বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সামরিক ড্রোন উৎপাদনে চীনের সঙ্গেই হাত মেলাল ঢাকা। মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) ঢাকা সেনানিবাসে বিমানবাহিনীর এনেক্স ভবনে দুই দেশের মধ্যে এ-সংক্রান্ত একটি চুক্তি সই হয়। বাংলাদেশ বিমানবাহিনী এবং চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সিইটিসি ইন্টারন্যাশনালের মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
আইএসপিআরের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ‘মনুষ্যবিহীন আকাশযান (ইউএভি)’ উৎপাদন ও সংযোজন কারখানা স্থাপন এবং প্রযুক্তি হস্তান্তর প্রকল্পের জন্য চুক্তিটি হয়। ‘গভর্নমেন্ট টু গভর্নমেন্টের (জিটুজি) আওতায় ঢাকা সেনানিবাসে বিমানবাহিনীর সদর দপ্তরে আনুষ্ঠানিকভাবে ওই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এ সময় বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
এ চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ বিমানবাহিনী এবং চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সিইটিসি ইন্টারন্যাশনাল যৌথভাবে বাংলাদেশে একটি অত্যাধুনিক ইউএভি উৎপাদন ও সংযোজন সুবিধা স্থাপন করবে। এর মধ্যে রয়েছে প্রযুক্তি হস্তান্তর, সক্ষমতা বৃদ্ধি, শিল্প-দক্ষতা উন্নয়ন এবং যৌথ প্রযুক্তিগত সহযোগিতা, যা দীর্ঘ মেয়াদে ইউএভি উৎপাদনে স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যে সহায়ক হবে।
আইএসপিআর আরও জানায়, বাংলাদেশ বিমানবাহিনী প্রাথমিকভাবে বিভিন্ন ধরনের ‘মিডিয়াম অল্টিটিউড লো এন্ডুরেন্স (মেল) ড্রোন এবং ভার্টিক্যাল টেক-অফ অ্যান্ড ল্যান্ডিং (ভিটিওএল) ড্রোন উৎপাদন ও সংযোজনের সক্ষমতা অর্জন করবে। এ ছাড়া বাংলাদেশ বিমানবাহিনী নিজস্ব ইউএভি বা ড্রোন এই প্রকল্পের মাধ্যমে উৎপাদন করবে। এই ইউএভিগুলো সামরিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি মানবিক সহায়তা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে। এই চুক্তির ফলে দেশীয় ইউএভি বা ড্রোন উৎপাদনে পূর্ণ স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যে সক্ষমতা সম্প্রসারিত হবে, যা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চাহিদা পূরণে সহায়ক হবে। একই সঙ্গে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ, জ্ঞান বিনিময় এবং দক্ষ অ্যারোস্পেস কর্মশক্তি গড়ে তোলার মাধ্যমে জাতীয় প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতেও উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে।
এ চুক্তি সই অনুষ্ঠানে চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল এস এম কামরুল হাসান, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সচিব মো. সাইফুল্লাহ পান্না, লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের সচিব ড. হাফিজ আহমেদ চৌধুরী, বিমানবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সিইটিসি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিনিধি, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রতিনিধি, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সামরিক ড্রোনের জন্য বিশ্বব্যাপী একটি বাজার তৈরি হয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, যুক্তরাজ্য এবং চীনের মতো শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর নির্মাতারা মিত্র দেশগুলোতে ড্রোন রপ্তানি করছে। ভূ-রাজনৈতিক জোটের পরিবর্তন এবং সামরিক চাহিদা বিকশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশীয়ভাবে উন্নত এবং বিদেশি উভয় ধরনের ড্রোনের চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সুনির্দিষ্ট আক্রমণ মিশনে সক্ষম উন্নত ড্রোন আধুনিক যুদ্ধে বিপ্লব ঘটাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বায়ত্তশাসিত বিমানব্যবস্থা এবং সেন্সর প্রযুক্তির চলমান অগ্রগতির সঙ্গে সামরিক ড্রোনের ভবিষ্যৎ ক্রমেই পরিশীলিত এবং সামরিক কৌশলের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক ড্রোন নির্মাণ ও প্রযুক্তিতে চীন বর্তমানে বিশ্বজুড়ে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। পরবর্তী যুদ্ধে কার কাছে সবচেয়ে বেশি ট্যাংক বা জেট আছে তা বিবেচ্য হবে না, বরং সবচেয়ে বুদ্ধিমান ঝাঁকের নেতৃত্ব কারা দেবে, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। সে ক্ষেত্রে অত্যাধুনিক এআই-সমৃদ্ধ সোয়ার্ম ড্রোন, রাইফেল বহনকারী ড্রোন এবং সিএইচ-৭-এর মতো উন্নত ড্রোন তৈরির মাধ্যমে চীন বিশ্বে যুদ্ধের কৌশল বদলে দিচ্ছে। কম খরচে উৎপাদন ক্ষমতা এবং প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারের কারণে রাশিয়া-ইউক্রেনসহ বিভিন্ন সংঘাতময় পরিস্থিতিতে চীনা ড্রোনের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে, যা তাদের বৈশ্বিক সামরিক আধিপত্য নিশ্চিত করে। এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ২০৩৩ সালে চীনের সামরিক ড্রোন আঞ্চলিক বাজারে শীর্ষস্থানীয় হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ ছাড়া তুরস্ক ও ইরানও এখন উন্নত মানের ড্রোন তৈরি করছে। বাংলাদেশে এ ধরনের ড্রোন তৈরিতে তুরস্কের পক্ষ থেকেও প্রস্তাব ছিল।
চীনের সামরিক ড্রোনগুলোর মধ্যে এআই-সমৃদ্ধ সোয়ার্ম প্রযুক্তির বিশেষ দিক হচ্ছে একসঙ্গে ২০০টির বেশি ড্রোনের একটি সোয়ার্ম বা ঝাঁক নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম, যা একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখে নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। চীনের রাইফেল বহনকারী ড্রোনের বিশেষত্ব হয়েছে, এটি নির্ভুলভাবে রাইফেল চালাতে পারে, যা স্থল বাহিনীর জন্য একটি বড় সহায়তাকারী হিসেবে কাজ করে। এ ছাড়া চীনের অত্যাধুনিক সিএইচ-৭ ড্রোনের বড় সুবিধা হচ্ছে, হাই-স্পিড ও দূরপাল্লার ড্রোন নজরদারি এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। চীন সম্প্রতি উচ্চক্ষমতা ও গতিসম্পন্ন মানববিহীন আকাশযান ‘সিএইচ-৭’-এর পরীক্ষা চালায়। এতে রয়েছে অত্যাধুনিক ক্যামেরা ও সেন্সর। অনেক বেশি উচ্চতায় এটি দীর্ঘ সময় ধরে আকাশে থাকতে পারে। যেকোনো জটিল পরিস্থিতিতে ভূমি পর্যবেক্ষণ এবং ডেটা সহায়তার প্রয়োজনীয়তা মেটাতে সক্ষম অত্যাধুনিক এই ড্রোন।
প্রতিবেশী দেশ ভারতও সামরিক ড্রোন উৎপাদনে দ্রুত স্বাবলম্বী হচ্ছে। দেশটি বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম সামরিক ড্রোন আমদানিকারক হওয়া সত্ত্বেও এখন নিজস্ব ড্রোন উৎপাদনের মাধ্যমে আমদানি নির্ভরতা কমানোর ওপর জোর দিচ্ছে। ভারতের আদানি ডিফেন্স (দৃষ্টি-১০), ডিআরডিও (তপস, আর্চার) এবং আইডাফোর্জের (সুইচ) মতো প্রতিষ্ঠানগুলো নজরদারি ও হামলার সক্ষমতা সম্পন্ন ড্রোন তৈরি করছে। ভারত ইসরায়েলি প্রযুক্তিতে হায়দরাবাদে ড্রোন তৈরির কারখানা স্থাপন করেছে এবং কামিকাজি ড্রোনেরও বড় অর্ডার দিয়েছে। ভারতের এই পদক্ষেপ সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করতে এবং প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে চীন ও পাকিস্তানের তুলনায় সক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করছে।
পাকিস্তানও নিজস্ব প্রযুক্তিতে এবং তুরস্ক ও চীনের সহযোগিতায় সামরিক ড্রোন উৎপাদনের ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। জিআইডিএস ও নেসকমের মতো সংস্থা শাহপার-২, শাহপার-৩, বুরাক এবং উকাবের মতো দূরপাল্লার এবং সশস্ত্র ড্রোন তৈরি করছে। এ ছাড়া তুরস্কের সঙ্গে যৌথভাবে ‘আনকা’ ড্রোন উৎপাদনের চুক্তিও করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীও বিভিন্ন ধরনের ড্রোন ব্যবহার করে, যার মধ্যে রয়েছে এমকিউ-৯ রিপার, আরকিউ-৪ গ্লোবাল হ্যাক, আরকিউ-১১ রাভিন, কে-ম্যাক্সসহ আরও অনেক ধরনের ড্রোন। দেশটির সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে প্রতিটি ড্রোনের একটি অনন্য ভূমিকা রয়েছে।
বিশ্বের প্রধান দুই পরাশক্তি চীন ও যুক্তরাষ্ট্র ড্রোন যুদ্ধের বিস্তার ঘটাচ্ছে। তবে উৎপাদন সক্ষমতার দিক দিয়ে চীন মাসে পাঁচ লাখ এফপিভি ড্রোন তৈরি করতে পারে এবং যুদ্ধের সময়ে সাত লাখ পর্যন্ত তৈরি করতে পারে। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন উৎপাদন ক্ষমতা প্রতি মাসে মাত্র কয়েক হাজার। তবে যুক্তরাষ্ট্র ২০২৮ সালের প্রথম দিকে তিন লাখের বেশি ড্রোন সংগ্রহের একটি বিশাল কর্মসূচি হাতে নিয়েছে, যার লক্ষ্য ২০২৭ সালের মধ্যে দুই লাখের বেশি ড্রোন উৎপাদন সম্পন্ন করা। এ ছাড়া চলতি বছরের জুলাইয়ের মধ্যে ৬০ হাজার ড্রোন উৎপাদনের টার্গেট রয়েছে।