প্রতিবছরই ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার বাড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, চলতি বছরের বেশির ভাগ মৃত্যুর কারণ শক সিনড্রোম। যা অনেকটা ২০২২ সালের মতো। এ বছর যারা মারা গেছেন তাদের বেশির ভাগ হাসপাতালে এসেছেন দেরিতে। তবে আগের বছরগুলোতে কেন মৃত্যু বেশি হয়েছে তার কারণ জানা যায়নি। সে বিষয়ে কোনো গবেষণা হয়নি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত পাঁচ বছরে ডেঙ্গুতে মৃত্যু বেড়েছে সাড়ে ৩ গুণ। ২০১৯ সালে ৬১৮ জন আক্রান্তের বিপরীতে ১ জনের মৃত্যু হয়েছে। ২০২৪ সালে এসে মৃত্যু হয়েছে ১৭৬ জনের বিপরীতে ১ জনের। ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২৩৪ জনের বিপরীতে ১ জনের মৃত্যু হয়েছে। যা ২০২২ সালের কাছাকাছি।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১৯ সালে ১ লাখ ১ হাজার ৩৭৪ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন। মৃত্যু হয় ১৬৪ জনের। আক্রান্তের বিবেচনায় ৬১৮ জনের মধ্যে ১ জনের মৃত্যু হয়। ২০২০ সালে করোনার কারণে ডেঙ্গুর দিকে নজর ছিল না। ২০২১ সালে আক্রান্ত হন ২৮ হাজার ৪২৯ জন। মৃত্যু হয় ১০৫ জনের। আক্রান্তের বিবেচনায় ২৭০ জনে ১ জনের মৃত্যু হয়। ২০২২ সালে ৬২ হাজার ৩৮২ জন আক্রান্ত হন। মৃত্যু হয় ২৮১ জনের। আক্রান্তের বিবেচনায় ২২২ জনে ১ জনের মৃত্যু হয়। ২০২৩ সালে ডেঙ্গু পরিস্থিত ভয়াবহ আকার ধারণ করে। এ বছরের মতো আগে কখনোই এত আক্রান্ত বা মৃত্যু হয়নি। এই বছর আক্রান্ত হন ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন। মৃত্যু হয় ১ হাজার ৭০৫ জনের। আক্রান্তের বিবেচনায় ১৮৮ জনে ১ জনের মৃত্যু হয়। ২০২৪ সালে ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন আক্রান্তের মধ্যে ৫৭৫ জনের মৃত্যু হয়। চলতি বছরের ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন ৪২ হাজার ৫০৯ জন। মৃত্যু হয়েছে ১৮১ জনের। আক্রান্তের বিবেচনায় ২৩৪ জনে ১ জনের মৃত্যু হয়।
চলতি বছরের ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মৃত্যু হওয়া ১৮১ জনের মধ্যে ১১৪ জনের মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণ করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তাতে দেখা গেছে, ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে (ডিএসএস) বেশি রোগী মারা গেছেন এবং এক্সপান্ডেড ডেঙ্গু সিনড্রোম দ্বিতীয় সর্বোচ্চ কারণ। শক সিনড্রোমে ৫৬ জন, এক্সপান্ডেড ডেঙ্গু সিনড্রোমে ৩৬ জন, উভয় সমস্যা ছিল ৯ জনের, এ ছাড়া ডেঙ্গুর সঙ্গে কার্ডিয়াক শকে মারা যান ৯ জন। যারা মারা গেছেন তাদের বেশির ভাগ দেরিতে হাসপাতালে এসেছেন। হাসপাতালে ভর্তির ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৬৬ জন অর্থাৎ ৫৭.৮৯ শতাংশ, ২৪-৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ১৮ জন, ৪৮-৭২ ঘণ্টার মধ্যে ৫ জন, ৭২ ঘণ্টা পর ২৫ জন মারা গেছেন । মৃতদের গড়ে হাসপাতালে থাকার সময় ২.৫ দিন। বেশির ভাগ রোগী হাসপাতালে এসেছেন জ্বরে ৩-৬ দিন ধরে ভোগার পর।
গত সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কনফারেন্স রুমে সংবাদ সম্মেলন করে এসব তথ্য জানায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবু জাফর বলেন, ‘ডেঙ্গুতে মৃত্যুর কারণ শক সিনড্রোম, রোগীদের হাসপাতালে দেরিতে আসা, এর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অন্য রোগ মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।’ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মারা যাওয়া ৯০ জনের মধ্যে ৩৯ জনই দীর্ঘমেয়াদি নানা রোগে ভুগছিলেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে প্লাজমা লিকেজ হয়। সার্কুলেশন থেকে তরল পদার্থ (প্লাজমা) বের হয়ে পেটে ও ফুসফুসের চারপাশে জমা হয়। তখন রোগীর রক্তচাপ কমে যায়, শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি হয়। এটাকে ডেঙ্গু শক সিনড্রোম বলে। এই সিনড্রোম ডেঙ্গুর একটি গুরুতর ও বিপজ্জনক পর্যায়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি ১০৮ জনের মৃত্যু হয়েছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায়। যা মোট মৃত্যুর ৫৯.৬৬ শতাংশ। এরপর বরিশাল বিভাগে ২৮ জন বা ১৫.৪৬ শতাংশ, চট্টগ্রামে বিভাগে ২৩ জন বা ১২. ৭০ শতাংশ। এ ছাড়া রাজশাহী বিভাগে ১০ জন বা ৫. ৫২ শতাংশ, এ ছাড়া ময়মনসিংহে ৬ জন ৩. ৩১ শতাংশ, খুলনা বিভাগে ৫ জন বা ২.৭৬ শতাংশ, ঢাকা বিভাগে ২ জন বা ১.১০ শতাংশ। রংপুর, সিলেটে কোনো মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়নি।
বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৬ থেকে ৩০ বছর বয়সীদের মধ্যে আক্রান্ত ও মৃত্যু বেশি। এই বয়সে আক্রান্ত হয়েছে ১৬ হাজার ২২১ জন। যা মোট চলতি বছরে ডেঙ্গু আক্রান্তের মোট ৩৮. ১৫ শতাংশ। মৃত্যু হয়েছে ৬৩ জনের।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের তুলনায় ডেঙ্গুতে মৃত্যুর হার কম। কারণ সেসব দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা যতটা উন্নত বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ততটা উন্নত না।
ডেঙ্গু আগে শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক ছিল। কিন্তু দিন দিন এটা ছড়িয়ে পড়েছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। গত বছর থেকেই ডেঙ্গু ঢাকার বাইরে ছড়িয়েছে ব্যাপকহারে। কিন্তু ঢাকার বাইরে সে রকম চিকিৎসার বিকেন্দ্রীকরণ হয়নি। চিকিৎসার জন্য যে গাইডলাইন দেওয়া হয়, রোগী ব্যবস্থাপনার সে রকম প্রাকটিক্যাল অভিজ্ঞতা না থাকায় অনেক সময় যথাযথ চিকিৎসা হয় না। আস্থার অভাবে এবং উন্নত চিকিৎসার আশায় ঢাকার বাইরের অনেক রোগী ঢাকামুখী হন।
আইসিডিডিআরবির সিনিয়র কমিউনিকেশন ম্যানেজার এ কে এম তারিফুল ইসলাম খান বলেন, ১৯ সাল থেকে ২৪ সাল পর্যন্ত প্রতিবছরই মৃত্যু কেন বেশি হয়েছে, এটা নিয়ে কোনো গবেষণা হয়নি। তবে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কারণ বের করা হয়েছে। বিভিন্ন ফোরামে আলোচনা হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে, দ্রুত সময়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়া এবং চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার অপর্যাপ্ততা এবং ডেঙ্গুর ধরন। তবে ধরন তেমন একটা দায়ী না।
জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘চিকিৎসাব্যবস্থা অতিমাত্রায় কেন্দ্রীভূত হওয়ার কারণে আক্রান্তের অনুপাতে মৃত্যুর হার বাড়ছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্বাস্থ্যসেবা আলাদা করে সেখানে মানুষকে চিকিৎসা নেওয়ার জন্য আকর্ষণ করাতে পারলে মৃত্যু হার কমানো যেতে পারে। এ জন্য সেখানে চিকিৎসার সব ধরনের সাপোর্ট থাকতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘ডেঙ্গুর পরীক্ষার ব্যবস্থা বিনামূল্যে এবং বাসার কাছাকাছি থাকলে মানুষ পরীক্ষায় আগ্রহী হবে। সতর্ক থাকবে। জ্বর হলে অনেকেই টাকা খরচ করে পরীক্ষা করাতে চান না। কিন্তু জ্বর কমার পরই তো জটিলতা শুরু হয়। ডেঙ্গুর এখন জটিলতা হচ্ছে শক হচ্ছে। রক্তক্ষরণ হলে তো বোঝা যায়। কিন্তু ব্লাড প্রেশার কমে যাওয়া চোখে পড়ে না। এরকম জটিলতায় পড়ে গিয়ে শেষ মুহূর্তে হাসপাতালে আসে। বড় হাসপাতালে খুব ভিড় থাকে। রোগীদের তিন ঘণ্টার মধ্যে পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে হয়। কিন্তু ভিড়ের কারণে তা সম্ভব হয় না।’