আমানতকারীদের আতঙ্ক যেন কাটছেই না। একীভূতকরণ ও অবসায়নের গুঞ্জনে গ্রাহকদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ব্যাংকে ঘুরেও যারা আমানতের টাকা তুলতে পারছেন না, তাদের মানসিক অস্থিরতা বাড়ছে। একদিকে তারা আমানতের নিরাপত্তার খোঁজে এক ব্যাংক থেকে অন্য ব্যাংকে ছুটছেন, অন্যদিকে বাড়ছে ব্যাংকের বাইরে থাকা টাকার পরিমাণ। এতে আমানতের প্রবৃদ্ধি কমে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে শেষে ব্যাংক খাতে মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৩২ হাজার ৬৫ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ বেশি। অথচ গত মার্চে এই প্রবৃদ্ধি ছিল ৯ দশমিক ৫১ শতাংশ। এরপর থেকে তা কমতে থাকে। মার্চ পর্যন্ত আমানত কমার তালিকায় ছিল ১১টি ব্যাংক, যা মে মাসে বেড়ে দাঁড়ায় ১৬টিতে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর কয়েকটি ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা প্রকাশ্যে এলে ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মন্তব্যে আমানতকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এসব ব্যাংক থেকে আমানত তোলার হিড়িক পড়ে যায়। পরে বাংলাদেশ ব্যাংকের তারল্য সহায়তায় পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা হলেও ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ জারি হওয়ায় একীভূতকরণ-সংক্রান্ত অনিশ্চয়তায় নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক এখন পর্যন্ত ১৪টি ব্যাংকের পর্ষদ পুনর্গঠন করেছে। সব মিলিয়ে ১৮টি ব্যাংক পুনর্গঠন করা হবে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত রয়েছে। এতে এসব ব্যাংক থেকে আমানত তুলে নিয়ে অন্য ব্যাংকে রাখছেন গ্রাহকরা। আবার অনেকে আমানত তুলে ব্যাংকের বাইরে রাখছেন। এতে আমানতের প্রবৃদ্ধি কমছে।
জানতে চাইলে এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম স্বপন খবরের কাগজকে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক যে বিবেচনায় পাঁচ ব্যাংককে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে, তার মধ্যে এক্সিম ব্যাংক পড়ে না। একীভূত করার ঘোষণার কারণে আমাদের গ্রাহকরা আতঙ্কের মধ্যে পড়েছেন। অনেক আমানতকারী আমানত তুলে নিচ্ছেন, যা পুরো ব্যাংক খাতে আস্থাহীনতা তৈরি করেছে। এরই মধ্যে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়েছেন গ্রাহকরা।
আমানতকারীদের টাকা উত্তোলনের চাপে ব্যাংকগুলো যখন হিমশিম খাচ্ছে তখন সময়মতো গ্রাহকের টাকা ফেরত দিতে এসব ব্যাংককে প্রায় সাড়ে ৫২ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গ্রাহকের আমানত পরিশোধের সুবিধার্থে ১০টি ব্যাংককে ‘ডিমান্ড লোন’ হিসেবে ৩৩ হাজার কোটি টাকা ছাপিয়ে সরবরাহ করা হয়েছে। পাশাপাশি ৯টি ব্যাংকের চলতি হিসাবের ঘাটতিতে থাকা ১৯ হাজার কোটি টাকাও রূপান্তর করা হয়েছে ডিমান্ড লোনে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অপর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকের বাইরে থাকা টাকার পরিমাণ বাড়ছে। ঈদের মৌসুমে সাধারণত নগদ টাকার ব্যবহার বাড়ে। তবে এবার সেটি রেকর্ড ছুঁয়েছে। গত ঈদুল আজহার আগে, ৫ জুন প্রচলনে থাকা নগদ টাকার পরিমাণ দাঁড়ায় ৩ লাখ ৩৯ হাজার ১৭৯ কোটি টাকা, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এর আগের মাস, মে শেষে, প্রচলনে থাকা নগদ ছিল ৩ লাখ ১৭ হাজার ৯৮৬ কোটি টাকা। গত বছর ঈদুল আজহার আগে এই অঙ্ক ছিল ৩ লাখ ২৫ হাজার ৫৮৩ কোটি টাকা। এ ছাড়া গত মে মাস শেষে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ টাকার পরিমাণ আবার বেড়ে গেছে। গত মার্চ মাসে ব্যাংকের বাইরে মানুষের হাতে রাখা টাকার পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ২৫ হাজার কোটি। এপ্রিলে তা কিছুটা কমলেও মে মাসে আবার বেড়েছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় গত মে মাসে বেড়েছে ৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ। আর আগের মাসে এপ্রিলের তুলনায় বেড়েছে ৫ দশমিক ৯২ শতাংশ।
আলোচ্য সময়ে গ্রাহকরা এই পরিমাণ টাকা তুলে নিলেও সেটা আর ব্যাংকে ফেরত আসেনি। ফলে এই টাকা রয়ে গেছে মানুষের হাতে। মানুষ ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নেওয়ার পর যা আর জমা হয়নি, তা-ই ব্যাংকের বাইরে রাখা টাকা হিসেবে পরিচিত। এই টাকা মানুষ নিজের কাছে বা কোনো সমিতিতে রাখেন। এভাবে টাকা মালিকের নিজের হাতে কিংবা এক হাত থেকে অন্য হাতে ঘুরলেও ব্যাংকে ফেরেনি।
ব্যাংকারদের দাবি, একীভূতকরণ বা অবসায়ন-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত স্পষ্টভাবে ও দ্রুততার সঙ্গে কার্যকর না হলে সাধারণ মানুষের আস্থা আরও কমে যেতে পারে। একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, যেকোনো ব্যাংকের ক্ষেত্রে একীভূতকরণ বা অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত দ্রুত কার্যকর না করায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে, যার প্রভাব পুরো ব্যাংক খাতে পড়ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যেসব ব্যাংকের আমানত সবচেয়ে বেশি কমেছে তাদের মধ্যে রয়েছে- বেসিক ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, মধুমতি ব্যাংক, ইউনিয়ন এবং কমিউনিটি ব্যাংক। এ ছাড়া বিদেশি মালিকানাধীন আলফালাহ, স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া, উরি, হাবিব এবং স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের আমানতও কমেছে। তবে বিদেশি ব্যাংকগুলো মূলত এলসি ও কমিশনভিত্তিক ব্যবসার ওপর বেশি নির্ভর করে এবং তাদের সুদের হার কম হওয়ায় আমানত-প্রবণতাও কম থাকে।
ব্যাংক-সংশ্লিষ্টদের মতে, গত জুন মাসে ঈদ থাকায় নগদ টাকার চাহিদা বেড়ে গিয়েছিল। এ ছাড়া এ সময় কিছু ব্যাংককে একীভূত করার সিদ্ধান্তের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। এ খবরে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো থেকে আমানত তুলে নেন আমানতকারীরা। ফলে মানুষের হাতে নগদ অর্থের পরিমাণ বেড়ে যায়। এ ছাড়া কিছু ব্যাংককে টাকা ধার দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক, তাতে বাজারে ছাপানো টাকার পরিমাণও বেড়ে যায়। আবার বাংলাদেশের বর্তমান বাজারব্যবস্থায়ও নগদ অর্থের চাহিদা ব্যাপক। যেকোনো ডিজিটাল লেনদেনের ওপর করারোপ করা হয়। ফলে সাধারণ মানুষ নগদ টাকায় কেনাকাটায় স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। গুটিকয়েক শপিংমল আর হোটেল-রেস্টুরেন্ট বাদ দিলে দেশের কোথাও ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যবস্থা নেই। দোকানিরাও চান লেনদেন নগদে হোক। তা ছাড়া ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ হস্তান্তর করলে তার ওপর শুল্ক দিতে হয়। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের প্রতিটি লেনদেনে উচ্চ মাশুল দিতে হয়। এ কারণে সাধারণ মানুষ ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিচ্ছেন এবং নগদ লেনদেন করছেন। এ ছাড়া অসাধু ব্যবসায়ী, অসৎ কর্মচারী এবং চোরাকারবারিরাও ব্যাংকে টাকা জমা রাখতে আগ্রহী নন। এ কারণেও ব্যাংকের বাইরে বাড়ছে নগদ অর্থের প্রবাহ। এর ফলে অবারিত হচ্ছে ছায়া অর্থনীতির দ্বার।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ও বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরী খবরের কাগজকে বলেন, ‘সরকারের নানামুখী প্রচারণায় অনেক ব্যাংকের ওপর মানুষের আস্থা কমে গেছে। এসব ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিচ্ছেন গ্রাহকরা। এতে হয়রানিরও শিকার হতে হচ্ছে অনেককেই। ব্যাংক খাতের ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে; পাশাপাশি জড়িত ব্যক্তিদের উপযুক্ত শাস্তি দিতে হবে। অনেক দিন ধরে নানা ঘোষণা শোনা যাচ্ছে। তবে কার্যকর তেমন কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। বাস্তবে আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে এনে ব্যবসায় ঋণ বাড়াতে হবে। কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনতে উদ্যোগ নিতে হবে। তাহলেই কাজের কাজ হবে।’