জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রস্তুতির অন্যতম ধাপ হলো সংসদীয় আসনগুলোর সীমানা চূড়ান্তকরণ। তবে এ-সংক্রান্ত আইন সংশোধন না হওয়ায় সীমানা পুনর্নির্ধারণের কাজ শুরু করতে পারছে না সংস্থাটি। ফলে এ-সংক্রান্ত আইনের কয়েকটি ধারায় সংশোধনী আনতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রস্তাব পাঠিয়েছে তারা। এদিকে সংসদীয় ৩০০ আসনের মধ্যে ৬০টি আসনের সীমানা নিয়ে আপত্তি তুলে নির্বাচন কমিশনে সেগুলো পুনর্নির্ধারণের আবেদন জমা পড়েছে ৩৬৯টি। তার মধ্যে একটি আসনের বিপরীতে শতাধিক আবেদন করেছেন সংক্ষুব্ধরা।
এ বছরের ডিসেম্বরে জাতীয় সংসদ নির্বাচন করতে হলে জুলাই-আগস্টের মধ্যেই নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচনি এলাকাগুলোর সীমানা পুনর্নির্ধারণ করতে হবে। সেই লক্ষ্যে ইসির পক্ষ থেকে সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণে বিদ্যমান আইনি জটিলতা দূর করতে সংশোধিত খসড়া আইন তৈরি করা হয়েছে। বিদ্যমান সীমানায় বড় পরিবর্তনের সুযোগ রেখে করা সেই খসড়াটি প্রস্তাব আকারে সরকারের কাছে পাঠিয়েছে সংস্থাটি। গত ২৭ জানুয়ারি ইসির আইন ও বিধিমালা সংস্কার কমিটির বৈঠকে খসড়াটি অনুমোদন করা হয়। প্রস্তাবিত আইনে নির্বাচনি এলাকা নির্ধারণে ভৌগোলিক অবস্থা ও অবস্থান, সর্বশেষ জনশুমারি প্রতিবেদনের পাশাপাশি ভোটার সংখ্যা সামঞ্জস্য রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া জাতীয় সংসদের নির্বাচনি এলাকার সীমানা নির্ধারণ আইনের ৮ ধারায় ইসির ক্ষমতা সীমাবদ্ধ করা হয়। ২০২১ সালে পাস হওয়া আইনে সেটা তুলে দেওয়ার বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) একচ্ছত্র ক্ষমতা কমাতে ‘স্বাধীন কমিশন’ গঠনের সুপারিশসহ এ-সংক্রান্ত আইনের একটি খসড়া তৈরি করেছে নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন। তাদের এমন প্রস্তাবে তীব্র আপত্তি জানিয়ে সম্প্রতি সরকারের জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, সংস্কার কমিশনের যেসব সুপারিশ ইসির কর্তৃত্ব ও স্বাধীনতা খর্ব করবে, সেসব সুপারিশ মানবে না সংস্থাটি।
সীমানা পুনর্নির্ধারণ নিয়ে প্রশ্ন ও আইনি জটিলতা
বর্তমান সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দীন কমিশনের এ-সংক্রান্ত কমিটির বিশ্লেষণ- বিগত চার জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে করা সীমানা পুনর্নির্ধারণ কাজ যথাযথ হয়নি। এই কমিশন মনে করে, ২০০৮ সালে রাজনৈতিক বিশেষ কারণে দেশের ১৩০ আসনের সীমানা পরিবর্তন করা হয়। পরে ওই সীমানার ধারাবাহিকতা রক্ষা করে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে যেসব আসনে সীমানা পরিবর্তন করা হয়, সেগুলো নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এমনকি বিগত আওয়ামী লীগ সরকার বিশেষ উদ্দেশ্যে ২০২১ সালে আগের অধ্যাদেশ রহিত করে নতুন আইন প্রণয়ন করে।
ইসির এ-সংক্রান্ত কমিটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বিদ্যমান আইনের ৪ ধারায়- এই আইনের অধীন কমিশন তার দায়িত্ব পালনের জন্য প্রধান নির্বাচন কমিশনার বা কোনো নির্বাচন কমিশনার বা তার কোনো কর্মকর্তাকে ক্ষমতা দিতে পারবে। এই ধারায় ইসির প্রস্তাব হলো- এই আইনের অধীন কমিশন তার দায়িত্ব পালনের জন্য প্রধান নির্বাচন কমিশনার বা অন্য কোনো নির্বাচন কমিশনারকে প্রধান করে প্রয়োজনীয় সংখ্যক নির্বাচন কমিশন কর্মকর্তার সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করবে। কমিটি প্রয়োজনবোধে কোনো ভূগোলবিদ, মানচিত্রকার, পরিসংখ্যানবিদ, জনসংখ্যাবিদ ও নগর পরিকল্পনাবিদকে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে।
বর্তমান আইনের ৬(২) ধারায় নির্বাচনি এলাকার সীমানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট এলাকার জনসংখ্যাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ায় দেশব্যাপী নির্বাচনি এলাকার ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। ফলে ঘন বসতিপূর্ণ শহর এলাকায় আসনসংখ্যা বেড়েছে। আর গ্রাম এলাকায় আসনসংখ্যা কমেছে। এতে বেড়েছে জনমনে অসন্তোষ। এ ক্ষেত্রে ইসির প্রস্তাব- যতদূর সম্ভব সংশ্লিষ্ট এলাকার ভৌগোলিক অবস্থা ও অবস্থান এবং সর্বশেষ জনশুমারি অনুযায়ী জনসংখ্যা এবং ভোটার সংখ্যার সামঞ্জস্য রাখতে হবে। আর আঞ্চলিক নির্বাচনি এলাকার সীমানা নির্ধারণে ৬(২) ধারা পাল্টে সেখানে নতুন চারটি ক্লাস্টার যুক্ত করার প্রস্তাব করেছে ইসি।
এ ছাড়া ৮(৩) উপধারায় বিদ্যমান বিধানের উপধারা ৮(১) প্রতিস্থাপন করার কথা বলা হয়েছে। কারণ ৮(৩) উপধারায় করণিক ত্রুটির কারণে সীমানা পুনর্নির্ধারণ নিয়ে বড় ধরনের জটিলতা তৈরির শঙ্কা ছিল। নির্বাচন কমিশন মনে করে, এই উপধারা সংশোধন হলে ওই শঙ্কা দূর হবে এবং ইসির ক্ষমতাও অক্ষুণ্ন থাকবে।
এ প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার খবরের কাগজকে বলেন, ‘বর্তমান আইনের ৪, ৬ ও ৮ ধারায় অস্পষ্টতা ও সীমাবদ্ধতা থাকায় জনগণ এবং রাজনৈতিক দল ও নেতাদের মনে সংশয় ও আপত্তি রয়েছে। ফলে এসব সংশয় ও আপত্তি দূর করতে দেশের নানা স্থান থেকে সীমানা পুনর্নির্ধারণের আবেদন জমা দিচ্ছেন সংক্ষুব্ধরা। বিদ্যমান আইনের এসব বাধা সমাধান না হওয়া পর্যন্ত আমরা কাজটাই শুরু করতে পারছি না। এরই মধ্যে আইন সংশোধনের প্রস্তাব মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠিয়েছি। সীমানা নির্ধারণ-সংক্রান্ত বিষয়ে এসব আবেদন নিষ্পত্তিতে আমরা সরকারি সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করছি।’
কোন আসনের জন্য কতটি আবেদন
দেশের সংসদীয় ৩০০ আসনের মধ্যে ৬০টি আসনের সীমানা নিয়ে আপত্তি-সংক্রান্ত ৩৬৯টি আবেদন জমা পড়েছে নির্বাচন কমিশনে। আবেদনকারীদের বেশির ভাগই ২০০১ সালের সীমানায় ফিরতে চেয়েছেন। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১০৩টি আবেদন ইসিতে পড়েছে শুধু পিরোজপুর-২ আসনের জন্য। এই জেলার কাউখালী, ভান্ডারিয়া ও নেছারাবাদ উপজেলার পরিবর্তে আগের ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের মতো ‘কাউখালী, ভান্ডারিয়া’ অথবা ২০১৪ ও ২০১৮ সালের মতো ‘কাউখালী, ভান্ডারিয়া ও ইন্দুরকানী’ উপজেলার সমন্বয়ে পুনর্গঠন করা।
এরপর কুমিল্লা-১০-এর নাঙ্গলকোট উপজেলাকে আলাদা করে এই জেলার ১১ আসনকে ১২টিতে উন্নীতকরণে ৮১টি আবেদন পড়েছে। এ ছাড়া কুমিল্লা-১, ২, ৬ ও ৯ আসনের জন্য আরও ১০টি আপত্তি আবেদন করেছেন স্থানীয়রা। ৩৮টি আপত্তি আবেদন জমা পড়েছে মানিকগঞ্জ-১ আসনে। এই জেলার একটি আসন পুনর্বহাল করে চারটি সংসদীয় আসন পুনর্নির্ধারণ করার দাবি উঠেছে। ঢাকা-৭ আসনের জন্য আবেদন পড়েছে ২৭টি। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত কামরাঙ্গীরচর থানাকে সংসদীয় আসন-২ থেকে আলাদা করে এবং ঢাকা-২ আসনের ৫৫, ৫৬ ও ৫৭ নম্বর ওয়ার্ডকে কেটে ঢাকা-৭ আসনের অন্তর্ভুক্ত করা। আর ঢাকা-১ আসনের দুই উপজেলা দোহার ও নবাবগঞ্জকে আলাদাভাবে ঢাকা-১ ও ঢাকা-২ সংসদীয় আসন পুনর্বহালের দাবিতে এ পর্যন্ত ২৩টি আবেদন করেছেন স্থানীয়রা।
এ ছাড়া চাঁদপুর-৩ ও ৫ আসনের জন্য ১০টি আবেদন; সিরাজগঞ্জ-১, ২, ৫ ও ৬ আসনের জন্য ১০টি; বরগুনা-১ আসনের জন্য ৭টি, মুন্সীগঞ্জ জেলার আসন ৩টি থেকে ৪টিতে উন্নীত করতে ২টি আবেদন; গাজীপুর-১, ৩ ও ৫ আসনের জন্য ১০টি, ঢাকা-১৯ ও চাঁদপুর-৫ আসনের জন্য ৯টি করে, নোয়াখালী-১ ও ২ আসনের জন্য ৫টি করে; ফেনী-২, ৩ আসনের জন্য ৪টি, শরীয়তপুর-২ ও ফরিদপুর-৪ আসনের জন্য ২টি করে; ঢাকা-১২, ১৬ ও ২০ আসনের জন্য ১টি করে; চট্টগ্রাম-৭, ৮ ও ১০ আসন; বরিশাল-৩, পিরোজপুর-১, নেত্রকোনা-৫, কিশোরগঞ্জ-২, সাতক্ষীরা-৪, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩, রাজবাড়ী-১, নারায়ণগঞ্জ-১, সিলেট-১ ও ২, চাঁদপুর-৩, ও গাইবান্ধা-৩ আসনের জন্য ১টি করে আবেদন জমা পড়েছে।
এসব আবেদন প্রসঙ্গে ইসির অতিরিক্ত সচিব কে এম আলী নেওয়াজ বলেছেন, ‘আইনি জটিলতায় এখনো আমরা সীমানা পুনর্বিন্যাসের বিজ্ঞপ্তি জারি করিনি। এ-সংক্রান্ত আবেদনগুলো সংশ্লিষ্ট শাখাকে কম্পাইল করা এবং পর্যালোচনা করে কাজ এগিয়ে রাখা হচ্ছে। এ বিষয়ে সরকারি সিদ্ধান্ত পাওয়ার পর আবেদনগুলোর যৌক্তিকতা যাচাই করা হবে।
বিশ্লেষকের মন্তব্য
নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুল আলীম খবরের কাগজকে বলেন, “সংসদীয় এলাকার সীমানা নির্ধারণ একটি জটিল ও সময়সাপেক্ষ কাজ; যার জন্য দরকার বিশেষায়িত জ্ঞান ও টেকনিক্যাল দক্ষতাসম্পন্ন জনবল। কাজটি সঠিকভাবে করা চ্যালেঞ্জিংও বটে। এ জন্য কাজটি পরিচালনায় ভবিষ্যতে ‘স্বাধীন কমিশন’ গঠনের সুপারিশ আমরা করেছি; যেটা খসড়া আইনে রাখা হয়নি। এ ছাড়া ওই কমিশন গঠনের আগে পর্যন্ত সীমানা পুনর্নির্ধারণে ইসির নেতৃত্বে ‘বিশেষায়িত কমিটি’ গঠন করে কাজটি করার পরামর্শ রাখা রয়েছে। সেই কমিটিতে ইসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বিশেষায়িত জ্ঞান ও টেকনিক্যাল দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তিরা থাকবেন।” সীমানা পুনর্নির্ধারণ-সংক্রান্ত প্রস্তাবিত আইনের খসড়া সরকার অধ্যাদেশ আকারে জারি না করা পর্যন্ত ইসির কিছু করার নেই। একই সঙ্গে সংসদীয় আসনের খসড়া সীমানা নির্ধারণের আগেই ইসিতে জমা পড়া আবেদনগুলো অর্থহীন মনে করছেন এই বিশ্লেষক।
ইসির বক্তব্য হলো, স্বাধীন কমিশন গঠন হলে ইসির কর্তৃত্ব বা ক্ষমতা কমবে। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে ড. আলীম বলেন, ‘স্বাধীন কমিশন হলে ইসির ক্ষমতা কমবে কি না সেটা বড় বিষয় নয়, কাজটি সঠিকভাবে করাকে আমরা বিবেচনায় নিয়েছি। আর বিশেষায়িত কমিটি তো গঠিত হবে ইসির নেতৃত্বেই। সংস্কার কমিশন মনে করে, এই কাজের কর্তৃত্ব আলাদা কমিশনের অধীনে গেলে, তাদের মাধ্যমে কাজটি হলে ইসির ঘাড় থেকে দায় নেমে যাবে। কারণ বিগত কয়েকটি সংসদ নির্বাচনে সীমানা নির্ধারণ নিয়ে ইসিকে অনেক বদনাম কুড়াতে হয়েছে।’ তিনি জানান, আন্তর্জাতিক নীতি অনুসরণ করেই সীমানা নির্ধারণ আইনের খসড়া প্রস্তাব করা হয়েছে। সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে শুধু বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে ওই নীতিমালা মানা হয়নি। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, নেপাল, ভুটানসহ অনেক দেশেই আলাদা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণ করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, সীমানা পুনর্নির্ধারণে আইনি জটিলতা কাটিয়ে ওঠার পরও নির্বাচন কমিশনকে এ কাজে নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। কারণ নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদ্যমান আসনগুলোর বর্তমান সীমানা ত্রুটিপূর্ণ। এর আগে ২০০৮ সালে প্রশাসনিক অখণ্ডতা বিবেচনায় আসনগুলোর সীমানা ব্যাপকভাবে পরিবর্তনের কারণে নির্বাচনি এলাকার ভোটার সংখ্যায় অসমতা সৃষ্টি হয়। পরে ইসিতে লিখিত অভিযোগ জমা পড়ে ৩ হাজার ৬৯০টি। তিনটি জাতীয় নির্বাচন- ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মোট ১৯৮টি আসনের সীমানা পুনর্বিন্যাসের ঘটনায় নানা রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি হয়, সংক্ষুব্ধরা আদালতের শরণাপন্নও হন।