পবিত্র ঈদুল আজহা আগামী ৭ জুন উদযাপিত হবে। এরই মধ্যে রাজধানীর গাবতলীর পশুর হাটে ট্রাক বোঝাই করে আসতে শুরু করেছে গরু, ছাগল, মহিষ তথা কোরবানির পশু। গত সোমবার রাত থেকেই গাবতলীর হাটে ট্রাক বোঝাই করে প্রচুর কোরবানির পশু আনা হয়েছে। এক রাতেই এই হাটে প্রায় ৫০ হাজারের মতো পশু আনা হয়েছে। আজকের মধ্যে তা ১ লাখ ছাড়িয়ে যাবে বলে জানিয়েছেন হাট-সংশ্লিষ্টরা। কেবল গাবতলী নয়, রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের পশুর হাটসহ অন্যগুলোতেও প্রায় অভিন্ন চিত্র।
মঙ্গলবার (৩ জুন) দুপুরে গাবতলী হাটে গিয়ে দেখা গেছে, পশু বিক্রির জন্য প্রস্তুত রাজধানীর একমাত্র স্থায়ী পশুর হাট গাবতলী। সেখানে ক্রেতা-বিক্রেতা-দর্শনার্থীর আনাগোনা বেড়েছে। কোরবানির পশুর দাম কিছুটা কম বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা। তবে অনেক বিক্রেতা শেষ দিকের বিক্রিতে বেশি লাভের আশাবাদী।
ওই হাট ঘুরে দেখা যায়, প্রধান ফটকসহ হাটের ভেতরেও সাজসজ্জা করা হয়েছে। এবার হাটের আয়তন ৫৪ বিঘা বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। বৃষ্টির জন্য টানানো হয়েছে প্যান্ডেল। গরম কমাতে ঝোলানো হয়েছে সিলিং ফ্যান। হাটের অভ্যন্তরে কাদা-পানি ঠেকাতে ফেলা হচ্ছিল বস্তা বস্তা বালি। অনেক স্থানে গরু বাঁধার জন্য বাঁশ ও ত্রিপল দিয়ে শেড তৈরি করা হয়েছে। বসানো হয়েছে ৮ থেকে ৯টি হাসিল ঘর। সেখানে পশুর চিকিৎসার জন্য রয়েছে ১০ থেকে ১১ সদস্যবিশিষ্ট দুটি মেডিকেল টিম। গাবতলীর হাট ও প্রধান সড়কে দেখা গেছে সেনাবাহিনীর টহল। হাটে রয়েছে র্যাব-৪-এর কন্ট্রোল রুম ও পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা। আছে র্যাবের ওয়াচ টাওয়ার ও জাল টাকা শনাক্তের মেশিন। পাশাপাশি আছে সাদা পোশাকে গোয়েন্দা পুলিশের নজরদারি।
এই হাটে দেশি গরুর পাশাপাশি রয়েছে ভারত, নেপাল ও মায়ানমারের গরু। মহিষ, ষাঁড়, উট, দুম্বাও সেখানে দেখা গেছে। কোরবানির পশু সাজাতে বিক্রি হচ্ছিল বাহারি রঙের কাগজের মালা। এ ছাড়া জবাইয়ের ও মাংস বানানোর কাজে ব্যবহৃত চাপাতি-ছুরিসহ প্রায় সব সরঞ্জাম পাওয়া যাচ্ছে এই হাটে।
অপরদিকে মঙ্গলবার বিকেলে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলে নাবিস্কোর পাশের প্রশস্ত সড়কে বসানো হাটেও মঙ্গলবার জমজমাট চিত্র দেখা যায়। প্রধান সড়কের মুখেই হাটের গেট সাজানো। বিভিন্ন পয়েন্টে মাইক স্থাপন করা হয়েছে। কন্ট্রোল রুম থেকে হাটের চিত্র দেখে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছিলেন দায়িত্বশীল সংশ্লিষ্টরা। ওই হাট ঘিরেও ছিল বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা। গাবতলী ও তেজগাঁওয়ের এই হাট ছাড়াও রাজধানীর প্রায় সব হাটেই মঙ্গলবার ট্রাক বোঝাই করে প্রচুর কোরবানির পশু ঢাকায় আসে। আজ বুধবারের মধ্যে সেই সংখ্যা আরও অনেক বাড়বে বলে মনে করছেন হাট-সংশ্লিষ্টরা।
হাট-সংশ্লিষ্টরা জানান, পশুর হাটে ক্রেতার উপস্থিতি প্রতিনিয়ত বাড়ছে। ব্যবসায়ী ও হাটের ইজারাদাররা বলেছেন, ঈদের তিন দিন আগে থেকে পশু বিক্রির ধুম পড়বে। তখন ভিড়ে পা ফেলার জায়গা থাকবে না রাজধানীর সবচেয়ে বড় এই পশুর হাটে।
গত সোমবার রাতে গাজীপুর থেকে ৩৭টি গরু নিয়ে গাবতলী হাটে এসেছেন আব্দুল খালেক। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘পশু বিক্রি শুরু হয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত তিনটি গরু বিক্রি করেছি। এখন দাম কম থাকলেও ঈদের তিন দিন আগে থেকে প্রত্যাশা অনুযায়ী দাম পাব বলে আশা রাখছি।’
কুষ্টিয়া থেকে বেশ কয়েকটি গরু নিয়ে এই হাটে এসেছেন রিপন ইসলাম। তিনি জানান, গত সোমবার রাতে লালুসহ বেশ কয়েকটি গুরু নিয়ে হাটে এসেছেন। ক্রেতারা আসছেন, দাম বলছেন, চলেও যাচ্ছেন। কেনাবেচা শুরু হলেও তিনি শেষ সময়ের অপেক্ষায় আছেন বলে জানান।
এই হাট থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকায় একটি দেশি গরু কিনে বাড়ি ফিরছিলেন ইরফান। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘হাটে এখনো ঠাসা ভিড় হয়নি, এ ছাড়া দাম ও বাজেট অনুযায়ী পশু মেলানো যাচ্ছে। তাই একটু আগেই কিনে ফেললাম।’
এবার গাবতলী পশুর হাটের ইজারা পেয়েছে এরফান ট্রেডার্স। হাসিল ঘরের দায়িত্বে থাকা ইয়াহিয়া সামি খবরের কাগজকে বলেন, ‘হাট দেখভালে দেড় হাজার স্বেচ্ছাসেবক কাজ করছেন। তারা হাটে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সার্বিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছেন। হাসিল লাখে ৫ হাজার টাকা আদায় করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আজ (কাল মঙ্গলবার পর্যন্ত) ৫০ হাজারের বেশি কোরবানির পশু এলেও কাল (আজ বুধবার) তা ১ লাখ ছাড়িয়ে যাবে।’
পশুর চিকিৎসা ও ক্রেতা-বিক্রেতার পশু সংক্রান্ত স্বাস্থ্যসেবার পরামর্শ দিতে অবস্থান করছিল দুটি মেডিকেল টিম। এ বিষয়ে মহাখালী প্রাণিসম্পাদ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. কাজী আলমগীর হোসেন (এফএমডি ভ্যাকসিন উৎপাদন অনুবিভাগ) খবরের কাগজকে বলেন, পশুর স্বাস্থ্যসেবায় দুটি মেডিকেল টিম কাজ করছে। গরমে পশুর হিট স্ট্রোক ও গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা বেশি হয়। এই সংক্রান্ত সেবা দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়াও ক্রেতা-বিক্রেতার পশু স্বাস্থ্যসংক্রাস্ত যেকোনো পরামর্শের জন্য আমাদের দুয়ার খোলা।
এদিকে রাজধানীর গাবতলীতে পশুর হাটের নিরাপত্তা ব্যবস্থা-সংক্রান্ত সংবাদ সম্মেলনে মঙ্গলবার র্যাব-৪ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক (সিও) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মাহবুব আলম বলেন, পশুর হাটে চাঁদাবাজি ও এক হাটের পশু অন্য হাটে নিলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। হাটে আভিযানিক দল নিয়োগ, গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি ও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। এ ছাড়া ছিনতাইকারী, মলম পার্টি, অজ্ঞান পার্টিসহ পেশাদার অপরাধীদের প্রতিরোধে কাজ করছে র্যাবসহ আইনশৃঙ্খলাবাহিনী।