বাংলাদেশে নাইজেরিয়ান নাগরিকদের বিভিন্ন ধরনের প্রতারণা ঠেকাতে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি চিঠি ইস্যু করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। চিঠিতে নাইজেরিয়াসহ আফ্রিকার ৫৫ দেশের নাগরিকদের বাংলাদেশ ভ্রমণে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। এতে বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া মহাদেশটির নাগরিকদের ভিসার জন্য বাংলাদেশ পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) অনুমোদন নিতে বলা হয়। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে গত চার বছরে ব্যবসা বা বিনিয়োগের জন্য হাজারও ভিসার আবেদন বাংলাদেশ দূতাবাসে জমা পড়েছে। তবে এসবির অনুমোদন প্রাপ্তিতে দীর্ঘসূত্রতা এবং অনাপত্তিপত্র না পাওয়ায় বাংলাদেশে আসতে পারছেন না বহু আবেদনকারী। এতে বাংলাদেশের সঙ্গে আফ্রিকার ৫৫টি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক কার্যত থমকে আছে।
বাংলাদেশের জন্য পোশাক, ওষুধ, কৃষিপণ্য, সিরামিক, প্লাস্টিক পণ্য, আইটি সেবা, পাটপণ্য এবং হালকা প্রকৌশল পণ্য আফ্রিকায় রপ্তানির ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে আফ্রিকা থেকে তুলা, খনিজ, গম, পশুখাদ্য, কাঁচামাল এবং বিভিন্ন কৃষিপণ্য আমদানির ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের আগ্রহ বাড়ছে। ভিসা জটিলতা দূর হলে আফ্রিকার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক জোরদার হবে এবং বাংলাদেশ নতুন অর্থনৈতিক দিগন্ত উন্মোচনের মাধ্যমে বৈচিত্র্যময় বাণিজ্যের বাজার গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, আফ্রিকার ৫৫টি দেশের মধ্যে ৯টি দেশে বাংলাদেশের দূতাবাস রয়েছে। এর মধ্যে অনেক দেশেই রয়েছে বাংলাদেশের বাণিজ্য-বিনিয়োগের বিপুল সম্ভাবনা। তবে ভিসা জটিলতার কারণে সেখানকার আগ্রহী অনেকেই বাংলাদেশে আসতে পারছেন না। এতে ৫৫টি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য-বিনিয়োগ গতি পাচ্ছে না। কূটনৈতিক সূত্রের মতে, আফ্রিকার একটি দেশের কারণে গোটা মহাদেশের অন্য দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক থেমে থাকা কাম্য নয়। এতে ওই সব দেশের রপ্তানিযোগ্য অনেক পণ্য রপ্তানি করা সম্ভব হচ্ছে না। সূত্র জানায়, আফ্রিকার দেশগুলোর নাগরিকরা এখন বাংলাদেশের ভিসা পাচ্ছেন না। তাই সংশ্লিষ্ট দেশগুলোও বাংলাদেশের নাগরিকদের ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করেছে। এতে বাংলাদেশের ওষুধ ও গার্মেন্টস পণ্য সরাসরি রপ্তানি করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত বা তৃতীয় কোনো দেশ হয়ে বাংলাদেশের পণ্য আফ্রিকার দেশগুলোতে পৌঁছায়। এতে খরচ বাড়ে এবং চাহিদা অনুযায়ী পণ্য পাঠানো সম্ভব হয় না।
এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২০২২ সালে ইস্যু করা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে আলজেরিয়া, মিসর, মরক্কো, মরিশাস, কমোরস, মাদাগাস্কার ও সিশেলস- এই সাতটি দেশের নাগরিকদের ভিসার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দূতাবাসকে ভালো করে বিবেচনা করে ভিসা দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। এ ছাড়া আফ্রিকার অন্যান্য দেশের নাগরিকদের সরকারি ও শিক্ষার্থী ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ বিবেচনা করার সুপারিশ করা হয়। কিন্তু আফ্রিকার বাকি দেশগুলোর ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের ভিসার ক্ষেত্রে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ বা এসবির অনুমোদন নিতে বলা হয়। বাস্তবে দেখা গেছে, আফ্রিকার দেশগুলোর ভিসা আবেদনের ২ থেকে ৩ শতাংশেরও কম এসবি ক্লিয়ারেন্স পেয়েছে। এতে আফ্রিকার ৫৫টি দেশের প্রায় ৯৮ শতাংশ ব্যবসায়ী ও ভ্রমণকারী শেষ পর্যন্ত ভিসা পান না। এ ছাড়া আফ্রিকার ৯টি দেশে বাংলাদেশের দূতাবাস থাকলেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিঠির কারণে ভিসা দেওয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। প্রতিবন্ধকতার চার বছর পেরিয়ে গেলেও জটিলতা নিরসনে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
এই চিঠির ব্যাপারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা বিভাগের নিরাপত্তা ও বহিরাগমন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. শামীম খানের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি খবরের কাগজকে বলেন, এ বিষয়ে তিনি অবহিত নন। জানা গেছে, এই চিঠিতে স্বাক্ষর করেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা বিভাগের তৎকালীন যুগ্ম সচিব মো. শাহরিয়াজ। চিঠিটি স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, ইমিগ্রেশন, পাসপোর্ট অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরে পাঠানো হয়। শুধু নাইজেরিয়ার নাগরিকদের প্রতারণা ঠেকাতে ইস্যু করা এই চিঠির বিষয়টি গত চার বছরে আর পর্যালোচনা করা হয়নি। এতে আফ্রিকার মতো একটি বড় মহাদেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়ন, ব্যবসা ও বিনিয়োগ পিছিয়ে আছে।
বাংলাদেশ মোটাদাগে পোশাকশিল্প ও কৃষিপণ্য রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল। তবে এখন নতুন বাজার খোঁজা হচ্ছে। বিশ্ব বাণিজ্যে নিজেদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর চেষ্টাও চলছে। এই প্রেক্ষাপটে আফ্রিকা মহাদেশ বাংলাদেশের জন্য এক বিশাল সম্ভাবনাময় বাণিজ্যক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
আফ্রিকা পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মহাদেশ, যেখানে ৫৫টি স্বাধীন দেশ এবং প্রায় ১৪০ কোটি মানুষ বসবাস করেন। মহাদেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, বাড়ছে জনসংখ্যাও। সেখানে মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ এবং নগরায়ণ উল্লেখ করার মতো। সে কারণেই আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে নতুন পণ্য ও সেবার চাহিদা তৈরি হচ্ছে।