। তারা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে দেড় বছরে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এর মধ্যে বেনজীর আহমদের প্রতিষ্ঠান আহমদ ইন্টারন্যাশনাল মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর দিক থেকে পঞ্চম শীর্ষ প্রতিষ্ঠান। মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাতে সরকারনির্ধারিত খরচ ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকা। কিন্তু একজন কর্মী খরচ করেছেন ৫ লাখ ৪৪ হাজার টাকা।
এভাবে বেনজীর আহমদের বার্ষিক আয় গত পাঁচ বছরে বেড়েছে প্রায় ৩০ গুণ। সেই সঙ্গে আয় বেড়েছে তার স্ত্রী ও সন্তানেরও। সর্বশেষ নির্বাচনে দাখিল করা হলফনামা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে বেনজীর আহমদের আয় বেড়েছে ২৯ দশমিক ৯২ গুণ।
২০০৮ সালে রাজধানীর নিউ ইস্কাটনের দিলু রোডের ১৬/এ ভবনে কেনেন দুটি ফ্ল্যাট। ২০১৮ সালে রাজধানীতে আরও দুটি ফ্ল্যাট ও একটি দোকানের মালিক হন। রয়েছে দুটি বিলাসবহুল গাড়ি।