‘রানার ছুটেছে
তাই ঝুম ঝুম
ঘণ্টা বাজছে রাতে’
কালের দুই কিংবদন্তি, সুকান্ত ভট্টাচার্যের কথায় এবং হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠের রানার গানের সেই রানার আর নেই। পোস্ট অফিসের জৌলুস হারানোর সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেছে রানারের ছুটে চলা। বেশ অনেক আগে থেকেই রাতে রানারের ছুটে চলা নেই। ব্রিটিশ ভারতের পর পাকিস্তান আমল পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশের সময়কালও ৫৪ বছর হয়ে গেছে। প্রযুক্তির কল্যাণে পরিস্থিতি এখন অনেক পাল্টে গেছে। রাতে এখন রানারের ঘণ্টা শোনা না গেলেও মোবাইল ফোনের টুংটাং শব্দ বেজেই চলে। তথ্যপ্রযুক্তির এই দাপটেই মিইয়ে গেছে পোস্ট অফিসের পথচলা। ডাকঘর চলছে রীতিমতো ধুঁকে ধুঁকে।
আজ বিশ্ব ডাক দিবস। সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি পালন করা হবে। ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের উদ্যোগে এ উপলক্ষে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ডাক ভবনে দুই দিনের বর্ণাঢ্য কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। এ বছর বিশ্ব ডাক দিবসের প্রতিপাদ্য- ‘জনগণের জন্য ডাক: স্থানীয় পরিষেবা, বৈশ্বিক পরিসর’। সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরকারের সংযোগ বাড়ানো, টেকসই উন্নয়নে ডাকসেবার ভূমিকা তুলে ধরা এবং আধুনিক ডাকব্যবস্থার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোই দিবসটি পালনের উদ্দেশ্য।
১৯৬৯ সাল থেকে প্রতিবছর ৯ অক্টোবর বিশ্ব ডাক দিবস পালিত হয়ে আসছে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে ১৯৭৩ সাল থেকে প্রতিবছর দিবসটি পালিত হচ্ছে। স্বাধীনতার পর দেশ-বিদেশে যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম ছিল ডাক বিভাগ।
নব্বইয়ের দশকেও ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে ডাকঘরই ছিল ভরসা। এর পর থেকে তথ্যপ্রযুক্তি প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তিগত চিঠিপত্র আদান-প্রদানের ঐতিহ্য গতি হারিয়ে ফেলতে শুরু করে। প্রযুক্তির প্রসারের এই ধাক্কা বিশ্বের সব দেশেই ডাক বিভাগের ওপর পড়েছে। তবে উন্নত দেশগুলো ডাকসেবাকে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবায় রূপান্তর করেছে। বাংলাদেশেও তেমন চেষ্টা মাঝেমধ্যে দেখা যায়।
পোস্টাল ক্যাডার বা ডাক ক্যাডার দেশের প্রাচীন ক্যাডার সার্ভিসগুলোর একটি হলেও হাল আমলে বিসিএস চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে এই নিয়ে খুব একটা আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। আবার অবসরের কারণে খালি হওয়া পদগুলোতে নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারেরও খুব একটা তোড়জোড় দেখা যায় না। জানতে চাইলে ডাক বিভাগের সিনিয়র অ্যাকাউন্টস অফিসার জামাল উদ্দিন গতকাল বুধবার দৈনিক খবরের কাগজকে বলেন, ‘এখানে অনুমোদিত পদের সংখ্যা ১৬ হাজার ৯৩৪টি। সেখানে লোকবল আছে মাত্র ৯ হাজার ৮৪৮ জন।’
ডাক বিভাগের অতিরিক্ত মহাপরিচালক এস এম হারুনুর রশীদ বলেন, ‘পোস্ট অফিস একদম ধুঁকে ধুঁকে চলছে, বিষয়টা ঠিক তা নয়। প্রযুক্তির কল্যাণে বিভিন্ন সেক্টরেই এর প্রভাব পড়েছে। প্রযুক্তির এই সময়ে ব্যক্তিগত চিঠির পরিমাণ কমে গেছে ঠিক, কিন্তু দাপ্তরিক চিঠিপত্র ও পার্সেল সেবা বেড়েছে অনেক। প্রযুক্তির কল্যাণে আমাদের সেবার মানও কিন্তু বেড়েছে। যেমন ধরুন, একটা পার্সেল গন্তব্যে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত কখন কোথায় আছে, কতখানি এগিয়েছে তার অবস্থান গ্রাহক সরাসরি মনিটর করতে পারেন। দেশে ই-কমার্স বিস্তৃতিতে আমাদের বড় ভূমিকা আছে। ট্রাফিক পুলিশের ভিডিও কেস নিষ্পত্তিতে আমাদের বড় ভূমিকা আছে। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পোস্টাল ব্যালটে ভোট গ্রহণের ক্ষেত্রে আমাদের ব্যস্ততা অনেক বাড়বে। অনুমান করা হচ্ছে ১০-৫০ লাখ ভোটার পোস্টাল ভোট দেবেন। বিশেষ করে প্রবাসীদের পার্সেল সেবায় অনেক উন্নতি হয়েছে। মানুষের আগ্রহ বেড়েছে। তিন বছর আগেও আমরা বিমানকে বিল পরিশোধ করতাম বছরে ২০-২২ কোটি টাকা। কিন্তু গত বছর আমরা বিল পরিশোধ করেছি ৩৮ কোটি টাকা। চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসেই ৩৮ কোটি টাকা বিল হয়ে গেছে। আরও তিন মাস তো রয়েছেই। আমরা ভূমির পর্চাসেবা দিয়ে হিউজ আয় করছি এবং এ ক্ষেত্রে গ্রাহকের কমপ্লেইন জিরো।’