সন্তান হারিয়ে অনেক মা-বাবা এখন পাগলপ্রায়। যাদের এখনো সন্ধান মেলেনি, তারা খুঁজে ফিরছেন প্রাণপ্রিয় সন্তানকে। যেখানে যুদ্ধবিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে সেই মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনে ছুটে যাচ্ছেন কেউ কেউ। সেখানে গতকাল মঙ্গলবারও ছিল পোড়া গন্ধ। ঘটনাস্থল, বিভিন্ন হাসপাতাল ও মর্গ এলাকায় স্বজনদের কান্নাকাটি ও আহাজারি করতে দেখা যায়। তাদের বিলাপে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।
শুধু বাবা-মা কিংবা পরিবারের লোকজন নন, মর্মান্তিক এই ঘটনা কাঁদিয়ে যাচ্ছে সবাইকে। শোকে স্তব্ধ সারা দেশ। মর্মান্তিক এ ঘটনায় গতকাল পালন করা হয়েছে রাষ্ট্রীয় শোক। এ ছাড়া বিধ্বস্ত ওই যুদ্ধবিমানের নিহত পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলামের ‘ফিউনারেল প্যারেড’ গতকাল অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ সময় মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির ঘটনায় সামাজিকে যোগাযোগমাধ্যমের গুজবে কান না দেওয়ার আহ্বান জানান বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খান।
গত সোমবার দুপুরে রাজধানীর দিয়াবাড়ীর মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাসের একটি ভবনে প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত বিমানবাহিনীর ওই যুদ্ধবিমানটি (এফ-৭ বিজিআই) বিধ্বস্ত হয়। এ ঘটনায় গতকাল পর্যন্ত ৩১ জনের করুণ মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছে দেড় শতাধিক। মর্মান্তিক ওই ঘটনায় সাধারণ মানুষও হতভম্ব-স্তব্ধ। পথেঘাটে যেখানেই জটলা, সেখানেই চলছে মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি নিয়ে আলোচনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে সবখানে শোকের ছায়া। বিশেষ করে দুর্ঘটনার পর আটকে পড়া অন্তত ২০ জন শিশু শিক্ষার্থীকে উদ্ধার করে নিজের প্রাণ উৎসর্গকারী শিক্ষিকা মাহেরীন চৌধুরীর আত্মত্যাগ তুলে ধরা হচ্ছে সব মাধ্যমে।
গতকাল জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট ও বিভিন্ন হাসপাতালের শয্যায় অসহ্য যন্ত্রণায় চিকিৎসা নিতে দেখা যায় মাইলস্টোনের ঘটনায় দগ্ধ ও আহতদের। যাদের অধিকাংশের সারা শরীরে ব্যান্ডেজ। কারও কারও শরীরের বিভিন্ন অংশের ঝলসে যাওয়া চামড়া-মাংস খসে পড়েছে। মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে কেউ কেউ। কোমলমতি এসব শিশুর করুণ পরিস্থিতিও নিরুপায় দর্শকের মতো দেখতে হচ্ছে মা-বাবাকে।
ঘটনাস্থলে পোড়া গন্ধ
গতকাল সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দিয়াবাড়ীর মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রাঙ্গণে অবস্থানকালে নানা চিত্র দেখা যায়। দ্বিতীয় দিনেও দিনভর ঘটনাস্থলে ছিল লাখো মানুষের ভিড়।
গতকালও সেখানে ছিল পোড়া গন্ধ। সেখানকার বাতাসে বিমানটির তেলসহ নানা উৎকট গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছিল। এ যেন নিঃশব্দ এক মৃত্যুপুরী। ক্লাস রুমগুলো খালি। ভেতরে পড়ে ছিল পুড়ে চ্যাপ্টা হওয়া টেবিল-চেয়ারের অংশবিশেষ। দোতলা ভবনের নিচতলায় যেখানে বিমানটি আছড়ে পড়েছিল সেখানে গতকালও পোড়া ছিন্নভিন্ন বিভিন্ন সামগ্রী, জুতা, স্যান্ডেল পড়ে থাকতে দেখা যায়। হায়দার আলী ভবনের করিডরে পুরোটাই ধ্বংসস্তূপ, যা আগুনে পুড়ে গেছে। স্কুল ভবনের সামনে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে ছিল শিশুদের বই, খাতা, ব্যাগ, জুতা, পানির বোতল, এমনকি কয়েকজনের আঁকা ছবিও।
সরেজমিনে বিধ্বস্ত ভবনটি ঘুরে দেখা যায়, তৃতীয় শ্রেণির প্রাথমিক বিজ্ঞান, বাংলা ব্যাকরণসহ একাধিক বই অর্ধেক পোড়া ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে ছিল ধ্বংসস্তূপের পাশে। সিঁড়ির পাশে পড়ে ছিল ছোটদের ব্যাগ।
ভবনের সামনের ও ভেতরের অংশ ধ্বংসযজ্ঞে পরিণত হয়েছে। পেছনের অংশও মোটামুটি ক্ষতি হয়েছে। আছড়ে পড়া বিমানটি পেছনের দেয়ালেও আঘাত হেনে ভেঙে ফেলেছে। পেছনের দেওয়ালে ফাটল ধরেছে। জানালার গ্লাসগুলো ভেঙে পড়েছে। ভেতরে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করায় বাইরের অংশ দিয়েই সেই ভয়াবহতার চিত্র বোঝার চেষ্টা করছিলেন উৎসুক নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ।
এর আগে গতকাল সকালে বিমানবাহিনীর সদস্যরা বিধ্বস্ত বিমানের বাকি অংশ কুড়িয়ে নিয়ে যান আলামত হিসেবে। পরে বিধ্বস্ত ভবনে আলামত সংগ্রহ করতে আসেন পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক বিভাগের ক্রাইম সিন ইউনিট। দীর্ঘ সময় ধরে তারা বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেন।
গতকাল রাত ৯টার দিকে দিয়াবাড়ী গোলচত্বরে পুলিশের একটি এপিসি ও কিছুসংখ্যক পুলিশ সদস্যকে অবস্থান করতে দেখা যায়। পুলিশের একটি দল গোলচত্বরে অবস্থান করছিল, অপর একটি দল মেট্রোরেল ডিপোর পাশে অবস্থান করছিল। তবে ওই এলাকায় কোনো শিক্ষার্থীকে দেখা যায়নি।
তদন্তের ভিত্তিতে ভুলত্রুটি থাকলে ব্যবস্থা নেব: বিমানবাহিনী প্রধান
‘ফিউনারেল প্যারেড’ আয়োজনে বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খান সাংবাদিকদের বলেন, ‘মাইলস্টোন কলেজে প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক গুজব ছড়িয়ে পড়েছে। ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন গুজবে কান না দিতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি। বিমানবাহিনী প্রধান বলেন, এই ঘটনায় একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা তদন্ত করে বের করবে কী ঘটেছিল। তার ভিত্তিতে কোনো ভুলত্রুটি থাকলে সে অনুযায়ী আমরা ব্যবস্থা নেব।’
হাসান মাহমুদ খান বলেন, পাইলট সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিলেন বিমানটিকে একটি খালি জায়গায় নামানোর জন্য এবং তিনি তার জীবন উৎসর্গ করেছেন। দয়া করে দেশের এই বিপদের সময় সামাজিক মাধ্যমের গুজবে কান দেবেন না। একটি শক্তিশালী বিমানবাহিনী স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য অপরিহার্য। দয়া করে গুজব ছড়িয়ে দেশের সার্বভৌমত্বের এই স্তম্ভকে দুর্বল করে দেবেন না।
এক প্রশ্নের জবাবে বিমানবাহিনী প্রধান বলেন, ‘বিমান রক্ষণাবেক্ষণে বিমানবাহিনী কোনো আপস করে না। দুর্ঘটনা প্রতিরোধে আমরা দৈনন্দিন ব্যবস্থা নিই। তবে আমরা অবশ্যই এই দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা নেব। বিমান সাধারণত সহজে পুরোনো হয় না। প্রতিটি বিমানের একটি লাইফটাইম আছে। এক যুগ, দুই যুগ ব্যাপার না। বিষয় হলো রক্ষণাবেক্ষণ। আমাদের রক্ষণাবেক্ষণ সব সময় ভালো হয়। এগুলো আমরা ভালোভাবেই মেরামত করি।’
এর আগে বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় তুরস্ক সফর বাতিল করে দেশে ফিরে আসেন বিমানবাহিনী প্রধান। পরে তিনি পৃথক সময় দগ্ধ ও আহতদের দেখতে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) এবং জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট পরিদর্শন করেন।
তৌকির ইসলামের ‘ফিউনারেল প্যারেড’ অনুষ্ঠিত
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) গতকাল বিকেলে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, মাইলস্টোন স্কুল ভবনে বিধ্বস্ত হওয়া যুদ্ধবিমানটির নিহত পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলামের ‘ফিউনারেল প্যারেড’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিমানবাহিনীর ঘাঁটি বীর উত্তম এ কে খন্দকার প্যারেড গ্রাউন্ডে গতকাল তৌকির ইসলামের প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় তাকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। ফিউনারেল প্যারেডে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। সেনাবাহিনী প্রধান, বিমানবাহিনী প্রধান ও নৌবাহিনী প্রধানের পক্ষে সহকারী নৌবাহিনী প্রধান (পরিচালন) মরহুমের কফিনে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে তার প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। এ ছাড়াও অনুষ্ঠানে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলামের পরিবারের সদস্য, সামরিক বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং অন্য পদবির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। ফিউনারেল প্যারেড শেষে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলামকে রাজশাহীতে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়।