ঢাকা ১০ আষাঢ় ১৪৩৩, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
২৪ জুন  ২০২৬ তারিখের নামাজের সময়সূচি মেক্সিকোর চোখ গ্রুপসেরায়, দ.কোরিয়ার সামনে নকআউট নিশ্চিতের সুযোগ অপেক্ষা ফুরাচ্ছে ওচোয়ার! ইংল্যান্ডকে জিততে দিল না ঘানা মায়ের মৃত্যুতে দেশে ফিরে গেলেন ফ্রান্সের কোচ অতঃপর দেম্বেলে… প্রথমার্ধে ইংল্যান্ডকে রুখে দিল ঘানা বিশ্বকাপে ইরানের সফর নীতি নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলের ক্যানভাসে চিরযৌবন নেইমারে ভয় নেই স্কটল্যান্ডের মাঠে হেঁটেই সফল মেসি রোনালদোর রেকর্ডের রাতে পর্তুগালের গোল উৎসব ৪১ বছরেও থামেননি রোনালদো, ভাঙলেন মেসির রেকর্ড পর্তুগিজ কিংবদন্তিতে ছাড়িয়ে শীর্ষে রোনালদো রোনালদোর বিশ্বরেকর্ড, প্রথমার্ধে উজবেকিস্তানের জালে ৩ গোল পর্তুগালের গোল করেই ইতিহাস গড়লেন রোনালদো ফ্রান্স ম্যাচ নিয়ে ভাবছেন না হালান্ড তৃণমূল থেকে ফিরহাদ-অরূপসহ ৮ নেতা বহিষ্কার উপদেষ্টা জাহেদের ফেরা ছিল তার নিজের সিদ্ধান্ত: জয়সওয়াল কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় সিএফমোটো বাংলাদেশের নতুন শোরুম উদ্বোধন পর্তুগালের একাদশে ২ পরিবর্তন ব্লিং লেদার প্রোডাক্টস লিমিটেড ঘুরে দেখলেন রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি বিস্ফোরক সংকটে বন্ধ মধ্যপাড়া পাথরখনির উত্তোলন কার্যক্রম জলবায়ু অঙ্গীকার বাস্তবায়নে বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর হরমুজ প্রণালিতে রেকর্ড তেল রপ্তানির তথ্য দিলেন ট্রাম্প কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণবিরোধী মানববন্ধন আলোচিত কৃষক কবির হোসেন আর নেই ‘জুয়া প্রতিরোধ বিল, ২০২৬’ সংসদে উত্থাপন আদব মানুষকে সম্মানিত করে, আদবহীনতা মর্যাদা নষ্ট করে: ছারছীনার পীর ছাহেব কারা পাবেন হেদায়েতের এই পরম নিয়ামত?

নৈশপ্রহরীরা নিরাপত্তাহীন

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১০:৩৯ এএম
আপডেট: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১০:৪৯ এএম
নৈশপ্রহরীরা নিরাপত্তাহীন
খবরের কাগজ ইনফোগ্রাফ

রাতের রাজধানী ঢাকায় প্রতিনিয়ত বাড়ছে খুন-ছিনতাই এবং ডাকাতিসহ ভয়ানক সব অপরাধ। এলাকাভেদে রাত হলেই বিরাজ করছে ভীতিকর থমথমে পরিবেশ। এই অবস্থায় কিছুটা সাহস ও ভরসা হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন নৈশপ্রহরীরা। কিন্তু সেই নৈশপ্রহরীরাই যখন নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তখন সাধারণ বাসিন্দা বা নাগরিকদের অবস্থা কী হতে পারে, বলার অপেক্ষা রাখে না।
 
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকার অপরাধের মাত্রায় বা ধরনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ‘দুর্বলতার’ সুযোগে পেশাদার অপরাধীরা রাতের ঢাকায় বেপরোয়া হয়ে উঠছে। এর বিপরীতে পেশাদার অপরাধীদের আগ্নেয়াস্ত্র বা ধারালো ছুরি-চাপাতির মোকাবিলায় নৈশপ্রহরীরা ব্যবহার করছেন লাঠি-বাঁশি। ফলে, এক ধরনের ঝুঁকি নিয়েই নগরবাসীর নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করছেন নৈশপ্রহরী বা নাইটগার্ডরা।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাতের অন্ধকারের সঙ্গে রাজধানীর মোহাম্মদপুর, আদাবর, মিরপুর, হাজারীবাগ, পুরান ঢাকা, যাত্রাবাড়ী, শ্যামপুর ও উত্তরার বিভিন্ন এলাকায় ভয়ের আবহ বিরাজ করতে থাকে। অনেক এলাকায় রাতে টহলের জন্য ‘নাইটগার্ড’ বা নৈশপ্রহরীরা দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু তারাও এখন ভুগছেন চরম নিরাপত্তা শঙ্কায়। শহরে খুন, চুরি–ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা দিন দিন বেড়ে যাওয়ায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিরাতে পাহারায় নামতে হয় এই প্রহরীদের। অথচ হাতে থাকে শুধু একটি লাঠি আর মুখে বাঁশি। অপরাধীদের হাতে থাকে চাপাতি, ছুরি কিংবা আগ্নেয়াস্ত্র। ফলে, নৈশপ্রহরীরা দায়িত্ব পালন করলেও তাদের মধ্যে ভয় কাজ করে। প্রতিটি মুহূর্ত আতঙ্ক তাদের গ্রাস করছে। রাতে নিরাপত্তার বিষয়ে অন্তত ১২ জন নৈশপ্রহরীর সঙ্গে কথা বলেছেন এই প্রতিবেদক। 

তারা জানিয়েছেন, আগে কোনো বিপদ আঁচ করলে লাগাতার বাঁশি বাজিয়ে পুলিশ কিংবা এলাকাবাসীকে ডাকতেন নৈশপ্রহরীরা। তখন সময়মতো সাহায্যও মিলত। কিন্তু গেল বছরের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর থেকে সেই নাগরিক সহযোগিতা কমে এসেছে। ক্ষমতা পরিবর্তনের শুরুতে এলাকাবাসী ও শিক্ষার্থীরা প্রহরীদের পাশে দাঁড়ালেও সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এখন তেমন কেউ এগিয়ে আসেন না। অন্য দিকে পুলিশও সেই অর্থে যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে পারছে না। ফলে প্রশ্ন উঠছে- যাদের ওপর ভরসা করে রাজধানীবাসী নিশ্চিন্তে রাত কাটান, সেই নৈশপ্রহরীরাই যদি নিরাপত্তার শঙ্কায় থাকেন, তবে নগরবাসীর নিরাপত্তা কোথায়?
 
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের তথ্যমতে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) ৫৪টি ওয়ার্ড এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) রয়েছে ৭৫টি ওয়ার্ড। প্রতি ওয়ার্ডে গড়ে ১০ জন করে নৈশপ্রহরী রাতে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করেন। সে হিসেবে রাজধানীতে উত্তর ও দক্ষিণ সিটির মোট ১২৯টি ওয়ার্ডে প্রায় দেড় হাজার নাইটগার্ড কর্মরত রয়েছেন। একদিকে অস্ত্রসজ্জিত অপরাধীচক্র, অন্য দিকে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সামগ্রীর অভাব; সব মিলিয়ে নৈশপ্রহরীরা কার্যত অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছেন।

ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে খুন, চুরি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন ঘটনায় প্রায় ১০ হাজার মামলা হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ২২ হাজার জনকে। ২৫৬টি খুনের ঘটনায় মামলা হয়েছে। ছিনতাইয়ের ঘটনায় ২৫০টি মামলা হয়েছে। তেজগাঁও জোনের- শিল্পাঞ্চল, হাতিরঝিল, শেরেবাংলা নগর, আদাবর ও মোহাম্মদপুরে এসব ঘটনা বেশি হয়েছে। চলতি বছরে চুরির ঘটনার সংখ্যা প্রায় ১৫০০, ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে অর্ধশত।

বাড়ছে ছিনতাই ও ডাকাতি, কমছে ভরসা
মোহাম্মদপুর, মিরপুর, উত্তরা ও যাত্রাবাড়ীর নাইটগার্ডরা বলেছেন, সম্প্রতি ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা বেড়েছে। বিশেষ করে রাত গভীর হলে অচেনা তরুণদের দলে দলে ঘোরাঘুরি করতে দেখা যায়। তাদের মধ্যে অনেকেই থাকে ধারালো অস্ত্র হাতে। সন্ত্রাসীদের প্রতিহত করতে প্রহরীদের হাতে থাকে শুধু লাঠি, আর মুখে বাঁশি।

খুন-ডাকাতি-চুরিসহ অপরাধপ্রবণ এলাকা রাজধানীর মোহাম্মদপুর। এই এলাকার রায়েরবাজারে নৈশপ্রহরীর দায়িত্ব পালন করেন আনোয়ার হোসেন (৬৫)। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমার নিরাপত্তা নেই। এখন লাঠির পাশাপাশি লোহার রডও সঙ্গে রাখি। তার পরও ভয়ে থাকি! কারণ সন্ত্রাসীদের হাতে থাকে পিস্তল, বড় রামদা। তাদের সঙ্গে আমার লাঠি টিকবে না।’ তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি ৬ বছর এই দায়িত্ব পালন করছি। কিন্তু আগে কখনো এত ভয় পেতাম না। ৫ আগস্টের পর পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে।’ 

এ সময় পাশে হাত দিয়ে ইশারা করে একটি ঘর দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘বেশি সন্ত্রাসী দেখলে আমি ওই ঘরে লুকিয়ে থাকি!’

খিলগাঁওয়ের নৈশপ্রহরী আজিজ বলেন, ‘যদি পাঁচজন চাপাতি হাতে আসে, আমরা একটা লাঠি দিয়ে কী করব? গত সপ্তাহেই আমাদের লেনে ডাকাতরা এক ভদ্রলোককে ছুরি মেরে ব্যাগ নিয়ে গেছে। তখন আমরা বাঁশি বাজালেও তারা ভয় পায়নি।’

লাঠি-বাঁশি বনাম পিস্তল-চাপাতি
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নিয়োজিত নৈশপ্রহরীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা সাধারণত রাত ১০টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। বেশির ভাগ সময়ই তারা একাই পুরো লেন বা একাধিক বাড়ি পাহারা দেন। হাতে থাকে একটি বাঁশের লাঠি এবং হুইসেল। প্রয়োজন হলে বাঁশির শব্দে অন্য গার্ডদের ডেকে সাহায্য চাওয়া যায়। কিন্তু বাস্তবে এই সামান্য প্রস্তুতি নিয়ে অস্ত্রধারী সশস্ত্র অপরাধীদের মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।

মিরপুরের গার্ড আবদুল হালিম বলেন, ‘আমরা লাঠি নিয়ে ঘুরি, কিন্তু ডাকাতরা যদি পিস্তল বা চাপাতি নিয়ে আসে তখন আমরা কী করতে পারব? অনেক সময় দেখি সন্দেহজনক লোকজন ঘোরাঘুরি করছে, কিন্তু কিছু বলার সাহস হয় না। বাঁশি বাজালেও পুলিশ অনেক সময় আসে না। আমরা দাঁড়াব কীভাবে?

রাত যত গভীর, ভয়ও তত বাড়ে
অনেক ক্ষেত্রে গার্ডদের ওপরই হামলার ঘটনা ঘটেছে। গত আগস্টে উত্তরা-১২ নম্বর সেক্টরে ডিউটিরত একজন নৈশপ্রহরীকে আহত করে পালিয়ে যায় তিনজন ডাকাত।

এই তথ্য জানিয়ে ওই এলাকার প্রহরী নূরুল ইসলাম বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনার পরও তাদের হাতে নেই কোনো কার্যকর প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম বা আইনি সুরক্ষা। রাত যত গভীর হয়, ভয়ও তত বাড়তে থাকে। কারণ রাত ২টা-৩টার দিকে সাধারণত মাদকসেবী বা ছিনতাইকারীরা সক্রিয় হয়। একবার ছিনতাইকারীরা আমাদের লাঠি ছিনিয়ে নিয়ে মারতে গিয়েছিল, তখন প্রাণে বাঁচতে দৌড়ে পালাই!’

নামমাত্র বেতন, নেই প্রশিক্ষণ
কোনো প্রতিষ্ঠান বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নাইটগার্ডদের জন্য নেই আনুষ্ঠানিক কোনো প্রশিক্ষণ। ফলে বিপদে পড়লে কীভাবে প্রতিরোধ করতে হবে, তা অনেকেই জানেন না।

গার্ডরা বলছেন, বেতন যতটা কম, ঝুঁকি ততটাই বেশি। তারা বলেন, যে টাকা মাসে পাওয়া যায় তাতে সংসার চলে না। সুরক্ষা সামগ্রী কেনার সামর্থ্যও নেই তাদের। এ ছাড়া তাদের নেই কোনো প্রশিক্ষণ। ফলে অপরাধীরা যখন অস্ত্র নিয়ে আসে, তখন প্রতিরোধ করা তো দূরের কথা, নিজেকেই পালিয়ে বাঁচতে হয়।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গণমাধ্যম শাখার উপকমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘পুলিশ রাজধানীর সব থানা এলাকা, তথা মূল সড়কসহ গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে টহল দিচ্ছে। ছিনতাইকারী-ডাকাতসহ পেশাদার অপরাধীদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হচ্ছে। যখনই কোথাও অভিযোগ পাওয়া যায়, সেখানেই পুলিশ যতটা দ্রুত সম্ভব সাড়া দেয়। নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ডিএমপি নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।’

এলাকাবাসীর যত শঙ্কা
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, চুরি-ছিনতাই ও ডাকাতি বাড়ায় গার্ডদের ওপর আর ভরসা করা যাচ্ছে না। মিরপুরের বাসিন্দা রাশিদা আক্তার বলেন, ‘আমরা মনে করি গার্ড থাকলে নিরাপদ। কিন্তু তারা নিজেরাই যদি নিরাপদ না থাকে, তাহলে আমাদের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত?’

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ও সহযোগী অধ্যাপক শাহরিয়ার আফরিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা নিরাপত্তার জন্য পরিবর্তন চেয়েছি। কিন্তু মানুষ রাতে নিরাপদে ঘুমাতেই পারছে না- এমন পরিবর্তন তো আমরা চাইনি! আগে অপরাধীরা অপরাধ করে চলে যেত- কিন্তু এখন অপরাধ শেষে সবার সামনে খুনও করছে। একজন অপরাধী অপরাধ করার পরে আপনি বলছেন তেমন কিছু হয়নি, সব ঠিক আছে! এই ধরনের বক্তব্যের ফলে অপরাধীরা অপরাধ করতে উৎসাহ পাচ্ছে।’

শাহরিয়ার আফরিন বলেন, ‘৫ আগস্টের পর থেকে পুলিশের উপস্থিতি কম। পুলিশ হামলা এবং মবের শিকার হচ্ছেন। আবার এসবের সঠিক বিচার হচ্ছে না। অপরাধীরা যদি বার্তা পেত যে, অপরাধ করে ছাড় পাওয়া সম্ভব নয়, শাস্তি পেতে হবে, তাহলে অপরাধের প্রবণতা কমত।

এই অপরাধ বিশেষজ্ঞ মনে করেন, রাজধানীতে ক্রমবর্ধমান চুরি-ছিনতাই ও ডাকাতি রোধে গার্ডদের আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা সরঞ্জাম দিতে হবে। একই সঙ্গে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, পুলিশি টহল ও কমিউনিটি সচেতনতা বাড়াতে হবে।’

 অস্ত্রের বিপরীতে লাঠি-বাঁশি দিয়ে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয় মন্তব্য করেন পরিকল্পনাবিদ ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক খবরের কাগজকে বলেন, এ ক্ষেত্রে প্রশাসন তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করার প্রয়োজনীয়তা আছে। কিন্তু পুলিশ অনেক ক্ষেত্রেই তাদের অর্পিত দায়িত্ব পালন করছে না। তাদের নিজেদের ভেতরেই একধরনের ভীতি কাজ করছে। গণ-অভ্যুত্থানের পর পুলিশ কাজে যেতে ভয় পায়! বিশেষ করে রাতে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণ না হলে নৈশপ্রহরীরাও নিরাপদে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না।

বরিশালে অর্থনৈতিক ইউনিট বেড়েছে, পিছিয়ে কর্মসংস্থানে

প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬, ০৮:৪৪ এএম
আপডেট: ২৩ জুন ২০২৬, ০৮:৪৭ এএম
বরিশালে অর্থনৈতিক ইউনিট বেড়েছে, পিছিয়ে কর্মসংস্থানে
ছবি: সংগৃহীত

দেশে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তারের ধারায় গত এক দশকে বরিশাল বিভাগে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও সেবা খাতের সম্প্রসারণের ফলে বিভাগে অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৭৮ দশমিক ২ শতাংশ। তবে অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা বাড়লেও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে দেশের অন্যান্য বিভাগের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে বরিশাল। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত ‘অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪’-এর জাতীয় প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে বরিশাল বিভাগে মোট অর্থনৈতিক ইউনিট রয়েছে ৬ লাখ ৫৬ হাজার ৯৪৪টি। ২০১৩ সালের শুমারিতে এ সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৬৮ হাজার ৫৬২টি। সে হিসাবে এক দশকে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ২ লাখ ৮৮ হাজার ৩৮২টি অর্থনৈতিক ইউনিট।

দেশের মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের মধ্যে বরিশাল বিভাগের অংশীদারত্ব ৫ দশমিক ৬১ শতাংশ। অর্থাৎ দেশের প্রতি ১০০টি অর্থনৈতিক ইউনিটের মধ্যে প্রায় ছয়টি বরিশাল বিভাগে অবস্থিত।

তবে কর্মসংস্থানের চিত্র তুলনামূলকভাবে ভিন্ন। শুমারির তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন অর্থনৈতিক ইউনিটে বর্তমানে ১২ লাখ ৭৯ হাজার ১২০ জন কর্মরত রয়েছেন। এটি জাতীয় কর্মসংস্থানের মাত্র ৪ দশমিক ১৮ শতাংশ। কর্মসংস্থানের দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে ঢাকা বিভাগ, যেখানে রয়েছে জাতীয় কর্মসংস্থানের ৯ দশমিক ৫১ শতাংশ।

অর্থনৈতিক শুমারির তথ্য অনুযায়ী, বরিশালের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বড় অংশই সেবা খাতনির্ভর। বিভাগে মোট ৫ লাখ ৯৬ হাজার ৩৯২টি অর্থনৈতিক ইউনিট সেবা খাতের আওতায় পরিচালিত হচ্ছে। এটি মোট ইউনিটের প্রায় ৯০ দশমিক ৮ শতাংশ। অন্যদিকে শিল্প খাতে রয়েছে ৬০ হাজার ৫৫২টি ইউনিট, যা মোট ইউনিটের ৯ দশমিক ২ শতাংশ।

প্রতিবেদনে আরও দেখা গেছে, বরিশালের অর্থনৈতিক ইউনিটগুলোর বড় অংশই ক্ষুদ্র, কুটির ও পারিবারিক পর্যায়ের উদ্যোগ। আকারভিত্তিক শ্রেণিকরণে বিভাগে কুটিরশিল্প রয়েছে ২ লাখ ৪৮ হাজার ৪১২টি এবং মাইক্রো শিল্প রয়েছে ৩ লাখ ৮৬ হাজার ৫৭৪টি। এ ছাড়া ক্ষুদ্র শিল্প রয়েছে ২০ হাজার ১৪০টি, মাঝারি শিল্প ১ হাজার ৫৬৯টি এবং বৃহৎ শিল্প মাত্র ২৪৯টি।

বরিশাল বিভাগের মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের মধ্যে স্থায়ী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৩ লাখ ৬৬ হাজার ৯৩৮টি। অস্থায়ী প্রতিষ্ঠান রয়েছে ১৯ হাজার ৯৪৬টি। আর অর্থনৈতিক খানা বা পারিবারিক অর্থনৈতিক ইউনিট রয়েছে ২ লাখ ৭০ হাজার ৬০টি।

কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও স্থায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর অবদান বেশি। এসব প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত রয়েছেন ৮ লাখ ৯৭ হাজার ৪৬৮ জন। অর্থনৈতিক খানাগুলোতে কর্মরত আছেন ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৩৩৩ জন এবং অস্থায়ী প্রতিষ্ঠানে রয়েছেন ২৫ হাজার ৩১৯ জন।

জেলাভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, অর্থনৈতিক ইউনিট ও কর্মসংস্থান উভয় ক্ষেত্রেই শীর্ষে রয়েছে বরিশাল জেলা। জেলায় মোট অর্থনৈতিক ইউনিট ১ লাখ ৭২ হাজার ৬৭৬টি এবং কর্মরত রয়েছেন ৩ লাখ ৭১ হাজার ৫৯২ জন।

এর পর রয়েছে পটুয়াখালী। সেখানে অর্থনৈতিক ইউনিট ১ লাখ ৩২ হাজার ১৬৪টি এবং কর্মসংস্থান ২ লাখ ৪৫ হাজার ৯৬ জন। ভোলায় রয়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার ৮৮৯টি ইউনিট এবং ২ লাখ ২১ হাজার ৬৯৪ জন কর্মরত।

পিরোজপুরে ৯৫ হাজার ৬০০টি ইউনিটে কর্মরত রয়েছেন ১ লাখ ৮৪ হাজার ৬৩২ জন। বরগুনায় রয়েছে ৭৪ হাজার ৬৭০টি ইউনিট এবং ১ লাখ ৪০ হাজার ৩৬০ জন কর্মসংস্থানে নিয়োজিত। সবচেয়ে কম অর্থনৈতিক ইউনিট রয়েছে ঝালকাঠি জেলায়। সেখানে ইউনিট সংখ্যা ৬২ হাজার ৯৪৫টি এবং কর্মরত রয়েছেন ১ লাখ ১৫ হাজার ৭৪৬ জন।

বরিশাল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি এবায়েদুল হক চাঁন বলেন, ‘অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা বৃদ্ধি কোনো অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য, উৎপাদন ও সেবামূলক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের গুরুত্বপূর্ণ সূচক। বরিশালে গত এক দশকে এই প্রবৃদ্ধি নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি, স্থানীয় বাজার সম্প্রসারণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতির গতিশীলতার ইঙ্গিত বহন করে।’

তবে কর্মসংস্থানের জাতীয় অংশীদারত্ব তুলনামূলক কম হওয়ায় উৎপাদনমুখী শিল্পায়ন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠা এখনো বিভাগের অন্যতম চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক জ্যোতিময় বিশ্বাস। তিনি বলেন, ‘গ্রামাঞ্চলে পারিবারিক পর্যায়ের উদ্যোগ ও ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এটিকে অতিরঞ্জিতভাবে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির প্রধান সূচক হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। ভারী শিল্প খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে পারলে অর্থনৈতিক ইউনিট বৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মসংস্থানেও আরও বড় অগ্রগতি সম্ভব হবে।’

ইসলামী ব্যাংকে বায়তুল মালের নামে কোটি কোটি টাকা চাঁদা আদায়

প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬, ০৮:০৯ এএম
আপডেট: ২৩ জুন ২০২৬, ১১:৪৯ এএম
ইসলামী ব্যাংকে বায়তুল মালের নামে কোটি কোটি টাকা চাঁদা আদায়
ইসলামী ব্যাংক

ইসলামী ব্যাংকে ‘বায়তুল মাল’-এর নামে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। এই চাঁদা দিতে কেউ অনাগ্রহ প্রকাশ করলে তাকে বদলি ও হয়রানি করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন–ব্যাংকটিতে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, যেন বায়তুল মাল না দিলে সেখানে চাকরি করার কারও অধিকার নেই। গতকাল সোমবার চট্টগ্রাম নগরীর কোতোয়ালি মোড়সংলগ্ন বাংলাদেশ ব্যাংকের আঞ্চলিক কার্যালয়ের সামনে পাঁচটি ইসলামি ব্যাংকের চাকরিচ্যুত ব্যাংকারদের মানববন্ধন ও অবস্থান কর্মসূচিতে এই অভিযোগ করা হয়।

মানববন্ধনে যোগ দেওয়া ইসলামী ব্যাংকের চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাঈদ উল্লাহ মানববন্ধন চলাকালে সাংবাদিকদের অভিযোগ করে বলেন, ‘যেদিন বেতন হতো, সেদিন একটি দল ব্যবস্থাপকের কক্ষে আসত। তারা শাখা ব্যবস্থাপকের কক্ষে বসে খাওয়া-দাওয়া করতেন। কিছুক্ষণ পর ব্যবস্থাপকের পক্ষ থেকে সবাইকে একটি বার্তা পাঠানো হতো। সবাই যেন ইয়ানত কিংবা বায়তুল মাল দিয়ে দেন। অফিস ছুটির আগে অফিসের পিয়ন অথবা দারোয়ান তালিকা নিয়ে টেবিলে টেবিলে হাজির হতেন। যার জন্য যত টাকা নির্ধারণ করা হয় তা তিনি দিতে বাধ্য। যদি কেউ কম দিতে চান কিংবা দিতে গড়িমসি করেন, তাহলে তার কপালে জোটে নানা দুর্ভোগ। আমরা চাকরি করেছি কোনো রাজনৈতিক দলকে মাসে মাসে অর্থ দেওয়ার জন্য নয়। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে আমরা কাজ করেছি নিজের পরিবারের জন্য। কিন্তু তারা জোর করে আমাদের কাছ থেকে বায়তুল মাল আদায় করতেন। শুধু বায়তুল মাল নয়, আরও নানাভাবে দলটির পক্ষ থেকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে টাকা আদায় করা হতো। ৫ আগস্টের পর বায়তুল মাল আদায়ের হার আরও বেড়ে যায়। আমরা কিছুটা গড়িমসি করেছি বলেই আমাদের চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।’ 

কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া একাধিক কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে খবরের কাগজকে জানান, ‎ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে ‘বায়তুল মাল’ বা দলীয় তহবিলের নামে বছরের পর বছর ধরে বাধ্যতামূলকভাবে কোটি টাকা চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নিয়ন্ত্রণে থাকা ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এই অর্থ তোলা হয়। তারা জানান, বায়তুল মালের নামে দলীয় চাঁদা আদায়ের বিষয়টি ওপেন সিক্রেট হলেও বিষয়টি সেভাবে প্রকাশ পায়নি। তবে সম্প্রতি বিশিষ্ট অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়েরের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি পোস্ট এবং কিছু ব্যাংকিং নথিপত্র ফাঁসের পর বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।

‎ভুক্তভোগীরা জানান, ইসলামি ভাবধারা, একচেটিয়া আস্থা ও গ্রাহক-নির্ভরতাকে পুঁজি করে ব্যাংকটি দেশের শীর্ষস্থানে পৌঁছালেও এর ভেতরে একটি নির্দিষ্ট দলের নামে নীরব চাঁদাবাজি চলছে দীর্ঘদিন ধরে। ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদমর্যাদা অনুযায়ী প্রতি মাসে ১ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়, যা কর্মকর্তাদের বেতন থেকে কেটে রাখা বা সংগ্রহ করা হয়।

‎বাধা দিলেই লাঞ্ছনা ও দূরবর্তী স্থানে বদলি

‎ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ব্যাংকের অভ্যন্তরে সব পর্যায়ে ওই নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের অনুসারীরা প্রভাবশালী অবস্থানে থাকায় সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জিম্মি হয়ে পড়েছেন। কেউ এই চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে বা বাধা দিলে তাকে কর্মস্থলে লাঞ্ছিত ও হুমকি দেওয়া হয়। এমনকি কম টাকা দিতে চাইলেও বিভিন্ন মাধ্যমে হেনস্তা করাসহ শাস্তিমূলক হিসেবে দূরবর্তী কোনো শাখায় বদলি (পানিশমেন্ট ট্রান্সফার) করা হয়।

‎প্রভাবশালী এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করেও লাভ হয় না বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। উল্টো অভিযোগকারীর বিরুদ্ধেই নানামুখী কলাকৌশল ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। চাকরি এবং জীবনের নিরাপত্তার ভয়ে সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পান না। তবে সাম্প্রতিক সময়ে অতিষ্ঠ হয়ে কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর প্রতিবাদ জানাতে শুরু করেছেন।

ব্যাংক স্টেটমেন্টে কোটি টাকার লেনদেন

চাকরিচ্যুত ব্যাংকাররা জানান, সম্প্রতি একটি ‎ফাঁস হওয়া নথির চিত্র দেখলেই বায়তুল মালের নামে সারা দেশে কী পরিমাণ চাঁদাবাজি করা হচ্ছে, এর ভয়াবহতা কত বিশাল তার কিছুটা আঁচ করা যায়। তারা জানান, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জোনের ‘বায়তুল মাল’ পরিচালনার জন্য একটি যৌথ ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করা হতো। ব্যাংকের এসপিও আলতাফ উদ্দিন, এসএভিপি নাজিম উদ্দিন এবং এরশাদুল হকের নামে পরিচালিত ওই যৌথ অ্যাকাউন্টের ব্যাংক স্টেটমেন্টে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত মাত্র ১১ মাসেই ১ কোটি ৫৩ লাখ টাকা লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। সেখানে কারও কাছ থেকে ৫ হাজার, কারও কাছ থেকে ২ হাজার বা ১ হাজার টাকা করে জমা নেওয়ার বিবরণ রয়েছে।

‎এ ছাড়া অপর একটি নথিতে ‘ইসলাম প্রতিষ্ঠার কাজে’ ব্যবহারের উদ্দেশ্যে মোটরসাইকেল ক্রয়ের জন্য অর্থ সংগ্রহের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মিলেছে। বেশ কয়েকটি রসিদে বায়তুল মালের নামে সংগৃহীত এই অর্থ সরাসরি রাজনৈতিক দলের ফান্ডে যাচ্ছে বলেও উল্লেখ রয়েছে।

‎সাধারণ কর্মকর্তা ও সচেতন মহলের প্রত্যাশা

‎নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ধর্মীয় অনুভূতির সুযোগ নিয়ে এভাবে কর্মজীবীদের কষ্টার্জিত অর্থ রাজনৈতিক ফান্ডে রূপান্তর করা সম্পূর্ণ অনৈতিক।

‎সচেতন মহল এবং ব্যাংকসংশ্লিষ্টদের দাবি–বায়তুল মালের নামে এ পর্যন্ত মোট কত টাকা জমা করা হয়েছে এবং সেসব টাকা ঠিক কী কী খাতে ব্যবহার করা হয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলটির স্বচ্ছতার স্বার্থেই প্রকাশ করা উচিত। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতের ভেতর এমন দলীয় সিন্ডিকেট ও জোরপূর্বক অর্থ আদায় বন্ধে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর নজরদারি জরুরি।

হাজারীবাগ থেকে হেমায়েতপুর পূর্ণতা পায়নি চামড়া শিল্পনগরী

প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬, ০৯:৩৩ এএম
আপডেট: ২২ জুন ২০২৬, ১০:৩৩ এএম
হাজারীবাগ থেকে হেমায়েতপুর পূর্ণতা পায়নি চামড়া শিল্পনগরী
খবরের কাগজ ইনফোগ্রাফ

২৩ বছরেও পূর্ণতা পায়নি চামড়া শিল্পনগরী স্থানান্তর প্রক্রিয়া। ২০০৩ সালে রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে এই শিল্পটি স্থানান্তরের অনুমোদন দেওয়া হয়। তারপর নানা চড়াই-উৎরাই পার হয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সাভারের হেমায়েতপুরে এই শিল্পটি স্থানান্তর করার কাজ শেষ হয় ২০২১ সালে। তবে আজও সেই শিল্পনগরী অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় কেনা গাড়িগুলো পাঁচ বছর পরও পরিবহন পুলে জমা দেওয়া হয়নি।

প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ১৫৫টি চামড়া প্রক্রিয়াকরণ কারখানাকে পরিবেশসম্মত স্থানে স্থানান্তরের কাজ শেষ করার কথা ছিল ২০০৫ সালে। কিন্তু ১০ বার সংশোধন করে সময় বাড়িয়ে তা শেষ করা হয়েছে ২০২১ সালের জুনে। সময় বেশি লেগেছে সাড়ে ১৫ বছর।

‘চামড়া শিল্পনগরী’ স্থানান্তরে প্রাথামিকভাবে খরচ নির্ধারণ করা হয় ১৭৬ কোটি টাকা। পরে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে খরচ হয়েছে ৯৩৮ কোটি টাকা। চামড়াশিল্প থেকে নির্গত বর্জ্য পরিশোধনের জন্য একটি কমন ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট বা সিইটিপি স্থাপনসহ সব কিছু করা হয়েছে সাভার ও কেরানীগঞ্জ উপজেলার ৬০০ বিঘা জমিতে।

তার পরও পরিবেশগত সনদ পাচ্ছেন না ট্যানারি শিল্পমালিকরা। বিক্রেতারা পাচ্ছেন না চামড়ার দাম। হেমায়েতপুর ট্যানারিশিল্প এলাকা থেকে নির্গত বর্জ্য ধলেশ্বরী নদীতে পড়ছে। বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা গেছে। 

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ট্যানারি শিল্পনগরী প্রকল্পটি প্রণয়ন ‘আগাগোড়া’ ছিল ত্রুটিপূর্ণ। তাই একবার নয়, দুবার নয়, ১০ বার প্রকল্পটি সংশোধন করা হয়েছে। প্রকল্প খরচও ১৭৬ কোটি থেকে বেড়ে ৯৩৮ কোটি টাকায় ঠেকেছে, বেড়েছে ৪৩৪ শতাংশ। সময় বেড়েছে ৬১৬ শতাংশ। প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২০ কোটি টাকা খরচ করে ৬০০ বিঘা জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। ৩২ কোটি টাকায় ২ লাখ ৮০ হাজার ঘনমিটার জমি উন্নয়ন, ৮ কোটি ৩৩ লাখ টাকা খরচ করে ৫ তলা প্রশাসনিক ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ৪৭৭ কোটি টাকা খরচ করে এসটিপিসহ কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) নির্মাণ করা হয়েছে ৫১ বিঘা জমিতে। চারটি মডিউলসংবলিত এই সিইটিপি নির্মাণে একবার প্রকল্পটি সংশোধন করে ৩ বছর সময় বাড়ানো হয়।

তবে নির্মাণ সত্ত্বেও তা কার্যকর করা হয়নি। প্রকল্পটির কাজের গতি ছিল খুবই ধীর। শিল্পনগরীর অগ্নিনির্বাপন সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য ১১ কোটি ৬৯ লাখ টাকা খরচ করে নির্মাণ করা হয় সীমানা প্রাচীরসহ ফায়ার স্টেশন। নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সাড়ে ১২ লাখ টাকায় পুলিশ স্টেশন নির্মাণ করা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে প্রায় ৬ কোটি টাকা, শিল্পনগরীর বর্জ্যপানি দ্রুত নিষ্কাশনে প্রায় ৩ কোটি টাকা খরচ করে ড্রেন নির্মাণ করা হয়। ২৭ কোটি টাকা খরচ করে পানি সরবরাহ পাইপলাইন, প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকার বিদ্যুৎ লাইন, ১ কোটি ২৯ লাখ টাকার সড়ক বাতি, ৮ কোটি টাকা খরচ করে ডাম্পিং ইয়ার্ড, ২টি গভীর নলকূপ, ৮টি সোলার প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে। এভাবে শতভাগ কাজ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এতে খরচ হয়েছে ৯৩৮ কোটি টাকা। বিপুল অঙ্ক ব্যয়ের পরও সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন হয়নি প্রকল্পটি।

সাবেক প্রকল্প পরিচালক ব্যবহার করছেন জিপ গাড়ি

প্রতিবেদন সূত্রে (আইএমইডি) জানা গেছে, হেমায়েতপুরের হরিণধরায় চামড়া শিল্পনগরীর শতভাগ অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও প্রত্যাশিত মাত্রায় কার্যকর হয়নি। রক্ষণাবেক্ষণেও সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। বিশেষ করে সিইটিপির কার্যক্ষমতা, ড্রেনেজব্যবস্থা ও বর্জ্যব্যবস্থাপনার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এখনো কাঙ্ক্ষিত মানে পৌঁছায়নি। স্থাপিত সিইটিপির ধারণক্ষমতা দিনে মাত্র ২৫ হাজার ঘনমিটার, যা বর্তমানে উৎপন্ন বর্জ্যপানির পরিমাণের তুলনায় অনেক কম। ফলে সিইটিপি প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করছে না। এদিকে কঠিন বর্জ্য অন্য কোনো শিল্পের উপজাত হিসেবে ব্যবহার না হওয়ায় খোলা জমিতে জমা করে রাখা হচ্ছে, এর ফলে ঘটছে গুরুতর পরিবেশ দূষণ।

শিল্পনগরীতে ১৬২টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে সেগুলোর সব কটিতে উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হয়নি। প্রকল্পের জন্য ২টি জিপ গাড়ি ও ৩টি মাইক্রোবাস কেনা হয়। প্রকল্প শেষ হওয়ার ৫ বছর পরও তা পরিবহন পুলে জমা দেওয়া হয়নি। সাবেক প্রকল্প পরিচালক যতীন্দ্র নাথ পাল একটি জিপ গাড়ি ব্যবহার করছেন। একটি মাইক্রোবাস সাভার বিসিক ট্যানারি শিল্পনগরীতে ব্যবহার হচ্ছে। প্রকল্পটি ৫ বছর আগে শেষ হলেও এখনো ৪৭টি অডিট আপত্তি নিষ্পত্তি হয়নি।

এলডব্লিউজির সনদ না পাওয়ার কারণ

শিল্পনগরীতে নির্মিত সিইটিপি প্রয়োজনের তুলনায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। ট্যানারির সংখ্যা ও বর্জ্যের পরিমাণের তুলনায় এর কার্যকারিকতা ও অপারেশনাল দক্ষতা পর্যাপ্ত নয়। এর ফলে নিরবচ্ছিন্নভাবে বর্জ্য পরিশোধন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। আবার অনেক ট্যানারির নিজস্ব ইটিপি নেই। প্রকল্প শেষ হলেও মানসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত হয়নি আজ পর্যন্ত। শুধু তাই নয়, শ্রমিকদের কর্মপরিবেশও পূর্ণাঙ্গ পরিবেশসম্মত হয়নি বলে মতপ্রকাশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

অপরদিকে লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) সনদের জন্য উপযুক্ত হতে কেমিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড, বায়োলজিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড, টোটাল ডিজলভড সলিডস (টিডিএস) মান বজায় রাখা আবশ্যক। কিন্তু এসব কিছু পূরণ হচ্ছে না। 

উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও রপ্তানি কমেছে

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্যানারির মালিকদের মধ্যে সর্বোচ্চ ৫২ শতাংশ স্নাতক পাস। সাভারে নতুন প্লটে পরিকল্পিত ট্যানারি স্থানান্তরের পর কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা অনেক বেড়েছে। তবে রপ্তানি সক্ষমতা কমে গেছে। শিল্পনগরীতে এখনো ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু হয়নি। ফলে বিদেশি ক্রেতা ও স্থানীয় উদ্যোক্তারা দ্রুত প্রয়োজনীয় সহায়তা পাচ্ছেন না।

অবকাঠামো উন্নত হলেও শ্রমিকরা এখনো বঞ্চিত

৪৯ শতাংশ শ্রমিক জানিয়েছেন, চামড়া শিল্পনগরীর কর্মপরিবেশ কিছুটা উন্নত হয়েছে। তবে ২ শতাংশ জানান, পরিস্থিতি প্রায় একই রকম আছে। ৭০ শতাংশ শ্রমিক জানান, আগের তুলনায় পরিচ্ছন্নতা কর্মকাণ্ড বেড়েছে। কাজের সময় দুর্ঘটনা অর্ধেক কমেছে। তবে অবকাঠামো উন্নত হওয়ার ৬ বছর পরও ২৮ শতাংশ শ্রমিক জানান, কারখানা থেকে তাদের কোনো ধরনের নিরাপত্তা সরঞ্জাম দেওয়া হয় না।

ট্যানারি কারখানায় কাজ করার সময় রাসায়নিকের গন্ধ ও বর্জ্যের সমস্যা আগের তুলনায় অনেক কমেছে। আগে ৫৯ শতাংশ শ্রমিক ত্বকের রোগ, চুলকানি ও অ্যালার্জি সমস্যায় ভুগলেও সাভার ট্যানারিতে এখন ভুগছেন ৩৬ শতাংশ। ৯৪ শতাংশ শ্রমিক জানান, কারখানায় কোনো স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা মেডিকেল সুবিধা নেই। কাজের সময় দুর্ঘটনায় ক্ষতি হলেও ৪০ শতাংশ শ্রমিক জানান, ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয় না।

চামড়া শিল্পনগরীর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মেহরাজুল মাঈয়ানের কাছে জানতে চাইলে তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নিয়েছি বছরখানেক হলো। প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে ৫ বছর আগে। কাজেই সেই সময়ের ঘটনা বলা সম্ভব না।’

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পটি দীর্ঘ সময় পর বাস্তবায়িত হলেও এর ফল পাওয়া যাচ্ছে না। পরিবেশের অবনতির কারণে এলডব্লিউজির সনদ পাওয়া যাচ্ছে না। ব্যাপক সম্ভাবনা থাকার পরও চামড়ার দাম পাওয়া যাচ্ছে না। রপ্তানি কমে যাচ্ছে।

বুড়িগঙ্গার মতোই ধলেশ্বরী নদী দূষণ হচ্ছে। তাই রপ্তানির বাজার ধরতে এটাকে পরিবেশবান্ধব করতে হবে। কীভাবে করতে হবে, সরকারকে সেটা ভাবতে হবে। আইএমইডির মূল্যায়নকে গুরুত্ব দিতে হবে। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের কোনো প্রকল্প দীর্ঘ না হয় সেদিকেও নজর দিতে হবে।’

মালেশিয়ায় শ্রমবাজার খোলার আশা আছে জটিলতাও

প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬, ০৯:১১ এএম
আপডেট: ২২ জুন ২০২৬, ১০:০৮ এএম
মালেশিয়ায় শ্রমবাজার খোলার আশা আছে জটিলতাও
ছবি: সংগৃহীত

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দুই দিনের সফরে গতকাল রবিবার মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে পৌঁছেছেন। সেখানে আজ তিনি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে প্রথমে একান্ত এবং পরে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন। বৈঠকে উভয় দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক ও দুটি ‘নোট অব এক্সচেঞ্জ’ সই হওয়ার কথা থাকলেও মূল টার্গেট থাকবে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য বন্ধ শ্রমবাজার খুলে দেওয়ার ঘোষণা। যদিও প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে তার সম্ভাবনা কম। 

এই সফরে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য ফের মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার প্রত্যাশা অনেক। কিন্তু এ রকম ঘোষণা আসার ক্ষেত্রে দুই দেশেই রয়েছে অনেক জটিল ও গভীর সমস্যা। কাজেই এই সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধানও করতে হবে যৌথভাবে। কারণ মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগে বাংলাদেশের সরকারের ভেতরে ও বাইরের সিন্ডিকেট যেমন দায়ী, তেমনি মালয়েশিয়ার সরকারের ভেতরের ও বাইরের সিন্ডিকেটও সমানভাবে দায়ী।

এ ক্ষেত্রে একটি মজার বিষয় হচ্ছে, এই সিন্ডিকেট নির্মূলে দুই দেশের সরকারি পর্যায়ে জোরালো কোনো উদ্যোগও নিতে দেখা যায়নি। সিন্ডিকেট নির্মূল ও দুর্নীতি রোধে দুই দেশের যৌথ পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, কিন্তু সে উদ্যোগটি অনুপস্থিত। ফলে সিন্ডিকেটের সদস্যরা বাংলাদেশে মামলা খেয়ে মালয়েশিয়া বা অন্য দেশে অবস্থান করলেও যৌথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

আবার সিন্ডিকেটের সঙ্গে মালয়েশিয়ার নাগরিক যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে এই শ্রমবাজারের ভবিষ্যৎ কতটা স্থায়ী হবে তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। তবুও আশা, এই সফরে ইতিবাচক কিছু একটা হবে। 

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর খবরের কাগজকে জানান, মালয়েশিয়ার এই শ্রমবাজারে সিন্ডিকেট প্রথা উভয় দেশের সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শুধু বহুরূপী প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হয়। এর বিরুদ্ধে সরকারি পর্যায়ে শক্ত অবস্থান নিতে দেখা যায়নি। না দেশে, না মালয়েশিয়ায়। সিন্ডিকেটের দুর্নীতিবাজরা নানা ভিসায় গিয়ে সে দেশে অবস্থান করলেও উভয় সরকার যৌথ পদক্ষেপ নেয়নি।

দুই দেশের মন্ত্রী পর্যায়ে এবং যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের মিটিংয়ে সংকট নিয়ে ভাসা ভাসা আলোচনা হলেও কার্যকর পদক্ষেপ আজও দেখা যায়নি। কাজেই দুর্নীতিবাজদের নির্মূল না করতে পারলে যেনতেনভাবে এই শ্রমবাজারটি খুললেও ফের বন্ধ হয়ে যাবে। এই শ্রমবাজারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে শক্ত পদক্ষেপ না নিলে এই সংকট ফের তৈরি হবে এবং বাজারটি বন্ধ হয়ে যাবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ‘মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আমাদের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। নানা কারণে এই শ্রমবাজার প্রায় দুই বছর ধরে বন্ধ হয়ে আছে। শ্রমিক নিয়োগে সিন্ডিকেট, অতিরিক্ত ব্যয়, ভিসা জটিলতা এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার অনিয়ম নিয়ে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে যে মামলা আছে, সেগুলো প্রত্যাহারসহ বহু বিতর্ক রয়েছে এখানে। এই শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের প্রতারণার হাজারও ঘটনা নিয়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন শ্রম সংস্থাগুলোর চাপে আছে মালয়েশিয়া সরকার।’

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এসব চাপ উত্তরণে উপযুক্ত পদক্ষেপ না নিলে শ্রমবাজারটি খোলার ক্ষেত্রে আরও দেরি হতে পারে। তবে আজ দুই প্রধানমন্ত্রীর একান্ত বৈঠক থেকে শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে বড় সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, শ্রমিক নিয়োগে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির মেয়াদ এখনো শেষ হয়নি, তাই নতুন করে এ বিষয়ে কোনো চুক্তি হবে না। কিন্তু সফরে শ্রমবাজার পুনরায় পুরোপুরি সচল করা, নতুন কর্মী নিয়োগ বৃদ্ধি এবং অনিয়মিত বাংলাদেশি কর্মীদের বৈধতা দেওয়ার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের প্রায় আট লাখ কর্মী রয়েছেন। এর মধ্যে তিন লাখ রয়েছেন অনিয়মিত। এদের বৈধকরণের বিষয়টিও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তোলা হবে। যদিও এর আগে বিভিন্ন সময় বিদেশি কর্মীদের বৈধকরণ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে একটি বড় সমস্যা হচ্ছে দেশটি বিদেশি কর্মীদের যতবারই বৈধকরণ করেছে, ততবারই নতুন করে ট্যুরিস্ট ভিসায় বা নদীপথে অবৈধ উপায়ে বিদেশি কর্মীরা ঢুকে পড়ে অধিক সংখ্যায় অবৈধ হয়েছেন। এ কারণে ফের আনুষ্ঠানিক বৈধকরণের ঘোষণা দেবে কি না, সেটি সময় বলে দেবে।

এদিকে জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বায়রার নেতারা মালয়েশিয়া সফরের আগে সিন্ডিকেট বন্ধে প্রধানমন্ত্রীকে একটি স্মারকলিপি দিয়েছেন। সংগঠনের সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফকরুল ইসলাম জানান, অতীতের সিন্ডিকেট ব্যবস্থার কারণে মালয়েশিয়ায় কর্মীদের অভিবাসন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

শত শত বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি ব্যবসা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। দুর্নীতি, অনিয়ম ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বেড়েছে। সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বারবার সংকট ও বন্ধের মুখে পড়েছে। তিনি শ্রমবাজারটি সিন্ডিকেটমুক্ত করতে সব বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। তিনি আরও বলেন, নেপালসহ ১৪টি দেশ সিন্ডিকেটমুক্ত উপায়ে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠায়। নেপালেও সিন্ডিকেট করার চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু সে দেশের সরকার সেটি হতে দেয়নি। তাই শুধু বাংলাদেশি কর্মী পাঠাতেই কেন সিন্ডিকেট থাকবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সফরের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে সফর-পরবর্তী বাস্তবায়নের ওপর। অতীতে বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের সফরে অনেক চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হলেও তার বাস্তব অগ্রগতি প্রত্যাশিত ছিল না। তাই এবার শুধু চুক্তি নয়, বরং এফটিএ চূড়ান্তকরণ, বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা দূর করা, বিনিয়োগ সহজীকরণ, ব্যবসায়িক যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং শ্রমবাজার ব্যবস্থাপনায় বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়াই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

তবে প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফর বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে রপ্তানি বাজার, নতুন বিনিয়োগ, নতুন কর্মসংস্থান এবং নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তার এই সময়ে এই সফরকে কেবল একটি রাষ্ট্রীয় সফর নয়, বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক কৌশল ও আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। 

বর্তমানে মালয়েশিয়া বাংলাদেশের অন্যতম বড় বিদেশি বিনিয়োগকারী দেশ। দেশটির বিনিয়োগ রয়েছে জ্বালানি, অবকাঠামো, পরিবহন, লজিস্টিকস এবং শিল্প খাতে। প্রধানমন্ত্রীর সফরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সেমি-কন্ডাক্টর, তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, লজিস্টিকস, বন্দর উন্নয়ন, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং উৎপাদনশীল শিল্পে নতুন বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি আসতে পারে। বাংলাদেশের ২০ কোটির বিশাল বাজার, তরুণ কর্মশক্তি, ভৌগোলিক অবস্থান এবং ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি মালয়েশিয়ার বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।

এ ছাড়া এই সফর আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ এনে দিতে পারে। কারণ মালয়েশিয়া আঞ্চলিক সংস্থা আসিয়ানের অন্যতম সদস্যরাষ্ট্র। বাংলাদেশও আসিয়ানের সদস্য হতে চায়, এ জন্য দেশটির সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ। মালয়েশিয়াতেও রয়েছে দুই লক্ষাধিক রোহিঙ্গা। বাংলাদেশে আছে ১৩ লাখ। এসব রোহিঙ্গা মায়ানমারে প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে মালয়েশিয়ার মাধ্যমে আসিয়ানকে সম্পৃক্ত করার সুযোগ আছে। এ নিয়ে দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে আলোচনাও হবে বলে কূটনীতিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। 

ইসলামী ব্যাংক থেকে চাকরিচ্যুতদের নতুন চাকরি মিলছে না

প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬, ০৮:০২ এএম
ইসলামী ব্যাংক থেকে চাকরিচ্যুতদের নতুন চাকরি মিলছে না
ইসলামী ব্যাংক

ইসলামী ব্যাংক থেকে চাকরিচ্যুত প্রায় ১০ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে অধিকাংশের নতুন করে চাকরি পাওয়ার বয়স চলে গেছে। কিছুসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারীর চাকরির বয়স থাকলেও তারা কোথাও সহজে চাকরি পাচ্ছেন না। ইসলামী ব্যাংক থেকে ছাঁটাইয়ের বিষয়টি নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছে। যে কারণে অনেক দক্ষ ও মেধাবী কর্মকর্তা নতুন করে চাকরি পাচ্ছেন না। 

  • অধিকাংশের চাকরির বয়স চলে গেছে
  • যাদের বয়স আছে তাদের জন্য ‘টার্মিনেটেড’ শব্দটি নতুন চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে
  • পরিবারগুলোতে আর্থিক অনটন, দাম্পত্য কলহ, মানসিক বিষণ্ণতা এবং সামাজিক মর্যাদাহানির এক ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিতে কয়েক দফায় ব্যাপক জনবল ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটে। যথাযথ আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে ঢালাওভাবে চাকরিচ্যুত করার কারণে কর্মকর্তাদের জীবনে এক চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে। অনেকের বয়স বেশি হওয়ায় যেমন নতুন কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুযোগ মিলছে না, তেমনই সামাজিক অপবাদ ও ‘ট্যাগিং’য়ের কারণে অন্য কোথাও দাঁড়ানোর পথ বন্ধ হয়ে গেছে। একাধিক ভুক্তভোগীর সঙ্গে আলাপ করে এ তথ্য জানা গেছে। 

‎একাধিক চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা খবরের কাগজকে জানান, চাকরিচ্যুত কর্মকর্তাদের মধ্যে যাদের এখনো চাকরির বয়স রয়েছে তারাও চরম বিপাকে আছেন। কোথাও আবেদন করে সাড়া পাচ্ছেন না। তাদের আবেদনপত্রের সঙ্গে যখন চাকরিচ্যুতির বিষয়টি উল্লেখ করা হয়, তখন নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান তাদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করছে। এখানে তাদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাকে মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। এ কারণে অনেক দক্ষ ও মেধাবী কর্মকর্তা নতুন করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আবেদন করেও সাড়া পাচ্ছেন না। 

ভুক্তভোগীরা জানান, আকস্মিক এই ছাঁটাইয়ে শুধু তাদের রুটি-রুজির পথ বন্ধ হয়েছে তা নয়, বরং বয়সজনিত সীমাবদ্ধতার কারণে তাদের এক অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিয়েছে। এর ফলে তাদের পরিবারগুলোতে আর্থিক অনটন, কলহ, মানসিক বিষণ্ণতা এবং সামাজিক মর্যাদাহানির এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে।

তারা জানান, আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের পেশাগত জীবনে একবার কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হওয়ার ঘটনা পরবর্তী সময়ে তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। ব্যাংকটি প্রায় ১০ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীকে টার্মিনেট করেছে। কিন্তু টার্মিনেশন লেটারে সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ করেনি, যা তাদের পরবর্তী চাকরি পেতে বড় ধরনের জটিলতায় ফেলে দিয়েছে। এ কারণে ইসলামী ব্যাংক থেকে চাকরি হারানো কিছুসংখ্যক ব্যক্তির এখনো চাকরির বয়স থাকা সত্ত্বেও তারা নতুন করে চাকরি পাচ্ছেন না। যখনই নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান জানে আবেদনকারীকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে, তখন তারা সন্দেহের চোখে দেখে।

‎ইসলামী ব্যাংকের চাকরিচ্যুত সিনিয়র অফিসার সৈয়দ মোহাম্মদ ফখরুল আবেদীন (৩৪) খবরের কাগজকে বলেন, “পরীক্ষা দিয়ে মেধার জোরে চাকরি পেয়েছিলাম, অথচ আজ চোরের অপবাদ নিয়ে সমাজে মুখ লুকাতে হচ্ছে। ‎২০১৭ সালের পর নিয়োগ পেয়েছি বলেই ধরে নেওয়া হলো আমি কোনো এক বিশেষ গ্রুপের লোক। অথচ আমি শতভাগ নিয়ম মেনে, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় পাস করে চাকরিতে ঢুকেছিলাম। বৃদ্ধ মা-বাবাকে নিয়ে আমার সংসার। বয়স ৩৪ বছর হয়ে গেছে, এই বয়সে নতুন কোনো ব্যাংক বা করপোরেট প্রতিষ্ঠান আর আমাকে ইন্টারভিউতেই ডাকছে না। অনেকে তো মুখ ফুটে বলেই দেয়–‘আপনারা তো অমুক আমলের লোক, আপনাদের চাকরি দিলে আমাদের রিস্ক।’ ধারদেনা করে দিন চলছে, নিজের সম্মানটুকু হারিয়ে এখন পুরোপুরি সামাজিক ও মানসিকভাবে পঙ্গু হয়ে গেছি।”

আরেক ভুক্তভোগী মো. নওশাদ জামান (৩৯) জানান, পরিবারে যে ব্যক্তি একসময় প্রধান ছিল, সে আজ সবার বোঝা। তিনি বলেন, “ব্যাংকিং ক্যারিয়ারে দীর্ঘ ৭ বছর ৯ মাস সততার সঙ্গে পার করার পর এভাবে বিদায় নিতে হবে কখনো ভাবিনি। ৫ আগস্টের পর এক কলমের খোঁচায় আমাদের ক্যারিয়ার ধ্বংস করে দেওয়া হলো। বয়স ৩৮ হওয়ায় নতুন চাকরির বাজারে আমি সম্পূর্ণ ‘অনুপযুক্ত’। সমাজ ও আত্মীয়স্বজন এমনভাবে তাকায় যেন আমরা কোনো অপরাধ করে ব্যাংক থেকে বিতাড়িত হয়েছি। নিজের জমানো টাকা যা ছিল তা-ও শেষ। পারিবারিক মূল্যবোধ ও সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকাটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিজের সন্তানদের স্কুলের বেতন দিতে পারছি না, এর চেয়ে বড় মানসিক নির্যাতন আর কী হতে পারে?”

চাকরিচ্যুত আরেক কর্মকর্তা জোনায়েদ মো. কামরুল হাকিম (৩৮) বলেন, ‘ব্যাংকের টার্গেট পূরণ করতে দিন-রাত এক করেছি, বিনিময়ে পেলাম বিনা নোটিশে ছাঁটাই। ‎বিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ, এমবিএর ভালো রেজাল্ট নিয়ে বের হয়ে ব্যাংকে ঢুকেছিলাম। গত বছরও দিন-রাত এক করে ব্যাংকের আমানত সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করেছি। অথচ আমাদের অপরাধ আমরা নির্দিষ্ট একটি অঞ্চলের বাসিন্দা এবং নির্দিষ্ট একটি সময়ে চাকরিতে ঢুকেছি। চাকরি হারিয়ে এখন ছোটখাটো ব্যবসা বা অন্য কিছু করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু সেখানেও ‘ব্যাংক থেকে বিতাড়িত’ তকমাটা পিছু ছাড়ছে না। পারিবারিক ও সামাজিকভাবে সম্পূর্ণ একঘরে হয়ে পড়েছি। এই বয়সে এসে নতুন করে জীবন শুরু করার কোনো পথ খোলা নেই।’

‎সাদিব সাব্বির (৩৬) নামে আরেক চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা বলেন, “যে হাত একসময় মানুষকে সাহায্য করত, সেই হাত এখন ধার নেওয়ার জন্য পাততে হয়। ‎বয়স ৩৬ বছর। ব্যাংকিং সেক্টরে আর রি-এন্ট্রি নেওয়ার কোনো আইনি বা প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ আমার নেই। হোম লোন ও পার্সোনাল লোনের কিস্তি শোধ করার জন্য এখন ব্যাংক থেকে প্রতিনিয়ত নোটিশ আসছে। যে সমাজ আমাকে একজন সফল ব্যাংকার হিসেবে সম্মান করত, সেই সমাজ এখন আমাকে এড়িয়ে চলে। বৃদ্ধ মা-বাবার ওষুধের খরচ চালাতে পারছি না। চাকরিচ্যুত হওয়ার পর থেকে পরিবারে আমার অবস্থান এখন একজন ‘ব্যর্থ’ মানুষের মতো। এই তীব্র অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবমাননা সহ্য করে বেঁচে থাকা প্রতিদিনের এক জীবন্ত যুদ্ধ।”