বছরখানেক ধরে ডলারসংকটের ফাঁদে আটকা দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য। খরচ বেড়ে আকাশ ছুঁয়েছে। জিনিসপত্রের দাম বেড়েই চলেছে। ভোক্তা ও ব্যবসায়ীরা গ্যাসের দাম কমানোর দাবি জানিয়ে আসছেন। গণশুনানিতেও দাম না বাড়িয়ে ‘সিস্টেম লস’ কমিয়ে দাম কমানোর কথা বলা হয়েছে। এসব আমলে না এনে সরকার উল্টোপথে হাঁটল। গ্যাসের দাম এক ধাক্কায় ৩০ শতাংশ বাড়িয়ে দিল।
শিল্প খাতের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এটা ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’। দাম বাড়ানোয় নতুন শিল্প-বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে। খরচ বাড়ার আশঙ্কায় পুরোনো শিল্পেও আশানুরূপভাবে বিনিয়োগ বাড়বে না। একই মত জানিয়ে অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলেছেন, গাসের দাম বাড়ানোয় গোটা শিল্প খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, যা অর্থনীতির গতি কমাবে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) নতুন সভাপতি ও ইফাদ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান তাসকীন আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ভোক্তা ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের তীব্র আপত্তির পরও নতুন শিল্পের জন্য গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে ৩৩ শতাংশ। প্রতি ইউনিটে ১০ টাকা বাড়তি দিতে হবে। ঘোষিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, শিল্প গ্রাহকদের জন্য প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ৩০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪০ টাকা এবং ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে ৩১ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে- এসব সিদ্ধান্তে আমরা ব্যবসায়ীরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।’
ব্যবসায়ী এই নেতা বলেন, নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের কথা বলে দুই বছর আগে শিল্পে গ্যাসের দাম ১৫০ থেকে ১৭৯ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল। গত বছরও দাম বাড়ানো হয়েছিল। কিন্তু দুই বছর পরও শিল্পে গ্যাসসংকট কাটেনি।
ইফাদ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, বর্তমানে দেশে দিনে অনুমোদিত গ্যাসের লোড ৫৩৫ কোটি ঘনফুট। এর বিপরীতে দিনে ৩৮০ থেকে ৪০০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা আছে। সর্বোচ্চ সরবরাহ করা হয় ২৮০ থেকে ৩০০ কোটি ঘনফুট। এতে ঘাটতি থাকছে দিনে ১০০ থেকে ১২০ কোটি ঘনফুট। এমন পরিস্থিতিতে গ্যাসের দাম না বাড়িয়ে কীভাবে ঘাটতি কাটানো যায় তা দেখা উচিত।
তিনি বলেন, ‘দেশের শিল্প খাতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাসের সরবরাহ নিশ্চিত না করেই পুনরায় দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের শিল্প খাতের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই সিদ্ধান্তের ফলে ব্যবসার খরচ কয়েক গুণ বাড়বে। গ্যাসের এমন মূল্যবৃদ্ধি বিনিয়োগের পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে, নতুন শিল্প স্থাপনের সম্ভাবনা কমবে এবং বিদ্যমান বিনিয়োগকারীদের ব্যবসা পরিচালনায় বাধা সৃষ্টি করবে। ফলে রপ্তানিমুখী শিল্পের, বিশেষ করে আরএমজি, সিরামিক ও স্টিল উৎপাদন খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যেহেতু এ খাতগুলো গ্যাসনির্ভর; যা আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানকে দুর্বল করে তুলবে। পাশাপাশি ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান বেশি ক্ষতির মুখে পড়বে, কারণ তারা অতিরিক্ত খরচ বহন করতে সক্ষম নয়। সরকার রাজস্ব বাড়ানোর স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত না নিয়ে সময়োপযোগী নীতি সহায়তা প্রণয়ন করতে পারত। পাশাপাশি রপ্তানিকারক দেশগুলের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে জ্বালানিনিরাপত্তা নিশ্চিত করে শিল্প ও ভোক্তাদের ওপর চাপ কমাতে পারত।’
বাংলাদেশ চেম্বারের পরিচালক প্রীতি চক্রবর্তী খবরের কাগজকে বলেন, গ্যাসের দাম বাড়ানোয় শিল্প ও ব্যবসাসংশ্লিষ্ট সবাই একটি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য যেখানে বর্তমান উৎপাদন ধরে রাখা ও নতুন শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বাড়ানোর উদ্যোগ দরকার, সেখানে গ্যাসের দাম বাড়িয়ে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান যেন গড়ে না ওঠে এবং বর্তমান শিল্পগুলো যেন আর না চলতে পারে এরূপ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ২০২৩ সালে গ্যাসের একতরফা মূল্যবৃদ্ধির সময় শিল্পমালিক ও ব্যবসায়ীদের নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়নি। শিল্পমালিক ও ব্যবসায়ীরা চাহিদার ৩০-৪০ শতাংশ কম গ্যাস পায় এবং কম চাপের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এতে শিল্পমালিকরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন। গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিগুলোর অদক্ষতা ও অসততার দায়ভার শিল্পের ওপর চাপানো হচ্ছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে জানা যায়, ২০২২-২৩ সালে শিল্পের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৮ দশমিক ৩৭ শতাংশ এবং ২০২৩-২৪ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৩ দশমিক ৫৭ শতাংশে।
বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ২০২৪ সালের নভেম্বরে ৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ, ডিসেম্বরে ৭ দশমিক ২৮, সর্বশেষ ফেব্রুয়ারিতে ৬ দশমিক ৮২ শতাংশ হয়েছে।
২০২৪-২৫-এর জুলাই-ফেব্রুয়ারিতে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য এলসি বা ঋণপত্র তার আগের একই সময়ের তুলনায় কমেছে ২৫ শতাংশ এবং মধ্যবর্তী পণ্যের ক্ষেত্রে কমেছে ৮ শতাংশ। এদিকে ২০২২ সালে এসএমই খাতে উৎপাদন কমে দাঁড়ায় ১৫ দশমিক ৩৯ শতাংশ । সেখান থেকে ২০২৩ সালে ৯ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ কমে যায় এবং ২০২৪ সালে আরও ৫ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ কমে যায়। বিবিএসের তথ্যমতে, বেকারত্ব জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০২৪-এ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬ লাখ ৬০ হাজার। শিল্পের দুরবস্থার মূল কারণ নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস না পাওয়া এবং ২০২৩ সালের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি।
দেশের শিল্প ও বিনিয়োগের এমন নেতিবাচক পরিস্থিতির মধ্যেও কিসের ভিত্তিতে দাম বাড়ানো হলো এবং এর ফলে শিল্প ও বিনিয়োগ আরও কমে যাবে কি না তার জবাবে সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, ‘বিইআরসির আইনি আওতার মধ্যে থেকেই দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে বিনিয়োগ কমার বিষয়টা এখনই বলা যাবে না। বিনিয়োগে প্রভাব পড়বে কি না, তা নজরে রাখা হবে। নতুন যারা আসবেন, তারা যদি দেখেন তাদের পোষাবে, তাহলে তারা আসবেন। তারা বিকল্প জ্বালানিও ব্যবহার করতে পারেন।’
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজের (বিএপিএলসি) সভাপতি ও বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রূপালী চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, সব মহলের বিরোধিতা সত্ত্বেও আবার গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি করা হলো। এর ফলে নতুন বিনিয়োগ আসবে না, বেকারত্বের হার বৃদ্ধি পাবে, বর্তমান শিল্পও আস্তে আস্তে বন্ধের দিকে যাবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে কেউ আর শিল্প প্রতিষ্ঠা করতে চাইবে না। দেশের অর্থনীতি ধরে রাখতে হলে গ্যাসের দাম আগের চেয়ে কমানো দরকার।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি ও বাংলাদেশ রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মো. হাতেম খবরের কাগজ বলেন, ‘গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে একটি নেতিবাচক বার্তা পাঠাবে, যেখানে বৈদেশিক বিনিয়োগ ইতোমধ্যেই মাত্র ১ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলারে সীমাবদ্ধ। ব্যবসার পরিবেশ খারাপ হলে এফডিআই পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হতে পারে। রপ্তানি খাত, বিশেষভাবে তৈরি পোশাক খাতের ব্যবসায়ে খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। কীভাবে টিকে থাকব, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছি।’
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহিন আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘ডলারসংকটে গত তিন বছরের মতো চামড়া খাতের ব্যবসা কোনোমতে টিকে আছে। এর মধ্যে বারবার গ্যাসের দাম বাড়িয়ে চামড়া খাতের ব্যবসায়ীদের নিঃস্ব করে দেওয়া হচ্ছে। খরচের এত চাপ নেওয়া আমাদের পক্ষে যেখানে প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে, সেখানে আবারও গ্যাসের দাম বাড়িয়ে এক কথায় চামড়া খাত টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ল।’
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. আবুল বাশার মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, শিল্পে বিনিয়োগের পরিস্থিতি ভালো না। এমন পরিস্থিতিতে গ্যাসের দাম বাড়িয়ে সমগ্র অর্থনীতিকে ঝুঁকিতে ফেলা হলো।