আজ ৩১ জুলাই। ছিটমহল দিবস। ২০১৫ সালের এই দিনে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ছিটমহল বিনিময় সম্পন্ন হয়। যার ফলে ৪১ বছরের সীমানা বিরোধের অবসান ঘটে। এতে দুই দেশের ছিটমহলগুলোর ৫১ হাজার ৫৮৪ বাসিন্দা এক ধরনের ‘মুক্তি’ পান। তাই ৩১ জুলাইকে ছিটমহলবাসী মুক্ত দিবস হিসেবে পালন করে থাকে।
ছিটমহল বিনিময় চুক্তিটি ১৯৭৪ সালের ইন্দিরা-মুজিব চুক্তির একটি অংশ এবং দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা একটি জটিল সমস্যা ছিল। এই চুক্তির আলোকে ২০১৫ সালের এই দিনে মধ্যরাতে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ১৬২টি ছিটমহল বিনিময় হয়। এর ফলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা ভারতের ১১১টি ছিটমহল বাংলাদেশের ভূখণ্ডে অন্তর্ভুক্ত হয়, যার পরিমাণ ১৭ হাজার ১৬০ একর এবং ভারতের অভ্যন্তরে থাকা বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল ভারতের ভূখণ্ডে অন্তর্ভুক্ত হয়, যার পরিমাণ ৭ হাজার ১১০ একর।
বাংলাদেশের ভূখণ্ডে অন্তর্ভুক্ত হওয়া ১১১ সাবেক ছিটমহলের মধ্যে লালমনিরহাটে ৫৯, কুড়িগ্রামে ১২, নীলফামারীতে ৪ ও পঞ্চগড়ে ৩৬টি। ছিটমহল বিনিময়ের মাধ্যমে ভারতের ভেতরে বাংলাদেশের ছিটমহলের মালিক হয় ভারত এবং বাংলাদেশের ভেতরে ভারতের ছিটমহলের মালিক হয় বাংলাদেশ। বাংলাদেশের ভূখণ্ডে অন্তর্ভুক্ত ভারতের ছিটমহলে বসবাসকারী ৩৭ হাজার ৫৩৫ জন বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পান। ভারতের মূল ভূখণ্ডে বাংলাদেশি ৫১টি ছিটমহলের জনসংখ্যা ছিল ১৪ হাজার ২১৫ জন। তাদের কেউ বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডে গিয়ে বসবাস করতে রাজি হয়নি।
এর আগে ২০১৫ সালের ৭ মে ভারতীয় সংসদের নিম্ন কক্ষ লোকসভায় বাংলাদেশ-ভারত স্থল সীমান্তচুক্তি-সংক্রান্ত বিল ৩৩১-০ ভোটের ব্যবধানে পাস হয়। ভারতের লোকসভায় রাজনৈতিক বাধার কারণে বিগত কংগ্রেস এবং বর্তমান বিজেপি সরকার এই বিলটি পাস করতে পারছিল না। এর আগে কংগ্রেসের শাসনের সময় বিজেপিই এই বিল পাসের বিরোধিতা করে। আর সর্বশেষ আসামকে বাদ দিয়ে সীমান্তচুক্তি বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধন বিল উত্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হলে কংগ্রেস বেঁকে বসে। রাজ্যসভায় কংগ্রেসের তুলনায় আসনসংখ্যা কম থাকায় বিজেপিও নতুন করে বিবাদে না জড়িয়ে কংগ্রেসের দাবি অনুযায়ী শেষ পর্যন্ত আসামকে সংযুক্ত করে সীমান্ত বিল বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়। এর পরই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সভাপতিত্বে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় ১১৯তম সংবিধান সংশোধনের বিল অনুমোদনের জন্য উত্থাপন করা হয় এবং সেটি সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদন পায়।
তবে এরই মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস তাদের আগের নীতি থেকে সরে এসে সীমান্তচুক্তিতে সায় দেয়। এ সময় মমতা বলেন, মানবিক কারণে এই চুক্তি বাস্তবায়নে আমরা রাজি।
এদিকে ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ-ভারত স্থল সীমান্তচুক্তি ও ২০১১ সালে ওই চুক্তির প্রটোকলেই স্পষ্টভাবে বলা হয়, দুই দেশের মধ্যে কোন সীমানা কীভাবে নির্ধারিত হবে। ২০১১ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরকালে সই হওয়া ১৯৭৪ সালের স্থল সীমান্তচুক্তির প্রটোকলে সীমান্তবিষয়ক সব সমস্যার সমাধান হয়। ওই চুক্তি ও প্রটোকল বাস্তবায়নের ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের চার রাজ্য- আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গের সীমানারেখায় পরিবর্তন আসে। সীমান্তচুক্তি ও প্রটোকল একই সঙ্গে বাস্তবায়ন করার ফলে উভয় দেশের মধ্যে ছিটমহল সমস্যা, অপ-দখলীয় ভূমি ও অচিহ্নিত সীমানা সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়। এতে প্রায় ৬.১ কিলোমিটার অচিহ্নিত সীমানা, ১৬২টি ছিটমহল বিনিময় ও অপ-দখলীয় ভূমির বিষয়েও সমাধান হয়।