‘নিজের জমি না থাকায় ১০ বিঘা জমি বর্গা নিয়ে আম্রপালি আমের বাগান করি। প্রথম দুই বছর কোনো ফলন হয়নি। তৃতীয় বছরে আম বাগানে পানি, সার ও বিভিন্ন সময়ে স্প্রে করতে সব মিলিয়ে ১ লাখ টাকার বেশি খরচ হয়েছে। আম বিক্রি করে ৪ লাখ টাকার মতো পাওয়া গেছে গতবার। কিন্তু এবার ঢলন প্রথার কারণে লোকসান গুনতে হচ্ছে। ৪০ কেজিতে মণ হলেও আড়তে ৫০ কেজি নেওয়া হচ্ছে।’
এভাবেই চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমনুরার মতিউর রহমান আমের দামের ব্যাপারে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
ঢলন প্রথায়, এক মণ আমের ওজন ৪০ কেজির পরিবর্তে বেশি ধরা হয়, যেমন- ৪২ থেকে ৫৫ কেজি পর্যন্ত। এতে করে কৃষকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন, কারণ তাদের বেশি ওজনের আমও ৪০ কেজি হিসেবে বিক্রি করতে হয়।
নওগাঁ জেলার সাপাহারের আমচাষি মইনুল হোসেন জানান, লাভের আশায় ধানখেতে আমের বাগান করা হলেও ঢলন প্রথাসহ বিভিন্ন কারণে লোকসান গুনতে হচ্ছে। শুধু এই দুজনই নয়, রাজশাহীর পবা, কাকনহাট, চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমনুরা, নাচোল, আড্ডা, নওগাঁর পোরশা, সাপাহারের অসংখ্য আমচাষির একই অভিযোগ।
মানভেদে বিভিন্ন আড়তে ফজলি আমের মণ ১ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার টাকা, আম্রপালি ১ হাজার ৬০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা মণ বিক্রি হচ্ছে। আড়তে ৪৬ থেকে ৫২ কেজিতে মণ ধরছে। তারা সঠিক দাম পাচ্ছেন না। সেই আম ঢাকার বিভিন্ন বাজারে ভোক্তাদের ১৩০ টাকা কেজিদরে কিনতে হচ্ছে। ভ্যানেও ৬০ থেকে ৯০ টাকা কেজিদরে বিক্রি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিকভাবে আমের উৎপাদন ও চাহিদার পরিসংখ্যান বের করতে হবে। আমের বাই-প্রোডাক্টে যেতে হবে। আড়তে আমের ‘ঢলন’ প্রথা বাতিল করতে হবে।
সম্প্রতি নাটোর থেকে শুরু করে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, আগের তুলনায় ধানের জমিতে আম বাগান বেড়ে গেছে। কেউ নিজের জমিতে বাগান করছেন। অনেক আমচাষির নিজের জমি না থাকায় অন্যের জমি ১০ বছরের জন্য লিজ নিয়ে বাগান করেছেন। বিনিময়ে প্রতি বিঘায় জমির মালিককে বছরে ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা দিতে হচ্ছে। কাজেই যারা অন্যের জমি লিজ নিয়ে বাগান করছেন, তাদের লাভও কম হচ্ছে। রাজশাহীর পবা উপজেলার মড়মড়িয়াহাটের শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আগে ধান চাষ করা হলেও পাঁচ বছর ধরে আমের বাগান করা হচ্ছে। গত বছরের তুলনায় এবার আমের দাম বেশি না। আড়তেও ওজনে বেশি নিচ্ছে। তাই অত লাভ হয় না।’
গোদাগাড়ীর কাকনহাট হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমনুরা-নাচোল-রহনপুর-নওগাঁর সাপাহার ও নিতপুরে দেখা গেছে, যেদিকে চোখ যায় চারদিকে শুধু আমের বাগান। বিশেষ করে এসব এলাকায় দেখা যায় ছোট ছোট আম্রপালি জাতের আম বাগান। সড়কের দুই ধার থেকে শুরু করে প্রায় ঘরবাড়িতেও আমের গাছ। এসব এলাকার আমচাষিরা জানান, ধান চাষে অনেক পরিশ্রম করতে হয়। সেই তুলনায় আম বাগানে পরিশ্রম নেই। তবে ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে এপ্রিল মাসের কালবৈশাখীতে আম ঝরে গেলে কিছুই থাকে না। তার পরও মানুষ আম চাষে ঝুঁকছেন। অনেকের প্রশিক্ষণ না থাকায় ইচ্ছামতো বালাইনাশক স্প্রে করছেন। এতে উৎপাদন খরচও বাড়ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদর উপজেলার আতাহারে কৃষিবিষয়ক বেসরকারি সংস্থা ‘কৃষি উদ্যোগ’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুনজের আলম মানিকের সঙ্গে কথা হয় । তিনি খবরের কাগজকে তার আম বাগান দেখিয়ে বলেন, ‘চাকরি ছেড়ে কৃষি উদ্যোক্তা হয়েছি। এখানে বিভিন্ন জাতের আমের বাগান করা হয়েছে। আমার মতো এই এলাকার অনেকেই নতুন নতুন বাগান করছেন। কিন্তু ঝুঁকি বাড়ছে। কারণ দেশে আমের কত চাহিদা, কত উৎপাদন হচ্ছে তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। এ জন্য আমের দাম পাচ্ছেন না আমচাষিরা। লাভের ভাগ মধ্যস্বত্বভোগীরা খাচ্ছেন। কারণ আড়তে এখনো চলছে ঢলন প্রথা। দীর্ঘ ছুটি ও গরমের কারণে একসঙ্গে আম পেকে যাওয়ায় এবারে দাম নেই। আবার রপ্তানিও বাড়ছে না। অনেকেই কীটনাশক, বালাইনাশক বা সারের সঠিক প্রয়োগ করছেন না। কৃষকরা দোকানদের কাছ থেকে এসব নিয়ে আসেন এবং ইচ্ছামতো প্রয়োগ করেন। এতে খরচও বাড়ছে।’
কী করলে আমচাষিরা লাভবান হবেন- এমন প্রশ্নের উত্তরে এক যুগের বেশি সময়ের অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি বলেন, ‘আমের বাই-প্রোডাক্টে যেতে হবে। এর বিকল্প নেই। ঝরে পড়া ও পরিপক্ব আম থেকে ১১ হাজার কোটি টাকা আয় হবে। ঝরে পড়া আম দিয়ে আমচুর তৈরি করে ১ হাজার কোটি টাকা, আচার তৈরি করে ৪ হাজার কোটি টাকা ও কাঁচা আমের পাউডার ও আমসত্ত্ব তৈরি করে হাজার কোটি টাকা আয় করা সম্ভব। এ ছাড়া পরিপক্ব ও পাকা আমের আচার করে ১ হাজার কোটি টাকা এবং আম শুকানো, আমের পাল্প ও আমসত্ত্ব থেকে আয় করা সম্ভব ৪ হাজার কোটি টাকার। যারা আগ্রহ দেখাবেন তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে মেশিনারিজের জন্য ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে।’
সার্বিক ব্যাপারে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. এম এ রহিম খবরের কাগজকে বলেন, ‘বাঙালির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যেদিকে ঝোঁকে তার শেষ দেখেই ছাড়ে। আমের ক্ষেত্রেও তা হচ্ছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নওগাঁ, সাতক্ষীরা, যশোরসহ সারা দেশে ব্যাপকভাবে আমের বাগান হচ্ছে। ফলন বাড়ছে। তার পরও কৃষকের লোকসান হচ্ছে। এটা চিন্তার বিষয়। আমাদের আমের চাহিদা কত তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। কৃষি মন্ত্রণালয়কে এ ক্ষেত্রে অবশ্যই উদ্যোগ নিতে হবে।’
এক প্রশ্বের উত্তরে এই আম বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানির দিকে নজর বাড়াতে হবে। অবশ্যই আমসত্ত্ব, ম্যাংগো জুসসহ বিভিন্ন বাই-প্রোডাক্টে যেতে হবে। ক্ষুদ্র পর্যায়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জে কিছুটা শুরু হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বড় বড় কোম্পানিকে এগিয়ে আসতে হবে। কারণ সম্প্রতি বছরে বিভিন্ন জেলায় ধানি জমিতে আমের বাগান ছেয়ে গেছে। বছরে চারবার আমগাছে স্প্রে করেও কেজিতে উৎপাদন খরচ ২০ টাকার বেশি হওয়ার কথা না। তার পরও বিভিন্ন এলাকায় কৃষকের লোকসান হচ্ছে। কিছু মধ্যস্বত্বভোগীর কারণে আমবাগানিদের এই লোকসান। তা দূর করতে হবে। কারণ এখনো বিভিন্ন জেলায় ৪৪ থেকে ৫২ কেজিতে এক মণ ধরা হচ্ছে। এতে প্রতি মণে ৪ থেকে ১২ কেজি বেশি নেওয়া হচ্ছে। আমচাষিরা ঠকছেন।’
দামের পার্থক্য বেশি হলে যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ ভেবে দেখতে হবে
কৃষি সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান বলেন, ‘ ঈদুল আজহার সময় লম্বা ছুটি ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে এবার আমের দাম কম। দেশের বিভিন্ন জেলায় আম চাষ বাড়ছে। ২৪ থেকে ২৫ লাখ মেট্রিক টন উৎপাদন হচ্ছে। তবে চাহিদা বোঝা মুশকিল। কারণ এটা যে যার মতো কিনে থাকেন।’ দামের ব্যাপারে তিনি বলেন, নিত্যপণ্যের পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে যৌক্তিক মূল্য নিরূপণ করা হয়। তবে আমের উৎপাদন ও ভোক্তাপর্যায়ে দামের পার্থক্য বেশি হলে যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণের ব্যাপারে ভেবে দেখতে হবে।’
এখনো ঢলন প্রথায় আম বিক্রি
প্রশাসনের কড়া হুঁশিয়ারির পরও রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও নাটোরের মোকামগুলোয় আম কেনাবেচায় ‘ঢলন প্রথা’ চলছে। তা বাতিলের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হলেও কোথাও তা কার্যকর হচ্ছে না। কেজির বদলে আগের মতোই মণ হিসেবে বিক্রি হচ্ছে আম। মোকামভেদে আমের মণ ধরা হচ্ছে ৪৬ থেকে ৫২ কেজি। এতে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন হাজার হাজার আমচাষি। কেননা তারা পান ৪০ কেজির দাম। বাকি ৫ থেকে ১২ কেজি অতিরিক্ত আমের মূল্য চলে যায় আড়তদার ও ফড়িয়া-বেপারিদের পকেটে।
আমচাষিদের দাবির মুখে গত ১১ জুন রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার অফিসে এক সভায় সিদ্ধান্ত হয়, রাজশাহী বিভাগের চার জেলার মোকামগুলোয় আম বেচাকেনায় ঢলন প্রথা আর থাকবে না। ঢলন প্রথার বদলে আম বিক্রির সময় আড়তদাররা প্রতি কেজি বিক্রীত আমের ওপর ১ টাকা ৫০ পয়সা করে কমিশন লাভ করবেন। আড়তদাররা এই কমিশন পাবেন আমচাষি বা বিক্রেতার কাছ থেকে। সভার সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, স্থানীয় সেনা ক্যাম্প, পুলিশ সুপার ও ওসিদের কাছে চিঠি পাঠানো হলেও কোথায় ঢলন প্রথা বাতিল হয়নি। এতে ঠকছেন চাষিরা। রাজশাহীর আম কেনাবেচার বড় মোকাম বানেশ্বরহাটে ৪৪ কেজিতে মণ হিসাবে বিক্রি হচ্ছে। রহনপুর মোকামে ৫০ থেকে ৫৪ কেজিতে মণ ধরে আম বেচাকেনা হচ্ছে। মেহেরপুরেও ‘ঢলন প্রথা’য় প্রতি মণে ৮ কেজি পর্যন্ত অতিরিক্ত আম দিতে হচ্ছে আমচাষিদের।
বিভিন্ন বাজারে আমের দর
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের কানসাট ও অন্যান্য বাজারে আমের বর্তমান দর হচ্ছে- ল্যাংড়া আম প্রতি মণ ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকা, ফজলি ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০, আম্রপালি ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার, ব্যানানা ম্যাংগো ৪ হাজার, লক্ষণভোগ ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা মণ। কিন্তু সেই আম রাজধানীতে ভোক্তাদের বেশি দরে কিনতে হচ্ছে। মোহাম্মদপুরের টাউন হল বাজারের ফল বিক্রেতা সবুর হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘ভালো মানের আম্রপালি ১৩০ টাকা কেজি, ব্যানানা ১৪০, হাঁড়িভাঙা ৮০ ও বারি-৪-এর কেজি ৭০ টাকা। অন্য বাজারেও দেখা গেছে এভাবে বেশি দরে আম বিক্রি হচ্ছে। তবে ভ্যানে করে বিভিন্ন জাতের আম ৬০ থেকে ৮০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে।