ভাঙারি ব্যবসায়ী লালচাঁদ ওরফে সোহাগ হত্যাকাণ্ডের পর গা ঢাকা দিয়েছে পুরান ঢাকার মিটফোর্ড এলাকায় বিভিন্ন অপকর্মের সঙ্গে জড়িতরা। বীভৎস ওই খুনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত মহিন সিন্ডিকেটের সদস্যদের পাশাপাশি চাঁদাবাজি ও আধিপত্য নিয়ে লড়াই করা অন্যরাও এখন এলাকা ছাড়া। এতে করে কয়েক দিন ধরে কিছুটা স্বস্তিবোধ করছেন স্থানীয় ছোট-বড় ব্যবসায়ীরা। তবে নৃশংস ওই হত্যাকাণ্ডের আতঙ্কের রেশ এখনো কিছুটা রয়ে গেছে মিটফোর্ড হাসপাতাল এলাকায়।
এদিকে সোহাগ হত্যা মামলায় মহিনের সহযোগী নান্নু কাজীকে (২৭) গত সোমবার দিনগত রাতে নারায়ণগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব-১০ ব্যাটালিয়ন। নান্নু এই মামলার এজাহারভুক্ত ৭ নম্বর আসামি। এ ছাড়া মঙ্গলবার মামলার প্রধান আসামি ও খুনের মাস্টারমাইন্ড মহিনের আরও পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। এই মামলায় মঙ্গলবার রাতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত মোট আটজনকে গ্রেপ্তার করা হলো। এজাহারভুক্ত আরও ১১ আসামি এখনো পলাতক আছেন। পুলিশ ও র্যাবসহ বিভিন্ন সংস্থা তাদের গ্রেপ্তারে মাঠে রয়েছে বলে জানিয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা।
মঙ্গলবার (১৫ জুলাই) দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মিটফোর্ড হাসপাতাল এলাকায় যেখানে সোহাগকে হত্যা করা হয়েছিল সেখানে মানুষের জটলা। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ ভিডিও করছেন। ঘটনাস্থলের আশপাশের দেয়ালে লাগানো হয়েছে হত্যায় জড়িতদের বিচারের দাবিতে ব্যানার ও পোস্টার। ব্যানারের এক পাশে ছিল হত্যার শিকার সোহাগের ছবিও।
এ ছাড়া নিহত সোহাগের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সোহানা মেটালে গতকালও তালা ঝুলছিল। এমনকি মহিনের টর্চার সেল হিসেবে যে কক্ষটি সামনে এসেছে সেটিও তালাবদ্ধ পাওয়া যায়।
ওই এলাকায় কথা বলতে গেলে মহিন ও সোহাগকে ব্যবসায়ী সম্বোধন করে কথা বলতে নারাজ অধিকাংশ ব্যবসায়ী। তারা খবরের কাগজকে বলেন, ‘এরা সন্ত্রাসী, তারা মূলত চোরাই কারবার করত। ভাঙারি পণ্য (তামা, পিতল, দস্তা, সিসা, প্লাস্টিকের পণ্য) ব্যবসার আড়ালে চোরাই কেবলসহ (তার) নানা অবৈধ অ্যালুমিনিয়াম পণ্যের কারবার ছিল তাদের। চোরাই ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করেই এখানে গড়ে ওঠে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেট এমনভাবে রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় প্রভাব বা আধিপত্য তৈরি করেছিল, যেখানে প্রতিবাদ করলে নির্যাতনের সম্মুখীন হতে হতো। এই সিন্ডিকেট এলাকায় আধিপত্য নিয়ন্ত্রণ করে বিপুল টাকা কামাত। সেই সব টাকার ভাগবাঁটোয়ারা বা ওই সব ব্যবসার দ্বন্দ্বের জেরে খুন হন সোহাগ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক স্থানীয় ব্যবসায়ী জানান, সোহাগ-মহিন গ্রুপের দৌরাত্ম্য-আধিপত্য বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য অতিষ্ঠ ছিলেন মিটফোর্ডের ব্যবসায়ীরা। এই হত্যাকাণ্ডের পর সোহাগ-মহিনের সঙ্গে থাকা সন্ত্রাসীরা এবং অন্য গ্রুপের সদস্যরাও গা ঢাকা দিয়েছে। আপাতত এখন কিছুটা স্বস্তিতে ব্যবসা করছেন তারা।
সোহাগের পাশের দোকানের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলী খবরের কাগজকে জানান, প্রায় এক যুগ ধরে তিনি এই এলাকায় ব্যবসা করেন। সোহাগ এখানে দোকান দিয়েছেন তিন মাস। এর আগে সোহাগ মহিনের সঙ্গে মিলে বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করে বেড়াতেন। তিনি বলেন, ‘সোহাগ-মহিন গ্রুপ এই এলাকায় বেশ পরিচিত। তারা চাঁদাবাজি ও চোরাই কারবারের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করতেন। এলাকায় তাদের খুব দাপট ছিল। কেউ কথা না শুনলে চালাতেন নির্যাতন। এখন কাউকে দেখা যায় না। সব পালিয়েছে।’
পাশে খবির দেওয়ান নামে আরেকটি একটি পিতলসামগ্রীর দোকানের কর্মচারী মাহফুজ খবরের কাগজকে বলেন, ‘সোহাগ আশপাশের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে খুব একটা মিশতেন না। মহিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ছিল। তারাসহ ১০ থেকে ১২ জন এখানে নিয়মিত আড্ডা দিতেন।’
টর্চার সেলে তালা
মিটফোর্ড হাসপাতালের ৩ নম্বর গেট থেকে পশ্চিম দিকে তাকালেই চোখ যায় বাংলাদেশ চতুর্থ শ্রেণি সরকারি কর্মচারী অফিসে (মিটফোর্ড হাসপাতাল)। টিনের ছাউনিযুক্ত এই অফিসের একটি কক্ষ মহিনের টর্চার সেল হিসেবে ব্যবহার হতো বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তবে গতকাল ওই অফিসের সেই কক্ষের দরজা তালাবদ্ধ পাওয়া যায়। কেউ তাদের কথা না শুনলে এখানে এনেই নির্যাতন করা হতো বলে জানান স্থানীয়রা।
জানা যায়, মহিনের নির্যাতনের শিকার এই এলাকার বাসিন্দা গাড়ি ব্যবসায়ী শাওন। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘বাবার সূত্র ধরে আমি গাড়ির ব্যবসা করি। সোহাগ হত্যাকাণ্ডের কিছুদিন আগে মহিন গ্রুপ আমার কাছে চাঁদা দাবি করে। চাঁদা দেব না বলে জানিয়ে দিলে পরে চতুর্থ শ্রেণি সরকারি কর্মচারী অফিসে নিয়ে আমাকে মারধর করে।’
শাওন আরও অভিযোগ করেন, সন্ত্রাসী মহিন সঙ্গে অস্ত্র রাখতেন। মহিন গ্রুপের ভয়ে এলাকার লোক তটস্থ থাকতেন। ১০ থেকে ১৫ জন দল বেঁধে তারা এলাকায় ঘুরে বেড়াতেন। প্রশাসনকে ম্যানেজ করে চলা মহিনের বিরুদ্ধে কেউ কথা বলার সাহস পেতেন না। মহিনের ডান হাত ছিল নান্নু গাজী।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গণমাধ্যম শাখার উপকমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, সোহাগ হত্যাকাণ্ডে মোট আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া মহিনের আরও পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়েছে। সোহাগকে পাথর মারা ও লাশের ওপর ওঠে উল্লাস করা দুই ব্যক্তিকে অনেক গুরুত্ব দিয়ে খুঁজছে পুলিশ। এই দুজনের বিষয়ে পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে। দ্রুত সময়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হবে।
আসামি নান্নু কাজী গ্রেপ্তার
সোহাগকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় অন্যতম আসামি নান্নু কাজীকে নারায়ণগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে র্যাব। র্যাবের কর্মকর্তারা জানান, নারায়ণগঞ্জ বন্দর থানার কলাগাছিয়া ইউনিয়নের বালিয়া গ্রামে নান্নু কাজী তার মামার বাড়িতে আত্মাগোপন করেছিলেন। গোপন তথ্যের ভিত্তিতে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে নান্নু হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন বলেও জানানো হয়েছে।
মহিনের আরও ৫ দিনের রিমান্ডে
মহিনকে আবারও পাঁচ দিন রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। গতকাল ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মিনহাজুর রহমান ওই আদেশ দেন। এর আগে প্রথম দফায় পাঁচ দিন রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাকে আদালতে হাজির করা হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আবারও ১০ দিন রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেন। গত ১০ জুলাই প্রথম দফায় মহিনকে রিমান্ডে নেওয়ার আদেশ দেওয়া হয়। আদালতে রিমান্ড আবেদনের বিপরীতে আসামির পক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন না।
প্রসঙ্গত, গত ৯ জুলাই সন্ধ্যার আগে মিটফোর্ড হাসপাতালের ৩ নম্বর গেটসংলগ্ন রজনী বোস লেনে পাকা রাস্তার ওপর সংঘবদ্ধভাবে ভাঙারি ব্যবসায়ী ও যুবদলকর্মী লালচাঁদ ওরফে সোহাগকে (৩৯) এলোপাতাড়ি পাথর দিয়ে আঘাত করে ও কুপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সোহাগ হত্যাকাণ্ডে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৯ জনের সম্পৃক্ততা পেয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা। তাদের মধ্যে ভিডিও ফুটেজ ও নানা তথ্য বিশ্লেষণ করে ১১ জনকে শনাক্ত করেছেন তারা।