গত রবিবার রাত সাড়ে ৯টা। রাজধানীর বিজয় সরণি মোড়ে দুটি ট্রাকে জব্দ করা প্রায় অর্ধশত রিকশা তুলছিলেন দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা, যা নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল ডাম্পিংয়ের জন্য। এসব রিকশা প্রধান সড়কে চলাচল করছিল।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে দায়িত্বরত একাধিক পুলিশ সদস্য খবরের কাগজকে জানান, প্রধান সড়কে কোনোভাবে রিকশা চলাচল করতে দেওয়া হবে না। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে পুলিশ ব্যবস্থা নেবে। তারা আরও জানান, চালকরা যতই বেপরোয়া হোন না কেন, তা শক্ত হাতে দমন করা হবে।
একই দিন দুপুরে বাংলামোটর এলাকায় দেখা যায় আরেকটি ঘটনা। শাহবাগ থেকে বাংলামোটর সড়ক ধরে উল্টোপথে দ্রুতগতিতে আসছিল একটি ব্যাটারিচালিত রিকশা। মোড়ে আসার আগে বাধা দিলে ওই রিকশার চালক পুলিশকে আক্রমণের চেষ্টা করেন। পরে রিকশাটি জব্দ করা হয় ও আইন ভাঙার কারণে ওই চালকের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
গত কয়েক দিন রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে ঘুরে রিকশা ও ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যান এবং ইজিবাইকের বেপরোয়া চলাচল দেখা যায়। তবে সেসব খুব বেশি ছাড় পায়নি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ট্রাফিক পুলিশকে বেশ ‘অ্যাকশন মুডে’ দেখা গেছে। বর্তমানে ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে সহযোগী হিসেবে কাজ করা তরুণ শিক্ষার্থীদেরও মূল সড়কগুলোতে রিকশা ও ব্যাটারিচালিত রিকশা ঠেকাতে বেশ তৎপর থাকতে দেখা যায়।
কারওয়ান বাজার থেকে ফার্মগেটমুখী সড়কে রাত ৯টার পর থেকে বাড়ে মালবাহী ভ্যানের চলাচল। ডাবল চাকাওয়ালা এই ভ্যানগুলো মালপত্রসহ কাঁচা সবজি নিয়ে ছুটে চলে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায়। গত সোমবার এই সড়কে ভ্যানে মালপত্র নিয়ে মিরপুর যাচ্ছিলেন আক্কাস। প্রধান সড়কে কেন আসছেন জিজ্ঞাসা করতেই তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘পুলিশ আটকাইলে অন্য রাস্তা দিয়া যামু।’
মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতেও (সংসদ সড়ক) দেখা গেছে রিকশার দৌরাত্ম্য। এই সড়কে আইন ভেঙেই চলছে রিকশা। সোমবার এই সড়কে রিকশা চলাচল নিয়ন্ত্রণের জন্য কঠোর হয় পুলিশ। বেশ কিছু রিকশা জব্দও করা হয়।
নীতিমালা দ্রুত চূড়ান্ত করতে হবে
আইন না মেনে প্রধান সড়ক দিয়ে রিকশাচালকদের এমন বেপরোয়া চলাচলের বিষয়ে রিকশা-ভ্যান ইউনিয়নের উপদেষ্টা আব্দুল্লাহ কাফি রতন খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা প্রধান সড়ক চিহ্নিত করে দিতে বলেছিলাম, সেই কাজটি এখনো করা হয়নি। সংশ্লিষ্টরা আমাদের বলেছেন, বাস চলাচল করে যেসব সড়কে, সেগুলো মূলত প্রধান সড়ক। আমরা বলেছি, আপনারা (ট্রাফিক বিভাগ) এভাবে না বলে নির্দিষ্টভাবে আমাদের জানান। প্রধান সড়কে রিকশা চলুক, এটা আমরাও চাই না।’
আব্দুল্লাহ কাফি রতন বলেন, ‘৫ আগস্টের পর দেশে আইশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় সড়কে রিকশার চলাচল বেড়ে যায়, যা এখন নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। আমরা বিআরটিএ থেকে রিকশার লাইসেন্স, রুট পারমিট ও চালকের প্রশিক্ষণের কথা বলেছিলাম। এটি ছিল আমাদের মূল তিনটি দাবি। এই দাবিগুলো সরকার না মানায় বিশৃঙ্খলা বাড়ছে। ট্রাফিক কন্ট্রোলের সঙ্গে কয়েক দফা মিটিং হলেও সুফল মেলেনি।’
তিনি বলেন, রাজধানীজুড়ে ১০ লাখ রিকশা চলাচল করছে। এর মধ্যে শুধু কামরাঙ্গীরচরে ২০ হাজার রিকশা চলে। এই চালকরা যখন আন্দোলনে নেমেছিলেন, সেই সময়ে এর সমাধান হওয়া উচিত ছিল। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। সড়কে রিকশার শৃঙ্খলা ফেরাতে সরকারকে সব ধরনের সহযোগিতা করতে তারা প্রস্তুত বলেও জানান এই ইউনিয়ন নেতা।
ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যান বা ইজিবাইক এখন রাজধানীর অলিগলি ছাপিয়ে মূল সড়কে দাপটের সঙ্গে চলছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ব্যাটারিচালিত রিকশা পরিষদের আহ্বায়ক খালেদুজ্জামান লিপন খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা চালকদের বলে দিয়েছি, যাতে তারা প্রধান সড়ক ব্যবহার না করেন। পাশাপাশি চালকরা যেন প্রধান সড়কে উঠতে না পারেন, সে বিষয়ে ট্রাফিক পুলিশদের কঠোর হওয়া উচিত।’
সম্প্রতি সড়কে রিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচলের নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সাইনবোর্ড টানানো হয়েছে। এ বিষয়ে তিনি বলেন, সাইনবোর্ড দিলেই হবে না। পুলিশকে শক্ত হাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। বেপরোয়া আচরণ প্রতিরোধ করতে হবে। প্রতিটি থানায় এ বিষয়ে চালক-মালিকদের মিটিং হতে পারে। এ ছাড়া রিকশা চলাচলের নীতিমালা দ্রুত চূড়ান্ত করতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এর কোনো বিকল্প নেই।
কী বলছেন সাধারণ যাত্রীরা
চলতি সপ্তাহে সরেজমিন রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউর (সংসদ ভবন সড়ক), ফার্মগেট, বাংলামোটর, মিন্টু রোডসহ বেশ কয়েকটি প্রধান সড়ক ঘুরে দেখা যায়, প্রধান সড়কে নেমে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে রিকশা (ব্যাটারি/প্যাডেলচালিত)। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর থেকে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে প্রধান সড়কে রিকশার চালকরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। বেশ কয়েক মাস ধরে পুলিশ তাদের নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলেও পুরোপুরি তা হয়নি। প্রধান সড়কগুলোতে রিকশা চলাচল নিষিদ্ধ লেখা বড় সাইনবোর্ড টানিয়ে সতর্ক করার চেষ্টা করলেও মানছেন না চালকরা। এর ফলে এখন অ্যাকশনে নেমেছেন পুলিশ সদস্যরা।
ঢাকায় ট্রাফিক পুলিশের তৎপরতা বাড়লেও যানজট পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। এর প্রধান কারণ ভিআইপিসহ প্রধান সড়কে রিকশার বেপরোয়া চলাচল। দুই দিন আগে এমন একজন রিকশাচালক আব্দুস সালামকে মিন্টো রোডে রিকশা চালাতে দেখা যায়। এই সড়কে রিকশা চালাচ্ছেন কেন- প্রতিবেদকের এমন প্রশ্নের উত্তরে সালাম বলেন, ‘চালাইলে সমস্যা কী? পুলিশ তো ধরে না, কিছু বলেও না।’
ওই দিন ফার্মগেট থেকে শাহবাগের দিকে যাচ্ছিল একটি প্রাইভেট কার। ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের আগে সিগন্যালে আটকে থাকা ওই প্রাইভেট কারের চালক ইব্রাহীম খবরের কাগজকে বলেন, ‘ফার্মগেট হয়ে শাহবাগ সড়কের দিকে প্রতিদিনই গাড়ি চালিয়ে মতিঝিল যান। তার গাড়ির মালিক ব্যাংকে চাকরি করেন। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, এই সড়কে প্রচুর রিকশার চলাচল। বইমেলা শুরু হওয়ার পর রিকশার চলাচল আরও বেড়েছে। প্রধান সড়কে কীভাবে রিকশা চলে মাথায় আসে না। পুলিশ কী করে তা-ও বুঝে আসে না।’
ওই দিন এই সড়কে দায়িত্বরত ট্রাফিক কনস্টেবল সাখাওয়াত খবরের কাগজকে বলেন, ‘ট্রাফিক আইন অমান্য করা এক রকম অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। রাস্তা পার হওয়ার জন্য জেব্রা ক্রসিং ও ফুটওভার ব্রিজ কেউ ব্যবহার করছে না। হুটহাট দৌড় দিয়ে রাস্তা পার হতে বেশি দেখা যায়। এ ছাড়া সড়কে রিকশার বিশৃঙ্খলা সব সহ্যের সীমা ছাড়িয়েছে। আইন করে এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে। আমরা বাধা দিলে বা কিছু বলতে গেলে অনেক চালকই বাজে আচরণ করেন, কখনো কখনো হামলার সাহসও দেখান।’
এই সড়কের একজন যাত্রী সুমাইয়া বলেন, প্রধান সড়কে কোনোভাবেই রিকশা চলতে পারে না। এতে যানজট যেমন হয়, তেমনি সড়কে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। সরকারকে এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।
লাইসেন্স ও রুট পারমিট দিতে নীতিমালা হচ্ছে
গত বছরের নভেম্বরে চেম্বার আদালতের রায়ের আলোকে ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেছিলেন, এখন থেকে প্রধান সড়কে কোনো অটোরিকশা চলবে না। তবে ভেতরের সড়কগুলোতে আগের মতো এসব যান চলবে। এ ছাড়া নতুন কোনো অটোরিকশা যাতে রাজধানীর রাস্তায় না নামে, এ ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকার তাগিদ দেন কমিশনার। নভেম্বর মাসেই ডিএমপি সদর দপ্তরে ডিএমপি কমিশনারের সঙ্গে ব্যাটারিচালিত রিকশাচালক, মালিক, গ্যারেজ মালিক ও রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক শ্রমিক ইউনিয়নের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক হয়। বৈঠকে ট্রাফিক আইন মেনে চলা ও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে সবার সহযোগিতা কামনা করেন কমিশনার।
এর আগে ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধে হাইকোর্টের রায় স্থগিত করার দাবিতে সেই সময়ে কয়েক দিন ধরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলন করেছিলেন ব্যাটারিচালিত রিকশার চালকরা। গত ২৫ নভেম্বর ঢাকা মহানগর এলাকায় তিন দিনের মধ্যে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল বন্ধে হাইকোর্ট যে আদেশ দিয়েছিলেন তার ওপর এক মাসের স্থিতাবস্থা দেন চেম্বার আদালত।
রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার এসব বিষয়ে কথা বলতে কয়েক দিন ধরে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার মো. সরওয়ারের সরকারি মুঠোফোন নম্বরে কয়েকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি। এরপর গত সোমবার বেলা আনুমানিক ২টার দিকে ডিএমপি সদর দপ্তরে গিয়ে যথাযথ প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত কমিশনার সরওয়ারের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও তার সাক্ষাৎ পাওয়া যায়নি।
পরে এই বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপির উপকমিশনার (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘ভিআইপিসহ প্রধান সড়কগুলোতে ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যান ও ইজিবাইক চলাচল বন্ধের কাজ চলছে। সংশ্লিষ্ট নেতাদের সঙ্গে বেশ কয়েক দফা আলোচনাও হয়েছে। লাইসেন্স ও রুট পারমিট দিতে নীতিমালা করা হচ্ছে। নীতিমালা হতে একটু সময় লাগছে, তবে এটি হয়ে গেলে ভিআইপিসহ প্রধান সড়কগুলোতে রিকশা চলাচল বন্ধ করা যাবে।’