বরিশালের ঐতিহ্যবাহী মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব মাঠে মসজিদের সাইনবোর্ড টানিয়ে টিনশেড ঘর নির্মাণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত ১৭ নভেম্বর রাতে মুসলিম ইনস্টিটিউট জামে মসজিদের নামে সেখানে সাইনবোর্ড ও একটি অস্থায়ী ঘর নির্মাণ করা হয়। পরদিন মঙ্গলবার সেখানে ফজর ও জোহরের নামাজও আদায় করা হয়। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে ক্লাবের একাধিক সাবেক নেতা মোহামেডান মাঠে যান। তারা সেখানকার নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেন। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় উত্তেজনা দেখা দিয়েছে।
মুসলিম সোসাইটির সভাপতির পরিচয় দেওয়া অধ্যাপক আব্দুর রব বলেন, ‘মোহামেডান মাঠের জমিটি মুসলিম সোসাইটির মালিকানাধীন স্টেটের মালিকানাভুক্ত। তাই এখানে মসজিদের কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। এ কারণে সোমবার রাতে মাঠের ভেতর টিনশেড ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। ফজরের নামাজ আদায় হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুরে মসজিদের সাইনবোর্ড টানানো হয় এবং জোহরের নামাজও আদায় করা হয়।’
মসজিদ কমিটির সভাপতি ও জামায়াতে ইসলামী-সংশ্লিষ্ট আইনজীবী সালাহউদ্দিন মাসুম বলেন, ‘মুসলিম সোসাইটির মালিকানাধীন স্টেটে মসজিদ নির্মাণ করা হচ্ছে। এখানে কারও বাধা দেওয়ার অধিকার নেই।’
২০২৩ সালের জানুয়ারিতে গভীর রাতে তৎকালীন সিটি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ ক্লাবটি ভেঙে দেন। পরে ক্লাবের পক্ষ থেকে আন্দোলন হয়। সেই সময় মুসলিম সোসাইটি কেন দাবি উত্থাপন করেনি, এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো জবাব দেননি।
ওই বছর গঠিত মাঠ ও ক্লাব রক্ষা কমিটির সদস্য ডা. মনীষা চক্রবর্তী বলেন, যখন অবৈধ উচ্ছেদ হয়েছিল, তখন সোসাইটির নামে কোনো দাবি ছিল না।
তিনি বলেন, ‘২০২৩ সালের ১০ জানুয়ারি গভীর রাতে তৎকালীন সিটি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ ক্লাবটি ভেঙে দেন। সিটি করপোরেশন অবৈধভাবে ক্লাবটি ভেঙে ফেলেছিল। তখন আমরা উচ্চ আদালতে গিয়েছিলাম। জমিটি ক্লাবের মালিকানায় বলেই আদালত আমাদের পক্ষে আদেশ দিয়েছেন। ফলে মাঠে কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না।’
স্থানীয়রা জানান, যেখানে ঘরটি নির্মাণ করা হয়েছে, একসময় সেখানে ক্লাবের মূল ভবন ছিল। ২০২৩ সালের ১০ জানুয়ারি গভীর রাতে বরিশাল সিটি করপোরেশন কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের ভবন ভেঙে ফেলে।
তারা বলেন, এখন একটি মহল জায়গাটি দখল করতে ধর্মীয় অনুভূতি সামনে রেখে কৌশলে মসজিদ নির্মাণের পাঁয়তারা চালাচ্ছেন। বরিশাল কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের পাশেই অবস্থিত বঙ্গবন্ধু অডিটোরিয়াম ও মিলনায়তন। বছরজুড়ে এখানে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক চর্চা হয়। বরিশালের ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক চর্চা ধ্বংস করতে একটি মহল মোহামেডান ক্লাব মাঠে মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে।
ক্লাবের সদস্যরা জানান, ব্রিটিশ আমলে ‘জাতীয় জাগরণের প্রতীক’ হিসেবে বরিশাল মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ১৯৩৭ সালে জমিদার সৈয়দ ফজলে রাব্বীর দান করা ৩ দশমিক ৩০ শতাংশ জমিতে ১৯৪২ সাল থেকে মোহামেডান ক্লাবে কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছিল। পরে দলিল ও বিএস খতিয়ানেও জমিটি ক্লাবের মালিকানা হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
ক্লাবটি প্রথম দিকে মুসলিম যুবকদের খেলাধুলার কেন্দ্র হলেও পরে সব ধর্ম-বর্ণের মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। বরিশালের ক্রীড়াঙ্গনে এর অবদান দীর্ঘদিনের। ১৯৩৮ সালে শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হকের অনুপ্রেরণায় কলকাতা মোহামেডানের সঙ্গে বরিশাল মোহামেডানের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচও অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আহসান কবির হাসান জানান, নিবন্ধিত ৩০০ সদস্যের ভোটে পরিচালনা কমিটি গঠনের বিধান থাকলেও ২০১৪ সালের পর নানা জটিলতায় নতুন কমিটি হয়নি। তিনি বলেন, ‘এই ক্লাবে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি আব্দুর রহমান বিশ্বাস, এম ডব্লিউ লকিতুল্লাহ, বি ডি হাবিবুল্লাহ, বিসিবির সাবেক পরিচালক প্রয়াত আলমগীর হোসেন আলো।