দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন-খ্যাত তৈরি পোশাকশিল্পে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলে একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ছোট ও মাঝারি আকারের কারখানা। গত এক বছরে স্থায়ী ও অস্থায়ীভাবে ১১৭টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। এতে বেকার হয়েছেন এসব কারখানার লক্ষাধিক শ্রমিক। যদিও অপেক্ষাকৃত দক্ষ শ্রমিকদের অনেকেই অন্য কোথাও কাজ খুঁজে নিয়েছেন।
ব্যবসায়ী নেতারা দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ট্যারিফ বৃদ্ধি, চট্টগ্রাম বন্দরের সেবা চার্জ বৃদ্ধি, আর্থিক সংকট, এলসি জটিলতা, আন্তর্জাতিক বাজারে কার্যাদেশ কমে যাওয়া এবং শ্রমিক অসন্তোষ পোশাক খাতকে অস্থিরতার মধ্যে ফেলেছে। তাদের শঙ্কা, নীতিগত সহায়তা, আর্থিক নিশ্চয়তা ও এলসি জটিলতার নিরসন না হলে বন্ধ পোশাক কারখানার তালিকা আরও দীর্ঘ হবে।
গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে পোশাক খাতে অস্থিরতা চলছে। শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে পোশাক খাতে মোট কারখানার সংখ্যা ১ হাজার ৭২০টি। এর মধ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ৫০টি কারখানা স্থায়ীভাবে ও ৬৭টি কারখানা অস্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। বন্ধের তালিকায় বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) ১৮টি কারখানাও রয়েছে।
চট্টগ্রাম শিল্প-পুলিশের সুপার আবদুল্লাহ আল মাহমুদ খবরের কাগজকে বলেন, শ্রমিক অসন্তোষসহ নানা কারণে চট্টগ্রামের পোশাক কারখানাগুলো বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে সাব-কন্ট্রাক্টে কাজ করে এমন কারখানার সংখ্যা বেশি। আবার অধিকাংশ কারখানা বন্ধ হওয়ার পর পুনরায় চালু হয়েছে। বর্তমানে ১১৭টি কারখানা বন্ধ রয়েছে। ছোট বা মাঝারি কারখানায় শ্রমিকের সংখ্যা খুব বেশি নয়। বড় কারখানায় শ্রমিক বেশি বেকার হয়েছেন। তবে কাজ জানা শ্রমিকরা অন্যখানে কাজ খুঁজে নেন। কিন্তু অপেক্ষাকৃত কম দক্ষ শ্রমিকরা স্থায়ীভাবে বেকার থেকে যান। বন্ধ কারখানাগুলোর মালিকরা বেতন-ভাতা পরিশোধ করলেও কাজ হারিয়ে দিশেহারা এসব কারখানার শ্রমিকরা। শুধু কারখানা বন্ধই নয়, এক বছরে চট্টগ্রামের ৭০টি কারখানায় ৩১৫ বারেরও বেশি শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনা ঘটেছে। বেতন-ভাতা ও চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে এ অসন্তোষ শিল্প পরিবেশকে আরও অস্থির করে তুলেছে।
বিজিএমইএর প্রথম সহসভাপতি সেলিম রহমান বলেন, চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণ এবং জাতীয় রপ্তানিতে অংশীদারত্ব বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। বন্ধ থাকা বা পরিচালনা করতে না পারা কারখানাগুলোকে পুনরায় চালু করতে এই পদক্ষেপ চট্টগ্রামের এসএমই শিল্পের জন্য ফলপ্রসূ হবে।
গত ৩১ মে অনুষ্ঠিত বিজিএমইএ ২০২৫-২০২৭ মেয়াদের পরিচালনা পর্ষদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম থেকে ভোটার সংখ্যা কমেছিল ১৩৩ জন। এ থেকেও বোঝা যায়, ওই ১৩৩ জন ব্যবসায়ী আর পোশাক কারখানার ব্যবসায় নেই। তবে বিজিএমইএ বলছে, তাদের তালিকাভুক্ত ১৮টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। চালু আছে মাত্র ৩৪৩টি। বন্ধ হওয়া কারখানাগুলোর প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক বেকার হয়েছেন।
অন্যদিকে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান অধিদপ্তরের হিসাব মতে, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ সদস্যভুক্ত কারখানাসহ তৈরি পোশাকের সঙ্গে জড়িত স্থায়ী-অস্থায়ী প্রায় ১ হাজার ৭০০ কারখানা রয়েছে চট্টগ্রামে। এর মধ্যে অধিকাংশ অস্থায়ী বা সাব-কন্ট্রাক্ট অর্ডার নিয়ে পণ্য তৈরি করে। সরকার পরিবর্তনের পর বিভিন্ন সমস্যার কারণে শতাধিক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এ থেকে প্রায় এক লাখ শ্রমিক বেকার হয়ে গেছেন।
তবে এ সংস্থার তথ্যমতে, শ্রমিকরা এক কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে অন্য কারখানায় চাকরিতে যোগদান করেন। কাজ জানা শ্রমিকদের বেশি দিন বেকার থাকতে হয় না। তবু কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া শুভ সংবাদ নয়।
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান অধিদপ্তর চট্টগ্রামের উপ-মহাপরিদর্শক মোহাম্মদ মাহবুবুল হাসান খবরের কাগজকে বলেন, গত বছরের ৫ আগস্টে সরকার পরিবর্তনের পর অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় অনেকেই ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন। হালকা বা মাঝারি কারখানার সংখ্যাই বেশি। আবার কিছু কারখানা নতুন চালু হয়েছে। তবে কোনো চালু কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া উচিত নয়। এতে শ্রমিক-মালিক উভয় পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হন।
বিজিএমইএ পরিচালক ক্লিফটন গ্রুপের প্রধান নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ট্যারিফ বৃদ্ধি, অর্ডার কম আসা, চট্টগ্রাম বন্দরের বর্ধিত ট্যারিফের প্রভাব পড়েছে পোশাক কারখানার ওপর। হঠাৎ করে অতিরিক্ত খরচ বহন করতে পারছেন না অনেক পোশাক কারখানার মালিক। ফলে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা বাকি পড়ে যাচ্ছে। বেতন-ভাতার জন্য শ্রমিকরা রাস্তা অবরোধ করছেন। মোটকথা, একধরনের অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। সরকারকে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। ব্যবসা টিকিয়ে রাখার জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে সরকারকে। কারণ বৈদেশিক রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক থেকে। এ খাত ধ্বংস হতে দেওয়া যাবে না।